শিবলী আজাদ : | বৃহস্পতিবার, ১৪ নভেম্বর ২০২৪
একাত্তেরর যুদ্ধে কতজন নিহত হয়েছিল, তর্কের আজও অবসান হয়নি। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তর্কটি জিয়ে রাখা হয়। নইলে, সেন্সাসে আনুমানিক সংখ্যাটি বের করা যেত। ত্রিশ লাখ সংখ্যাটি যে অতি উর্বর কল্পনা প্রসুত, বলে দিতে হয় না। বছর দশেক আগে ‘দ্য ল্যানসেট’ জার্নালের এক লেখায় এপ্লাইড স্ট্যাটিস্টিকসের সূত্র প্রয়োগ করে বৃটিশ দুই গবেষক সংখ্যাটি ৫৬ হাজারের কাছাকাছি বলেছিলেন। তাতে হৈ হৈ রব পড়ে যায়। মুনতাসীর মামুন, শাহরিয়ার কবীর প্রমুখ বিবৃতি দিয়ে রীতিমত হিক্কা তুলে ইতিহাস বিকৃতির কান্না জুড়ে দেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ভুলন্ঠিত করার পেছনে পাক ষড়যন্ত্রের অস্তিত্বও দাবী করেন তারা। ষড়যন্ত্রের কোন প্রমান অবশ্য দাখিল করেননি তারা।
শুনেছি, আশির দশকে জেনারেল এরশাদের নির্দেশে বাংলাদেশ সরকার একটি স্যাম্পল সেন্সাস করেছিল। সেন্সাসে সংখ্যাটি আড়াই লাখের মতো হয়। রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে প্রতিবেদনটি সরকার আর প্রকাশ করেনি। কথাটি আমি শুনেছিলাম বাম মহলে পরিচিত তথ্য মন্ত্রণালয়ের এক সিনিয়র আমলার মুখে, নিজেও যিনি প্রতিষ্ঠিত লেখক। এদিকে, ১৯৯০/৯১ সালে ঢাকায় বেড়াতে আসেন জেনারেল অরোরা। সাপ্তাহিক বিচিত্রার জন্যে মুনতাসীর মামুন ও শাহরিয়ার কবীর জেনারেল অরোরার সাক্ষাৎকার কাভার স্টোরি হিশেবে প্রকাশ করেন। সাক্ষাৎকারের এক প্রশ্নের উত্তরে জেনারেল অরোরা মৃতের সংখ্যা ৫০ হাজারের মতো বলেছিলেন।
নিহতের সংখ্যা পঞ্চাশ হাজার হলেও কম নয়। যে কোন বিচারে সেটিও গণহত্যা। কিন্তু সমস্যা অন্যত্র। বাংলাদেশে ইতিহাসচর্চা তথ্য নির্ভর নয়। আর আছে তথ্য ব্যবসা, ন্যারেটিভের ব্যবসা। মুক্তিযুদ্ধ ও যুদ্ধের ন্যারেটিভ বাংলাদেশে অনেকের জীবিকার উৎস। সত্য-মিথ্যা মিলিয়ে গপ্প বলা রুটি-রুজির মামলা। বলাবাহুল্য, সংখ্যার ব্যবসায় সর্ব-অগ্রগন্য মুনতাসির মামুন ও শাহরিয়ার কবীর। দুজনে আবার আওয়ামী ঘরানার অগ্রগন্য প্রোপাগান্ডিস্ট রূপে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছেন।
মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন স্পট কিলিং-এর সংখ্যা বাড়িয়ে বিগত পঞ্চাশ বছর চেতনার নামে আবেগের যে ব্যবসা ফাঁদা হয়েছে, তার আনুপূর্বিক বিশ্লেষণ করেছেন অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির ইতিহাসের যশস্বী অধ্যাপিকা শর্মিলা বসু। বসুর বক্তব্যঃ পাকবাহিনীর সিস্টেমেটিক্যালী গণহত্যার কোন প্ল্যান ছিল না। সেটা অবশ্য পাক আর্মীর মহানুভবতা কিংবা মানবপ্রেমের লক্ষণ নয়। না থাকাটা মূলত পাক সামরিক পরিকল্পনার ত্রুটি। ২৫ মার্চের ক্র্যাকডাউন যে সিভিল ওয়ার শুরু করবে, পাকিস্তানি আর্মি ধারণাই করেনি। আগেভাগে ম্যাস-কিলিং বা জেনোসাইডের কোন প্ল্যান তারা তৈরি করেনি। বড় হত্যাকাণ্ডগুলো, যেমন সাতক্ষীরার চুকনগরে যেটা হয়েছে, অন দ্য স্পার অব মোমেন্টে, স্থানীয় কম্যান্ডারের সিদ্ধান্তে। কেন্দ্রীয় পরিকল্পনার অংশ হিশেবে নয়।
যুক্তির পক্ষে শর্মিলা বসু গোপন দলীল দস্তাবেজ ঘাটাঘাটি ছাড়াও তৎকালীন পাকিস্তানি জেনারেলদের সাক্ষাতকার নিয়েছেন। অধ্যাপক বসু তার বিশ্লেষণে মুনতাসীর মামুন ও শাহরিয়ার কবীরের সংখ্যা বাণিজ্যের সমালোচনাও করেছেন। একে তো কলকাতার কায়স্থ হিন্দু, আবার নেতাজী সুভাষ বসুর দৌহিত্রী, ওদিকে হার্ভার্ড পাশ এবং অক্সফোর্ডের অধ্যাপিকা, ফলে না মামুন না কবীর, শর্মিলা বসুর বইটিকে চ্যালেঞ্জ করার সাহস ওদের হয়নি। মিনমিনে গলায় মুনতাসীর মামুন “বাঙালি মেয়ের পাকিস্তানি প্রেম” নামক নীতিদীর্ঘ এক প্রবন্ধ লিখেই কাজ সেরেছেন। বসু যেভাবে পরিসংখ্যান ধরে যে আলোচনা করেছেন, তা খারিজ করার ধারে কাছেও যাননি মামুন।
শর্মিলা বসু কিন্তু নিহতের সংখ্যা গুনতে বসেননি। সেটা তার অভিপ্রায় নয়, বইটির উদ্দিষ্টও নয়। বাংলাদেশে ৭১-এর গণহত্যার ধরণ ও জনশ্রুতির পর্যালোচনা এই বই। বাংলাদেশে ৭১-এর গণহত্যা অধ্যয়নে এই বইটিই প্রথম তাত্ত্বিক আলোচনা এবং খুব গুরুত্বপূর্ন এক কাজ। শুনেছি, বইটির বাংলা অনুবাদও হয়েছে। আমি অবশ্য দেখিনি।
নিউ ইয়র্কের কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটি প্রেস বইটির প্রকাশক।
Posted ১০:৩৪ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ১৪ নভেম্বর ২০২৪
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh