কাজী জহিরুল ইসলাম : | বৃহস্পতিবার, ২১ আগস্ট ২০২৫
আমি যখন খুব ছোটো ছিলাম তখন উন্মুক্ত প্রান্তর পছন্দ করতাম। দৃষ্টির প্রতিবন্ধকতা আমার কাছে অসহ্য লাগত। কেউ আমার দৃষ্টিকে আটকে দেবে কেন? না কোনো বস্তু না কোনো ব্যক্তি, কেউ আমার দৃষ্টিকে থামাতে পারবে না, যতদূর দৃষ্টি যায় আমি দেখবো ততদূর অব্দি। এইরকম একটা জেদ ছিল শিশুকাল থেকেই। পুরনো ঢাকায় এরকম খোলা প্রান্তর তেমন একটা ছিল না বলে শিশু বয়সেই হেঁটে হেঁটে দূর-দূরান্তে চলে যেতাম। ধলপুরের দিকে গেলে কিছু খোলা বিল পেতাম।
প্রায়শই যেতাম রেল সড়কের কাছে। যত দূর চোখ যায় সোজা রেল সড়কের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। শীতের ভোরে দূরে তাকিয়ে দেখতাম দৃষ্টি আটকে আছে ঘন কুয়াশায়। এরপর একটু একটু করে ভোরের আলো ফুটত, আস্তে আস্তে কুয়াশার জাল ছিঁড়ে দৃষ্টি বহুদূর অব্দি পৌঁছে যেত। তখন আমি বিজয়ের আনন্দ অনুভব করতাম। মাঝে মাঝে সূর্যের দিকে তাকিয়ে দেখার চেষ্টা করতাম কী আছে অগ্নিপিণ্ডের বুকে। এরপর অনেকক্ষণের জন্য অন্ধ হয়ে যেতাম। যখন গ্রামে যেতাম দূরের গ্রামগুলোর কালো প্রান্তরেখা তাকিয়ে থাকতাম।
চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ, নক্ষত্রের মতো মহাকাশজগতের পাশাপাশি ক্ষুদ্র তৃণলতা, সীমফুলের গঠন, লাউ-কুমড়ো ফুলের রঙের পার্থক্য, শসার গায়ের কাটা, পিপিলিকার শৃঙ্খলাবোধ, বাবুইয়ের শিল্পদক্ষতা, কাটাঝোঁপে জন্মানো সুদৃশ্য বেতফল, রেলগাড়ির মতো ক্যারাপোকা, কুকুরের জন্মগত সাঁতারকৌশল জানা এইসব হাজারো বিষয় নিয়ে ভাবতাম, বিস্মিত হতাম। আমি দেখতাম অস্থির টুনটুনিও একটা সময় স্থির হয়ে বসে, ঘুমায় অথবা ধ্যান করে। বৃক্ষদের নিদ্রা-জাগরণও আমি টের পেতাম। কখন কোন গাছ জেগে আছে, কোন গাছ ঘুমিয়ে আছে, গাছটির পাশে গিয়ে দাঁড়ালেই আমি বুঝতে পারতাম। ওরা ওদের ভাষায় আমার সঙ্গে কথা বলত। বর্ষাকালে কচু বনের ভেতরে হাঁটু পানিতে নেমে ব্যাঙের চোখের দিকে তাকিয়ে কাটিয়ে দিয়েছি পুরো একটি বিকেল। ব্যাঙের সঙ্গে তখন চোখে চোখে অনেক কথা বলেছি। জেনে নিয়েছি ওর বিবর্তন বৃত্তান্ত।
আমার নানা ছিলেন খুব ধার্মিক এবং সত্যবাদী মানুষ। তার সংস্পর্শে আমার ধর্মানুরাগ তৈরি হয়। এই সুবৃহৎ বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের শৃঙ্খলাবোধ আমার কাছে একটি মৌলিক ধর্ম বলে মনে হতো। শিশুকালে প্রকৃতিকে বোঝার জন্য আমি প্রচুর প্রকৃতি ধ্বংস করেছি। বরুণ গাছের খোড়লে হাত ঢুকিয়ে বালিহাঁসের ডিম চুরি করে এনেছি। এনে মুরগির ওমে একুশ দিন রেখে বাচ্চা ফুটিয়েছি। প্রচুর চড়ুই হত্যা করেছি। বকের ডিম চুরি করে এনে মুরগির ওমে বাচ্চা ফুটিয়েছি। বকের বাসা থেকে বাচ্চা চুরি করেও এনেছি। সেই বাচ্চা পেলে বড়ো করেছি। বকের বাচ্চা বড়ো হয়ে উড়ে চলে যেত না। সারাদিন খালে-বিলে কাটিয়ে সন্ধ্যায় এসে নারকেল গাছের পাতার ওপর বসে থাকত।
টেঁ টেঁ শব্দ করে ডাকলেই আমার মাথায়, কাঁধে এসে বসত। আব্বা-আম্মা ঢাকায় থাকতেন, আমি লম্বা সময় নানাবাড়ি-গ্রাম খাগাতুয়ায় থাকতাম। নানা-নানী আমাকে নিয়ে আতঙ্কে থাকতেন। নানী অন্যদের বলতেন, আমার নাতির চোখ বগায় খাইবো। কিন্তু আমার পোষা বকেরা কখনোই আমার চোখে ঠোকর দেয়নি। শালিকের বাচ্চাও চুরি করে এনেছি, পেলে বড়ো করেছি। এনেছি ঘুঘুর বাচ্চাও। এসবের মধ্য দিয়ে প্রকৃতি পর্যবেক্ষণের সুযোগ যেমন হয়েছে ওদের জীবনের ছন্দটাও আমি শিখতে পেরেছি এবং আমার সব সময় মনে হয়েছে প্রকৃতির সকল কিছুই, যারা নড়ে এবং যারা নড়ে না, কোনো একটা সময়ে প্রার্থনায় মগ্ন হয়। কার প্রার্থনা করে সবাই?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে কখনোই নানাজানকে জিজ্ঞেস করিনি। নিজে নিজে আবিস্কারের একটা আনন্দ আছে, আমি সেই আনন্দটা পেতে চেয়েছি। হিন্দু পাড়ার মেয়েদের দেখেছি স্নান করে কেউ কালিমূর্তিকে, কেউ দূর্গাকে, কেউ শিবকে পূজো করে। হিন্দু ব্যবসায়ীদের দোকানে গণেশ, লক্ষ্মীর মূর্তি দেখেছি। পৈতা পরা উদোম ব্রাহ্মণ ক্রেতার কাছ থেকে টাকা নিয়ে কপালে ছোঁয়ায়, গনেশের গায়ে ছোঁয়ায়, লক্ষ্মীর গায়ে ছোঁয়ায়, তারপর ক্যাশবাক্সে রাখে।
আমার মনে হতো বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের একটি কেন্দ্র আছে, যেখান থেকে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করা হয়। সকলেই সেই কেন্দ্রের কাছে নতজানু, কেন্দ্রের দিকে মুখ রেখেই সকলে আবর্তিত হচ্ছে। কিন্তু কোথায় সেই কেন্দ্র? আমাকে তা খুঁজে বের করতেই হবে। এই খোঁজার নেশাই আমাকে ভ্রমণে উৎসাহিত করে। আমি দুইভাবে ভ্রমণ করি। হেঁটে, উড়ে, নদীপথে ছুটে চলেছি পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে, আবার চোখ বন্ধ করে ভ্রমণ করি প্রকৃতির মনোজগতে। খুঁজি সেই কেন্দ্র যেখান থেকে নিয়ন্ত্রিত হয় সবকিছু। সবাই একটি আলোর কথা বলেন। আলোর দিকে ছোটেন। আমার মনে হয় আলোবৃত্তেরও একটি কেন্দ্র আছে এবং তা অন্ধকার। একটি আঁধারবিন্দু থেকেই সব কিছুর শুরু আর শুরুটাই কেন্দ্র। বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সেই কেন্দ্রের চতুর্দিকে আবর্তিত। এই আবর্তনই প্রার্থনা। প্রার্থনা আর কিছু নয়। ‘চমক দেখি তার’ আমার রচিত একটি দীর্ঘ কবিতা।
সেই কবিতাটিতে এবং আমার আরো বহু কবিতায় ‘চোখ বন্ধ করে যে ভ্রমণ আমি করি’ তা প্রতিফলিত হয়েছে। এই দীর্ঘ কবিতাটিতে আমি বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের জন্ম এবং বিনাশ নিয়ে একটি সমাধানে পৌঁছুনোর চেষ্টা করেছি। হাতের তালু খোলা আর বন্ধ করা, ব্যাস, এতোটাই সহজ সেই সমাধান।
কেউ একজন এই সম্প্রসারণ এবং সংকোচনের নিয়ন্ত্রক। কে সে? সে কোনো একক সত্ত্বা নয়। আবার এক অর্থে একক। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সকল কিছু সেই সুবৃহৎ এককের ভগ্নাংশ। এক থেকেই সম্প্রসারণের মধ্য দিয়ে তৈরি হয়েছে জিলিয়ন জিলিয়ন সৃষ্টি, কাজেই সকলেই সেই এককের ভগ্নাংশ। একদিন এই সম্প্রসারণ থেমে যাবে, হয়ত বহু লক্ষ আলোকবর্ষ সব কিছু স্থির থাকবে তারপর আবার শুরু হবে সংকোচন। সংকুচিত হতে হতে যেখান থেকে শুরু হয়েছিল সেখানেই, সেই আঁধারবিন্দুতে, সব কিছু নিঃশেষ হবে। একটি ছোট্ট আঁধারবিন্দু সব কিছু শুষে নেবে।
আমি নিজেও তো সেই সুবৃহৎ এককের অংশ, কাজেই আমিও নিয়ন্ত্রক। প্রার্থনার মধ্য দিয়ে আমরা ভগ্নাংশগুলোর সঙ্গে যুক্ত হতে হতে যতটা সম্ভব পূর্ণাঙ্গতার আশ্বাদ নিতে পারি। যে আঁধারবিন্দু থেকে শুরু, যেখানে আবার সবকিছু বিলীন হবে, সেই কেন্দ্রকে ধ্যানের লক্ষ্য স্থির করে প্রার্থনা করলেই ভগ্নাংশগুলোর সঙ্গে সংযুক্তি স্থাপন করা যায় বলে আমি বিশ্বাস করি। আসমানী কিতাবপ্রাপ্তরা অদৃশ্য এক কেন্দ্রকে লক্ষ্যস্থির করে প্রার্থনা করে, আদিবাসী বা সনাতন ধর্মাবলম্বীরা কেন্দ্রকে কল্পনা করে নানান আকৃতি তৈরি করে এবং সেইসব আকৃতিকে সামনে রেখে প্রার্থনা করে। সুফিরা গান বাজনা, জিকির, ঘুর্ণন নৃত্য, নেশায় বুঁদ হয়ে কেন্দ্র খোঁজে।
এর সবই ধর্ম। সবই প্রার্থনা। প্রার্থনার মূল কাজ হলো সংযোগ স্থাপন করা। যুক্ত হতে হলে বিচ্ছিন্ন হতে হয়। প্রার্থনায় প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে একটি শূন্য স্লেটের মতো পরিস্কার করে নিতে হয়। তারপর নিজেকে ভারমুক্ত করতে হয়। ভারমুক্ত করার জন্য প্রথমেই পরিপূর্ণ সমর্পণ করতে হয়।
এরপর ধীরে ধীরে সেই কাঙ্খিত কেন্দ্রের দিকে মনোযোগ স্থাপন করতে হয়, কেন্দ্রকে স্পর্শ করতে হয়, কেন্দ্রে অবস্থান করতে হয়, কেন্দ্রের সঙ্গে বিলীন হয়ে যেতে হয়। এই বিলীন হওয়ার মধ্য দিয়েই পূর্ণতায় পর্যবসিত হওয়া যায়। যে যতোটা বিলীন হতে পারে সে মহাঅসীমের ততোটুকু পূর্ণতা অর্জন করতে পারে। ঠিক এই সময়টাতেই প্রাণীকূল তার নিজের ও তার সঙ্গে যুক্ত অন্য যে কারো দেহ ও মনের বিকল, অর্ধবিকল হয়ে পড়া যন্ত্রাংশ মেরামতও করে নিতে পারে বলে আমার বিশ্বাস।
Posted ১০:৪৩ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২১ আগস্ট ২০২৫
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh