কাজী জহিরুল ইসলাম : | বৃহস্পতিবার, ১৯ জুন ২০২৫
মুক্তির বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী নুরুল খান, ওর একটা ভারী মিষ্টি ডাকনাম আছে, ইরন। কখনো যদি ভুল করে নুরুল ডাকি, ও খুব রাগ করে, বলে এটা দূরের মানুষের জন্য, কাছের মানুষের কাছে আমি ইরন। ইরনের দুটি গুণ আছে, একটি হচ্ছে জানার প্রবল আগ্রহ, ওর জ্ঞানতৃষ্ণা আমাকে মুগ্ধ করে, অন্য গুণটি হচ্ছে ওর সারল্য এবং বিনয়। আমরা অনেকেই সচেতনভাবে বিনয়ী, প্রশংসিত হবার জন্য বিনয় প্রকাশ করি কিন্তু ইরনের বিনয়টা স্বতঃস্ফূর্ত, স্বভাবগতভাবেই ও বিনয়ী। এই বিনয় ওর মধ্যে তৈরি হয়েছে গভীর জীবনবোধ থেকে, ‘এক মিনিটের নাই ভরসা’ কথাটি যদি কেউ গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারে তাহলে তার মধ্যে ঔদ্ধত্য বিকশিত হবেই না।
আগে থেকেই বলে রেখেছে ও আমাকে আজ পায়া এবং নান খাওয়াবে। আমি বলি,
‘পায়াতে তো অনেক ক্যালোরি, হাই কোলেস্টেরল, ওটা আমি খেতে পারবো না।’
‘তাহলে বুটের ডাল আর নান।’ তাই হলো। আমরা কিং কাবাবে বসলাম। শুরুতেই ও আমার সদ্য ফেইসবুকে পোস্ট করা গল্প ‘কোন দিকে যাবো’র কথা তুলল। ‘সেদিন বলেছিলাম না, আপনার কবিতা তো অনেক পড়েছি, এবার গল্প পড়তে চাই। আজ ট্রেনে বসে আপনার গল্পটা পড়লাম’। আমি ওর মুখের দিকে মুগ্ধতা এবং ঔৎসুক্য নিয়ে তাকিয়ে আছে। ও বলে, ‘ওইগুলো ছাড়া কি গল্প লেখা যায় না জহির ভাই?’
আমি বুঝতে পারি ও কোনদিকে ইঙ্গিত করছে। এই গল্পে, গল্পের প্রয়োজনেই নারীদেহের সামান্য বর্ণনা এসেছে। আমি একটি বিশেষ শ্রেণির সমাজ-চিত্রটি তুলে ধরতে চেয়েছি, তাদের জীবনযাত্রার প্রতিফলন ঘটাতে চেয়েছে। ইরন ইমদাদুল হক মিলনের প্রসঙ্গ টেনে আনলেও স্বীকার করে যে এই গল্প সেই দিকে যায়নি।
এরপরে ও যা বললো তার মধ্যে একজন কথাশিল্পীর সার্থকতাই ব্যক্ত হয়েছে। ‘গল্পটা শেষ না করে তো ছাড়া যায় না। ট্রেনে বসে পড়ছিলাম, হঠাৎ নেটওয়ার্ক চলে গেলে, পরে ম্যানহাটনের এক স্টেশনে নেমে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে শেষ করলাম।’ কথা সাহিত্যের এবং একজন সফল কথাসাহিত্যিকের এটি একটি গুণ বটে, পাঠককে গল্পের মধ্যে ধরে রাখা, তবে এটি প্রাথমিক গুণ, মূল কাজটি হলো পাঠককে আটকে রেখে তার ঝুলিতে কিছু একটা তুলে দেওয়া, সেই কাজটি করতে না পারলে লেখকের মূল কাজটি করা হয় না।
‘কথাসাহিত্যে তো ইতিহাসের মত সত্য থাকে না’। ওর এই কথার সম্ভবত একটি ভালো উত্তর আমাকে দিতে হবে। আমি বলি, ‘এই গল্পে হুমায়ূন এবং হাসিনার কথা বলেছি। ওরা শংকরে থাকে। হুমায়ূন অবসরপ্রাপ্ত সরকারী কর্মকর্তা। সত্যি সত্যি শংকরে হয়ত এই নামের কেউ থাকে না কিন্তু এই গল্পে হুমায়ূন এবং হাসিনার মধ্যে যা যা ঘটলো ঢাকা শহরে ঠিক ওই সময়টাতে, নব্বুইয়ের দশকে, এমন ঘটনা কি বহু পরিবারে ঘটেনি? এইটিই হচ্ছে কথাসাহিত্যের সত্য। কথাসাহিত্য একটি সময় ও একটি সমাজকে সামগ্রিকভাবে প্রতিনিধিত্ব করে।’
‘আচ্ছা কিছুদিন আগে আপনার আরেকটি লেখায় যে পড়লাম, কেউ একজন গাড়ির ট্রাংক বন্ধ করতে গিয়ে আপনার মাথা ফাটিয়ে দিল, আপনি নিজের মাথা থেকে রক্ত পড়তে দেখে ওই লোককে বললেন, ভাই আপনি তাড়াতাড়ি চলে যান, আমার স্ত্রী দেখলে বিপদে পড়বেন, ওটাও কি গল্প ছিল, নাকি সত্যি ঘটনা?’ আমি বলি,
‘ওটা সত্যি ঘটনাই ছিল।’
‘সত্যি সত্যি রক্ত বেরিয়েছিল, নাকি সামান্য আঘাত লেগেছিল?’
‘রক্ত বেরিয়েছিল।’
‘আপনি তো তাহলে মানবতার অনেক উচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে গেছেন। এই পর্যায়ে তো আমাদের সমাজের বহু মানুষ যেতেই পারবে না। আমরা তো খালি নামাজ নিয়ে ব্যস্ত, মানবিক হওয়ার কোনো চেষ্টাই তো নাই।’
এরপর আমাদের আলোচনা ধর্ম, আধ্যাত্মিকতা, জীবাত্মা, পরমাত্মা, পরকাল, বিশ্বাস-অবিশ্বাস হয়ে রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনা, বাক স্বাধীনতা ইত্যাদি বৃত্তে ঘুরপাক খায়। এরই মধ্যে আমাদের সঙ্গে যোগ দেন বিটিভির সাবেক প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম এবং তার বন্ধু হাসান। তখন আমাদের বাক-স্বাধীনতার আলোচনাটি প্রায় টেলিভিশনের টক শো-এর মত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
ইরনের বক্তব্য হলো, ‘একজন নাস্তিক যদি নবী রসুলের সমালোচনা করে, তাকে তা করতে দিতে হবে, সবাই তার মনের কথা নির্ভয়ে, নিঃসংকোচে বলতে পারবে, আমি এইরকম একটা সমাজ চাই।’
এতোক্ষণ ইরন কোনো একটা কথা বলে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকত সেই প্রসঙ্গে আমার মতামত শোনার জন্য। এখন যেহেতু আমরা চারজন নৈর্ব্যক্তিক বক্তব্যের ওপর যে কেউ মন্তব্য করতে পারে। সাইফুল ভাই কথা কম বলা মানুষ কিন্তু হাসান সাহেব কোনো কথাই মাটিতে পড়তে দেন না, সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য করেন। তিনি ফ্রান্সের সেই কার্টুনিস্টের প্রসঙ্গ টেনে আনেন। ‘লোকটাকে মেরেই ফেললো!’
আমি বলি, ‘বাক-স্বাধীনতা আমরা কার কাছে চাইব? রাষ্ট্রের কাছে। কিন্তু জনতাকে সামলাব কী করে? সেজন্য মত প্রকাশের ক্ষেত্রে আমাদের দায়িত্বশীল হতে হবে। আমি যদি বলি, তোমাকে গালি দিতে পারা আমার মত প্রকাশের স্বাধীনতা, তাহলে তুমি বলবে আমাকে জুতো দেখানোও তোমার স্বাধীনতা, এভাবে সমাজে কলহ সৃষ্টি হয়। আমাকে অবশ্যই শালীন মত প্রকাশ করতে হবে। বহু মানুষের অনুভূতিতে আঘাত লাগে এমন কথা বলার ক্ষেত্রে ঝুঁকি থাকবেই। বিশেষ করে ধর্ম বা সম্প্রদায় নিয়ে কটু কথা বলাকে বাক-স্বাধীনতার পর্যায়ে না ফেলাই ভালো।’
এই ধরনের আলোচনায় আড্ডাবাজেরা কখনো ক্লান্ত হয় না, আলোচনা চলতেই থাকে কিন্তু আমাকে যেহেতু উঠতে হবে, সকলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে উঠে পড়ি। দিনের আলো নিভে গেছে। ঝুপ করেই অন্ধকার নেমে এলো। হেনলি অ্যাভিনিউতে অনেক চড়াই-উতরাই। গাড়িটা যখন একটি নিচু জায়গা থেকে ওপরের দিকে উঠছিল তখন পুরো উইন্ডশিল্ড জুড়ে উদ্ভাসিত হলো প্রকাণ্ড এক পূর্ণ চাঁদ, এ যেন সত্যি সত্যি বিশাল এক রূপোর থালা। গাড়িটা যেভাবে ওপরে উঠছিল, মনে হচ্ছিলো এর গন্তব্য ওই চাঁদ ছাড়া আর অন্য কোথাও হতেই পারে না। এমন অনন্য দৃশ্য দেখতে দেখতে যদি চন্দ্রাহত হই, যদি আমাকে কবিতার ঘোরে পেয়েই বসে, ক্ষতি কী?
Posted ১২:৩৮ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ১৯ জুন ২০২৫
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh