জাফর আহমাদ : | বৃহস্পতিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৪
বাংলার পথে প্রান্তরে, পাড়া, মহল্লায়, অলি-গলিতে সর্বত্রই আজ শিক্ষিত শিক্ষিতে. অশিক্ষিত অশিক্ষিতে, যুবক যুবকে, ছাত্র ছাত্রে, নারী নারীতে এমনকি খেটে খাওয়া মানুষ মানুষে একটিই আলোচনা করতে শোনা যায়, সেটি হলো “দূর্নীতি”। জাতীয় আলাপচারিতার মেন্যুতে দুর্নীতি একটি অত্যন্ত মুখরোচক পরিবেশনা। এক কথায় দুর্নীতি বর্তমান সময়ের টক অব দ্যা কান্ট্রি। সকলেই এ সমস্ত দুর্নীতিবাজদের যতোপযুক্ত শাস্তি কামনা করেন।কিন্তু স্থায়ীভাবে দুর্নীতি দমনের কার্যকরী কোন আলোচনা বা পদক্ষেপের কথা কেউ বলেন না। ক্ষমতার পালাবদলে সকলের মতামত হলো, ‘দূর্নীতিবাজকে ধর, মার ও জেলে পুরো। দক্ষিণ-পূর্ব এশিায়ার সম্ভবনাময় বাংলাদেশটি স্বাধীনতার অর্ধশত বৎসর দুর্নীতির কারণে জর্জড়িত। এই পর্যন্ত যতবারই ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে প্রত্যেক পূর্ববর্তী সরকারের দূর্নীতিবাজকেই শুধু দমন করে এসেছে। কিন্তু দুর্নীতি দমনের জন্য কিছুই করেনি।
ভবিষ্যত প্রজন্ম যাতে দূর্নীতিতে আক্রান্ত না হয় সে জন্য কার্যকরী কোন পদক্ষেপই গ্রহণ করেনি। দূর্নীতির রাস্তা খোলা রেখে দুর্নীতি দমন অনেকটা বাঁধ না বেঁধে পানি সেচ করার মত অবস্থা। নির্ধারিত জায়গাকে পানিশূণ্য করতে হলে সেখানকার পানির উৎস মুলে আগে বাঁধ দিতে হবে। পক্ষান্তরে কোথাও পানি ধরে রাখার জন্য অবশ্যই আগে পানি চলে যাওয়ার ছিদ্রসমুহ বন্ধ করতে হবে। দুর্নীতির উৎসমুলে বাঁধ দেয়ার নিমিত্তে সমাজ অংগন থেকে অপরাধ দুর করার জন্য প্রথমত শিক্ষার সাহায্য নিতে হবে। শিক্ষার মাধ্যমে ব্যক্তির মনে অপরাধের প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি করতে হবে। তিনটি অংগন থেকে ব্যক্তিকে দূর্নীতি বা অপরাধের প্রতি ঘৃণা সৃষ্টির কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। যথাঃ পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং প্রচার মাধ্যম। দূর্নীতিকে ভবিষ্যত বংশধরদের কাছ থেকে দূরে রাখার জন্য এ তিনটি পন্থাই অবলম্ভ^ন করা একান্ত জরুরী।
(১) পরিবারঃ মানব শিশু জন্ম গ্রহণ করার পর যাদের পরিবেষ্টনে আবদ্ব থাকে সেটি সে শিশুর পরিবেশ বলা হয়। ছোট্র এ গন্ডি বা বেষ্টনীর প্রধান দু’জন সদস্য হলো, পিতা ও মাতা, যাকে আমরা পারিবার বলে থাকি। বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে তার পরিবেশেরও সম্প্রসারণ ঘটে। পরিবেশের প্রভাব সম্পর্কে সমাজ ও মনেবিজ্ঞানীগণ ব্যাপক গবেষণা ও আলোচনা করে বলেছেন যে,পরিবেশ মানব শিশুর বিভিন্নমুখী আচরণ, ব্যবহার ও দোষ-গুণের ওপর কার্যকরী প্রভাব বিস্তার করে। ইসলাম বলে, সকল শিশুই ফিতরাত তথা সত্য ও ন্যায়ের যোগ্যতা নিয়ে জন্ম গ্রহণ করে। কিন্তু পরবর্তিতে তার পিতা-মাতা তাদেরকে হয় ভালো বানায় না হয় খারাপ বানায়। শিশুটি যে পরিবেশে বা পরিবারে জন্ম গ্রহণ করে, সেটি যদি তার ফিতরাতের অনুকুল হয়, তবে সে সত্য ও ন্যায়ের উপর টিকে থেকে তার সুকুমার বৃত্তিগুলোকে সুচারুরূপে প্রস্ফুুটিত করতে পারে। আর পরিবেশটি যদি বিপরীতমুখী হয় তবে তার চরিত্র বিপরীতমুখী ধাঁচেই গড়ে উঠে। পারিবারিক পরিবেশ যদি শয়তানী চরিত্রের হয়, সে পরিবেশে লালিত শিশুটি শয়তানের শিরোমনি হবে এটিই স্বাভাবিক।
পরিবার হলো একটি শিশুর জীবন গড়ার প্রাথমিক পাঠশালা। এ পাঠশালার পাঠ্য তালিকায় যে ধরনের বই সিলেকশন করা হবে, শিশুর জীবনের ভীত রচিত হবে সে সিলেবাসেরই উপড়। এ জন্য পরিবারের শক্তিশালী দ’ুজন সদস্য পিতা ও মাতার গুরুত্ব অপরিসীম। পিতা-মাতা যে ধরনের আচরণ,কথা-বার্তা ও কাজ-কর্ম করেন, ছেলে-মেয়ে সে সব অনুসরণ করতে শেখে। ছেলে-মেয়েরা তাদের জীবনের মডেল হিসাবে পিতামাতাকে গ্রহণ করে থাকে। তাই অনুকরণ প্রিয় শিশুর পিতা-মাতা যদি ব্যক্তিগতভাবে সৎ ও আল্লাহভীরু হন এবং পারিবারিক পর্যায়ে নৈতিকতার পরিচর্চা করেন, তাহলে তাদের সন্তানেরাও সেভাবেই গড়ে উঠবে। ছেলে-মেয়েদের নৈতিক চরিত্র গঠন করা পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের মৌলিক অধিকার। এ অধিকার থেকে তাদেরকে বঞ্চিত করা সুষ্পষ্ট জুলুম হিসাবে বিবেচিত হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন: “ তোমাদের নিজেদেরকে ও পরিবার পরিজনকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করো।”(আল-কুরআন) রাসুলে করীম সাঃ বলেছেনঃ “সুন্দর নৈতিক চরিত্র ও শিষ্টাচার শিক্ষা দেয়ার চাইতে উত্তম কিছুই মা বাপ সন্তানদের দান করতে পারে না।”(তিরমিযি)
(২) শিক্ষা প্রতিষ্ঠানঃপরিবারের পর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হলো, একটি শিশুর জীবন গড়ার সেকেন্ডারী পাঠশালা। এ পাঠশালার পাঠ্য তালিকাও একটি শিশুর জীবনের ভীত রচনায় মুখ্য ভুমিকা পালন করে। শিক্ষার উপর ভিত্তি করেই গড়ে ওঠে জাতিসত্বা ও সভ্যতার অবকাঠামো। জাতীয় চরিত্র গঠন এবং জীবনের সকল ক্ষেত্রে ও বিভাগে নেতৃত্ব দানের উপযোগী সৎ নেতৃত্ব গড়ে উঠে শিক্ষার মাধ্যমে। কিন্তু আমাদের বর্তমান শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে আধুনিক ও অবাধ ভোগবাদী পৃথিবীর মনোভাবাপন্ন সিলেবাস চালু আছে। যা আলোকিত লোক তৈরীর সম্পূর্ণ অনোপযোগী। যার বাস্তব ফল আমরা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। বর্তমানে গ্রেফতারকৃত দুর্নীতিবাজদের একটা বিরাট অংশ উচ্চ শিক্ষিত। অথচ বলা হয় শিক্ষাই আলো। আমার প্রশ্ন এ সমস্ত আলোকিত উচ্চশিক্ষিত লোকগুলো কেন আজ অন্ধকার জগতের বাসিন্দা? প্রকৃতপক্ষে উচ্চশিক্ষিত হওয়া আর সৎ লোক হওয়া এক কথা নয়। সৎ ও আধুনিক যোগ্য লোক গঠনের জন্য অবশ্যই আধুনিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রায় সমান্তরালভাবে নৈতিক শিক্ষা একান্ত প্রয়োজন। কর্মমুখী আধুনিক শিক্ষার পাশাপাশি অবশ্যই নৈতিক শিক্ষার সমন্বয় ঘটাতে হবে। কোন বিষয়ে উচ্চশিক্ষিত হিসাবে গড়ে তোলার পাশাপাশি অপরাধের প্রতি ঘৃণা এবং অপরাধ থেকে বেঁেচ থাকার মনোভাব সৃষ্টির ব্যবস্থা করতে হবে।
নৈতিক শিক্ষার মাধ্যমে মানুষ তৈরী করা হলে এরা দুর্নীতি করবে তো দুরের কথা বরং কোন অপরাধ সংঘটিত হয়ে গেলে, বিবেকের কষাঘাতে টিকতে না পেরে নিজের অপরাধের বিচার নিজেই প্রার্থনা করবে। আগাছা রোপণ করে কেউ যদি আম-কাঠালের আশা করে তবে এটি তার জন্য বোকামী হবে। দূর্নীতির সদর দরজা খোলা রেখে দৃর্নীতি দমন হবে না। এ জন্য রাসুলের পন্থায় আলোকিত সোনার মানুষ তৈরীর জন্য আমাদের সেই কুরআন যা আজো অবিকৃত অবস্থায় রয়েছে, সেটিকে আমাদের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বাধতামূলক সিলেবাসে অন্তর্ভূক্ত করতে হবে।
(৩) প্রচার মাধ্যমঃদেশের প্রচার মাধ্যমগুলো দূর্নীতি উচ্ছেদে শক্তিশালী ভুমিকা পালন করতে পারে। সরকার মিডিয়াগুলোকে নৈতিকতা সম্পন্ন অনুষ্ঠান প্রচারের জন্য বাধ্য করতে পারে। এ জন্য মিডিয়ার স্বাধীনতা ক্ষুন্ন হবে না। কারণ দেশ ও জাতির কল্যাণের জন্য এ ধরনের বাধ্যবাধকতা কারো স্বাধীনতাকে ক্ষুন্ন করে না। অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো, অধিকাংশ মিডিয়াগুলো এমন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর দখলে যারা নীতি-নৈতিকতার ধার ধারে না। যারা মানুষকে মানুষ বানাবার পরিবর্তে বাঁদর বানাবার চেষ্টায় লিপ্ত। আমাদের দেশের মিডিয়াগুলো স্বাধীনতার নাম করে ভয়ঙ্কর স্বেচ্ছাচারিতার রূপ ধারণ করেছে। দেশের মানুষের চরিত্র হননের সাথে সাথে সমাজ ভাঙন ও জাতিসত্তা বিনষ্টেরজন্য কার্যকরী ভুমিকা পালন করছে। এমন সব জিনিস প্রচার করে, যা একটি মারাত্মক বোমার চেয়েও অধিক ক্ষতিকর। বোমা একটা নির্দিষ্ট আওতায় কিছু লোকের জান-মালের ক্ষতি করে থাকে। কিন্তু একটি খারাপ কথা সমাজ ভাঙ্গনের কার্যকরী হাতিয়ার হিসাবে কাজ করে থাকে। ইতারে ভেসে ভেসে তার ধ্বংসের আওতার বিস্তৃতি ঘটায়। সমাজকে বিভিষিকাময় পরিস্থিতির সম্মুখীনে এনে দাঁড় করায়। সমাজে ভ্রাতৃত্ববোধের স্থান দখল করে নেয় হিংসা-হানাহানি, বিদ্বেষ আর অহংবোধ। ফলে মানুষ চরম দুঃখ-দূর্দশার সম্মুখীন হয়। সুতরাং সরকারের এখনি সময় এ ধরনের স্বেচ্ছাচারিতাকে নিয়ন্ত্রণ করে প্রচারমাধ্যমকে নৈতিকার বিকাশে কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়ার জন্য বাধ্য করা।
আর একটি বিষয় সরকারকে পরামর্শ দিতে চাই সেটি হলো, মসজিদের দেশ বাংলাদেশ। বাংলাদেশের এমন কোন মহল্লা পাওয়া যাবে না যেখানে একটি মসজিদও নেই। এলাকার বাসিন্দাগণ মসজিদের ইমাম সাহেবকে সম্মানের চোখে দেখে থাকে। সুতরাং প্রচার মাধ্যম হিসাবে এবং সুস্থ সমাজ গঠণে এসব মসজিদের ইমামগণ বিশেষ ভূমিকা পালন করতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্রীয়ভাবে পৃষ্টপোষকতা না থাকার দরুন সমাজের মর্জির ওপর তাঁদের চলতে হয়। তাঁদের অনেকেই সত্য কথা বলতে পারেন না। অবহেলিত এ সব ইমামদের কাজে লাগাবার জন্য দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেম ওলামা ও ইসলামী স্কলারদের নিয়ে একটি স্থায়ী কমিটি গঠণ করা যেতে পারে। তারা ইমামদের জন্য বিভিন্ন কর্মর্সুচী প্রণয়ণ করবেন। গতানুগতিক খুতবার স্থলে সমাজ ও সভ্যতার বিকাশমূলক অভিন্ন খুতবা তৈয়ার করবে। আমি মনে করি যদি তাঁদেরকে সরকারীভাবে এ ধরনের পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া হয় তবে দূদক ও অন্যান্য সংস্থা থেকে এঁরা সমাজকে আরো অধিক কিছু দিতে পারবে।
সরকারের এখনি সময় উপরোল্লেখিত তিনটি বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করার। অন্যথায় দূর্নীতি নতুন নতুন কৌশল ও রূপ ধারন করে আরো প্রবলাকার নিয়ে আত্ম প্রকাশ করবে এবং আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মকে গ্রাস করবে।
Posted ১০:৩৪ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৪
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh