কাজী জহিরুল ইসলাম : | বৃহস্পতিবার, ০২ জানুয়ারি ২০২৫
ছেলেবেলায় আমরা প্রায়শই ইংরেজি সিনেমায় বা সিরিয়ালে দেখতাম, একদল মানুষ গুপ্তধনের সন্ধ্যানে বেরিয়ে পড়েছে। পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই গুপ্তধনের সন্ধ্যানে বেরিয়ে পড়ার গল্প, উপন্যাস আছে, সিনেমাও তৈরি হয়েছে। এটি একটি শিক্ষামুলক ধ্রুপদী কল্পকাহিনী। গুপ্তধনের সন্ধ্যানে বেরিয়ে পড়া দলটি নানান প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করে, বিভিন্ন রকমের শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধ করে। এইসব দুর্যোগে, যুদ্ধে তাদের শক্তি ক্ষয় হয়, সম্পদ ক্ষয় হয়, কিছু সঙ্গী প্রাণ হারায়। যারা বেঁচে থাকে তাদেরও অনেকে আহত হয়।
এরপর তারা একটি রহস্যময় দ্বীপে গিয়ে পৌঁছায়। সেখানেও পায়ে পায়ে ওঁৎ পেতে আছে আরো হাজারো বিপদ। অরণ্য-মানুষের আক্রমণ, হিংস্র জন্তুর আক্রমণ, অশরীরী আত্মার ভীতি, আরো কত কী। এইসব পেরুতে পেরুতে আরো কিছু সঙ্গীর মৃত্যু হয়।
দলনেতার কাছে একটি গোপন এবং অতি মূল্যবান মানচিত্র আছে, সেই মানচিত্র ধরে তারা এগুতে থাকে গুপ্তধনের গুহার দিকে। যতই গুপ্তধন কাছে আসছে বিপদ ততই বাড়ছে। শেষমেশ তারা যখন গুপ্তধনের গুহায় পৌঁছে যায় তখন আর মাত্র অল্প ক’জন সঙ্গী-সাথী বেঁচে আছে। গুপ্তধনের পরিমাণ দেখে তাদের চোখ ছানাবড়া। গুহার এখানে-ওখানে স্বর্ণের বার সাজানো, এক পাশে বড়ো বড়ো পাত্র ভর্তি হীরের দানা। নানান আকার ও আকৃতির অতি মূল্যবান গহনা। চতুর্দিকে শুধু হীরে, মানিক, সোনার ছড়াছড়ি। কে হবে এই বিপুল সম্পদের মালিক? এই নিয়ে তখন শুরু হয় নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ। শেষমেশ নিজেরা মারামারি করে সকলেই মৃত্যুবরণ করে।
এইরকম সিনেমা দেখে খুব কষ্ট পেতাম। আহা বেচারারা এতো কষ্ট করে লক্ষ্যে পৌঁছানোর পরে সম্পদ উপভোগ করতে পারলো না। কী দরকার ছিল একাই মালিক হবার লোভে নিজেদের মধ্যে মারামারি করে শেষ হয়ে যাবার? এই প্রশ্নের মধ্যেই কৈশোরের চিন্তা ঘুরপাক খেত। এখন বুঝতে পারি লেখকদের কিংবা সিনেমাগুলোর নির্মাতাদের মূল লক্ষ্যই ছিল দর্শকের অন্তরে এই প্রশ্ন জাগ্রত করা। যাতে তারা বুঝতে পারে লোভ একটি মন্দ জিনিস। গুপ্তধনের কাছে পৌঁছানোর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত তারা সকল বিপদ ঐক্যবদ্ধভাবে মোকাবেলা করেছে এবং প্রত্যেকবারই জয়লাভ করেছে অথচ যখনই নিজেদের ঐক্য ভেঙে গেল, সকলেই মারা পড়ল। এটি ছিল সিনেমার দ্বিতীয় শিক্ষা। অনৈক্য শক্তি ক্ষয় করে এবং তাতে সকলেরই অকল্যাণ হয়।
গত ৫ আগস্টে বাংলাদেশের তরুণ ছাত্র-জনতার বিপুল বিজয়ের মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদের অবসান ঘটে। কিন্তু গুপ্তধনের মালিক কে হবে, অর্থাৎ কে কোন পদে বসবে কিংবা কেন আমি কিছু পেলাম না, আমিও তো আন্দোলনে ছিলাম, এই আহাজারিতে বিপ্লবের ঐক্যে ছোটো ছোটো অসংখ্য ফাটল দেখা দিয়েছে। যে ত্যাগের মহিমায় প্রত্যয়ী হয়ে মৃত্যুকে বরণ করার জন্য পুলিশের বন্দুকের সামনে বুক পেতে দিয়েছিল ছাত্র-জনতা, হাসিনা-সরকারের পতন হবার সঙ্গে সঙ্গেই সেই আত্মত্যাগের শপথ, দেশপ্রেমের প্রত্যয় হাওয়ায় মিইয়ে গেছে।
গুপ্তধন এখন হাতের মুঠোয়, কাজেই যে যতটা পারো লুটে নাও। যারা পাচ্ছে না তাদের কণ্ঠে হতাশা, আমি কেন পেলাম না। যারা পায়নি, তারা, যারা পেয়েছে তাদের দিনরাত গালমন্দ করছে। কেউ বলছে না, এটা পাবার সময় নয়, আমরা এখনও যুদ্ধের মধ্যেই আছি, এখনও আমাদের শুধুই দেবার সময়। এখন আমরা সবাই দাতা, গ্রহীতা শুধু বাংলাদেশ। যারা বিভিন্ন পদ-পদবী পেয়েছেন তারাও সামনে এসে বলছেন না, দেখো ভাই, আগে রাজপথে থেকে যুদ্ধ করেছি, এখন সচিবালয়ে গিয়ে যুদ্ধ করছি, আমাদের যুদ্ধ এখনও শেষ হয়নি। আমরাও তোমাদের মত যুদ্ধের মাঠেই আছে, তোমরা আছো রাজপথে, আমরা আছি সচিবালয়ে, এইটুকুই শুধু পার্থক্য।
যারা সচিবালয়ে আছেন তাদের উচিত হবে গরীব দেশের মানুষের সামনে বিলাসী জীবন-যাপন প্রদর্শন না করা, দামী ফোন, মাথায় ছাতাধরা লোক, দামী গাড়িতে চড়া, দামী পোশাক ইত্যাদি পরিহার করা। যাতে রাজপথের সহযোদ্ধারা তাদেরকে উঁচু শ্রেণির মানুষ ভেবে ঈর্ষাকাতর হবার সুযোগ না পায়। শুধু মুখে মিষ্টি কথা বললে মানুষ বিশ্বাস করবে না, তাদেরকে প্রতি পদক্ষেপে প্রমাণ করতে হবে তারা এখনও রাজপথের যোদ্ধাদের মতোই সাধারণ বিপ্লবী, এদের আর তাদের মধ্যে প্রকৃতপক্ষে কোনো পার্থক্য নেই। এটা নিশ্চিত করতে না পারলে গুপ্তধনের, মানে পদ পদবীর লোভে, নিজেদের মধ্যে মারামারি করে গণভ্যুত্থানের শক্তি নিঃশেষ হয়ে যাবে, নতুন ফর্মে নতুন কোনো ফ্যাসিবাদ আগের ফ্যাসিবাদের স্থলাভিষিক্ত হবে।
আমাদের ভুলে গেলে চলবে না রাষ্ট্রসংস্কারের এক মহান শপথ নিয়ে, এদেশের মানুষকে বৈষম্যহীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখিয়ে, অন্তর্র্বতীকালীন সরকার তার যাত্রা শুরু করেছে। কোনো ভাবেই, আইনের দোহাই দিয়েই হোক কিংবা রাজনৈতিক শক্তির ভয়েই হোক, সেখান থেকে এক চুলও বিচ্যুত হওয়া যাবে না।
লেখক : কবি, কথাসাহিত্যিক।
Posted ১২:১৬ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ০২ জানুয়ারি ২০২৫
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh