কাজী জহিরুল ইসলাম : | বৃহস্পতিবার, ৩১ জুলাই ২০২৫
কিছুক্ষণের মধ্যেই রাত বারোটার ঘরে মিনিটের কাঁটা ঘন্টার কাঁটার ওপরে উঠবে। ক্যালেন্ডার হেলে পড়বে ১৮ অক্টোবরের দিকে।বিমান রানওয়ের মাটি ছুঁতেই সিটবেল্টের মেটাল-ফ্ল্যাপ খোলার শব্দে একটা হুলুস্থুল মিউজিক তৈরি হয়ে গেল। জান্নাত ও তার দল হিমশিম খাচ্ছে অসহিষ্ণু বাঙালি যাত্রীদের নিয়ন্ত্রণ করতে।
বাঙালিদের মধ্যে বিবেকের চেয়ে আবেগ বেশি কাজ করে, এই বিষয়টি সম্প্রতি এক নারী অপরাধীর বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। সেই আবেগ ইগ্নাইট করে, অর্থাৎ আবেগের আগুন জ্বালাতে ম্যাচের কাঠিতে ঘষা দেওয়ার কাজটি করে, হুজুগ। একজন সিটবেল্ট খুলেছে তো সবাই খুলতে শুরু করে। দেখলাম, এক যুবক যাত্রী এয়ারহোস্টেসদের কথাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে, অথবা বুঝতে না পেরে, সিট থেকে উঠে দাঁড়ালেন এবং ওভারহেড লকার খুলে হ্যান্ডলাগেজ টানতে শুরু করেন। সঙ্গে সঙ্গে আরো দশ/বারোজন উঠে একই কাজ শুরু করলেন।
বিমান তখনও রানওয়েতে ট্যাক্সি করছে এবং ট্যাক্সির গতি যথেষ্ঠই বেশি। এই অবস্থায় ওভারহেড লকার খোলা খুবই বিপদজনক, লাগেজ ছিটকে পড়ে যাত্রীদের মাথায় আঘাত লাগতে পারে। ঝুঁকি নিয়ে তখন দুজন এয়ারহোস্টেজ ছুটে এসে ওদের নিবৃত্ত করার জন্য খুব কঠিন কণ্ঠে ধমক লাগালেন। একজন বাঙালি হিসেবে আমি খুবই অপমানিত বোধ করলাম। আর কত বছর লাগবে আমাদের সভ্য হতে? প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় কি বিদেশ গমনেচ্ছু বাংলাদেশিদের জন্য একটি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে পারে না? আমি মনে করি প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জন্য এটি অবশ্য-কর্তব্য একটি কাজ এবং তা অগ্রাধিকার কর্মতালিকায় রাখা উচিত।
ঢাকা বিমান বন্দরে এলে প্রতিবার আমি চোখের সামনে তৈলাক্ত বাঁশ বেয়ে বানরের উঠানামার অঙ্কটির দৃশ্যপট দেখতে পাই। কখনো দেখি বিমানবন্দরের চিত্রে আমুল পরিবর্তন। সব নিয়মতান্ত্রিকভাবে এগুচ্ছে, ঝকঝকে পরিস্কার বিমানবন্দর, ইমিগ্রেশন পুলিশেরা সহযোগিতামূলক আচরণ করছে। বাথরুম পরিস্কার, লাগেজ পেতে সময় লাগছে না।
মনে মনে খুব খুশি হই, আমরা বুঝি আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছে গেলাম। কিন্তু পরের বছর গিয়ে দেখি সেই পুরনো চিত্র। ইমিগ্রেশনের লাইন এগুচ্ছে না। লাইন ভেঙে যাত্রী ঢুকছে পুলিশের সহায়তায়, লাগেজের জন্য দেড়ঘন্টা বসে আছি লাগেজ আসছে না। যাত্রীরা হৈ চৈ গালাগালি করছে। দুর্গন্ধে বাথরুমে ঢোকা যাচ্ছে না।
বিমান থেকে নামার পরে লাগেজ নিয়ে গাড়িতে উঠতে এবার আমার সময় লেগেছে দুই ঘন্টা। বেল্টে লাগেজের জন্য দাঁড়িয়ে আছি, তখন আবার সুবিনয় বাবুর সঙ্গে দেখা।
এখানে প্রায় দেড় ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে বলে একজন প্রবাসীর দৃষ্টিতে বাংলাদেশকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখার সুযোগ পাই। ময়মনসিংহে তিনি গ্রাম খুঁজে পান না, এই আক্ষেপ করলেন। সকলের হাত স্মার্ট ফোনে, চোখ ইউটিউবে। বাড়ির কাজের মেয়েরা দিনের একটা বড়ো সময় ইউটিউবে ভিডিও দেখে কাটায়। দশ/পনের হাজার টাকার নিচে কাজের মেয়ে পাওয়া যায় না। অবশ্য তাদের দোষ দিয়েও কোনো লাভ নেই। নিত্যপণ্যের দাম এতো বেড়েছে এর কমে ওরা চলবেই বা কী করে? এরপরে এদিক-ওদিক তাকিয়ে তিনি আমার প্রায় মুখের কাছে এসে বলেন, ভাই, বাংলাদেশের থানা, ইউনিয়ন পর্যায়ের সরকারী দলের নেতা-কর্মীদের হাতে এতো টাকা, আমরা যারা আমেরিকায় থাকি, ডলারে আয় করি, তারাও তাদের কাছে কিছুই না। বিশ বছর আগে যেসব পরিবারের ছেলেমেয়েরা দুইবেলা খেতে পারত না, সেইসব পরিবারের ছেলেরা এখন শত কোটি টাকার মালিক, গ্রামের মধ্যে ডুপ্লেক্স বাড়ি বানিয়েছে, গাড়ি হাঁকাচ্ছে।
বিমান বন্দরের কাস্টমস বিভাগের লোকদের মনস্তাত্ত্বিক জ্ঞান অসম্ভব রকমের উচ্চ পর্যায়ের। আমি প্রতিবার এই বিষয়টি লক্ষ করি তারা ঠিক শনাক্ত করে ফেলেন কোন যাত্রীর ব্যাগ স্ক্যান করতে হবে। আমি প্রায়শই আমার ইউএন পাসপোর্টটি হাতে রাখি যাতে দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তি দেহে নিয়ে আরো দশ মিনিট লাগেজ স্ক্যানের জন্য ব্যয় করতে না হয়।
নিউইয়র্ক থেকে বেরুবার আগে খেয়াল করিনি যে আমার নীল পাসপোর্টটির মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়েছে। ফলে এবার ওটা আনিনি, ট্রাভেল করছি বাংলাদেশি ন্যাশনাল পাসপোর্ট নিয়ে। মনে মনে ভাবছি, স্ক্যান না করে ছাড়বে তো? আমার বড়ো চুল? দাড়ি? নাকি হাঁটার ছন্দে কিছু ছিল? সামনের প্রায় সব যাত্রীকেই মেশিনে লাগেজ তুলতে বললেও ভদ্রলোক আমার দিকে তাকিয়েই বলেন, স্যার যান।
আমি মনে মনে কাস্টমসের লোকটির প্রতি কৃতজ্ঞতা অনুভব করি। মধ্যরাতে বিমান থেকে নামার একটা বড়ো সুবিধা হলো ট্রাফিকমুক্ত ঢাকা শহর পাওয়া। বাইরে আমার ছোটো ভাই বিটন গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছিল।
মাত্রা কুড়ি মিনিটে বিমানবন্দর থেকে রামপুরার বনশ্রীতে পৌঁছে যাই। নীরব, অসংখ্য গাড়ির চাকার ঘষ্টানি আর হর্নের শব্দদূষণমুক্ত, ঢাকা শহর আমাকে রাতের স্নিগ্ধ অভিবাদন জানালো। [২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে ঢাকায় যাওয়ার অভিজ্ঞতা]
Posted ১২:২১ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ৩১ জুলাই ২০২৫
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh