কাজী জহিরুল ইসলাম : | বৃহস্পতিবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০২৪
“রাজনৈতিক দলগুলো না চাইলে সংস্কার হবে না, তারা চাইলে নির্বাচন দিয়ে দিব” – অন্তর্র্বতীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের এই বক্তব্যে আমি হতাশ হয়েছি। আমার ধারণা, যারা, ডেইলি স্টারের পক্ষ থেকে পত্রিকাটির সম্পাদক মাহফুজ আনামের নেওয়া সাক্ষাৎকারটি শুনেছেন, তারা সকলেই হতাশ হয়েছেন। এর পরের বাক্যটি ছিল আরো বেশি হতাশাজনক, তিনি বলেছেন, “জনগণ পর্যন্ত যেতে পারবো না, রাজনৈতিক দল পর্যন্তই।
জনগণের কাছে যেতে হলে আবার একটা রেফারেন্ডাম…” বাক্যটি তিনি শেষ না করলেও আমরা তার দেহের এবং মুখের অভিব্যক্তি দেখে বুঝেছি তিনি বেশ বিরক্ত, হতাশ এবং ক্লান্ত। তাঁর দেহভাষা বলছে, হে জাতি আমাকে ক্ষমা করো, বিদায় দাও, আমি আর পারছি না। অথচ দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিন থেকে বেশ অনেক দিন পর্যন্ত তাঁকে রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নে আপোষহীন মনে হয়েছিল। মনে হয়েছিল ফ্যাসিবাদের যাঁতাকলে পড়ে বৈষম্যের যে অন্ধকারে নিপতিত হয়েছে এই জাতি, সেখান থেকে জাতিকে টেনে তোলার এক দৃঢ় সংকল্প তিনি ধারণ করেন।
বিপ্লবের যে আকাঙ্খা এর সঙ্গে ড. ইউনূস একাত্ম। আমাদের অনেক পরিণত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের মতো তিনি নষ্ট স্রোতে গা ভাসিয়ে দেবার মানুষ নন, তারুণ্যের প্রত্যাশা তিনি সঠিকভাবে বুঝতে পেরেছেন। আমি এখনও বিশ্বাস করি সেই বোধ এবং বিশ্বাসের মধ্যেই তিনি আছেন, হয়ত বড়ো বেশি ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। ঠিক এই সময়টাতে আমাদের উচিত হবে তার পাশে থাকা, তার হাতকে শক্তিশালী করা এবং তার চিন্তার ও অভিব্যক্তির, যা কথায় এবং কাজে প্রতিদিন প্রকাশিত, ত্রুটিগুলো ধরিয়ে দেয়া। যখন থেকে তাঁকে চিনি, সব সময়ই দেখেছি তিনি খুব অস্থির এবং সব বিষয়ে খুব তাড়াহুড়ো করেন। এটিকে আমি সব সময় তাঁর সৃজনতাড়না হিসেবে ইতিবাচকভাবেই দেখেছি।
শুধু একবার, যখন নাগরিক শক্তি নাম দিয়ে রাজনৈতিক দল গঠন করলেন এবং তিন মাসের মধ্যেই ঘোষণা দিয়ে বিলোপ সাধন করলেন তখন মেনে নিতে পারিনি, তখন তাঁর চিন্তাকে, দল গঠন এবং বিলোপসাধন, দুটোকেই অপরিণত চিন্তা বা তাড়াহুড়ো দোষে দুষ্ট মনে হয়েছে। তবুও বহুদিন ধরেই এই স্বপ্ন দেখেছি এই পোড়া দেশে ওই একজনই পরিক্ষীত সৎ এবং যোগ্য মানুষ আছেন যিনি এই দুখিনী বাংলা মায়ের দুঃখ ঘোচাতে পারেন, শুধু অপেক্ষা করেছি একদিন যেন সেই শুভসময় আসে, তিনি যেন এই দেশের হাল ধরেন। আমাদের সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছে, তিনি হাল ধরেছেন।
কিন্তু আজ তিনি যখন বলেন, “জনগণ পর্যন্ত যেতে পারবো না, তাহলে আবার একটা রেফারেন্ডাম…” তখন আমরা তার পরাজিত কণ্ঠস্বর শুনি। তার পরাজয় মানে এদেশের আঠারো কোটি মানুষের পরাজয়। তিনি আজ আর শুধু ড. ইউনূস নন, তিনিসহ এই অন্তর্র্বতীকালীন সরকার জুলাই অভ্যুত্থানের স্বপ্নের নির্যাস। যে স্বপ্ন রচিত হয়েছে দুই হাজার শহীদের রক্ত দিয়ে, পঁয়ত্রিশ হাজার আহত বিপ্লবী ও তাদের পরিবারের দীর্ঘশ্বাস দিয়ে। “জনগণের কাছে যেতে পার না” বাক্যটি সেই রক্তের সাথে, সেই দীর্ঘশ্বাসের সাথে তামাশা করার মতই শোনায়।
খুব স্পষ্ট করেই আমাদের উচিত হবে তাঁকে মনে করিয়ে দেওয়া যে তাঁর নেতৃত্বে এই অন্তর্র্বতীকালীন সরকার গঠনের পথ কোনো রাজনৈতিক দল নির্মাণ করে দেয়নি। এই পথ নির্মাণ করেছে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ, এদেশের সাধারণ ছাত্র-জনতা। সেই সাধারণ মানুষের মধ্যে সকল রাজনৈতিক দলের, সকল মতের মানুষ ছিল, শুধু ছিল না তাদের কোনো রাজনৈতিক পরিচয়, তারা সকলেই জুলাই মাসে নতুন বাংলাদেশ গড়ার জন্য রাজপথে নিজের জীবন দিতে নেমে এসেছিলেন একেকজন অকুতোভয় দেশপ্রেমিক বাংলাদেশী হিসেবে, বিএনপি হিসেবে নয়, জামায়াত হিসেবে নয়। কাজেই আজ সংস্কারের প্রশ্নে যদি কারো সঙ্গে বোঝাপড়া করতে হয় তা করতে হবে সেই অগ্নিস্ফুলিঙ্গের সঙ্গে, যে স্ফুলিঙ্গ পুড়িয়ে দিয়েছে ফ্যাসিবাদের প্রাসাদ।
প্রকৃতপক্ষে “আবার একটা রেফারেন্ডাম” এর কোনো প্রয়োজনও তো নেই। রেফারেন্ডামের মধ্য দিয়ে কি আমরা এই সরকার গঠন করেছি? যে জনস্রোত সরকার গঠন করেছে তারাই তো একই সঙ্গে ঠিক করে দিয়েছে কী হবে এই সরকারের দায়িত্ব। এবং সেই দায়িত্ব এই সরকার ঠিকঠাক মত বুঝেই ৬টি সংস্কার কমিশন গঠন করেছে। সরকার তো ঠিক রাস্তায়ই হাঁটছিল, হঠাৎ রাজনৈতিক খানাখন্দে পড়ে হোচট খেলে তো চলবে না।
যে লক্ষ্য ঠিক করেছেন সেই লক্ষ্য থেকে এক চুল এদিক-সেদিক হবার কি এই সরকারের কোনো সুযোগ আছে? সংস্কারের লক্ষ্যই কি এই সরকারের একমাত্র বৈধতা এবং ম্যান্ডেট নয়? এখান থেকে বিচ্যুত হওয়া মানেই কি বৈধতার ভিত নড়ে যাওয়া নয়? বরং ড. ইউনূস যেটা বলেছেন, “রাজনৈতিক দলগুলো সংস্কার না চাইলে হবে না, নির্বাচন দিয়ে দেব” – এই পথে পা বাড়াবার কোনো ম্যান্ডেট বা বৈধতা এই সরকারের নেই। যদি এটা করতে চান তাহলেই বরং সরকারকে জনগণের কাছে যেতে হবে, রেফারেন্ডামের আয়োজন করতে হবে। কারণ জনগণ আপনাদের এই ম্যান্ডেট দেয়নি, এই কাজের জন্য অন্তর্র্বতীকালীন সরকার গঠন করেনি। তাহলে কি সরকার নির্বাচন করবে না? হ্যাঁ অবশ্যই করবে, সেটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই আসবে, নির্বাচন না হলে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার হবে কী করে? নির্বাচন তো হতেই হবে। তবে নতুন বাংলাদেশের মানুষের জন্য কেমন নির্বাচন হবে, কেমন সংবিধানের আলোকে হবে, এগুলো ঠিক না করে আপনি কোন নির্বাচন করবেন? আবার একটা ফ্যাসিস্ট সরকার তৈরি করার নির্বাচন? তা হতেই পারে না।
আপনাদের একথা মনে করিয়ে দিতে চাই, এদেশে অতীতেও এমন অনেক অরাজনৈতিক সরকার গঠিত হয়েছিল। তাদের কথা শ্রদ্ধাভরে কেউ উচ্চারণ করে না। যদি আপনারা সত্যিকার অর্থে জুলাই বিপ্লবের প্রত্যাশা অনুযায়ী একটি বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশের ভিত্তি নির্মাণ করে দিয়ে যেতে না পারেন, যা কেবল রাষ্ট্র সংস্কারের মধ্য দিয়েই অর্জন করা সম্ভব, তাহলে আপনারাও বাংলাদেশের ইতিহাসের অতল অন্ধকারে তলিয়ে যাবেন। যদি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আবার একটি ফ্যাসিস্ট সরকার প্রতিষ্ঠিত হয় তাহলে জুলাই বিপ্লবে নিহত, গণতন্ত্রের জন্য, সুশাসনের জন্য গত ৫৩ বছরে প্রাণ বিসর্জন দেওয়া সকল শহীদের আত্মা আপনাদের প্রতি অভিশাপ বর্ষণ করবে, এদেশের স্বপ্নচারী সহজ-সরল কোটি কোটি খেটে-খাওয়া মানুষ আর কোনো দিন কাউকে বিশ্বাস করবে না, মানুষের হৃদয়ে শাসক সম্পর্কে একটি স্থায়ী অবিশ্বাস তৈরি হবে। প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস নিজেও একাধিকবার বলেছেন, আমাদের ব্যর্থ হবার কোনো সুযোগ নেই, এই বাক্যটির সঙ্গে আমি আরো একটি বাক্য যোগ করে দিই, আমাদের ভুল করবারও কোনো সুযোগ নেই।
Posted ১২:৫৪ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০২৪
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh