রাজীব নন্দী | শুক্রবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৪
রাজীব নন্দী
সকালে উঠে কাগজ পড়লাম। মনটা খারাপ। ১৫ বছরের লুটপাট ও শোষণ শেষে দেশ থেকে পালাচ্ছে আওয়ামী লীগের বড় বড় নেতারা। এরাই আমাদের দেশ চালিয়েছিলো! এরাই আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বয়ান দিয়েছিলো। এরাই আমাদের হর্তা কর্তা বিধাতা হয়ে আমাদের ভাগ্য নিয়ন্ত্রক ছিলেন! এরাই তো মঞ্চে উঠে মাইক হাতে নিয়ে অনর্গল অনলবর্ষী বক্তৃতায় প্রতিপক্ষকে ধরাশায়ী করতেন!
এরা পালাচ্ছে ভারতে। বাংলাদেশের তিন দিকে ঘেরা ভারত তাঁদের আশ্রয়স্থল। প্রতিবেদন পড়ে জানলাম, ভিসা পাসপোর্টহীন এই নেতাদের প্রতি ভারতের ইমিগ্রেশন বেশ দয়ালু। সীমান্ত ঘেঁষা মেঘালয়, আসাম, ত্রিপুুরা, বেনাপোল, পঞ্চগড়ে এখন শত শত আওয়ামী লীগের নেতা।
সংবাদে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ এবং অন্যান্য সংগঠনের সাবেক ও বর্তমান নেতাদের মধ্যে অন্তত ২৭ জনের দেশ ছাড়ার খবর জানা গেছে। তবে দেশ ছেড়ে পালানো ব্যক্তিদের প্রকৃত সংখ্যা কয়েক শ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সিলেট, আখাউড়া (ব্রাহ্মণবাড়িয়া), নেত্রকোনা ও ময়মনসিংহ (হালুয়াঘাট), যশোর অঞ্চল, লালমনিরহাটসহ উত্তরাঞ্চলীয় সীমান্ত এলাকাগুলো দিয়ে দেশ ছাড়ার প্রবণতা বেশি। এ জন্য জনপ্রতি ৫০ হাজার থেকে ২৫-৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত দিতে হয় সীমান্তের দুই পাশের দালালদের। এই যে রাতের আঁধারে হিজরতের উদ্দেশ্যে শত শত দুর্নীতিবাজ, গণহত্যার আসামীরা যে সীমান্ত পেরুলো বা পেরুচ্ছে কিংবা পার হবে; তাঁদের জন্য ভারতের উতলে পড়া দরদ দেখে অবাক হচ্ছি।
প্রতিবেদনের শেষে রয়েছে একদম আসল তথ্য। যেখানে লেখা আছে, বিত্তশালী নেতাদের পলায়নে বিপদে আছে সারাদেশের কর্মীরা। যারা জীবন বাজি রেখে দলটি করতো! প্রথম আলো লিখলো, “দেশ ছাড়ার পর নেতারা আর দেশে থাকা নেতা-কর্মীদের খোঁজ নিচ্ছেন না। অনেকে আগের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরসহ ফেসবুক ও মেসেঞ্জার বন্ধ রেখেছেন। বিপদে আছেন তৃণমূলের অসচ্ছল নেতা-কর্মীরা।”
এই দৃশ্য জীবদ্দশায় দেখবো বলে ভাবিনি। কিন্তু বিধাতার লীলা বোঝা ভার।
গত ৮ বছরে কনফারেন্স, সেমিনার ও পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসার জন্য অসংখ্যবার ভারত গিয়েছি। ভারতের বিখ্যাত সব বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠানের আমন্ত্রণে ২০বারেরও বেশি সসম্মানে ভারতের নানান প্রদেশ ঘুরেছি। ভারতের সাধারণ জনগণের সাথে মিশে দেখেছি, তাঁদের বেশিরভাগই সেদেশের কর্তৃত্ববাদী মৌলবাদী শাসন নিয়ে অসন্তুষ্ট। ভারতে গিয়ে নানান জায়গায় ঘুরে ঘুরে ভারতের নানান বৈশিষ্ট্য জানার চেষ্টা করেছি। যাক, সেসব কথা!
সারারাত ভিসার লাইনে দাঁড়িয়ে, ভিসা ফরম পূরণ করে, শত ভোগান্তির পর আমরা কলকাতা, দার্জিলিং, চেন্নাই, কাশ্মীর যাওয়ার ভিসা পেতাম। একটি কনফারেন্সে যাওয়ার জন্য ভিসা আবেদন করে কত যে ভোগান্তিতে পড়তে হতো আমার কলিগদের! আমার প্রয়াত বাবা, মেডিক্যাল ভিসা নিয়ে আখাউড়া সীমান্তে কত যে অবর্ণনীয় কষ্ট পেয়েছেন তা আমি ভুলবো না। ভিসা নীতিতে ভারত বরাবরই এ দেশের সাধারণ মানুষকে তাচ্ছিল্য ও অবহেলা করেছে। অথচ ভারতে চিকিৎসা, বিয়ের শপিং ও পর্যটনের বড় ভোক্তা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষজনই।
আমরা ভারতে যেতে কাঠখড় পোড়াতে হতো, আজ বড় বড় ক্রিমিনালরা পয়সা দিয়ে ভারতে ঢুকছে! আমরা সবসময়ই বলে এসেছি, ভারতের সাধারণ মানুষ, ভারতের প্রকৃতি, ভারতের চিকিৎসা অবকাঠামোর প্রতি আমরা কখনোই বৈরী নই। কিন্তু ভারত সবসময়ই বাংলাদেশ= আওয়ামী লীগ সমীকরণে ভাবতে অভ্যস্ত ছিলো। আর আজ দেখছি তার খেসারত!
গত দেড়মাসে দুই দেশের রেল ও সড়কপথের বাস যোগাযোগ বন্ধ। ভিসা সংকটে যাত্রী অপ্রতুলতায় বিমানের উড়ানও কমে গেছে স্মরণকালের সবচেয়ে কমে। খোঁজ নিলে দেখা যাবে, চেন্নাই, ব্যাঙালুরু, হায়দরাবাদ, কলকাতা ও দিল্লির বড় বড় হাসপাতালগুলো ধুঁকছে। এইবছর পূজায় দার্জিলিং, আগরতলা ও কলকাতা যাওয়ার কোনো ব্যবস্থা নাই! ফলে ভারত তার বিদেশনীতির কারণেই একটি বড় পর্যটক হারাচ্ছে! বৈধভাবে আমরা যারা ভারতে যাই, ঘুরি, শিক্ষা ও গবেষণায় দুই দেশের যুথবদ্ধতার জন্য ভাবি, তাঁদের জন্য সীমান্ত বন্ধ কিন্তু গণহত্যাকারী ও দুর্নীতিবাজদের জন্য ভারতমাতা তাঁর দুই বাহু প্রশস্ত করে রেখেছে!!
এতকিছুর পরও তবুও শান্তি এটাই যে; “দেশ ছেড়ে অন্তত পালাতে হচ্ছে না আমাদের।”
মহাভারতে যুধিষ্ঠির এবং যক্ষের প্রশ্নোত্তর পর্বে যুধিষ্ঠির বলেছিলো- ‘পঞ্চমেইহনি ষষ্ঠে বা শাকং পচতি স্বে গৃহে। অনৃণী চাপ্রবাসী চ স বারিচর মোদতে।’ অর্থাৎ, অঋণী ও অপ্রবাসী হয়ে দিনের পঞ্চম বা ষষ্ঠভাগে যিনি নিজ বাড়িতে শাকান্ন রান্না করে খেতে পারেন তিনি জগতের সুখী ব্যক্তি। ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকার পতনের এক মাস পরও আওয়ামী লীগের অনেক নেতা-কর্মী, সাবেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য অবৈধভাবে দেশত্যাগের চেষ্টা করছেন। ইতিমধ্যে অনেকে দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছেন। যুধিষ্ঠিরের উক্তিটি তাঁরা কতটুকু বুঝবে জানি না, কারণ তাঁদের নিজ বাড়ি দৃশ্যত ‘বাংলাদেশ’ হলেও পৃথিবীর অনেক জায়গায় তাঁদের সেকেন্ড হোম! ফলে তাঁরা আদৌ প্রবাসী হবেন কিনা সেটাও একটি প্রশ্ন। বরং আমরা বলতে পারি, দেশ জঞ্জালমুক্ত হচ্ছে! আমাদের আশা, গণহত্যার আসামী ও চরম অগণতান্ত্রিক শক্তি একটি দলের দিকে একচোখা মনোভাব ত্যাগ করে ভারত তার পররাষ্ট্র ও ভিসানীতি চালু করবে। এতে দুই দেশের সাধারণ মানুষেরই লাভ!
লেখক: রাজীব নন্দী, অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
Posted ৫:৫৯ পূর্বাহ্ণ | শুক্রবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৪
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh