কাজী জহিরুল ইসলাম | বৃহস্পতিবার, ০৭ আগস্ট ২০২৫
সেলিব্রিটিরা অটোগ্রাফ দিতে পছন্দ করেন। যারা উঠতি সেলিব্রিটি তারা একটু বেশিই পছন্দ করেন। অটোগ্রাফ দেয়া নিয়ে অনেক মজার গল্প আছে। একদিন কবি শহীদ কাদরী একটি মজার অভিজ্ঞতার কথা বলেছিলেন। সিরাজগঞ্জ থেকে এক যুবক এসেছে, ঘুরে ঘুরে সব লেখকের অটোগ্রাফ নিচ্ছে। শামসুর রাহমানের নিয়েছে, সৈয়দ শামসুল হকের নিয়েছে। শহীদ কাদরী এবং আল মাহমুদ পাশাপাশি বসেছিলেন। আল মাহমুদ যুবককে ডেকে বলেন, অটোগ্রাফ নিতে এসেছো, আসো অটোগ্রাফ দেই। এরপর আল মাহমুদ খাতার পুরো পৃষ্ঠা জুড়ে নিজের নাম স্বাক্ষর করেন। শহীদ কাদরী কৌতুহলী হয়ে পৃষ্ঠা উল্টান, দেখতে চান আল মাহমুদ কী লিখলেন। দেখেন যে তিনি কিছুই লেখেননি, পুরো পৃষ্ঠা জুড়ে শুধু নিজের নামটাই লিখেছেন। শহীদ কাদরী তখন লিখলেন, সব স্বাক্ষরই একদিন মুছে যাবে। এর নিচে খুব ছোটো করে নিজের নাম লেখেন, শহীদ কাদরী। গল্পটা বানানোও হতে পারে। তবে এই গল্পের “সব স্বাক্ষরই একদিন মুছে যাবে” শহীদ ভাইয়ের কন্ঠে উচ্চারিত এই শব্দগুচ্ছ আমার প্রায়শই মনে পড়ে।
আজ দুপুরে সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমরা শুধু স্যুপ খাবো, আর কিছু না। ব্রোকলি চেডার স্যুপ খেয়ে মুক্তি এবং আমি অফিসের লম্বা করিডোরে পায়চারি করছি। হঠাৎ আমি মুক্তিকে প্রশ্ন করি, এমন ক’টা নাম আছে পৃথিবীতে যে নামগুলো পৃথিবীর প্রায় সব মানুষই জানে? মুক্তি হয়ত অন্য কিছু ভাবছিল, হঠাৎ আমার এইরকম প্রশ্ন শুনে একটা শূন্য দৃষ্টিতে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। আমি বলি, ঈসা, মূসা, মোহাম্মদ, বুদ্ধ, সক্রেটিস এদের নাম পৃথিবীর সব মানুষ না হোক অধিকাংশ মানুষই জানে। তখন হয়ত মুক্তি বিষয়টির মধ্যে ঢুকতে পারে এবং আচমকা বলে উঠে, অবশ্যই অবশ্যই। এই বিষয় নিয়ে আমরা বেশ কিছুক্ষণ কথা বলি। পৃথিবীতে নিজের নামটিকে স্থায়ী করার জন্য আমরা কত কিছুই না করি। গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের লেখা, নচিকেতা ঘোষের সুরে মান্না দে’র গাওয়া সেই বিখ্যাত গান “যদি কাগজে লেখো নাম/ কাগজ ছিঁড়ে যাবে/ পাথরে লেখো নাম/ পাথর ক্ষয়ে যাবে/ হৃদয়ে লেখো নাম/ সে নাম রয়ে যাবে” কত শতবার শুনেছি, তবু আমরা প্রতিদিন কাগজে লিখি, প্রায়শই শ্বেতপাথরের ফলকে লিখি কিন্তু মানুষের হৃদয়ে লেখার চেষ্টা খুব একটা করি না।
বিষয়টা খুবই কাকতালীয়। মানুষের জীবনে অহরহই কাকতালীয় ঘটনা ঘটে, আমার ঘটে একটু বেশিই, যখন তখন ঘটে। করিডোরের অন্য প্রান্তে, যেখানে ভিয়েনা ক্যাফে, সেখানে এসে একটা লম্বা লাইন দেখে দাঁড়িয়ে পড়ি। কি হচ্ছে এখানে? সৌদি দূতাবাস আজ এখানে প্রদর্শন করছে দুই হাজার বছরের প্রাচীন আরবী হরফের নিদর্শন। পাথরে, পোড়ামাটিতে, তামার পাত্রে খোদাই করা আরবী অক্ষর। সাধারণত এইসব প্রাচীন নিদর্শন দর্শনার্থীদের ছুঁয়ে দেখতে দেয়া হয় না। নির্দেশিকা লেখা থাকে। কিন্তু এখানে কোনো নির্দেশিকা নেই, সুযোগটা আমিও নিই। প্রাচীন স্থাপনা, নিদর্শন ছুঁয়ে দেখার তৃষ্ণা আমার আজন্ম। এইসব নিদর্শনে আঙুল রেখে চোখ বন্ধ করে আমি সেই সময়টাতে পৌঁছে যেতে চাই। পারিও হয়ত। আমি আসলে ছুঁতে চাই আমার শেকড়।
গতমাসে ওমরাহ করতে গিয়ে যখন কাবাঘরের দেয়ালে হাত রাখি, গিলাফে না, একেবারে দেয়ালে, তখন মনে হয়েছিল আমি আদিপিতা ইব্রাহীমের, ইসমাইলের হাত ছুঁয়ে আছি। বিশাল লাইনের পেছনে না দাঁড়িয়ে লাইনের তীর্থে চলে যাই। কী হচ্ছে এখানে? একজন জেলাবী পরা ক্যালিগ্রাফি শিল্পী আরবী ক্যালিগ্রাফিতে আগ্রহীদের নাম লিখে দিচ্ছেন। আমিও লাইনে দাঁড়িয়ে পড়ি। জানি সব নামই একদিন মুছে যাবে, তবুও দেখি না এই ভিনদেশি শিল্পীর শৈল্পিক ক্যালিগ্রাফিতে কতটা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে আমার নামখানি। অন্যদের মত আমি শুধু ক্যালিগ্রাফিটা নিয়েই চলে আসি না। কথা বলি শিল্পীর সঙ্গে। অনুমতি নিয়ে ছবি তুলি, ভিডিও করি। তার নাম আব্দুল আজিজ, বাড়ি সৌদি আরব। সৌদি দূতাবাসের স্পন্সরশিপে তিনি আজ এই সেবাটি দিচ্ছেন জাতিসংঘের কর্মীদের জন্য।
Posted ১২:৫৯ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ০৭ আগস্ট ২০২৫
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh