মন্তব্য প্রতিবেদন : | বৃহস্পতিবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৫
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর মুখোশ উন্মোচন করলেন নিউইয়র্কের অর্থপাচারকারী সিন্ডিকেটের। তাদের আয়োজিত ভূয়া রেমিট্যান্স মেলা বয়কট করে প্রবাসী বাংলাদেশীদের সাথে মিলিত হলেন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কনস্যুলেটে। রেস্টুরেন্টের বেইসমেন্টে বিতর্কিত ব্যক্তি বিশ্বজিৎ সাহা নয়, তিনি বড় করে দেখলেন অর্থপ্রেরণকারী প্রবাসী বাংলাদেশীদেরকে। সম্মান প্রদর্শন করলেন তাদের প্রতি। এরমধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর স্থাপন করলেন দেশ প্রেমের অনন্য নজির।
কথায় আছে ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, আর দলের চেয়ে দেশ। কিন্তু বাংলাদেশে স্বৈরশাসনামলে ঘটে তার উল্টোটি। দেশের চেয়ে দল এবং চূড়ান্ত বিচারে দলের চেয়ে বড় হয়ে উঠে ব্যক্তি। পরিবারতান্ত্রিক ব্যক্তি পূজার এই রাজনীতি বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে বিগত দেড় দশকে দাঁড় করিয়েছে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।
দুঃশাসন, দুর্নীতিই শুধু নয়, এসময়ে লক্ষ লক্ষ কোটি পাঁচার হয়েছে বিদেশে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে পাচার হয়েছে মোটা অংকের অর্থ। ফ্যাসিষ্ট সরকার প্রধান ও তার দোসরদের পরিবারের ঘনিষ্ঠজনের এদেশে বসবাসের কারণে অর্থপাচারকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠে বড় ধরণের একটি সিন্ডিকেট। যার মূল হাব ছিলো নিউইয়র্ক। স্বৈরশাসনামলে একশ্রেনীর রাজনীতিক, আমলা, ব্যবসায়ী ও ব্যাংকারদের নিয়ে গঠিত এই অর্থপাচারকারী সিন্ডিকেট অবাধে পাচারকৃত অর্থ যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগ করেছে বিভিন্ন খাতে।
রেমিট্যান্স মেলা, ট্রেড শো, অফশোর ব্যাংকিং, রোড-শো সহ বিভিন্ন নামে অনুষ্ঠানের আড়ালে অর্থপাচার করেছে তারা।নিউইয়র্কে অর্থপাচারকারীদের এমন একটি সিন্ডিকেটের ব্যক্তিরা ফ্যাসিবাদের পতনের পর পাল্টে ফেলেছে তাদের মুখোশ। নতুন করে সক্রিয় হয়ে উঠেছে পুরনো ব্যবসায়। লুটেরা মশিয়ুর রহমান, সালমান এফ রহমান, আতিয়ার রহমান গংদের পরিবর্তে তারা এখন ঝুঁকেছে বর্তমান অন্তবর্তীকালীন সরকারের রাষ্ট্রায়ত্ব ও বেসরকারী ব্যাংকসহ বিভিন্ন অর্থলগ্নীকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতি।
বর্তমান সরকার ও ব্যাংকিং খাতে ঘাপটি মেরে থাকা এক শ্রেনীর অসৎ কর্মকর্তা যারা আগে এই অর্থ পাচার কাজে অতীতে সহায়তা করেছে তারাই আবার নূতন করে যুক্ত হয়েছেন নিউইয়র্ক ভিত্তিক এই সিন্ডিকেটের সাথে। তাদের যোগসাজসেই নিউইয়র্কে এপ্রিলের তৃতীয় সপ্তাহে সিন্ডিকেটটি আয়োজন করে তথাকথিত রেমিট্যান্স মেলা। রেমিট্যান্স ব্যবসার সাথে সম্পর্কহীন এই চক্রটি অত্যন্ত সুকৌশলে বিভিন্ন ব্যাংক কর্মকর্তাদের ফাঁদে ফেলে আগেই মোটা অংকের অর্থ হাতিয়ে নেয় রেমিট্যান্স মেলার স্টলের উসিলায়। তারা কথিত এই মেলায় প্রধান অতিথি করেন বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর ডঃ আহসান এইচ মনসুরকে এবং অন্যান্য ব্যাংক কর্মকর্তাদেরকেকরা হয় বিশেষ অতিথি। এমনিতেই বাংলাদেশের বিত্তবান ব্যক্তিরা যেকোন উসিলায় যুক্তরাষ্ট্র সফরের জন্য মুখিয়ে থাকেন। সুযোগ নিতে চান রথ দেখতে এসে কলা বেচার। ফলে অতি সহজেই আতিথ্য গ্রহণ করেন তারা।
ওয়াশিংটনে বিশ্বব্যাংকের সাথে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের পূর্ব নির্ধারিত একটি বৈঠক ছিলো ২২ ও ২৩ এপ্রিল। এই দিনক্ষণকে সামনে রেখে তার দু’দিন পূর্বে চাতুর্য্যরে সাথে তারা কথিত মেলার আয়োজন করে নিউইয়র্কে। কথা ছিলো গত ১৮ এপ্রিল গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর নিউইয়র্ক আসবেন এবং সেদিনই সন্ধ্যায় আয়োজকদের নৈশভোজে অংশ নিবেন। পরদিন একটি রেস্টুরেন্টের বেইসমেন্টে উদ্বোধন করবেন কথিত রেমিট্যান্স মেলা। কিন্তু বিধিবাম হলে যা হয় তাই হয়েছে। পতিত স্বৈরাচারের দোসর, বিতর্কিত দু’জন ব্যক্তির অখ্যাত সংগঠন কর্তৃক আয়োজিত এই মেলার দুরভিসন্ধির তথ্য পৌছে যায় সরকারের শীর্ষ মহলে। বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর ও তার প্রতিনিধি দল বয়কট করেনকথিত রেমিট্যান্স মেলা।
নিউইয়র্কে তিনি স্থানীয় বাংলাদেশ কনস্যুলেটে সর্বস্তরের প্রবাসী বাংলাদেশীদের সাথে মিলিত হন মতবিনিময় সভায়। এই সভায় তিনি প্রবাসী বাংলাদেশীদের প্রতি আহ্বান জানান দেশ থেকে যারা অর্থ লুট করে এনে যুক্তরাষ্ট্রে অর্থবিত্তের পাহাড় গড়েছেন, যাপন করছেন বিলাসী জীবন তাদেরকে চিহ্নিত করে সরকারের নিকট তথ্য প্রদানের। দেশের পাচারকৃত অর্থ ফেরত নেয়ায় অভিযানে নেতৃত্ব দিচ্ছেন গভর্নর নিজেই। বাংলাদেশ কনসুলেটে তিনি পৃথকভাবে মতবিনিময় করেন স্থানীয় বাংলাদেশী রেমিট্যান্স হাউজের কর্মকর্তাদের সাথে।
দেশ ও জাতির স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় প্রাধান্য পায় মতবিনিময়কালে। ব্যক্তিত্বের মাঝে কি অভিনব বিপরীত্য, ফ্যাসিবাদী আমলের তৎকালীন গভর্নর আতিউর রহমান রাষ্ট্রীয় কোষাগার উন্মুক্ত করে দিয়ে সুযোগ দেন ৮০০ কোটি টাকা পাচারের। অপরদিকে একই ব্যাংকের গভর্নর দেশ থেকে দেশান্তরে ছুটে বেড়াচ্ছেন পাচারকৃত অর্থ দেশে ফিরিয়ে নিতে।
প্রবাসী বাংলাদেশীরা গভর্নর ডঃ মনসুরের প্রগার দেশপ্রেম ও সাহসী উদ্যোগের প্রশংসা করছেন। কথিত রেমিট্যান্স মেলায় বেসরকারি ব্যাংকের কর্তাব্যক্তি যারা অংশ নিয়েছেন তাদেরকে নজরদারিতে এনে ভবিষ্যতে এধরণের কর্মকান্ড রুখে দেয়ার দাবি জানিয়েছেন প্রবাসীরা। কথিত মেলার আয়োজকগণ নিজেদের মর্যাদা ও বিত্তবান হিসেবে পরিচয় দিতে এবারও আশ্রয় নেন প্রতারণার। এই মেলার অন্যতম আয়োজক ডাঃ জিয়াউদ্দিনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের একটি ভূয়া কোম্পানীর নামে বাংলাদেশ সরকারকে ১০বিলিয়ন ইউএস ডলার আর্থিক সহযোগিতার প্রস্তাব দেন। গত বছরের সেপ্টেম্বরে এই চিঠি তিনি ডঃ মুহাম্মদ ইউনূসকে হস্তান্তর করেন।
গভর্নর ডঃ আহসান এইচ মনসুর যাতে তাদের মেলায় অংশ নেন এজন্য তারা সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে তদ্বির করে ব্যর্থ হন শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত। তারপরও গভর্নরের নাম ব্যবহার করে বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয়। সাধারণ প্রবাসী বাংলাদেশীরা ভূয়া এই রেমিট্যান্স মেলা প্রত্যাখান করলেও গুটিকয় ব্যক্তি সামান্য অর্থের লোভে এসব বিতর্কিত ব্যক্তির পেছনে ছুটছেন। গুণকীর্তন করছেন তাদের।
বিতর্কিত ব্যক্তি বিশেষের স্বার্থের কাছে তারা বলি দিয়েছেন জাতীয় স্বার্থকে। এভাবেই বার বার জাতিকে তারা বিভ্রান্ত করে ঠেলে দিয়েছেন ধ্বংসের পথে। সত্য এবং মিথ্যে অথবা আসল ও নকল দু’টোই একসাথে সঠিক হতে পারে না। তোষামোদকারীদেরকে এ বিষয়টি বুঝতে হবে। এখানেই নিহিত বিবেক ও দেশপ্রেমের মাহাত্ব।
Posted ১১:৩২ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৫
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh