কাজী জহিরুল ইসলাম : | বুধবার, ২৫ ডিসেম্বর ২০২৪
বাহার ভাই খুব সৌভাগ্যবান মানুষ। তিনি প্রাইজবন্ডের প্রথম পুরস্কার পেয়েছেন। তাও একবার নয়, দুবার। আর ছোটোখাটো পুরস্কার তো পেয়েছেন বহুবার। মেধাবী ছাত্র ছিলেন, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে স্ট্যান্ড করেছেন। মেডিকেলে পড়েছেন। বিসিএস দিয়ে মেডিকেল অফিসার হয়েছেন। পরে যোগ দেন পুলিশ সার্ভিসে। অসম্ভব বিনয়ী, সৎ এবং প্রফেশন্যাল অফিসার। এমন মানুষ ডিপার্টমেন্টের সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত যাবেন এই প্রত্যাশা তিনি যেমন করতে পারেন, আমরাও করতে পারি। কিন্তু তা ঘটেনি। আমি যখন ২০১১ সালের নভেম্বর মাসে একটি অস্থায়ী পোস্টিং নিয়ে জাতিসংঘের সদর দফতর নিউইয়র্কে আসি বাহার ভাই তখন এখানে কাজ করেন। পুলিশের পোশাক খুলে সিভিল পোশাকের একজন কর্মকর্তা।
এখানে আসার আগে তিনি ছিলেন ডিআইজি। জাতিসংঘে বাহার ভাই কাজ করছিলেন পলিটিক্যাল এফেয়ার্স ডিপার্টমেন্টের ইউনিফর্মড পার্সোনালিটি শাখায়। আমার আরেক বন্ধু লে. কর্নেল তোফায়েল আহমেদও (পরে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হয়ে অবসরে যান) তখন সেকেন্ডমেন্টে জাতিসংঘ সদর দফতরে কাজ করছিলেন। আমরা তিনজন প্রতিদিন দুপুরে একসঙ্গে লাঞ্চে যেতাম। ম্যানহাটনের বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় ঘুরে ঘুরে খেতাম। মাঝে-মধ্যে তোফায়েল ভাই মিস করলেও বাহার ভাই আর আমি কখনোই মিস করতাম না।
বাহার ভাই যেহেতু নিজেই জানতেন তিনি একজন সৌভাগ্যবান মানুষ তাই লটারির টিকিট কেনার প্রতি তার একটা ঝোঁক ছিল। একদিন লাঞ্চ থেকে ফেরার পথে একটি দোকানের সামনে আমরা থমকে দাঁড়াই। ওটা ছিল লটোর দোকান। বাহার ভাই বলেন, কাজী ভাই, চলেন লটারির টিকিট কিনি। আমি নিমরাজি থাকলেও দোকানে ঢুকি এবং দুজন কিছু স্ক্রাচকার্ড কিনি। দশ ডলারের স্ক্রাচ কার্ড ঘষে আমি বিশ ডলার পাই, সেই বিশ ডলার দিয়ে আবার কার্ড কিনি, এবার পাই মাত্র দুই ডলার। বাহার ভাই সেদিন কিছুই পাননি। এরপর আমরা প্রায়ই লাঞ্চ থেকে ফেরার পথে ওই লটোর দোকানটিতে যেতাম। একদিন বাহার ভাই তার কার্ড স্ক্রাচ করে আমার দিকে একটা রহস্যের হাসি দিয়ে কার্ডটা পকেটে রেখে দেন। আমি জিজ্ঞেস করি, কিছু পেলেন?
তিনি আরো গভীর রহস্যের হাসি দিয়ে বলেন, বলবো না। এরপর সেই কার্ডে কী আছে তা দেখার জন্য দুজন স্কুলের ছাত্রদের মধ্যে একে অন্যের পেছনে ছোটাছুটিও করি। শুধু তাই না, সন্ধ্যায় তার বাসায় গিয়েও হাজির হই। বাসায় যাবার অবশ্য আরো একটা কারণ ছিল। আমার পরিবার তখন লন্ডনে, নিউইয়র্কে আমি একা থাকি। ঘরোয়া পরিবেশে বাঙালি খাবার খাওয়ার একটা বড়ো সুযোগ ছিল বাহার ভাইয়ের বাসা। ভাবীর রান্নার হাত অসাধারণ। সবচেয়ে বড়ো কথা হলো, একমাত্র হেলেন ভাবীর রান্না খেলেই আমার এসিডিটির কোনো সমস্যা হত না।
বাহার ভাই সেই কার্ডে কত ডলার পেয়েছিলেন কিংবা আদৌ পেয়েছিলেন কি-না তা আজও জানতে পারিনি। আমার ধারণা তিনি কিছুই পাননি। একটা রহস্যময়তা তৈরি করতে চেয়েছিলেন। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে আমি বুঝতে পারি গোপনীয়তা রক্ষা করার এক অসাধারণ দক্ষতা তার আছে। কোনো দুর্বল মুহূর্তেও তিনি যা গোপন রাখতে চান তা প্রকাশ করেন না। এখান থেকে বাহার ভাই দেশে ফিরে যান সম্ভবত ২০১৪ সালে। শেখ হাসিনার দেশে ফিরে গিয়ে তিনি পুলিশ বিভাগে সুবিধা করতে পারেননি। আবার জাতিসংঘ মিশনে চলে যান। এবার যান আফগানিস্তানে। দু’বছর পর পুনরায় দেশে ফিরে আসেন। সেই একই অবস্থা, কারণ দেশটা যে তখনও শেখ হাসিনার দখলে। এইরকম একজন সৎ এবং মেধাবী অফিসারের কদর হল না পুলিশ বিভাগে। তাকে অবসরে চলে যেতে হয়। আমি প্রায়শই মনে মনে ভাবতাম, বাহার ভাই একজন সৌভাগ্যবান মানুষ, কর্মজীবনে তার ভাগ্যের চাকা কেন তাকে বিট্রে করল? কিন্তু আমরা তখনও জানতাম না, প্রকৃতি তার ভাগ্যের হিসেব ঠিকই মিলিয়ে রেখেছেন। অন্তর্র্বতীকালীন সরকার তাকে অবসর থেকে ফিরিয়ে এনে বিভাগের সর্বোচ্চ পদে বসান।
বাহার ভাইয়ের সঙ্গে আমার এবং আমাদের দুই পরিবারের অসংখ্য আনন্দময় স্মৃতি আছে। এখন লটারি প্রসঙ্গে আরেকটি স্মৃতির কথা বলি। একদিন বাহার ভাই আমাকে জিজ্ঞেস করেন, আপনি যদি লটারিতে ৪/৫’শ মিলিয়ন ডলার পেয়ে যান তাহলে সেই টাকা দিয়ে কী করবেন? আমি বলি, এখানে, এই নিউইয়র্কে, একটি আন্তর্জাতিক মানের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলবো। বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ বইগুলো অনুবাদ করাবো এবং ইংরেজিতে প্রকাশ করবো। বাহার ভাই বলেন, আপনার নিয়ত ভালো, আপনি পেয়ে যেতে পারেন। আজ লক্ষ করে দেখলাম, বাহার ভাই চলে যাবার পরে সেই লটোর দোকানে আমি আর কোনোদিন যাইনি, আর কখনো স্ক্রাচ কার্ড কিনিনি। তবে আমার অফিসের সহকর্মীরা চাঁদা তুলে যৌথ ফান্ড দিয়ে লটারির টিকেট কেনে, এটা এখানকার একটা সংস্কৃতি। যদিও আমি কখনোই খোঁজ নিইনা, কিছু পাওয়া গেল কিনা।
আরেকদিনের কথা বলি। লাঞ্চ সেরে রেস্টুরেন্ট থেকে বের হয়ে বলি, চলেন একটু ওয়েস্টার্ন ইউনিয়নে যাব। বাহার ভাই বলেন, ওয়েস্টার্ন ইউনিয়নের মাধ্যমে টাকা পাঠাতে তো অনেক খরচ, আপনি সোনালী এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে পাঠান। আমি বলি, যেখানে টাকা পাঠাবো সেখানে ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। পরে ঘটনাটি তাকে খুলেই বলি। আমার পরিচিত এক তরুণ কবি মলদোভিয়ায় গিয়ে খুব বিপদে পড়েছে। ওর কাছে নাকি খাওয়ার পয়সাও নেই। ওকে কিছু টাকা পাঠাতে হবে। বাহার ভাই বলেন, আমিও কিছু দিতে চাই। আমি কিন্তু তার কাছে চাইনি, তিনি নিজে থেকেই আমার টাকার সঙ্গে আরো কিছু টাকা যোগ করলেন। টাকাটা পাঠিয়ে আমি সেই বিপদগ্রস্ত তরুণকে জানিয়ে দিই পাঠানো টাকার মধ্যে কে কত দিয়েছে। ছেলেটি ফিরতি ম্যাসেজে বাহার ভাইয়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানায়। বাহার ভাই আইজিপি হবার সঙ্গে সঙ্গেই আমাকে মেসেজ দিয়েছেন ব্রিগেডিয়ার তোফায়েল আহমেদ। তিনি এখন পরিবার নিয়ে নিউইয়র্কেই থাকেন। তার মেসেজে দারুণ উচ্ছ্বাস ছিল। আমরা সবাই উচ্ছ্বসিত। উচ্ছ্বসিত এ-কারণে নয় যে আমাদের খুব কাছের মানুষ, প্রিয় মানুষ আইজিপি হয়েছেন, আমাদের উচ্ছ্বাসের প্রধান কারণ বাংলাদেশ পুলিশ একজন ভালো আইজিপি পেয়েছে, পুলিশের কাছে আমাদের যা প্রত্যাশা, তা হয়ত এবার পুরণ হবে। আমরা সবাই অনেক প্রত্যাশা নিয়ে তাকিয়ে আছি বাহারুল আলমের সাফল্য দেখার জন্য।
হলিসউড, নিউইয়র্ক। ২১ ডিসেম্বর ২০২৪
Posted ১২:১৭ অপরাহ্ণ | বুধবার, ২৫ ডিসেম্বর ২০২৪
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh