কাজী জহিরুল ইসলাম : | বৃহস্পতিবার, ২০ নভেম্বর ২০২৫
লে মেরিডিয়ান হোটেলের এগারো তলায়, দুধ শুভ্র বিছানায়, শুয়ে শুয়ে দেখছি ইস্তাঁবুলের আকাশ। রাতের মেঘমুক্ত পরিস্কার আকাশ। তারার আলোয় ঝিকমিক করছে বসফরাসের প্রাচীন বুক। ইতিহাসের কত রক্ত এই বসফরাস ঢেলে দিয়েছে কৃষ্ণ সাগরে।
একটি প্রশস্ত রাস্তা ধীরে ধীরে উঠে গেছে বসফরাসের ওপর, সুলতান সেলিম সেতু রাস্তাটিকে পার করে দিয়েছে ওপারে, এশিয়ায়। এশিয়া শব্দটি চিন্তাবৃত্তের মধ্যে ঢুকে পড়তেই কেমন একটা তোলপাড় শুরু হল। বুকটা যেন কেমন করে উঠল। নিজের মহাদেশ, মনে হচ্ছে ওখানেই আছে আমার মা, আমার জন্মভূমি।
হঠাৎ বিদ্যুচ্চমকের মত ঝলক দিয়ে দুপুরের টেলিফোন কলটি স্মৃতিকর্ণে বেজে উঠলো। ‘আমাদের রুফটপ লাউঞ্জেও আপনাকে ফুল এক্সেস দেওয়া আছে, আনলিমিটেড অ্যালকোহল’।
আমি মদ্যপ না, মদ্যপায়ীদের জন্য এটি খুব আকর্ষণীয় অফার। মদ্যপান জীবনে করিনি তা-তো নয়, খুব কম বয়স থেকেই আমি মদ্যপান করি, তবে অবশ্যই তা পরিমিত। একটা সময়ে রেড ওয়াইন আমার ভীষণ প্রিয় হয়ে ওঠে। শুক্রবার বা শনিবার সন্ধ্যায় ডিনারের সঙ্গে দু’গ্লাস রেড ওয়াইন প্রায় রুটিন হয়ে উঠেছিল। হার্টের অসুখের পর ডাক্তার মৃদু নিষেধাজ্ঞা দিলেন। আমি তাকে পাল্টা প্রশ্ন করি,
তাহলে ওয়াইন খাওয়া ছেড়ে দেব?
তিনি জিভ কেটে বলেন,
না, না, ছেড়ে দিতে হবে না, ইউ ক্যান হ্যাভ ইট, এনজয় ইন মডারেশন।
আমি খুব দৃঢ়তার সঙ্গেই ড. শর্মাকে বলি,
নাহ, ছেড়েই দেব। ওই বস্তু আর স্পর্শ করবো না।
প্রায় দুবছর হতে চললো, এখনো আর অ্যালকোহল স্পর্শ করিনি। অফিসের পার্টিতে অন্যদের হাতে হাতে যখন ওয়াইনের গ্লাস, আমি এক গ্লাস পানি হাতে নিয়ে ওদের সঙ্গ দিই।
মদ্যপান না করি, তাই বলে ৪০ তলা হোটেলের রুফটপ রেস্টুরেন্ট কাম বারের সৌন্দর্যটা দেখতে যাব না? তা হতেই পারে না। নাইট গাউনের ভেতর ঢুকেই পড়েছিলাম। উষ্ণ দ্যুভের ভেতরে বেশ আরাম করেই সেঁধিয়ে ছিলাম। সেই আরামে বিরতি টেনে উঠে পড়ি।
ফ্রেশ হয়ে কাপড় পরি। রাতের বেলায় বারে যাবার নিশ্চয়ই আলাদা পোশাক আছে। তখনই বেডসাইড টেবিলের ওপর থেকে হোটেলের নির্দেশিকা পুস্তকটি তুলে নিই। হ্যাঁ, এই তো, পেয়েছি। স্মার্ট ক্যাজুয়াল।
আমি জিন্স পরেছি, ওপরে একটি ফুলস্লিভ শাদা টি-শার্ট, পায়ে ফরমাল জুতো। এটাকে নিশ্চয়ই স্মার্ট ক্যাজুয়ালের পর্যায়ে ফেলা যায়।
লিফটের কী প্যাডে আমারই গ্রন্থের প্রচ্ছদ আঁকা কী কার্ড স্পর্শ করি। ৪০ তলায় নেমে বিস্মিত হই। অভ্যর্থনার কী দারুণ আয়োজন। লিফট থেকে বেরুতেই বিশাল একটি উন্মুক্ত প্যাসেজ। প্যাসেজের সুবিস্তৃত দেয়াল জুড়ে দারুণ সব পেইন্টিংস। আমি কাছে গিয়ে, দূরে দাঁড়িয়ে, ভিন্ন ভিন্ন দূরত্ব থেকে, পেইন্টিংসগুলো দেখার এবং বোঝার চেষ্টা করি। যদি তুর্কি শিল্পীদের সম্পর্কে জানা থাকত তাহলে বুঝতে পারতাম কতটা মূল্যবান এইসব শিল্পকর্ম। তবে শিল্পের অর্থমূল্য বুঝতে না পারলেও সৌন্দর্যে মুগ্ধ হতে তো দোষ নেই।
শৈশব থেকেই আর্ট আমাকে দারুণ টানে। পৃথিবীর যেখানেই বেড়াতে গেছি আর কিছু সংগ্রহ করি আর না করি স্থানীয় শিল্পীদের আঁকা নিদেনপক্ষে একটি পেইন্টিংস সংগ্রহ করেছি। গ্রীসের ক্রিট দ্বিপ থেকে, মরক্কোর মারাকেশ থেকে, ফ্রান্সের প্যারিস থেকে, মন্টেনিগ্রোর বুধভা থেকে, কসোভোর প্রিজরেন থেকে আরো কত কত জায়গা থেকে পেইন্টিংস সংগ্রহ করেছি, এখন সব মনে করে বলতেও পারবো না। দুয়েকটি বিখ্যাত শিল্পীর রিপ্রোডাকশন আছে, যেমন ভ্যান গখের দ্য সিয়েস্তা। খুব বড়ো একটা ছবি সংগ্রহ করেছিলাম প্যারিসের ল্যুভ জাদুঘরের সামনে থেকে। ঢাকায় এনে সাজু আর্ট গ্যালারি থেকে বাঁধাই করি। কত কত দিন গেছে, ঘন্টার পর ঘন্টা এই ছবিটার সামনে বসে থেকেছি। এই একটি ছবি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেই ভ্যান গখের ছবির চরিত্রটা আত্মস্থ করে ফেলি। পরবর্তীতে পৃথিবীর যেখানেই ভ্যান গখের ছবি দেখেছি কাউকে বলে দিতে হয়নি এটা কার আঁকা ছবি।
কিছুকাল পরে আমি প্রেমে পড়ি ফরাসী পটুয়া অস্কার ক্লদ মনে’র। মনে’র একটি পেইন্টিংস-অ্যালবাম আমাকে উপহার দেয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত এক তরুণ কবি, নূপুর কান্তি দাশ। নূপুর তখন পিএইচডি শেষ করে পোস্ট ডক্টরেট করছিল। ভীষণ মেধাবী, কবিতা লিখত, গান করত, আবৃত্তি করত। আমি যখন ক্রিয়াপদহীন কবিতা লিখতে শুরু করি, নূপুর তখন আমার প্রধান সহযাত্রী হিসেবে নতুন ধারার এই বাংলা কবিতার যাত্রাপথে দ্বিধাহীন পা রাখে। আমার ভীষণ প্রিয় একজন মানুষ নূপুর। বহুদিন ওর সঙ্গে যোগাযোগ নেই।
নূপুরের দেয়া মনে’র অ্যালবামটি এক পর্যায়ে আমার পেইন্টিংস বাইবেল হয়ে ওঠে। কী জীবন্ত সব রঙের কাজ। আকাশ, মাটি, জল সব একাকার মনে’র ছবিতে। দিগন্ত রেখাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেয় শিল্পী কী অসীম ক্ষমতায়। আমি ওর আঁকা অ্যালবামে প্রায়শই ধ্যানস্থ থেকেছি।
আমাদের বৌমা ব্রিজিত হালিসে অসাধারণ ছবি আঁকে। ওর বাবা মাইকেল হালিসে খুব বড়ো মাপের একজন পটুয়া ছিলেন। মাইকেলের সংরক্ষণে ছিল পিকাসোর সকল ড্রয়িংস, বিশালাকৃতির দুটি ভলিউমে ঠাসা সেই সব ড্রয়িংস। মাইকেল মারা গেছেন অগ্নি এবং ব্রিজিতের বিয়ের বেশ কবছর আগেই। একদিন ব্রিজিত এই ঢাউস ভলিউম দুটি নিউ জার্সি থেকে বহন করে এনে বলে, এই দুটি পাওয়ার জন্য আপনার চেয়ে উপযুক্ত আমি আর কাউকে দেখি না।
মাঝে মাঝে ভলিউমগুলো খুলে পিকাসোকে বোঝার চেষ্টা করি।
তুর্কী শিল্পীদের এবং তাদের প্রভাবিত বহু কাজ, নানান মাধ্যমে করা, পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় দেখেছি, বিশেষ করে পূর্ব ইউরোপে যখন কাজ করতাম তখন সবচেয়ে বেশি দেখেছি। কিন্তু বিখ্যাত কোনো তুর্কী শিল্পীর নাম আমি জানি না, এই অজ্ঞতা এখন আমাকে দংশন করছে।
আমরা এক সৌভাগ্যবান প্রজন্ম। কোনো কিছু জানা না থাকলেও আটকে যেতে হয় না। আমাদের হাতের কাছে আছে গুগল সার্চ ইঞ্জিন। যা জানি না তা জানার ইচ্ছে থাকলে মুহূর্তেই জেনে নিতে পারি। এই পর্বটি লিখতে গিয়ে খুব ইচ্ছে হলো অন্তত একজন তুর্কী শিল্পীর কথা লিখি, নাহলে লে মেরিডিয়ানের রুফটপে সংরক্ষিত পেইন্টিংসগুলোকে যথাযথ সম্মান করা হবে না।
উনিশ শতকে অটোমান সাম্রাজ্যের একজন প্রশাসক ছিলেন ওসমান হামদী বে, তিনি একজন ইন্টেলেকচুয়াল, লেখক এবং পটুয়া ছিলেন। তার আঁকা কিছু ছবি অনলাইনে খুঁজে খুঁজে দেখলাম। ওসমান আর্টের ওপর প্যারিসে পড়াশোনা করেন। তার গুরু ছিলেন গুস্তাভ বাউলেঙ্গার এবং জ্যঁ-লেয়ন জেরোম। তার আঁকা ছবিগুলোতে তুরস্কের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং অটোমান সাম্রাজ্যের শান-শওকত উঠে এসেছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং সাধারণের জীবন তেমন খুঁজে পাইনি। তবে তার কাজ অসাধারণ, অনেকক্ষণ তাকিয়ে দেখার আনন্দ আছে।
বারে ঢুকতেই এক তরুণ যুবাপুরুষ এগিয়ে এসে অভ্যর্থনা জানালেন। গেলমান সম্পর্কে আমাদের দেশের মওলানারা যে ধারণা দেন, তুর্কী যুবকদের দেখতে ঠিক সেইরকম লাগে। অসম্ভব সুন্দর হবার কারণে ওদের মুখশ্রীতে কিছুটা নারীত্বের কমনীয়তা বিদ্যমান। আচ্ছা গেলমান নিয়ে একটি কথা না বললেই নয়। সাধারণ ধারণা হচ্ছে বেহেশতে হুরের পাশাপাশি পূণ্যবানেরা সুদর্শন ছেলে যৌনদাস পাবেন, যাদেরকে গেলমান বলা হয়। বিষয়টা কিন্তু তা নয়। গোলাম শব্দের বহুবচন হচ্ছে গেলমান বা গিলমান। কোরানে বর্ণিত আছে, ওরা হচ্ছে জান্নাতীদের গোলাম, তাদের খেদমতে নিয়োজিত থাকবেন।
গেলমান জানতে চাইলো, আমি কী ড্রিংকস চাই।
আমি ওকে বলি,
আমি ড্রিংক করবো না, তবে তোমার সাহায্য লাগবে। আমি রুফটপ থেকে চারপাশ ঘুরে ঘুরে ইস্তাঁবুল শহরটা দেখবো। তুমি আমাকে কোথায় কী আছে তা বলবে।
বারে তেমন লোক সমাগম নেই, ব্যস্ততা খুবই কম, তাই আমার এই অনুরোধ খুব একটা অবিবেচনাপ্রসূত হয়েছে তা মনে করছি না। ছেলেটি ইংরেজি বোঝে তবে ওর ইংরেজি জ্ঞান ততোটা ভালো নয় সেটা বুঝতে পারলাম যখন ও কিছু একটা বলতে গিয়ে হাত পা ছুঁড়তে শুরু করেছে।
বারটি ফ্লোরের ঠিক মাঝখানে এবং এর চারপাশ ঘিরে খোলা বারান্দা, আমার কাছে মনে হলো সার্কেল করা পুরো বারান্দাটিই ঝুল বারান্দা, দালানের মূল কাঠামো থেকে বাইরে বের করা। হাঁটতে গিয়ে একটু ভয়ই লাগছিল, পরক্ষণেই নিজেকে শান্তনা দিলাম, মাস দুয়েক আগেই মাত্র সিয়ার্স টাওয়ারের ১১০ তলার রুফটপে হেঁটে এলাম, এটা তো মাত্র চল্লিশ তলা।
ছেলেটি ছায়ার মত আমার পেছনেই আছে। ও তুর্কী, ইংরেজি মিশিয়ে হাত পা ছুঁড়ে ধারাবর্ণনা দিয়ে যাচ্ছে। এক পর্যায়ে মনে হল চারপাশে শুধু আলোর ফোয়ারা ছাড়া আর কিছুই তো দেখা যায় না। ওকে বরং বিদায় করে দিয়ে আমি রাতের ইস্তাঁবুলের রূপটা একাই দেখি।
ওকে ইশারা করে যেতে বলি কিন্তু সে যাচ্ছে না। যেমন আমার পেছন পেছন হাঁটছিল তেমনই হাঁটছে।
তোমার নাম কী?
মেহমেত।
বলো কী! সুলতান মেহমেত?
ও তখন মিষ্টি করে হাসে।
গুলবাহার হাতুন কেমন আছে?
ছেলেটি অবাক দৃষ্টিতে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। বুঝতে পারি, ওর ইতিহাসের পাঠ খুবই দুর্বল। সুলতান দ্বিতীয় মেহমেতের স্ত্রীর নাম যে গুলবাহার এটা ও জানেই না।
মিনিট পনেরো খোলা ছাদে হাঁটাহাঁটি করি। বেশ ঠাণ্ডা পড়ে গেছে। ফুল স্লিভ হলেও, টি-শার্টে কুলোচ্ছে না। ভেতরে চলে যাওয়াই ভালো।
ফেরার আগে বসফরাসের দিকে মুখ করে আরো কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকি। তিনটি সেতুই এখান থেকে দেখা যাচ্ছে। এই সেতুগুলো ইউরোপের সঙ্গে এশিয়াকে বেঁধে রেখেছে রাখীবন্ধনের মত। বুদাপেস্টে বেড়াতে গিয়েও আমি ঘন্টার পর ঘন্টা দানিয়ুবের দিকে চেয়ে থেকেছি।
জল আমাকে এতো টানে কেন?
Posted ১২:২০ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২০ নভেম্বর ২০২৫
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh