কাজী জহিরুল ইসলাম : | বৃহস্পতিবার, ১৯ মার্চ ২০২৬
খোকন মামার ছোটো ভাই নুরুল ইসলাম অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে। ওদের পরিবারের এক উজ্জ্বল প্রদীপ নুরুল ইসলাম। মানুষের নাম সংক্ষেপ করে ডাকার সংস্কৃতি পৃথিবীর সব দেশেই আছে, যেমন ইংরেজরা উইলিয়ামকে বলে বিল, রিচার্ডকে বলে ডিক, এলিজাবেথকে বলে লিজ। বাংলাদেশের মানুষ ততোটা ক্রিয়েটিভ না, তারা হোসেনকে বলে হুশিন্যা, বাদলকে বাদুইল্যা আর ভদ্রভাবে জহিরুলকে বলে জহির, আমিনুলকে আমিন, ব্যাস এইটুকুই। কিন্তু নুরুল ইসলামকে ওদের পরিবারের কেউ কখনো নুরুল বা নুরু ইত্যাদি বলে না। এমন কী ওর সঙ্গে ঝগড়া করে কেউ ওকে কখনোই নুরুইল্যা বলে ডেকেছে তাও শুনিনি। ওকে সবাই পূর্ণ নামে অর্থাৎ নুরুল ইসলাম বলেই ডাকে এবং ডাকের মধ্যে একটা শ্রদ্ধা ও সমীহ প্রকাশ পায়।
পুরো পরিবারের একটা বিশেষ ভক্তি, শ্রদ্ধা আছে ওর প্রতি। অন্যদের চেয়ে ওর পোশাক, মাথা আচড়ানো, চলন-বলনও ছিল ভিন্ন। নুরুল ইসলাম সব সময় প্রমিত উচ্চারণে কথা বলারও চেষ্টা করত। সেই বয়সেই ও পারফিউম ব্যবহার করত, মুখে দামী ক্রিম মাখত, নিয়ম করে চুল কাটাত, নখের যত্ন করত। তখনই ওর বড়ো তিন ভাই এবং পরে আরো দুজন, মোট পাঁচ ভাই বিদেশে থাকত বলে ওদের বাড়িতে এইসব প্রসাধন সামগ্রীর অঢেল উপস্থিতি ছিল। এসবের কারণ কী? কারণ হচ্ছে ওদের পরিবারের চোখে নুরুল ছিল সামাজিক মর্যাদার একমাত্র সেতু। সেই সেতু রিক্সার ম্যাকানিক সিদ্দিক মিয়ার পরিবারকে তুলে দেবে শিক্ষিত মধ্যবিত্তের মর্যাদায়, এটিই ছিল ওদের লক্ষ্য। নুরুলকে দিয়ে ওরা বাজার করাতো না, সংসারের কোনো কাজ করাতো না, সবাই ওকে একজন উচ্চশিক্ষিত এবং সমাজের উঁচুতলার ব্যক্তি হিসেবে তখন থেকেই দেখতে শুরু করে এবং সেইভাবে ওকে গড়ে ওঠার জন্য সব ধরণের পরিবেশ তৈরি করে দেয়। আমি হয়ে যাই নুরুল ইসলামের অবৈতনিক শিক্ষক। বয়সে নুরুল আমার চেয়ে বছর দুয়েকের বড়োই হবে কিন্তু নিচের ক্লাসে পড়ার কারণে তুমি করে বলি, আবার বয়সে বড়ো হবার কারণে ও আমাকে তুমি করে বলে। আমার বন্ধুত্ব অবশ্য নুরুলের সঙ্গে না, নুরুল আমার ছাত্রতুল্য, বন্ধু হচ্ছেন ওর বড়ো ভাই খোকন।
একদিন নুরুলদের বাড়িতে একজন লজিং মাস্টার আসেন। তার নাম মিজান। মিজান উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণির ছাত্র। বাড়ি চাঁদপুর, ছ-এর উচ্চারণ ঠিক মত করতে পারে না। ভেবেছিলাম মিজানের সঙ্গে একটা বন্ধুত্ব হবে কিন্তু দুদিন কথা বলেই মনে হলো মিজানের মানসিক বয়স খুবই কম, এমন অপরিণত একজন মানুষের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হতে পারে না। খোকন মামা জগৎ সংসারের অনেক বিষয়ে জ্ঞান রাখেন কিন্তু তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা খুব সীমিত হওয়ায় কবিতা নিয়ে তার সঙ্গে কথা বলে মজা পাই না। আমি যে কবিতাই তাকে পড়ে শোনাই তিনি একটা শূন্য লুক দিয়ে বলেন, সুন্দর। এই সুন্দরে আমার মোটেও পোষাচ্ছে না।
এক পড়ন্ত বিকেলে ঘাসের মাঠে বসে মিজানকে আমার সদ্য লেখা একটি কবিতা শোনাই। মিজান মুগ্ধ হয়ে শোনেন এবং প্রতিটা কবিতা তার মত করে ব্যাখ্যা করতে শুরু করেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তার ব্যাখ্যা স্কুলের ছাত্রদের মত হালকা। এবং সে তার কথাগুলো বলার জন্য খুব তাড়াহুড়ো করেন। কখনো কখনো কবিতাটি পড়া শেষ না হতেই কবিতা নিয়ে কথা বলতে শুরু করেন। তা সত্বেও মিজানের এই দিকটা আমাকে দারুণভাবে আকর্ষণ করে।
একটা মজার গল্প বলি। নুরুলদের একান্নবর্তী পরিবার, কম করে হলেও ১৫/১৬ টা খাওয়ার মুখ। বিদেশ থেকে টাকা এলেও ওদের জীবন-যাত্রার মান খুব বেসিক। যেমন মোটা ইরির চালের ভাত, খেসারির ডাল এইসব হচ্ছে প্রতিদিনের খাবার। মিজান যে ঘরে থাকে সেই ঘরের দরোজা এবং আমার ঘরের দরোজা মুখোমুখি। একদিন দুপুরে আমরা দুজন একই সময়ে খেতে বসেছি। মিজানের গলা দিয়ে মোটা চালের ভাত নামছে না। খুব কষ্ট করে খাচ্ছে। বিকেলে সাঁতারকুল সড়ক ধরে আমরা যখন হাঁটাহাঁটি করছিলাম, তখন জিজ্ঞেস করি, ভাত খাওয়ার সময় আপনার খুব মেজাজ খারাপ মনে হলো, কারণ কী? তিনি আমাকে উত্তেজিত হয়ে সব গড়গড় করে বলতে থাকেন। ওরা ভাই প্লাস্টিকের চাল খায়, চাবাতে চাবাতে দাঁত ভেঙে যায়। আমাদের দেশে আমরা গরুরে যে ডাইল খাওয়াই সেই খেসারির ডাইল দেয় প্রত্যেক বেলায়।
আম্মা আজ জলপাই দিয়ে মশুরির ডাল রান্না করেছেন এই কথা শুনে ও প্রায় কেঁদে ফেলে। কথাটা আমি বাসায় ফিরেই আম্মাকে বলি। আম্মা বলেন, বাবা ওদের অনেক বড়ো সংসার, হিসাব করে চলতে হয়। পরদিন আম্মা জলপাই দিয়ে মশুরের ডাল রান্না করে আমাকে বলেন, যাও, মিজানকে এক বাটি দিয়ে আসো। এরপর থেকে মিজান আম্মাকে নিজের মায়ের মতোই শ্রদ্ধা করত। আম্মাও প্রায়শই আমাকে দিয়ে ওর জন্য তরকারির বাটি পাঠিয়ে দিতেন।
আমার সহপাঠী তপনের লজিং মাস্টার জাহাঙ্গীর স্যারের বাড়ি নোয়াখালী। তাকে কেন জানি আমার খুব ধূর্ত মানুষ মনে হয়। তিনি বাসদের একজন এক্টিভ কর্মী, সারাদিন আমাদের বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র বোঝানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু তার বোঝানোর দক্ষতা ভালো ছিল না বলে শেষ পর্যন্ত কিছুই বোঝাতে পারতেন না। কার্ল মার্ক্স, লেনিনের জটিল তত্বগুলো তিনি আরো জটিল করে বলতেন, আমরা মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতাম না। শুধু সমাজতন্ত্র না, তিনি পাটিগণিতের অঙ্কগুলোও খুব জটিল করে বোঝাতেন, আমার প্রায়শই মনে হত তিনি নিজেই সেগুলো ভালো করে বুঝতেন না।
জিন্নাহ মামার কাছ থেকে শেখা “দুনিয়ায় মজদুর এক হও” শ্লোগান আমার কানে সব সময়ই বাজত। জাহাঙ্গীর স্যার কথা বলতে শুরু করলেই আমার চোখের সামনে জিন্নাহ মামার মুখটা ভেসে উঠত।
আমার সহপাঠী বন্ধু মিজানুর রহমান চৌধুরীকে আমার এই রাজনৈতিক দীক্ষা গ্রহণের বিষয়টা বলি। মিজান একদিন আমাকে শশ্রুমণ্ডিত এক বড়ো ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। বড়ো ভাইয়ের নাম রহিম। পুরো নাম আজ আর মনে নেই। মিজান পরিচয় করিয়ে দিয়েই বলে, রহিম ভাই খুব জ্ঞানী মানুষ। বিশ্বরোডের কাজ তখন শাহজাদপুর ব্রিজ পর্যন্ত ইট বিছানো হয়েছে, রিক্সা ছাড়া অন্য কোনো যানবাহন চলাচল শুরু হয়নি। রাস্তাটি এলাকাবাসীর বৈকালিক হাঁটার একটি উত্তম জায়গা হয়ে উঠেছে। বেশ কিছুদিন বিকেলে মিজান, আমি আর রহিম ভাই রামপুরা ব্রিজ থেকে শাহজাদপুর ব্রিজ পর্যন্ত হাঁটতে হাঁটতে রহিম ভাইয়ের জ্ঞানের কথা শুনেছি। রহিম ভাই বলতেন, শুধু পড়ালেখা করে ডিগ্রি অর্জন করলেই হবে না, আমাদের সৎ মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে হবে। মুসলমান হিসেবে নামাজ পড়তে হবে। নামাজ আমাদের নিয়মানুবর্তিতা শেখায়, জীবনকে সুশৃঙ্খল করে। মিথ্যা বলা পরিহার করতে হবে, অন্যকে সাহায্য করতে হবে। এমন অসংখ্য মানবিক গুণাবলি অর্জনের ওপর বিশেষ তাগিদ দেন। এরপর আমাকে একটি ফর্ম দেন, বলেন, আমাদের আত্মসমালোচনা করতে হবে, আত্মসমালোচনাই চরিত্র গঠনের একমাত্র অনুশীলন। রোজ ঘুমাতে যাওয়ার আগে এই ফর্ম পুরণের মধ্য দিয়ে আত্মসমালোচনা করবেন। তিনি আমাদের দুজনকেই আপনি করে বলতেন।
আমি দেখি সেই ফর্মে লেখা আছে সারাদিনে কয় ওয়াক্ত নামাজ পড়েছি, কয়টা মিথ্যা কথা বলেছি, কাউকে কি আঘাত দিয়েছি, কারো কোনো উপকার করেছি ইত্যাদি। রোজ ঘুমানোর আগে এই ফর্মটা পুরণ করে ঘুমাতে হবে। আমি তা কয়েকদিন করেছি এবং উপকৃত হয়েছি। জাহাঙ্গীর স্যার বলেন রহিমকে তিনি চেনেন এবং রহিম একজন সৎ, চরিত্রবান যুবক। তবে তার রাজনৈতিক আদর্শ ভিন্ন। রহিম ভাই ছিলেন শিবিরের কর্মী। তবে সেই শিবির আজকের জামায়াতে ইসলামীর যে অঙ্গ সংগঠন এই শিবির না। তখন একটা সংগঠন ছিল তারা ছাত্রদের চরিত্র গঠনের কাজ করত ছাত্রশিবিরের ব্যানারে এবং বড়ো হয়ে এরা যোগ দিত যুবশিবিরে। এটি কোনো রাজনৈতিক দল ছিল না, এদের কোনো রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্খা ছিল না। এইসবই রহিম ভাই বলেছিলেন। এর বেশি এই সংগঠনটি সম্পর্কে জানতে পারিনি। আত্মজীবনী লিখতে গিয়ে বিষয়টা ভালো করে জানার জন্য গুগলে সার্চ দিয়ে জানার চেষ্টা করেছি কিন্তু তেমন কোনো তথ্য পাইনি।
Posted ১১:৪৬ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ১৯ মার্চ ২০২৬
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh