কাজী জহিরুল ইসলাম : | বৃহস্পতিবার, ০১ মে ২০২৫
দুটি আনন্দের ঘটনা বলি। ২৭ এপ্রিল, রোববার ২০২৫। রাত দশটা বাজে। ওপরে উঠে গেছি। শুয়ে পড়ার আয়োজন চলছে। কাল সোমবার। জল স্কুলে যাবে, আমি অফিসে যাবো, খুব ভোরে উঠতে হবে। আমার স্ত্রী মুক্তি বাড়িতে নেই, বোনের বাড়ি বেড়াতে গেছেন, অনেক দূরের দেশ, নিউজিল্যান্ডে। সকালের কাজগুলো আমাকে একাই ম্যানেজ করতে হবে। দ্রুত শুয়ে পড়ার একটা তাগিদ অনুভব করছি।
ফোন বেজে উঠলো। স্ক্রিনের নীল আলোতে লেখা, দেওয়ান নাসের রাজা। নাসের ভাই, মানে আমাদের কবি দেওয়ান নাসের রাজা। হাসন রাজার চতুর্থ পুরুষ। ভীষণ অমায়িক একজন মানুষ। তিনি তার প্রপিতামহের মতো গান লেখেন, মরমী ধারার কবিতা লেখেন। শুদ্ধ ছন্দে কবিতা লেখার চেষ্টা করেন। তার এই চেষ্টা আমাকে আনন্দ দেয়। মাঝে মাঝে ছোটো ছোটো টেক্সট ম্যাসেজ পাঠিয়ে জেনে নেন যদি কোনো শব্দের মাত্রামূল্য নিয়ে খটকা লাগে।
জহির ভাই, আমি এবং আমার ছেলে আপনার গেইটে, একটা প্যাকেট দিব। এতো রাতে প্যাকেট দেবেন! আমি কিছুটা অবাক হই। সম্ভবত তিনি আর কখনোই আমাদের বাড়িতে আসেননি, এলেও তা এক-আধবারের বেশি হবে না। আমি বিছানা থেকে নামি, দোতলা থেকে নামি, বাড়ির সিকিউরিটি এলার্ম বন্ধ করি। দরোজা খুলতে খুলতে ভাবি, নিশ্চয়ই নাসের ভাইয়ের নতুন কোনো কবিতার বই বেরিয়েছে। কবিদের এই পাগলামী আমার অচেনা নয়। আমারও কী মাঝে মধ্যে মনে হয়নি, মধ্যরাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে গাড়িটা স্টার্ট দিই, যাই, শহীদ ভাইকে (কবি শহীদ কাদরী) নতুন কবিতার বইটা দিয়ে আসি? এরপর বাড়ি ফিরে চুপচাপ চোখ বন্ধ করে ভেবেছি, কোন কবিতাটা পড়ে শহীদ ভাইয়ের চোখে কী ধরণের অভিব্যক্তি খেলা করেছে। সেইসব ভেবে শক্তি পেয়েছি, অনুপ্রেরণা পেয়েছি, আনন্দ পেয়েছি। এভাবেই রচিত হয়েছে আমার কবিতা-যাত্রার সুদীর্ঘ পথরেখা।
নাসের ভাইয়ের ছেলে আমার দিকে একটা ব্যাগ বাড়িয়ে দিল, ওর ভেতরে বেশ কিছু বাক্স। আমি বলি, এগুলো কী নাসের ভাই? তিনি বলেন, আমার বোনের বাড়িতে গিয়েছিলাম, আপনাদের কাছেই, ও দুটো প্যাকেট দিলো, কিছু পিঠা ও মিষ্টান্ন। ভাবলাম, একটি আমার বাড়িতে নিয়ে যাই আর একটি আপনাকে দিয়ে যাই। কী আশ্চর্য! আমার চোখ হয়ত কিছুটা আর্দ্র হয়ে উঠলো। পৃথিবীর পথে পথে ছড়িয়ে থাকা এই ভালোবাসা আমাকে কাঁদাবে না তা কী হয়? নাসের ভাই ও তার পুত্র ভেতরে ঢুকলেন না। রাত হয়ে গেছে, সকালে কাজে যেতে হবে। দরোজায় দাঁড়িয়েই কবিতা নিয়ে, সাহিত্য নিয়ে কিছু কথা হয়। ওদের সময় করে আসতে বলি, এইসব নিয়ে আরো বিস্তারিত কথা বলার জন্য। নাসের ভাইয়ের ছেলেও গুণী এক যুবক। মানুষের জন্য কাজ করতে চায়। জুলাই বিপ্লবের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল। লেখালেখি করার ব্যাপারে ভীষণ আগ্রহী।
ওরা চলে গেলে প্যাকেট খুলে দেখি কয়েক রকমের পিঠা, গুড়ের পায়েশ ও আরো এক রকমের ডেজার্ট। মাঝরাতের এই দূর দেশে একটি প্লাস্টিকের প্যাকেটের ভেতর সযত্নে রাখা ভালোবাসায় মাখানো, মমতায় জড়ানো কয়েক টুকরো বাংলাদেশ। আমি আরো একবার আনন্দে কাঁদি। এবার দ্বিতীয় ঘটনাটি বলি। আজ দুপুরে একটি কাজে গিয়েছিলাম পার্সন্স বুলেভার্ডে। ওখানে একটি বাঙালি গ্রোসারি শপ আছে। বেশ পুরনো। কিন্তু ওই এলাকাটায় আমাদের যাওয়া হয় না। কোভিডের সময় আমাদের জুবায়ের হোসেন ভাই এই দোকানটির কথা আমাদের বলেন। তিনি নিশ্চিত করেন, ফোনে আইটেমগুলো বলে দিলেই ওরা গাড়িতে তুলে দেবে, আপনাকে দোকানে ঢুকতে হবে না। ওই একবারই গিয়েছিলাম।তখন গাড়িতেই বসেছিলাম, ফোনে কিছু পণ্যের নাম বলি, দোকান থেকে একজন এসে গাড়িতে তুলে দেয়। আজ আমি দোকানে ঢুকি। পেটমোটা একটি দইয়ের কন্টেইনার কিনি। পয়সা দেবার জন্য কাউন্টারে দাঁড়িয়েছি। শুভ্র শশ্রুমণ্ডিত সুদর্শন এক ভদ্রলোক কাউন্টারে। তিনি বারবার আমার দিকে তাকাচ্ছেন। এই তাকানোটার সঙ্গে আমার পরিচয় আছে। চেনা চেনা লাগছে। একই শহরে থাকি নিশ্চয়ই দেখেছেন কোথাও। এক পর্যায়ে আমি ক্রেডিট কার্ড তার হাতে তুলে দিতে গেলে তিনি সোজা আমার চোখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করেন, আপনি লেখালেখি করেন, তাই না?
আমি সম্মতিসূচক মাথা দোলাই। তিনি ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না এরপর কী বলবেন। মুখে তার বিজয়ের হাসি। হঠাৎ বলেন, আপনার লেখা পড়ি, খুব ভালো লাগে। আমার হয়ত তার সঙ্গে আরো কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে কথা বলা উচিত ছিল। কিন্তু কী এক তাড়ায় আমি দ্রুত বেরিয়ে আসি। হয়ত কিছুটা অভদ্রতাই হয়ে থাকবে। বলা যায় এই লেখাটি সেই অভদ্রতারই কৈফিয়ত।
গাড়ি চালাতে চালাতে খুব আল মাহমুদের কথা মনে পড়ছিল তখন। এখন এই অভিব্যক্তিটি লিখতে লিখতেও মাহমুদ ভাইকেই মনে পড়ছে। তিনি আমাকে বলেছিলেন, রাবারের স্যান্ডেল পায়ে দিয়ে গোলাপফুল আঁকা একটি টিনের বাক্স নিয়ে ১৯৫৫ সালে এসে নেমেছিলাম ফুলবাড়িয়া স্টেশনে। আজ এই যে এতো মানুষের ভালোবাসা পাই, এতো সম্মান পাই, দেশ-বিদেশে ঘুরি, সব তো কবিতার জন্য, শুধুই কবিতা। কবিতা ছাড়া আর কোনো সম্পদ ছিল না আমার।
আমরা জানি, গোলাপফুল আঁকা সেই টিনের বাক্সে করে তিনি নিয়ে এসেছিলেন বাংলাদেশের সব নদী, সব পাখি, সব বৃক্ষ, সব মানুষ। সেইসব বৃক্ষ, পাখি, মানুষ নদী একসঙ্গে কবিতার ভাষায় আমাদের সঙ্গে কথা বলেছে, এখনও কথা বলেই যাচ্ছে, বলবে আরো বহুকাল। আমিও কী কবিতার জন্যই এই ভালোবাসা পাচ্ছি না? কবিতার জন্য পাওয়া এই ভালোবাসা একেবারেই নিখাদ, এই ভালোবাসার জন্যই একটি লম্বা সময় বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করে।
হলিসউড, নিউইয়র্ক। ২৭ এপ্রিল ২০২৫
Posted ১১:৪৩ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ০১ মে ২০২৫
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh