বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬ | ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

Weekly Bangladesh নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত
নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত

মালিকের দালানের নয়, শুনতে হবে মালিকের কথা

কাজী জহিরুল ইসলাম :   |   বৃহস্পতিবার, ০৮ মে ২০২৫

মালিকের দালানের নয়, শুনতে হবে মালিকের কথা

জাতীয় ঐক্যমত্য কমিশনের ওপর আমার পুরোপুরি আস্থা আছে। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজের নেতৃত্বে এই কমিশন শেষ পর্যন্ত দেশপ্রেমকেই তাদের চালিকা নীতি স্থির রেখে রাষ্ট্র মেরামতের, যেটিকে আমরা সংস্কার বলছি, সেই কাজকে একটি সফল পরিণতির দিকে নিয়ে যাবেন। আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলো, বিশেষ করে বিএনপি, দেশের চেয়ে তাদের দলের, এবং তারও চেয়ে বেশি জিয়া পরিবারের, স্বার্থকে বড়ো করে দেখছে, এবং সেটিকে এই কমিশন সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে কিন্তু প্রকৃত সত্য হয়ত তা নয়।

কিছুতেই একটি পরিবারের স্বার্থ রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার কাজের প্রধান বিবেচ্য বিষয় হতে পারে না। সেটি যত বড়ো শক্তির মুখ দিয়েই উচ্চারিত হোক না কেন।

রাজনৈতিক দলগুলোর মূল শক্তি দেশের মানুষের আকাঙ্খার সঙ্গে একাত্মতা। তারা যদি গণমানুষের আকাঙ্খা বুঝতে না পারেন তাহলে তাদের এই শক্তির প্রাসাদ মুহূর্তেই এক মুঠো ছাই হয়ে শূন্যে মিলিয়ে যেতে পারে। বিএনপির সাম্প্রতিক কার্যক্রম এবং নেতাদের বক্তব্যে সেই ছাই হয়ে ঝরে পড়ার লক্ষণ বেশ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলো কোনো না কোনো একক ব্যক্তির কারিশমায় গড়ে ওঠে এবং ক্রমশ সেই ব্যক্তি, এবং কালক্রমে তার পরিবার, হয়ে ওঠে দলের পাওয়ার সেন্টার বা ক্ষমতার কেন্দ্র। পরবর্তীতে তারা আর মানুষের আকাঙ্খাকে মূল্য দেন না, পাওয়ার হাউসকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হতে থাকে দল, এভাবে চাটুকার শ্রেণি তৈরি হয়, ক্ষমতারোহণের পরে স্বৈরাচার তৈরি হয় এবং এক সময়ে পুরো দেশ একটা মাফিয়া রাজ্যে পরিণত হয়। দেশের মূল মালিক যারা, সেই জনগণ হয়ে যায় তাদের কৃপায় কোনোরকমে বেঁচে থাকা প্রজামাত্র।

দেশে যদি গণতন্ত্রের চর্চা অব্যাহত থাকে তাহলে আস্তে আস্তে এই অবস্থা থেকে, খুব ধীরে হলেও, উত্তরণ ঘটে। কিন্তু একক কোনো ব্যক্তি বা পরিবার কেন্দ্রিক রাজনীতি চলমান থাকলে গণতন্ত্র হোচট খাবেই, বাঁধাগ্রস্থ হবেই, ফ্যাসিবাদ তৈরি হবেই।
রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচন চাইছে। শাদা চোখে দেখলে মনে হবে এটিই তো চাওয়ার কথা। নির্বাচন ছাড়া আর কি কোনো পথ আছে গণতন্ত্রে উত্তরণের? উত্তর হচ্ছে, না নেই, নির্বাচনই একমাত্র সমাধান, গণমানুষের শাসন প্রতিষ্ঠার উপায়। তাহলে দেশের মানুষ কেন ড. ইউনূসের শাসন দীর্ঘায়িত করার কথা বলছে? আমরা কি একটি অনির্বাচিত সরকারকে দীর্ঘদিন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে রাখবো? না, রাখবো না। দেশের মানুষ দুটি কারণে ইউনূসের সরকারকে একটু বেশি সময় দিতে চায়।

জুলাই বিপ্লবের গণ-আকাঙ্খার মধ্য দিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়েছে, এই সরকারের ওপর মানুষের বিপুল আস্থা আছে এবং সেই আস্থা পুরণে তারা ইতোমধ্যেই অনেকখানি সফল হয়েছেন।

যদিও তাদের মূল কাজ দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইন শৃঙ্খলার উন্নতি, রাষ্ট্রের অর্থনীতি সুসংহত করা, বিদ্যুৎ, গ্যাস, ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিত করা ইত্যাদি নয়, তবুও রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকলে বাই ডিফল্ট এই কাজগুলো সফলতার সঙ্গে করতে হয় কারণ এগুলোর সুফল কিংবা কুফল সরাসরি জনজীবনকে প্রভাবিত করে। এইসব রুটিন কাজের মতোই অবাধ, সুষ্ঠু এবং গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন অনুষ্ঠান এই সরকারের একটি বাই ডিফল্ট কাজ। একটা সময়ে সেটি তাদের করতেই হবে যদিও সেটি তাদের ম্যান্ডেট নয়, জুলাই বিপ্লবের মূল গণ-আকাঙ্খা নয়।

যে আকাঙ্খা নিয়ে বাংলাদেশের মানুষ ১৪০০ প্রাণের বিনিময়ে, ৩০ হাজার আহত মানুষের আত্মত্যাগের বিনিময়ে, এই সরকার গঠন করেছে, মোটা দাগে তা মাত্র সুনির্দিষ্ট দুটি কাজ। সর্বপ্রধান কাজটি হচ্ছে রাষ্ট্র সংস্কারের মধ্য দিয়ে এমন একটি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যাতে এই দেশে আর কোনোদিন গণতন্ত্র ভূলুণ্ঠিত না হয়, আর কোনোদিন ফ্যাসিবাদ তৈরি না হয়। অন্য দায়িত্বটি বিপ্লবের বাই প্রোডাক্ট হিসেবে তাদের কাঁধে এসে পড়েছে। সেটি হচ্ছে গণহত্যার বিচার করা, এবং সেই বিচার এমন একটি দৃষ্টান্ত তৈরি করবে যাতে ভবিষ্যতে আর কেউ এই পথে হাঁটার কথা চিন্তাও করতে না পারে। এই দুটি কাজ হয়ে গেলে তারা একটি নির্বাচন দেবেন এবং জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারের কাছে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে বিদায় নেবেন।

ড. ইউনূসের সরকারকে মানুষ বেশি সময় দিতে চাইছে যে দুটি কারণে তার একটি হচ্ছে, তারা ভীত, যদি রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় এসে আবার দেশকে পুরনো জায়গায় নিয়ে যায়, যদি আবার সুশাসন ভূলুণ্ঠিত হয়।

ড. ইউনূসের সরকার রুটিন কাজগুলো দক্ষতার ও সততার সঙ্গে করে দেশের মানুষের আস্থা অর্জন করে ফেলেছেন। মানুষ কিছুটা নিরাপদ বোধ করছেন, একটা কমফোর্ট জোন তৈরি হয়েছে, এখান থেকে তারা বের হতে ভয় পাচ্ছেন। দ্বিতীয় যে কারণে মানুষ এই সরকারকে একটু বেশি সময় দিতে চায় তা হচ্ছে, মানুষ মনে করে নতুন বন্দোবস্ত নিশ্চিত না করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিদায় নিলে আবার গণতন্ত্র হাতছাড়া হয়ে যাবে, আবার দেশের জনগণ, যারা প্রকৃত মালিক, তারাই হয়ে যাবে কোনো না কোনো পরিবারের দাস, রাতের অন্ধকারে যে কাউকে তুলে নিয়ে যাবে রাজার কোতোয়াল।

নতুন বন্দোবস্ত নিশ্চিত করার জন্য গলদঘর্ম হয়ে কাজ করছে জাতীয় ঐক্যমত্য কমিশন। এই কমিশন জানে কী করতে হবে। তাদের হাতে চূড়ান্ত লক্ষের, অর্থাৎ স্বপ্নের বাড়িটার, স্থাপত্য নকশা আছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে বাড়িটা তারা কীভাবে নির্মাণ করবেন, কে অনুমোদন দেবে, সেটা বুঝতে পারছেন না। তারা রাজনৈতিক দলগুলোকেই সেই বাড়ি নির্মাণের অনুমোদনকারী ভাবছেন, তাই দফায় দফায় তাদের সঙ্গে আলোচনা করছেন, দর কষাকষি করছেন অনুমোদন পাওয়ার জন্য।

তারা এও জানেন, রাজনৈতিক দলগুলো দেশের প্রকৃত মালিককে পুরোপুরি প্রতিনিধিত্ব করে না। কিন্তু মালিকের সংখ্যা এতো বেশি যে মূল মালিকের কাছে পৌঁছানোর রাস্তাও তারা খুঁজে পাচ্ছেন না, তাই মালিকের প্রতিনিধি ভেবে ভুল মানুষদের কাছেই বারবার যাচ্ছেন। ১৯৯০ সালে এই প্রতিনিধিদের বিশ্বাস করেই স্থায়ী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার একটি রূপরেখা তৈরি করা হয়েছিল। রোপণ করা হয়েছিল তত্বাবধায়ক সরকার নামক একটি বীজ। সেই বীজ থেকে অঙ্কুরিত চারা গাছটি পূর্ণাঙ্গ বৃক্ষ হয়ে ওঠার আগেই রাজনৈতিক দলের পাওয়ার হাউজগুলো, মানে পরিবারগুলো, সেটিকে সমূলে উৎপাটন করেছে।

বিএনপি প্রথমে এর মূল কেটে দিয়েছে, পরে আবার জল ঢেলে বাঁচাতে চেয়েছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে পুরো গাছটিকেই শেকড়শুদ্ধ উপড়ে ফেলে দিয়েছে। তাই বাংলাদেশের মানুষ আর দুই পরিবার-কেন্দ্রিক এই দুটি দলকে বিশ্বাস করতে পারছে না। তারা এর চেয়েও শক্ত, মজবুত কোনো ব্যবস্থা চায় যাতে আগেরবারের মত আবারও তাদের ঠকতে না হয়, আবারও ১৪০০ মানুষকে প্রাণ দিয়ে বিপ্লব ঘটাতে না হয়।

রাজনৈতিক দলগুলো হচ্ছে দেশের মালিকের দালাল। সেই দালালের কাছে না গিয়ে বিপ্লবের মধ্য দিয়ে তৈরি হওয়া গণমানুষের সরকারকে, ঐক্যমত্য কমিশনকে, নতুন বন্দোবস্ত তৈরির অনুমোদনটা নিতে হবে সরাসরি মালিকের কাছ থেকেই। এজন্য তাদেরকে প্রচলিত নিয়মতান্ত্রিকতার চৌহদ্দি পেরিয়ে কিছুটা সৃজনশীল হতে হবে। যেভাবে তারা সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতাকে পাশ কাটিয়ে গণমানুষের আকাঙ্খা পূরণের জন্য একটি সৃজনশীল অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করেছেন ঠিক সেইভাবে গণমানুষের মূল আকাঙ্খা পূরণের জন্য পূর্ণাঙ্গ সংস্কারের কাজটিও সম্পন্ন করতে হবে। কোনো রাজনৈতিক দলের চাওয়া-না চাওয়াকে গুরুত্ব দেওয়া যাবে না।

সকল রাজনৈতিক দলের ঐক্যমত্যের ভিত্তিতে তারা যে জুলাই সনদ তৈরি করতে যাচ্ছেন সেটি বাস্তবায়ন করার জন্যও তো সাংবিধানিক নিয়মের ব্যত্যয় ঘটাতে হবে, অধ্যাদেশের মাধ্যমে তা কার্যকর করতে হবে। আংশিক বাস্তবায়ন যদি অধ্যাদেশের মাধ্যমে করা যায় তাহলে পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন কেন করা যাবে না? তারা হয়ত ভেবে থাকবেন রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যমত্যই তাদের বৈধতা, তাহলে আমি বলবো, এর চেয়েও অনেক শক্তিশালী বৈধতা অর্জনের পথে আপনারা হাঁটুন, যদিও জুলাই বিপ্লবই আপনাদের সেই বৈধতা দিয়েছে তবুও আরো একবার আপনারা জনগণের কাছে যেতে পারেন।

সকল রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা শেষে ঐক্যমত্যের ভিত্তিতে যে সংস্কারের তালিকা তৈরি হবে, সেটি এক হাতে নিন, অন্যহাতে নিন আপনাদের সুপারিশকৃত পূর্ণাঙ্গ তালিকা। এবার জনগণকে, যারা দেশের মালিক, তাদের জিজ্ঞেস করুন, আপনারা কোনটি চান?
কীভাবে জিজ্ঞেস করবেন? বলছি সে কথা। না, আমি প্রচলিত গণভোটের কথাও বলবো না। আপনারা একটি অনলাইন ভোটের আয়োজন করবেন। এর আগে ৯০ দিনের সময় নিয়ে সরকারি মেশিনারিজ, যেমন: জেলা, উপজেলা প্রশাসন, সকল সরকারি স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, বিশ্ববিদ্যালয়, জেলা নির্বাচন কমিশনারের অফিস ইত্যাদির মাধ্যমে যতটা সম্ভব গণসচেতনতা তৈরি করবেন। মানুষকে বোঝাবেন দুটি তালিকার পার্থক্য।

এরপর একটি অনলাইন ভোটের আয়োজন করবেন। অনলাইন জরিপের সবচেয়ে বড়ো অসুবিধা হলো, একজন মানুষ একাধিক ভোট দিতে পারে। এই অসুবিধা দূর করার জন্য এমন একটা সফটওয়্যার তৈরি করবেন যাতে ভোটাররা তাদের জাতীয় পরিচয়পত্রের নাম্বার ব্যবহার করে ভোট দেয়, তাহলে এক ব্যক্তির একাধিক ভোটদান রোধ করা যাবে। কোন বয়সের মানুষ সংস্কার জরিপে ভোট দিতে পারবে তাও জাতীয় পরিচয় পত্রের মাধ্যমে নিশ্চিত করা যাবে।

এই ব্যবস্থায় দেশের ও প্রবাসের সকল বাংলাদেশিকে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানাবেন। শতভাগ মানুষ এতে যুক্ত না হলেও এমন একটা সংখ্যার প্রতিনিধিত্ব পাবেন, তা অবশ্যই রাজনৈতিক দলগুলোর মুখচেনা কিছু নেতার বাগাড়ম্বরের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর ও সন্তোষজনক হবে। আপনাদেরও তখন আত্মবিশ্বাস অনেক বেড়ে যাবে।

হলিসউড, নিউইয়র্ক। ৩০ এপ্রিল ২০২৫

Posted ১১:৩৩ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ০৮ মে ২০২৫

Weekly Bangladesh |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

গল্প : দুই বোন

(9324 বার পঠিত)

মানব পাচার কেন

(1584 বার পঠিত)

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১
১৩১৫১৬১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭৩০  
Dr. Mohammed Wazed A Khan, President & Editor
Anwar Hossain Manju, Advisor, Editorial Board
Corporate Office

86-47 164th Street, Suite#BH
Jamaica, New York 11432

Tel: 917-304-3912, 718-523-6299 Fax: 718-206-2579

E-mail: [email protected]

Web: weeklybangladeshusa.com

Facebook: fb/weeklybangladeshusa.com

Mohammed Dinaj Khan,
Vice President
Florida Office

1610 NW 3rd Street
Deerfield Beach, FL 33442

Jackson Heights Office

37-55, 72 Street, Jackson Heights, NY 11372, Tel: 718-255-1158

Published by News Bangladesh Inc.