কাজী জহিরুল ইসলাম : | বৃহস্পতিবার, ১৩ মার্চ ২০২৫
কানেক্টিকাটের ছেলে জোসেফ থমাস লোগানো, ভালোবেসে সবাই যাকে ডাকে জোয়ি লোগানো। জোয়ি এক দুর্দান্ত গাড়িচালক, ২০১৮, ২০২২২, ২০২৪ এবং ২০২৫ সালের ন্যাসকার প্রতিযোগিতার চ্যাম্পিয়ন। জোয়ি যখন ফোর্ড মুস্তাঙের স্টিয়ারিংয়ে হাত রাখে তখন টর্নেডোও ভয় পায় ওর সঙ্গে পাল্লা দিতে। কিন্তু এই দুর্দান্ত রেসারকে যদি এমন একটি গাড়ি দেওয়া হয় যার মিরর ঝাপসা, উইন্ডশিল্ড ঘোলা, ফ্লাট টায়ার, ইঞ্জিন বিকল, গিয়ারবক্স কাজ করে না তাহলে কি তিনি জয়ী হতে পারবেন? জয়ী হওয়া তো দূরের কথা রেসের ট্র্যাকেই উঠতে পারবেন না।
বাংলাদেশের ড্রাইভিং সিটে জোয়ি লোগানো কিংবা মাইকেল শুমেখারের মতো দুর্দান্ত এক চালক বসে আছেন কিন্তু চালকের দুর্ভাগ্য গাড়িটির গিয়ার বক্স নষ্ট, চাকায় হাওয়া নেই, ইঞ্জিনে জটিল সমস্যা। তিনি কিছুতেই গাড়িটি স্টার্ট দিতে পারছেন না। একদল দুর্বৃত্ত গাড়িটি বিকল করে দিয়ে গেছে এবং এখনো নানানভাবে চেষ্টা করছে গাড়িটি যেন কেউ মেরামত করতে না পারে। বাংলাদেশের মানুষ ড. ইউনূসকে এই গাড়ির চালকের আসনে বসিয়েছে দুটি প্রত্যাশা নিয়ে। তিনি যেন গাড়িটি মেরামত করেন এবং রেসিং ট্র্যাকে তুলে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হন। কারণ এদেশের ছাত্র-জনতা জানে তিনিই এই গাড়িটিকে মেরামত করতে পারবেন এবং রেসিং ট্র্যাকে তুলে প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে একটি সম্মানজনক অবস্থান নিশ্চিত করতে পারবেন।
প্রাণপন চেষ্টা করছেন আমাদের জোয়ি। হাজারো প্রতিকুলতার মধ্যেও গাড়িটি মেরামত করার জন্য যা যা করা দরকার তার সবই তিনি করছেন। অনেকগুলো সংস্কার কমিশন হয়েছে৷ কমিশনগুলোর সুপারিশ এসেছে, সুপারিশ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপও হচ্ছে। দেশের মানুষ এখনো আশায় বুক বেঁধে আছে প্রস্তাবিত সংস্কারগুলো বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিকল হয়ে থাকা এই চমৎকার গাড়িটি সচল হয়ে উঠবে।
গাড়িটি যখন সচল হয়ে উঠবে তখন আমরা কী করবো? আসলে তখনই শুরু হবে আমাদের আসল কাজ। সেটি হচ্ছে রেসের ময়দানে ছুটতে থাকা, পৃথিবীর অন্যান্য দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে সামনে এগিয়ে যাওয়া। এই পর্যায়ে আমাদের কিছু জাতীয় লক্ষমাত্রা ঠিক করে নিতে হবে। নিজস্ব মূল্যবোধ, জাতিগত আত্মমর্যাদা অক্ষুন্ন রেখে অর্থনৈতিক অগ্রগতি ঘটানোই মূল কাজ। সেই কাজ করতে গেলে আমাদের কিছু অগ্রাধিকার ঠিক করতে হবে। সর্বপ্রথম যে কাজটি করতে হবে তা হচ্ছে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ।
প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তার শাসনামলে যে ১৮ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলেন, ভালো করে বিশ্লেষণ করলে দেখবেন ১৮ দফা প্রকৃতপক্ষে ছিল দুটি মূল লক্ষ্যের বিস্তার। একটি হচ্ছে উৎপাদন বাড়াও, অন্যটি জনসংখ্যা কমাও। পৃথিবীর অনেক দেশ জনসংখ্যা কমাতে পারলেও বাংলাদেশের পক্ষে তা এক দুরূহ কাজ, এক্ষেত্রে একে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখতে পারাই হবে প্রাথমিক লক্ষমাত্রা। জিয়ার শাসনামলেই পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা শুরু হয়। প্রথমে ৩ সন্তান ও পরে দুই সন্তানের পরিবার গঠনের তাগিদ দিয়ে রেডিও, টেলিভিশনে সরকারী বিজ্ঞাপন প্রচার করা হত। এরশাদের সময়েও জন্ম নিয়ন্ত্রণের একটা সরকারী তাগাদা ছিল। এরপরের সরকারগুলোর মধ্যে এই বিষয়ে কোনো তৎপরতা আর দেখা যায়নি, যদিও পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর বহাল তবিয়তেই আছে। আমি একসময় ঢাকাস্থ জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলে কাজ করতাম, তখন পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি তাদের কাজের মধ্যে সামান্যতম পেশাদারিত্ব এবং সততা নেই। গ্রামে-গঞ্জে তারা বিনামূল্যে যেসব কনডম বিতরণ করত সীমান্ত দিয়ে সেসব ভারতে পাচার হয়ে যেত। কাগজ-পত্রে মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা থাকলেও এইসব কাজের জন্য যাদের নিয়োগ দেয়া হত তাদের কখনোই কর্মস্থলে খুঁজে পাওয়া যেত না।
উন্নয়নের রেসিং ট্র্যাকে উঠে এগিয়ে যেতে হলে আমাদের বহু কিছু করতে হবে। সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জ হচ্ছে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ। লাগামছাড়া ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার কারণে তৈরি হয় অন্যান্য বহু সমস্যা। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসার মত মৌলিক উপাদান ও উপকরণের বর্ধিত যোগান তো আছেই তার ওপর দেশের আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থাও ভেঙে পড়ছে বর্ধিত জনসংখ্যার চাপেই। যানজট, জনজট, সড়ক দুর্ঘটনা, দুর্নীতি কোনটার মূলে নেই বর্ধিত জনসংখ্যা সমস্যা।
পৃথিবীর সবচেয়ে জনবহুল দেশ চায়না, যার মোট জনসংখ্যা ১৪২ কোটি, তা সত্বেও গড়ে প্রতি ববর্গকিলোমিটারে কিন্তু সেদেশে লোক বাস করে মাত্র ১৫০ জন। সেই দিক থেকে ওরা মোটেও ভয়াবহ ঘনবসতির দেশ হয়ে ওঠেনি। তবুও চীনা সরকার ওয়ান চাইল্ড পলিসি গ্রহণ করে জনসংখ্যা বৃদ্ধি রোধ করে ফেলেছে। এখন চায়নার বার্ষিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার নেগেটিভে পৌঁছে গেছে। মহাদেশ হিসেবে আফ্রিকার জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার সবচেয়ে বেশি, ২.৩৫ শতাংশ কিন্তু আফ্রিকা একটি বিরল বসতির মহাদেশ, সেখানে গড়ে প্রতি বর্গকিলোমিটারে লোক বাস করে মাত্র ৫১ জন। অর্থনীতিকে গতিশীল করার জন্য ওদের আরো মানুষ দরকার। ইউরোপের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার মাত্র ০.২ শতাংশ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বছরে লোকসংখ্যা বাড়ে ০.৯৮% হারে। এটি পৃথিবীর গড় হার ০.৮৫ শতাংশের চেয়ে যথেষ্ঠই বেশি হলেও সেদেশে প্রতি বর্গকিলোমিটারে লোক বাস করে মাত্র ৩৮ জন।
বাংলাদেশ একটি ছোটো দেশ। আয়তনের দিক থেকে ৯২তম দেশ হলেও আশ্চর্যের বিষয় হলো জনসংখ্যার দিক থেকে অষ্টম বৃহত্তম দেশ। এখানে গড়ে প্রতি বর্গকিলোমিটারে লোক বাস করে ১,৩৫০ জন। কী ভয়াবহ অবস্থা! অথচ এখনও প্রতি বছর ১.২০ শতাংশ হারে লোক বেড়েই চলেছে। এই দেশকে বাঁচাতে হলে এই মুহূর্তেই চায়নার মত এক সন্তানের নীতি গ্রহণ করতে হবে, যাতে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই বৃদ্ধির হার শূন্যে নামিয়ে আনা যায়। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে কোনো উন্নয়নই দৃশ্যমান হবে না।
হলিসউড, নিউইয়র্ক। ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৫
Posted ১:০৬ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ১৩ মার্চ ২০২৫
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh