কাজী জহিরুল ইসলাম : | বৃহস্পতিবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৫
অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে দেশের রাজনৈতিক দলগুলো ক্রমশ জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। তারা জনআকাঙ্খাটা বুঝতে পারছে না অথবা জনআকাঙ্খার চেয়ে নিজ দলের ক্ষমতাকাঙ্খাকে বড়ো করে দেখছে। জুলাই বিপ্লবের পরে যে ফ্যাসিবাদবিরোধী একটা ঐক্য গড়ে উঠেছিল তা ক্রমশ ভেঙে যাচ্ছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পর মনে হয়েছিল এই ঐক্য বাংলাদেশের মানুষের জন্য বড়ো কোনো সুফল বয়ে আনবে। সকল রাজনৈতিক দল মিলে ড. ইউনূসের হাতকে শক্তিশালী করবে, পূর্ণ সংস্কারের মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদ তৈরি হওয়ার সকল বন্দোবস্ত আমরা ভেঙে দিতে পারবো।
এই অবস্থাটা সুদৃঢ় রাখার জন্য দেশে এমন একটি শক্তি দৃশ্যমান থাকা দরকার ছিল যে শক্তি সর্বদা অন্যায়, অবিচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকবে। যেখানেই অন্যায় সেখানেই তারা গিয়ে হাজির হবে।
৫ আগস্টের পরে বাংলাদেশের মানুষ সেইরকম একটি শক্তির উত্থান দেখেছিল। তারা ঝাঁপিয়ে পড়ে সংসদ ভবন, গণভবন সাফ করেছে, শহরের রাস্তাগুলো সাফ করেছে৷ দেয়াল পরিস্কার করেছে, পাড়া-মহল্লার হাট-বাজার থেকে চাঁদাবাজদের কান ধরে তাড়িয়ে দিয়েছে, পুলিশের অবর্তমানে রাস্তায় দাঁড়িয়ে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করেছে। কিন্তু সেই শক্তির অস্তিত্ব ধীরে ধীরে মিইয়ে গেছে। আবার হাট-বাজারে, বাস-টেম্পু স্ট্যান্ডে চাঁদাবাজ বসে গেছে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারেই তৈরি হয়েছিল সেই শক্তি, যেন আকাশ থেকে একদল দেবদূত নেমে এসেছিল বাংলার মাটিতে, এই দেশকে, এই জাতিকে রক্ষা করতে। এক ভয়াবহ দানব বধ করে তারা এদেশের মানুষকে উদ্ধার করেছে ঠিকই কিন্তু তারা নিজেরাই, যে পথে হাঁটলে দানব তৈরি হয়, সেই পথে হাঁটতে শুরু করলো। কেন তারা রাজনৈতিক দল গঠন করল? এই প্রশ্ন এখন সব দেশপ্রেমিক মানুষের, স্বপ্নচারী কোটি বাংলাদেশীর।
হ্যাঁ, একথা ঠিক যে তাদেরকে একটি সাংগঠনিক কাঠামোর মধ্যে থাকতে হবে, নিজেদের সুরক্ষার জন্য, জাতির সুরক্ষার জন্য এবং এদেশের কোটি কোটি শান্তিকামী দেশপ্রেমিক মানুষের সুরক্ষার জন্যই তাদের একটি সাংগঠনিক কাঠামোর মধ্যে থাকা দরকার ছিল কিন্তু সেই সাংগঠনিক কাঠামো কিছুতেই পুরনো বন্দোবস্তের ক্ষমতা-কেন্দ্রিক কোনো রাজনৈতিক দল নয় বরং সততার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা একটি প্রেসার গ্রুপ যারা রাষ্ট্র ক্ষমতায় না গিয়েও গণমানুষের শক্তিতে বলীয়ান, ক্ষমতাসীনদের চেয়েও অধিক ক্ষমতাবান। ক্ষমতাসীনরা সর্বদা তাদের ভয়ে তটস্থ থাকবে, কোনো অন্যায় করলে, কোনো অনৈতিক কাজ করলে তারা আমাদের ধরে ফেলবে, এই ভয়ে থাকবে ক্ষমতাসীনরা।
জাতীয় নাগরিক পার্টি নামের একটি রাজনৈতিক দল গঠন করে সেই অমিত সম্ভাবনাকে তারা নষ্ট করে ফেলেছে।
এখনও সময় আছে ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে আবারও তারা শুদ্ধতার ডাক দিক, পাড়ায় মহল্লায় কমিটি করে অন্যায়, অবিচার, চাঁদাবাজি প্রতিরোধ করুক, আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি এই ভূমিকায় তারা অবতীর্ণ হলে আবারও কোটি মানুষ তাদের পেছনে দাঁড়াবে। কারণ ফ্যাসিবাদ থেকে এখনও এই জাতির মুক্তি ঘটেনি, এখনও সময় হয়নি দল গঠন করে রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়ার। পূর্ণাঙ্গ সংস্কারের মধ্য দিয়ে এই রাষ্ট্রের ঘুণে ধরা, মরচে পড়া নাট ব্লটু পাল্টে ফেলতে না পারলে, পুরোপুরি খোল নলচে বদলে দিতে না পারলে রাষ্ট্রক্ষমতায় গিয়ে কোনো কাজ হবে না। বরং আকাশ থেকে নেমে আসা আমাদের স্বপ্নবালকেরা, নিস্পাপ বীরেরা নির্বাচন করে রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলেও তারাই হয়ে উঠবে নতুন দানব, নতুন ফ্যাসিস্ট।
তোমরা ২০২৪ সালের জুলাই মাসে বিপ্লবের যে বীজ বুনেছ সেখানে একটি ছোট্ট চারাগাছ গজিয়েছে মাত্র, এটিকে যত্ন করো, পানি ঢালো, তৈরি করো চূড়ান্ত বিপ্লবের এক মহীরূহ। বিপ্লব এখনো চলমান, তোমরা বিপ্লবীদের ভূমিকায়ই থাকো, নেতৃত্ব দাও, চূড়ান্ত বিজয় না হওয়া পর্যন্ত। ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে রাজনীতির পচা রাস্তায় পা বাড়ালে ইতিহাসের এক অন্ধকার নর্দমায় গিয়ে পতিত হবে।
এখন তোমাদের কাজ গণমানুষের কাছে যাওয়া, তাদের সঙ্গে নিয়ে জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্খার পূর্ণ বাস্তবায়নে মনোযোগ দেওয়া। জুলাই ঘোষণাপত্র তৈরি করো, শহীদ মিনারে যাও, ঘোষণা দাও। তোমরা তোমাদের রাস্তায় অটল থাকো। কেউ তোমাদের আপন নয়।
সাংবিধানিক রাস্তা তোমাদের জন্য নয়। এখন যারা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে আছেন, তোমরাই যাদের নিয়োগ দিয়েছ, সাংবিধানিক নিয়ম-শৃঙ্খলার চাপে পড়ে তারা তোমাদেরই ঠিক করে দেওয়া লক্ষ্য থেকে, জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্খা থেকে, অনেক দূরে সরে গেছে। এই কক্ষচ্যুতি কিংবা বিচ্যুতি একদিন তোমাদের গ্রাস করে ফেলবে, তোমাদের প্রতি মুহূর্তে সচেতন থাকতে হবে, যাতে নিয়মের বিভ্রমে তোমরা না পড়ো। মনে রাখবে, কোনো নিয়ম মানার জন্য তোমাদের জন্ম এবং উত্থান হয়নি, নতুন নিয়ম তৈরি করার জন্য তোমাদের জন্ম হয়েছে। সেই নতুন নিয়ম প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত তোমাদের বিপ্লব অব্যহত রাখতে হবে। মনে আছে তো, ‘বিপ্লব কোনো নৈশভোজ নয়’? বিপ্লবীদের পায়ে পায়ে হাঁটে মৃত্যু, প্রতি মুহূর্তে মৃত্যুকে হাতের মুঠোয় নিয়েই তোমাদের এগিয়ে যেতে হবে, পাড়ি দিতে হবে অনেক অনেক বন্ধুর পথ।
হলিসউড, নিউইয়র্ক। ২৪ এপ্রিল ২০২৫
Posted ১১:২১ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৫
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh