চৌধুরী মোহাম্মদ কাজল : | বৃহস্পতিবার, ২৭ মার্চ ২০২৫
নরেন্দ্র মোদী তার রাজ্য সরকারের আমলা ও পুলিশ কর্মকর্তাদের নিয়ে জরুরী মিটিং করছেন। সেদিন ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০০২ সালের সভায় মোদী গুজরাটের উচ্চ পদস্থ সব পুলিশ কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছিলেন পরদিন উগ্র হিন্দুদের আ্রক্রোশকে তারা যেন বাধা না দেন। উত্তেজিত হিন্দুরা যাই করুন তারা যেন নিশ্চুপ থাকেন। সেই দিন সবরমতি ট্রেনে আগুন লেগে ৫৯ জন হিন্দু তীর্থযাত্রীর মৃত্যু হয়। সন্দেহের তীর মুসলমানদের দিকে।
মুসলমানরা আগুন লাগিয়েছে। ক্ষোভে ফুসছে সংখ্যাগরিষ্ট হিন্দুরা। মুসলমানদের কচুকাটা করতে হবে। ওদের উচিত শিক্ষা দিতে হবে। গুজরাটের তখনকার মুখ্যমন্ত্রী পুলিশ কর্মকর্তাদের বলে দিয়েছেন তারা যেন হিন্দুদের প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে বাধা না দেয়। কি আশ্চর্য্য একজন মূখ্যমন্ত্র্ ীআইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বলে দিচ্ছে জনতা যদি নিজের হাতে আইন তুলে নেয় তারা যেন বাধা না দেয়।
ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে। উগ্র হিন্দুদের আক্রমনে পরবর্তী কয়েক দিনে দুই হাজারের অধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে নারী, পুরুষ, শিশু, বৃদ্ধ সবাই ছিল। মুসলমান নারীদের নির্যাতন করা হয়েছে। ছেড়ে দেওয়া হয়নি গর্ভবতী মহিলাদেরও। তাদের পেটে চিরে গর্ভের সন্তানকে হত্যা করা হয়েছে। অনেক মুসলমানকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়েছে। পুলিশ ছিল নিরব দর্শক।
অসহায় মুসলমানদের অনেকে আশ্রয় নেয় স্থানীয় কংগ্রেস নেতা এহসান জাফরীর বাড়ীতে। তাদের ধারনা ছিল এহসান জাফরীর মত একজন বড় মাপের নেতার বাড়ীতে নিশ্চয় হামলা হবে না। কিন্তু রাজ্যের মূখ্যমন্ত্রী যেখানে মানুষ হত্যার গ্রীন সিগনাল দিয়ে দিয়েছেন সেখানে কি কারো ভয় থাকে। অবস্থার ভয়াবহতা আচ করতে পেরে এহসান জাফরী সরাসরি ফোন করেন নরেন্দ্র মোদীকে।
তিনি মোদীর কাছে সাহায্য চান। মোদী ফোন উঠিয়েই বলে ‘ও আপনি বেচে আছেন। আপনাকে এখনও হত্যা করা হয়নি’। এরপর হিন্দু সন্ত্রাসীরা এহসান জাফরীকে টেনে হিচড়ে বাড়ী থেকে বের করে আনে। কেটে টুকরো টুকরো করে। তারপর আগুন ধরিয়ে দেয়। তার পরিবার বাড়ীর ভেতর থেকে পুরো ঘটনাটি দেখে। এরপর রাতারাতি নরেন্দ্র মোদীর জনপ্রিয়তা অনেক বেড়ে যায়। হিন্দুরা মুসলমানদের শায়েস্তা করার মত যোগ্য এক নেতাকে পেয়েছে। বিজেপিতে মোদীর প্রভাব আরও বেড়ে যায়। বর্তমানে তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী।
হরেন পান্ডিয়া ছিলেন নরেন্দ্র মোদীর মন্ত্রীসভার গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। তিনি সেই দিন নরেন্দ্র মোদীর বাসভবনের সেই সভায় উপস্থিত ছিলেন। তিনি এ ব্যাপারে আদালতে সাক্ষ্য দিয়ে বিজেপি’র রোষানলে পড়েন। এর কিছুদিন পর ২০০৩ সালের এক সকালে আহমেদাবাদের একটি পার্কে মর্নিং ওয়াক করতে গিয়ে তিনি নিহত হন। তার শরীরে পাচটি বুলেন আঘাত করে ও তার মৃতদেহ তার গাড়ীতে বসা অবস্থায় পাওয়া যায়। ধারনা করা হচ্ছে এটি ছিল একটি পরিকল্পিত হত্যাকান্ড এবং তাকে বাইরে হত্যা করে গাড়ীতে বসিয়ে রাখা হয়েছিল। কারন তিনি গাড়ীতে যেভাবে বসেছিলেন এবং যেখানে গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন তা সঙ্গতিপূর্ণ ছিল না।
হরেন পান্ডিয়া ছিলেন বিজেপিতে নরেন্দ্র মোদীর প্রধান প্রতিপক্ষ। এর আগে তাকে সতর্ক থাকার জন্য বলেছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা সঞ্জীব ভাট। পরবর্তী ভাট নিজেও আদালতে অনুরূপ সাক্ষ্য দেন। এরপর তাকে পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুর একটি মামলায় দোষী সাবস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেওয়া হয়। গুজরাট পুলিশের জনপ্রিয় এই কর্মকর্তা এখনও জেল খাটছেন।
আলোচনায় ফিরে এসেছেন হরেন পান্ডিয়া
মৃত্যুর ২২ বছর পর হরেন পান্ডিয়ার রহস্যজনক হত্যাকান্ডের বিষয়টি আবার আলোচনায় ফিরে এসেছে। এর কারন সুনিতা উইলিয়ামস। আমরা জানি মহাশূন্যে নয় মাস আটকে থাকার পর সম্প্রতি পৃথিবীতে ফিরে এসেছেন তিনি। সুনিতা উইলিয়ামস মার্কিন নাগরিক হলেও তার জন্ম এক গুজরাটি পরিবারে। মাইকেল উইলিয়ামসের সাথে বিবাহের আগে তার নাম ছিল সুনিতা পান্ডিয়া। হরেন পান্ডিয়া ছিলেন সুনিতা উইলিয়ামসের ফুপাতো ভাই। তাই মহাকাশ থেকে সুনিতার ফিরে আসার সাথে সাথে হরেন পান্ডিয়াও ভারতের রাজনৈতিক আলোচনায় ফিরে এসেছেন। অনেকে তার মৃত্যুর পুনর্বিচার দাবী করছেন। কিন্তু নরেন্দ্র মোদীর প্রভাব কাটিয়ে হরেন পান্ডিয়া হত্যাকান্ডের রহস্য উন্মোচন নিশ্চয় সম্ভব হবে না।
Posted ৪:১০ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২৭ মার্চ ২০২৫
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh