চৌধুরী মোহাম্মদ কাজল : | বৃহস্পতিবার, ১৩ মার্চ ২০২৫
বাংলাদেশে যখনই সংস্কারের কথা আসে তখনই গতানুগতিক কিছু ফ্যাশনেবল সংস্কারের কথা চলে আসে। অন্য দেশের দেখাদেখি কিছু পরিবর্তনের কথা বলা হয়। বেশীরভাগ ক্ষেত্রে আমাদের বুদ্ধিহীন বুদ্ধিজীবিরা তাদের সঙ্কীর্ণ স্বার্থ থেকে এই প্রস্তাবগুলি করে থাকেন দেশের সত্যিকারের উন্নয়নের কথা না ভেবেই। এর মধ্যে একটি হচ্ছে ৫০০ আসনের সংসদ। আ স ম আবদুর রব সহ কিছু বামপন্থী নেতা এই দাবীটি প্রায়ই করতেন। আমরা যেখানে ৩০০ জন সংসদ সদস্যের ভার বইতে গলদঘর্ম তারা আরও ২০০ সংসদ সদস্য বাড়ানোর কথা বলেন। কারন এইসব নেতারা জানেন নিজ যোগ্যতায় তারা কখনোই সংসদে যেতে পারবেন না বা সংসদে নিজ দলের সদস্য সংখ্যা বাড়াতে পারবেন না। যদি ৫০০ আসনের সংসদ হয় তাহলে তাদের আসন সংখ্যা হয়ত কিছু বাড়তে পারে। রাস্ট্রের ক্ষতি হয় হোক, সংসদে আসন সংখ্যা বাড়লে তাদের সংসদে যাওয়ার রাস্তাটা আরেকটু প্রশস্ত হয়। তাহলে আরও বেশী নমিনেশন বানিজ্য চলবে। এমনিতে এইসব পরগাছা রাজনীতিবিদরা অন্য দলের সাথে জোট বেধে নির্বাচনে জিতে সরকারের অংশীদার হওয়ার চেস্টা করে। সংসদের আসন সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে তাদের এই সুযোগটা আরও একটু বাড়বে।
আরেকটি প্রস্তাব থাকে দুই কক্ষ বিশিষ্ট সংসদ। পৃথিবীর অনেক দেশে আছে তাই আমাদেরও করতে হবে। এটা রাস্ট্রের ব্যয় বৃদ্ধি ছাড়া আর কি কাজে আসবে বা আদৌ কাজে আসবে কিনা এ নিয়ে তাদের গবেষনা নেই। আমাদের কিছু ডিগ্রীধারী বুদ্ধিজীবি জানেন নির্বাচন করে তারা ইউনিয়ন পরিষদের কাউন্সিলর হওয়ার যোগ্যতা রাখেন না। দ্বি কক্ষ বিশিষ্ট সংসদ হলে তাদের সামনে এই সুযোগ চলে আসবে। নিজেদের যখন নমিনেশনের নিলামে তুলবেন তখন ভালো দাম পাবেন বলে তাদের আশা। কিন্তু বর্তমান অবস্থায় তারা সংসদ সদস্য হলেও দেশের কোন উন্নতি হবে না। কারন দলগুলি তাদেরকে যখন কিনবে তখন তাদের বাক স্বাধীনতার কপিরাইটাও নিয়ে নেবে। তাদের যতই বুদ্ধি থাকুক তাদের সেই বুদ্ধি প্রচার করতে পারবেন না। দলীয় প্রধানের নির্দেশ অনুযায়ী লেফট রাইট করতে হবে। তবে ব্যাক্তিগত ভাবে হয়ত তারা লাভবান হবেন। এতদিন নামের আগে প্রফেসর, ডঃ, ব্যারিস্টার, প্রকৌশলী কত কিছুইতো লিখেছেন, নামের শেষে এম, পি লিখতে পারেননি।
একবার সংসদ সদস্য হতে পারলে এটা হয়ে যাবে। সেই সাথে ট্যাক্স ফি গাড়ী, সরকারী প্লট, তদবির, ওসির কাজে হস্থক্ষেপ, সন্ত্রাসীকে থানা থেকে ছাড়িয়ে আনার ক্ষমতা আরও কত কি। রাস্ট্রের ব্যয় বাড়ে বাড়ুক, উহাদের ক্ষমতা তো বাড়িবে। আরেক শ্রেণীর বুদ্ধিজীবিরা বাংলাদেশকে কয়েকটি প্রদেশে বিভক্ত করার কথা বলে থাকেন। সারাদেশে আঞ্চলিকতা ও বিভক্তি সৃষ্টি করার একটি কৌশল। সাবক রাস্ট্রপতি হোসেইন মোহাম্মদ এরশাদ ছিলেন এই নীতির প্রবক্তা। প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরন করে প্রশংসা কুড়ালেও সরকারের বিকেন্দ্রীকরন দেশের জন্য কতটুকু উপযোগী এটা মনে হয় তার সামরিক বুদ্ধিতে বোঝা সম্ভব হয় না। যে বাংলাদেশের অধিবাসীদের ৯৮ ভাগ একই ভাষা ও সংস্কৃতির অংশ সেই দেশে কেন প্রদেশ তৈরী করতে হবে। আমাদের আশে পাশে অনেক দেশেই প্রাদেশিক ব্যাবস্থা আছে। সেগুলি বহু ভাষাভাষী দেশ। তাদের অনেকের মধ্যে জাতিগত বিরোধ রয়েছে। আর কিছু দেশ আছে যারা প্রাচীনকাল থেকে বিভিন্ন প্রদেশ বা রাজ্যে বিভক্ত ছিল। আমাদের যেহেতু প্রয়োজন ও ঐতিহ্য কোনটাই নেই তাহলে অযথা আমরা কেন দেশকে বিভক্তির দিকে ঠেলে দেব। যদি প্রাদেশিক ব্যবস্থার প্রবর্তন হয় তাহলে কিছু অবসরপ্রাপ্ত সচিব ও জেনারেলদের প্রাদেশিক গভর্নর হওয়ার সুযোগ চলে আসব। প্রাদেশিক পরিষদ গঠিত হলে সারা দেশে প্রচুর পাতি নেতার আত্মপ্রকাশ ঘটবে। প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য হিসেবে তারা ক্ষমতা প্রয়োগের (বা অপব্যবহারের) লাইসেন্স পেয়ে যাবে। এরপর একসময় দেখা যাবে গভর্নর, আমলা ও প্রাদেশিক পরিষদের নেতাদের খোরাকী দিতে দিতে আমাদের ছোট এই দেশটিতে জনগনের জন্য কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।
তাহলে সংস্কার কোথায় প্রয়োজন?
আমাদের সরকার পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনতে হবে। আমি মনে করি আমাদের দেশে প্রেসিডেনশিয়াল পদ্ধতি চালু করা হোক। বাংলাদেশের বাস্তবতায় প্রেসিডেনশিয়াল পদ্ধতি হোক অথবা সংসদীয় পদ্ধতি হোক ক্ষমতা আসলে এক ব্যাক্তির হাতেই ন্যাস্ত থাকে। আমি চাই যিনি হবেন রাস্ট্রের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী তিনি যেন জনগনের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হয়ে আসেন। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী পদটি বিলুপ্ত করা হোক। আমাদের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে দুইজন ভিভিআইপি রাখার দরকার নেই। একজনই যথেষ্ট। পৃথিবীর অনেক দেশেই এমন ব্যবস্থা আছে। আর যদি প্রধানমন্ত্রী রাখতেই হয় তাহলে রাষ্ট্রপতি পদটি বিলুপ্ত করা হোক। দেশের সর্বোচ্চ পদটিতে কোন শো পিস রাখার দরকার নেই। অথবা কমনওয়েলথ দেশ হিসেবে গ্রেট বৃটেনের রাজাকে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে মান্য করা যেতে পারে। তাহলে খরচাপাতি যা হবে ওদের ওপর দিয়ে যাবে। আমাদের দুই গাধার বোঝা বইতে হবে না।
সংসদে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন বাতিল করতে হবে। গত ত্রিশ বছরে বাংলাদেশের নারীরা প্রচুর উন্নতি করেছে। এই সময় আমরা প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেত্রী, মন্ত্রী, স্পীকার সব জায়গায় মহিলাদের দেখেছি। আমি মনে করি মহিলারা আর পিছিয়ে নেই। তাই তাদের জন্য সংরক্ষিত আসনেরও প্রয়োজন নেই। যারা জনপ্রতিনিধি হবে তাদেরকে জনগনের প্রত্যাক্ষ ভোটে নির্বাচিত হয়ে আসতে হবে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রয়োজন – সংসদ সদস্যদের ইচ্ছামত ভোট দেওয়ার ক্ষমতা দিতে হবে। এখন তাদের ইচ্ছা অনিচ্ছার কোন মুল্য নেই। দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাদের ভোট দিতে হয়। আরেকটি পরিবর্তন প্রয়োজন যিনি একটি রাজনৈতিক দলের প্রধান থাকবেন তিনি রাস্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী পদের জন্য যোগ্য হবেন না। তাহলে দলীয় একনায়কদের গাছে খাওয়া ও নীচে কুড়ানোর দিন শেষ হবে। আর এটাই হবে প্রকৃত সংস্কার।
Posted ১:০৪ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ১৩ মার্চ ২০২৫
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh