মাহমুদ রেজা চৌধুরী : | বৃহস্পতিবার, ২৬ জুন ২০২৫
মাঝে, মাঝে জীবন চলার পথে কিছু নতুন সম্ভাবনা ও স্বপ্ন জাগে মনে। যেমন জেগেছে ২৪ শে জুন, ২০২৫ তারিখে যুক্তরাষ্ট্রে নিউইয়র্কের মেয়র নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে ডেমোক্রেট দলের প্রার্থী, জোহরান মামদানির প্রাথমিক ঐতিহাসিক বিজয়ে। এই দেশে গণতন্ত্রের এটা একটা বৈশিষ্ট্য যে, পাবলিক কোন বিশেষ পদের চূড়ান্ত নির্বাচনের আগেই দলের ভেতর থেকে একাধিক প্রতিনিধি সেই পদে প্রার্থী হিসেবে নিজেকে ঘোষণা দিতে পারেন। তারপর, সেখানে প্রাথমিক বা প্রাইমারি ভোট হয়। যেখানে দল থেকে কে, দলের প্রার্থী হবেন। চূড়ান্ত হয়, নাগরিকদের “সরাসরি” ভোটের মাধ্যমেই।
এটা প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও হয়। আমাদের দেশের মতো না যে, দল থেক একজনকেই দল মনোনীত করে আর সে-ই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন দলের প্রার্থী হিসেবে। এখানে দল থেকে যে কেউ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারেন প্রাথমিক প্রার্থী হিসেবে। এরপর জনগণ নির্ধারণ করেন, কে দলের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন প্রতিপক্ষের সাথে।
নিউইয়র্কে মেয়র নির্বাচনের প্রাথমিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অন্যতম প্রার্থী এই রাজ্যের প্রাক্তন গভর্নর অ্যান্ড্রু কুমোও ডেমোক্রেট দলের মেয়র প্রার্থী ছিলেন। প্রচন্ড প্রতিযোগিতামূলক প্রাইমারিতে বিজয়ী হন তাঁর অন্যতম প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী, জোহরান মামদানি। এন্ড্রো কুমোর সাথে প্রায় ১০% ভোটের ব্যবধানে জোহরান মামদানি বিজয়ী হন মেয়র প্রার্থী হিসাবে ডেমোক্রেট দলের প্রতিনিধি হিসাবে। আসছে নভেম্ব ২০২৫ এ চূড়ান্ত নির্বাচন হবে ডেমোক্রেট দলের জোহরান মামদানির সাথে রিপাবলিকান দলের প্রার্থীর ভোট যুদ্ধ।
আমেরিকার অন্যতম বড় স্টেট নিউইয়র্ক, সবসময়ই ডেমোক্রেট রাজ্য হিসেবেই সুপরিচিত। অতএব আশা করা যায়, স্বপ্ন দেখা যায়, নিউইয়র্কের আগামী মেয়র হচ্ছেন, ডেমোক্রেট দলের তরুণ উল্লেখিত বিজয়ী প্রার্থী জোহরান মামদানি,(৩৩)। মামদানির বয়স এখন মাত্র ৩৩ বছর। জন্ম, অক্টোবর ১৮, ১৯৯১।
ভোটে তাঁর বিপক্ষে ডেমোক্রেট দলের আরেক প্রার্থী ছিলেন নিউইয়র্ক স্টেটের প্রাক্তন গভর্নর ৭০ + বয়সের আলোচিত প্রার্থী মিস্টার কুমো। অনেকেই আশা করেছিলেন, সদ্য পরিচিত জোহরান মামদানির এই লড়াইয়ে বিজয়ী হওয়া কঠিন হবে। অনেকের এ-ও ধারণা ছিল যে, এন্ড্রু কুমোই বিজয়ী হবেন। শেষ পর্যন্ত দেখা গেল, এই ধারণাকে ভুল প্রমাণিত করে বিজয়ী হলেন ৩৩ বছরের তরুণ ও সম্ভাবনাময়ি জোহরান মামদানি। ভবিষ্যতে দেশে-বিদেশের রাজনীতিতেও তরুণদের সম্ভাবনাময় অংশগ্রহণ ও বিজয় অনেক কিছুর শুভ বার্তাও দেয় ও দিবে।
এই বিজয়ের বিশেষত্ব, নিউইয়র্ক স্টেটে এই প্রথম একজন মুসলিম প্রার্থী মেয়র হিসাবে প্রথমত, প্রাথমিক নির্বাচনে বিজয়ী হন, এবং নভেম্বর নির্বাচনেও তাঁর বিজয়ের সম্ভাবনা উজ্জ্বল বলেই মনে হয়। এই বিজয়ের আরেকটা বিশেষ দিক, নিউইয়র্কে বসবাসরত বাংলাদেশী কমিউনিটির বড় একটা অংশের জোহরান মামদানিকে সমর্থন করা ও তাঁর পক্ষে কাজ করা। এই নির্বাচনে নিউইয়র্কে বাংলাদেশী অধিবাসীদের বিশেষ এই ভূমিকা নিকট ভবিষ্যতে এই রাজ্যের রাজনীতির মানচিত্রকেও বদলে দিতে পারে। উল্লেখ্য যে, জোহরান মামদানি, তাঁর বিজয় ঘোষনার বক্তৃতাতে বাংলাদেশীদের তাঁকে সমর্থন করার কথা উল্লেখ করেন। এটাও বাংলাদেশীদের জন্য রাজনৈতিক ক্ষেত্রে আমাদের রাজনৈতিক অস্তিত্বের এক বড় স্বীকৃতি।
পাশাপাশি, এই নির্বাচনে আরেকজন বাংলাদেশী প্রার্থী, শাহানা হানিফ, নিউইয়র্ক সিটি কাউন্সিলের ৩৯ নাম্বার ডিস্ট্রিক্টে পুনঃনির্বাচিত হয়েছেন। এটাও কম আনন্দের না। এই দূর প্রবাসে বাংলাদেশীদের মূল স্রোত ধারার সাথে সংশ্লিষ্টতা, একাত্মতা, কাজের অভিজ্ঞতা। পাশাপাশি রাজনীতিতেও অংশগ্রহণের গুরুত্ব বাড়ছে। এটাকে খাটো করে দেখার অবকাশ কম। বেশ কয়েক বছর থেকেই দেখা গেছে ও যাচ্ছে যে, এইদেশের মূল ধারার অনেক বড়, বড় রাজনৈতিক নেতা ও কর্মীরা বাংলাদেশীদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এমনকি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানেও এসে বক্তৃতা দিচ্ছেন এবং আমাদের সমর্থন চাচ্ছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের আগামী মূল স্রোতধারার রাজনীতিতেও এর প্রভাব ও ভূমিকা আরো বাড়বে। ফলে, বিদেশে বসে দেশীয় রাজনীতির সভা-সমিতি বক্তৃতা, বিবৃতি, চিৎকার, বন্ধ হতে পারে। এটা বন্ধ হওয়াও দরকার। দেশের রাজনীতি দেশের মাটিতে বসে করা ভালো। জ্যাকসন হাইটসের “ডাইভারসিটি প্লাজা” বা কোন রেস্টুরেন্টের “বেইসমেন্টে” না। লক্ষ্য থাকা উচিত, এস্টেট অ্যাসেম্বলি বা সরাসরি কংগ্রেস বা সিনেটে বসে এই দেশের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করা। এর শুরুও হয়েছে কোথাও কোথাও, যেমন আমাদের গৌরব এখন, শাহানা হানিফ। এই সংখ্যা আগামীতে আরো বাড়ুক।
আরেকটা কথা না বললে নয় যে, জোহরান মামদানির প্রাথমিক বিজয়ে ভিন্ন রকমের একটা ভয় ও আশঙ্কাও আছে। মুসলিম কমিউনিটি বনাম ইহুদী ও খ্রিস্টান কমিউনিটির সাথে এক ধরনের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও আশঙ্কা, এই শহরের কোথাও, কোথাও শোনা যায়। ইতিমধ্যে মেয়র প্রার্থী, জোহরান মামদানির উপর আক্রমণ ও তাঁর জীবননাশের হুমকি এসছে। তাঁর উপরে একটা গুরুতর প্রাণনাশের হুমকিও দেয়া হয়েছে। একজন তাঁকে বোমা মেরে উড়িয়ে দেয়ার কথাও বলেছেন। মামদানিকে অলরেডি আখ্যায়িত করা হয়েছে “সন্ত্রাসী” হিসাবে। কারণ, জোহরান মামদানি, ধর্মমতে একজন মুসলিম। যেকোন মুসলিমকে “সন্ত্রাসী” বলে আখ্যায়িত করার পশ্চিমা মিডিয়া ও আন্তর্জাতিক অনেক মিডিয়ার পুরাতন স্বভাব ও চরিত্র। বেশ কয়েক বছর আগেও লন্ডনে যখন প্রথম একজন মুসলিম মেয়র নির্বাচিত হন; তখনও এই রকম প্রচারণা হয়। এটা নতুন না।
“কাভারিং ইসলাম”, এডওয়ার্ড ডব্লিউ সাঈদ, একজন রাজনৈতিক ভাষ্যকার, লেখক, অধ্যাপক এবং সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মী। তিনি আন্তর্জাতিক বিশ্বেও সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব। তাঁর উল্লেখিত বই পড়লেও জানা যায়, পশ্চিমা মিডিয়া বা এর প্রচার মাধ্যম কিভাবে ইসলামকে দেখে এবং ইসলাম সম্পর্কে একটা ভ্রান্ত ও আন্দাজী ধারণা উসকে দেয় বিশ্ববাসীর কাছে। বিভ্রান্ত করে পশ্চিমের চৈতন্যকেও। এই ব্যাপারে মুসলিম বিশ্ব এবং মুসলিম অনেক নেতাদের যে কোনও ভূমিকা নাই, তাও বলি না। তবে সেই সব ভূমিকার চাইতেও মারাত্মক ভূমিকা পালন করে “পশ্চিমা মিডিয়া” এই মুসলমান সম্পর্কে বিশ্বে নানান বিভ্রান্ত ছড়িয়ে। শুধু মুসলমানদের ও তাঁদের ধর্ম ইসলামকে মৌলবাদী “ট্যাগ” দিয়ে “সন্ত্রাসী” হিসাবেই চিহ্নিত করা পশ্চিমা মিডিয়ার অন্যতম প্রধান কাজ।
এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ আছে। তবে এই আলোচনাতে সেটা লিখছি না। শুধু এতটুকু বলা যায় যে, নিউইয়র্কের নতুন সম্ভাব্য মেয়র, জোহরান মামদানিকে এই অসম্ভব চ্যালেঞ্জের মোকাবেলায় নামতে হবে অত্যন্ত সতর্কভাবে এবং সুসংগঠিত হয়ে। আবেগ দিয়ে না, যুক্তি ও প্রজ্ঞা দিয়ে। জোহরান মামদানির বিজয় যতটা সহজ হয়েছে ও হবে। সেই বিজয়কে ধরে রাখা এবং সফল করা তার চেয়েও বড় কঠিন হবে। তবু বলা যায় যে, মামদানি তাঁর প্রাথমিক বিজয়ের পর বিশ্ব বরেণ্য নেতা নেলসন ম্যান্ডেলার একটা কথা বলেছেন, “ইট অলওয়েজ সিমস, ইম্পসিবল আনটিল ইটস ডান”। অর্থাৎ, কোন কিছু অসম্ভব হয় তখনই, যতক্ষণ না পর্যন্ত সেটা সম্ভব করা না যায়।
নিউইয়র্কের আগামী নতুন মেয়র, জোহরান মামদানি আপাতত একটা অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন তাঁর প্রাথমিক বিজয় অর্জনের মধ্য দিয়ে। পরবর্তী পদক্ষেপে তাঁর বিজয় আরো সুনিশ্চিত হবে, তাঁর সফল এবং সুনেতৃত্বের মাধ্যমে। নিউইয়র্কে বাংলাদেশী অধিবাসী ও নাগরিকদের পূর্ণ সহযোগিতা প্রসারিত হোক জাতি, ধর্ম ও সব বর্ণের ঊর্ধ্বে, নিউইয়র্কের আগামী মেয়র জেহরান মামদানির প্রতি। এটা আমাদের প্রত্যাশা, নিউ ইয়র্কের ইতিহাসে এই শুভ বিজয় চূড়ান্ত বিজয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হোক ও থাকুক যুক্তরাষ্ট্রের সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে সুদীর্ঘকাল। এখানে বাংলাদেশী সব নাগরিক ও অধিবাসীদের ইতিবাচক ভূমিকা থাকুক এবং তা যেন রাখতে পারি আমরা।
Email. [email protected]
Posted ১১:৩৬ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২৬ জুন ২০২৫
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh