কাজী জহিরুল ইসলাম : | বৃহস্পতিবার, ২৪ জুলাই ২০২৫
স্থানীয় সময় সকাল নয়টায় রানওয়ের মাটি ছুঁয়েছে বোয়িং ট্রিপল সেভেন। একটি ধারালো ছুরির মতো ভোরের আলো এসে যখন রাতটাকে কেটে দিচ্ছিল, ঘন্টা চারেক আগে, সেই দৃশ্য বিমানের জানালা দিয়ে দেখে শিহরিত হচ্ছিলাম। বিমান তখন আকাশে, চল্লিশ হাজার ফুট আল্টিচ্যুড। এই আলো কখন ধরার ধুলোয় লুটিয়ে পড়বে তা দেখার প্রতীক্ষায় ছিলাম এতোক্ষণ।
কিন্তু আইল সিট থেকে ১৮০ ডিগ্রি দৃষ্টিতে তাকিয়ে বিমানের জানালা দিয়ে আকাশের তলপেট দেখে এখন আমি হতাশ। ক্যাপ্টেন জানিয়েছেন পরিস্কার আকাশ। ‘পরিস্কার আকাশ’ কথাটা শুনলেই আমাদের চোখের সামনে ঝকঝকে নীল একটি আকাশের ছবিই ভেসে ওঠে কিন্তু রিয়াদের আকাশে নীলের সামান্যতম ছিটেফোঁটাও নেই। বানের জলের মতো ঘোলা কিংবা ধুসর একটি বিচ্ছিরি আকাশ। এমন অসুন্দর ভোরের আকাশের সঙ্গে আমি যে অপরিচিত তা নয়, সুদানের দারফুরে যখন কাজ করতাম তখন এই আকাশের সঙ্গে আমার প্রতিদিনই দেখা হতো।
আমার একজন সহকর্মী ছিলেন জহিরুল ইসলাম, জাতিসংঘের মানবাধিকার কর্মকর্তা, খুবই ইতিবাচক মানুষ। আমি জহিরের মুখে কোনোদিন কোনো কিছু ‘অসুন্দর’ এ-কথা শুনিনি। দারফুরের ধুসর আকাশের দিকে তাকিয়ে জহির বলতো, কাজী ভাই দেখেন, কী সুন্দর আকাশ। নীল বিবর্জিত আকাশে আমি কোনো সুন্দর খুঁজে পেতাম না। আমার দেখা অতি অসুন্দর একটি শহর দারফুরের আল ফেশার। এই শহরের অনেক মানুষ ইউরোপ, আমেরিকায় বসবাস করে।
বছরে, দু’বছরে একবার ওরাও ছুটিতে বাড়ি ফেরে। আল ফেশারের শেষ প্রান্তে ছোটো ছোটো টিলার মতো কয়েকটি বালির পাহাড় আছে। গোধুলি লগ্নে, যখন সূর্যের আলো লাল হয়ে আসে, তখন ওই টিলাগুলোর দিকে তাকিয়ে আমেরিকা ফেরত, ইউরোপ ফেরত দারফুরিয়ানরা আবেগে উচ্ছ্বসিত হত, আমাদের কাউকে কাছে পেলে বলত, দেখেন, ল্যান্ডস্ক্যাপটা সুইজারল্যান্ডের মত না?
আমরা তখন মনে মনে হাসতাম। ধুলোর আবরণের ভেতর দিয়ে পড়ন্ত বিকেলের যে লাল আভা দেখা যেত, তার ভেতরে ডুবে থাকা টিলাগুলোর আবছায়া ওদেরকে হয়ত নস্টালজিক করে তুলত, হয়ত বহু দূরে ফেলে আসা স্বদেশের শৈশব বুকের ভেতর থেকে লাফিয়ে বেরিয়ে আসত। মাঝে মাঝে ভাবতাম এতো টাকা খরচ করে ওরা ইউরোপ, আমেরিকা থেকে দারফুরের এই শুষ্ক, ধুসর মরুতে কেন ছুটি কাটাতে আসে?
তাপমাত্রাও অসহনীয় মাত্রায় উত্তপ্ত এবং শুষ্ক। পৃথিবীতে বেড়াবার কত সুন্দর জায়গা পড়ে আছে। আসলে মাতৃভূমির সৌন্দর্যের কাছে বুঝি পৃথিবীর সব সৌন্দর্যই ম্লান হয়ে যায়। নিজের মা কালো কিংবা খর্বাকৃতির হলেও পৃথিবীর সব মায়ের চেয়ে সুন্দর মনে হয়, সেই মায়ের কোলে মাথা রেখেই সর্বাধিক প্রশান্তি অনুভব করে পৃথিবীর প্রতিটি সন্তান।
নানান দেশে কাজ করার সময় কিছু সৌদি নারীর সঙ্গে দেখা হয়েছে। প্রায় সকলের মধ্যেই একটা কেষ্ঠ, পুরুষালী ভাব দেখেছি। নারীর কমনীয়তা দেখিনি। সাউদিয়া এয়ারলাইন্সের বিমান বালারাও এর ব্যতিক্রম কিছু নয়। সাজ-পোশাকেও, বিমানবালাসুলভ ধারালো অথচ কমনীয় যে ব্যাপারটি থাকে, তা একদমই নেই ওদের মধ্যে। সিট বেল্ট সাইন নিভে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ালো যাত্রীরা।
লক্ষ করে দেখি শুষ্ক, রুক্ষ, দীর্ঘদেহী এবং বলিষ্ঠ আরব্য নারীরা ওভারহেড লকার থেকে কেবিন ব্যাগগুলো এমনভাবে অনায়াসে নামাচ্ছে যেন ওগুলো একেকটা শিমুল তুলোর বালিশ। রিয়াদ বিমানবন্দরের ছোট্ট একটি অংশে হাতে গোনা কয়েকটি ডিউটি ফ্রি শপ। কেমন একটা ফকিরা ফকিরা ভাব সর্বত্র। পৃথিবীর আধুনিক বিমানবন্দরগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে রিয়াদ বিমানবন্দর অবশ্যই অত্যন্ত দরিদ্র গোছের একটি। এক সময় এই বিমান বন্দরে প্রচুর আসতাম। আজ থেকে কুড়ি বছর আগে এথেন্স-রিয়াদ রুটে প্রচুর ট্রাভেল করেছি। আমার মোটেও মনে হচ্ছে না এই কুড়ি বছরে রিয়াদ বিমানবন্দরের জৌলুস তেমন একটা বেড়েছে। অথচ অর্থবিত্তের দিক থেকে যথেষ্ঠ ধনী একটি দেশ সৌদি আরব, রিয়াদ এর রাজধানী।
জিডিপির মাথাপিছু আয় এখন ত্রিশ হাজার ডলারেরও অধিক। মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড়ো দেশ, পৃথিবীর কুড়িতম বৃহত্তম দেশ। মোট জিডিপি ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে, এপেকের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, জি-২০ এর সদস্য। ২০২৪ সালে ব্রিকসেও যোগ দিচ্ছে দেশটি। বিশ্ব রাজনীতিতে যথেষ্ঠ গুরুত্বপূর্ণ একটি দেশ। ইজরায়েল-ফিলিস্তিন যুদ্ধ কোন দিকে যাচ্ছে তার অনেকটাই নির্ভর করছে সৌদি আরবের ওপরে। সৌদি আরবের সবচেয়ে বড়ো পাওয়ার হচ্ছে জ্বালানি তেল। সৌদির হাতেই পৃথিবীর অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণের চাবি। পৃথিবীর সর্ববৃহৎ জ্বালানী তেল রপ্তানীকারক দেশ হিশেবে বিশ্ব-তেলের বাজারের নিয়ন্ত্রণ এই দেশটির হাতে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়লে পৃথিবীর অর্থনীতি অস্থির হয়ে পড়ে, সব কিছুর দাম বেড়ে যায়। এ-কারণেই সারা পৃথিবী সৌদি আরবকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে, সমীহ করে চলে।
ফ্রি ওয়াইফাই, পরিচ্ছন্ন টয়লেট এইসবও ভালো বিমানবন্দরের ইন্ডিকেটর, সেই দিক থেকে বিশ্বামানেরই কিন্তু সব কিছুর পরেও একটা ঝিমুনি ভাব বিমানবন্দরের সর্বত্র। বন্দরগুলোতে যেমন মানুষের উর্ধশ্বাসে ছুটে চলা চোখে পড়ে সেই রকম কোনো তাড়া বা চাঞ্চল্য নেই কোনো এক জোড়া পায়ে।
এলোমেলো শৈল্পিক দাড়ি, মুখে স্নিগ্ধ হাসি, নিভু নিভু যৌবনের এক পুরুষ হাঁটাহাঁটি করছেন রিয়াদ বিমানবন্দরে। চোখাচোখি হতেই কাছে এগিয়ে এলেন। প্রথমে ইংরেজিতে, তারপর বাংলাদেশে যাচ্ছি জানার সঙ্গে সঙ্গেই, বাংলায় জানতে চাইলেন, ওয়াইফাই কানেক্ট করবো কীভাবে? এসব বিষয়ে আমি একদম আনাড়ি, একটু সাহায্য করবেন?
নিশ্চয়ই করবো। ওই যে একটা মনিটর দেখছেন ওখানে আপনার বোর্ডিং পাস স্ক্যান করলে ওয়াইফাই পাসওয়ার্ড জেনারেট হবে। ওটা এন্ট্রি করলেই ওয়াইফাই পেয়ে যাবেন। ভদ্রলোক ইংরেজিটা বেশ মার্কিনি উচ্চারণে বললেও বাংলা বলছেন পুরো ময়মসিংহের টানে। নিজের নাম জানালেন সুবিনয় কুমার।
কোনো কথা খুঁজে না পেয়ে আমি হঠাৎ বলি, ঢাকায়ই থাকবেন?
প্রশ্নই ওঠে না। সোজা ময়মনসিংহ যাবো। আমি দেশে এলে মাস দুয়েক থাকি, পুরো সময়টা বাড়িতে কাটাই। ঢাকায় আসি শুধু প্লেনে ওঠার জন্য।
নিউইয়র্কে কি ব্যবসা করেন?
আমি রিটায়ার্ড। এমটিএ-তে ছোটোখাটো একটা চাকরি করতাম। বুয়েট থেকে পাশ করে বাংলাদেশে কিছুদিন চাকরি করেছি, আশির দশকের শুরুর দিকেই আমেরিকায় চলে যাই। ওয়াইফাইয়ের পাসওয়ার্ড সংগ্রহ করার জন্য সুবিনয় বাবু মনিটরের দিকে যান, আমিও ডিউটি ফ্রি দোকানগুলোর দিকে পা বাড়াই। ঢাকার ফ্লাইট বিকেল চারটায়, এখনো অনেক সময় বাকি। প্লেনে সৌদি কফি গাওয়া পান করে আমি এতোই মুগ্ধ হয়েছি যে ডিউটি ফ্রি শপে ঢুকেই গাওয়া খুঁজতে থাকি। এখান থেকে যদি একটা পণ্য ক্রয় করি তবে নিঃসন্দেহে তা গাওয়া।
তখন প্রায় তিনটা, বোর্ডিং শুরু হয়ে গেছে। আমাকে দেখে সুবিনয় বাবু মুখে প্রশস্ত হাসির একটি ইমোজি এঁকে হাত তুললেন। এতক্ষণ কোথায় ছিলেন? পাসওয়ার্ড পাওয়ার পরেও অনেক ঝামেলা হয়েছে কানেকশন পেতে। আপনাকে পইপই করে খুঁজলাম, কোথাও পেলাম না।
এখান থেকে ঢাকা ৬ ঘন্টার ফ্লাইট এবং এই ফ্লাইটের যাত্রীদের প্রায় সকলেই বাংলাদেশি। আগেও বিভিন্ন লেখায় ঢাকা-মধ্যপ্রাচ্য ফ্লাইটের বর্ণনা দিয়েছি। এই ফ্লাইটগুলোতে চড়লেই বাংলাদেশকে দেখা যায়। আমরা যে আধুনিক পৃথিবী থেকে কতটা পিছিয়ে আছি তা দেখার জন্য বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখতে হয় না। বাংলাদেশই তার পুরো চরিত্র নিয়ে এখন উঠে এসেছে রিয়াদ-ঢাকা রুটের এই বিমানটিতে।
অধিকাংশ যাত্রীই ক্রুদের নির্দেশনা বোঝেন না, যারা বোঝেন তারাও মানেন না। কখন সিট বেল্ট খুলতে হয় না তার তোয়াক্কা কেউ করছে না। একদল লোক আইলে হাঁটাহাটি করছে, জোরে জোরে কথা বলছে, চিৎকার করে একে অন্যকে ডাকছে, ক্রুদের নিয়ে জোরে জোরে বাজে মন্তব্য করছে, সিট নাম্বার বুঝতে না পেরে যে যার মতো বসে পড়ছে। প্লেনে ওঠার সময় আজকাল জোন ভাগ করে যাত্রীদের তোলা হয়, এই ঘোষণাও আমার বাঙালি ভাইয়েরা মানেননি, সকলেই আগে ওঠার জন্য হুড়োহুড়ি শুরু করে দেন।
এতোসব অনিয়ম হাসিমুখে মেনে নিয়ে একজন কেবিন ক্রু ক্রমাগত সার্ভিস দিয়ে যাচ্ছেন। মেয়েটি বাংলাদেশি, ওর নাম জান্নাত। ও হয়ত লক্ষ করে থাকবে আমি আশেপাশের যাত্রীদের বিভিন্ন নির্দেশনা বুঝিয়ে দেবার চেষ্টা করছিলাম। এক পর্যায়ে তিনি আমার কাছে এসে হাঁটু গেড়ে ফ্লোরে বসে পড়লেন।
ছিপছিপে শ্যামলা তরুণী, আমার ছেলের চেয়েও হয়ত ছোটো হবে, জানতে চাইলেন, আমার কিছু লাগবে কিনা। আমি বললাম, আপনি যে পরিমান পরিশ্রম করছেন যাত্রীদের সামলাতে, কিছু চাইতে আমার বরং সংকোচই লাগছে। মেয়েটি বিনয়ে গলে গিয়ে বলেন, না, না, একদম ভাববেন না যে আমার কোনো অসুবিধা হচ্ছে বা আমি বিরক্ত হচ্ছি, প্রকৃতপক্ষে আমি এই ফ্লাইটটা খুব উপভোগ করি। বাঙালিদের এই সান্নিধ্যটা আমার খুব ভালো লাগে।
আমরা আসলে কথা বলছিলাম ইংরেজিতেই। জান্নাত জানালো ওর পিতৃভূমি সিলেটে, তবে সে খুব ছোটোবেলা থেকেই রিয়াদে থাকে। এই রুটে আমি নানান দেশের কেবিন ক্রুদের দেখেছি যাত্রীদের সঙ্গে খারাপ ব্যাবহার করতে। জান্নাত যে ব্যতিক্রম, কাস্টমার এক্সেলেন্স বলে যে একটা বিষয়ের কথা আজকাল পশ্চিমারা বলেন, তার আইডিয়াল দৃষ্টান্ত জান্নাত, কথাটা আমি ওকে জানাতেই ও যারপরনাই খুশি হয়। জান্নাত খুব বিনয়ের সঙ্গে বলেন, ইউ মেইড মাই ডে স্যার, আমি ইকোনমি ক্লাসের ইনচার্জ, আমাদের বসকে কি আপনার কাছে পাঠাতে পারি? যদি আপনার ফিডব্যাকটা তাকে জানান পুরো টিম খুশি হবে। আমি বলি, সানন্দে জানাবো, আপনি চাইলে আমি তা লিখিতভাবেও বলতে রাজি আছি।
কিছুক্ষণ পরে এক সৌদি পুরুষ এসে মুখ গম্ভীর করে বলেন, আপনি নাকি আমার সঙ্গে কথা বলতে চান? ওর এইরকম রাশভারী এবং গম্ভীর ভাব দেখে আমার সব আবেগ মুহূর্তেই হাওয়া। আমিও বেশ ব্যক্তিত্ব বজায় রেখে ওকে প্রথমে জান্নাতের এবং জান্নাতের নেতৃত্বে পুরো টিমের কাস্টমার এক্সেলেন্সের প্রশংসা করলাম। সব শুনে ভদ্রলোক অনুমতি চাইলেন, আমার প্রফেশন কি তা জানতে পারেন কি-না এবং আমার পুরো নাম কী। আমি পেশা এবং নাম জানাতেই তিনি তা একটি ন্যাপকিনে লিখে নিয়ে চলে যান।
Posted ১২:৫৬ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২৪ জুলাই ২০২৫
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh