কাজী জহিরুল ইসলাম : | বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ ২০২৬
স্বাধীনতা দিবস এলে আমরা ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি করি, ইতিহাস পর্যালোচনা করি। কিন্তু কেন আমরা অতীত খুঁড়ে খুঁড়ে নানান তথ্য-উপাত্ত তুলে আনি, নতুন প্রজন্মের সামনে হাজির করি? জীবনানন্দ দাশ বলেছেন, “কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে?” ইতিহাস থেকে আমরা আনন্দ এবং বেদনা দুটোই তুলে আনতে পারি কিন্তু কেন তা করবো? একহার্ট টোলের বিখ্যাত গ্রন্থ “পাওয়ার অফ নাও” আমাদের শেখায় অতীতে নয়, ভবিষ্যতে নয়, বাস করো বর্তমানে।
আসলে ইতিহাসের কাজটা কী? ইতিহাসের কাজ একটাই, তা হচ্ছে অতীত থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা। অতীতে আমরা যে ভুল করেছি সেই ভুল আর করবো না। অতীতে যেসব ভালো কাজ করেছি আজ তার চেয়ে অনেক বেশি ভালো কাজ করবো। আমাদের আদর্শ লক্ষ্য হলো প্রতিদিন একটু হলেও আগের দিনের চেয়ে জোরে দৌড়ানো। কিন্তু আমরা কি প্রকৃতপক্ষে তা করি? করি না। সেজন্যই এই প্রবাদ তৈরি হয়েছে, ইতিহাসের শিক্ষা এটাই যে ইতিহাস থেকে কেউ কিছু শেখে না, বারবার তাই মন্দ ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটে।
এই ঘটনা পৃথিবীর সর্বত্রই ঘটে, আমাদের দেশে ঘটে একটু বেশি। এর মূল কারণ হয়ত মাত্রাতিরিক্ত আবেগ। বাঙালিরা খুব আবেগপ্রবণ জাতি। এই আবেগ একদিকে যেমন শক্তি, অন্যদিকে পিছিয়ে পড়ারও কারণ। আমার ধারণা দুটি কারণে বাঙালি মুসলমানেরা অতিমাত্রায় আবেগপ্রবণ এবং বিভ্রান্ত। প্রথমত এদেশে ঘন ঘন ঋতুবদল হয়। ছয় ঋতুর দেশ তো পৃথিবীর আর কোথাও নেই। দ্বিতীয় কারণটি হলো নানান জাতি-গোষ্ঠীর মিশ্রণে তৈরি হওয়া একটি শংকর জাতি।
চতুর্দশ শতকের বিশ্ব পর্যটক ইবনে বতুতা চট্টগ্রামে এসে বাংলা মুলুক সম্পর্কে বলেছেন, “প্রাচুর্যে ঠাসা এক নরক”। বলাই বাহুল্য এদেশের মানুষই তাদের অযোগ্যতা দিয়ে দেশটিকে নরক বানিয়ে রেখেছিলেন। আজও কি সেই অবস্থার খুব বেশি উত্তরণ ঘটেছে? বাঙালিদের চরিত্র বিশ্লেষণ করতে গিয়ে সালমান রুশদী অনেক নেতিবাচক কথা বলেছেন। এমন কী বাঙালির প্রাণের নেতা শেখ মুজিবুর রহমানও একজন পাকিস্তানি ক্যাপ্টেনের কাছে বাঙালিদের ‘বেঈমান’ বলে উল্লেখ করেছেন। মূল আলোচনায় যাওয়ার আগে শেখ মুজিব কোন প্রেক্ষিতে বাঙালিদের বেঈমান বলেছিলেন সেই গল্পটা বলি। হয়ত ঘটনাটি অনেকের কাছেই এখনো অজানা।
২৫ মার্চ ১৯৭১, বৃহস্পতিবার, রাত ১১টায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী শেখ মুজিবুর রহমানকে তার ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরের বাড়ি থেকে গ্রেফতার করে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একজন তরুণ ক্যাপ্টেন বেলাল স্পেশ্যাল সার্ভিস গ্রুপ (এসএসজি)র ছোট্ট একটি দল নিয়ে তাকে গ্রেফতার করতে যান। সেখানে গিয়ে দেখেন বাড়িটি ঘিরে রেখেছে অসংখ্য বাঙালি পুলিশ ও দলীয় নেতাকর্মী।
ক্যাপ্টেন ভেবেছিলেন এমন একজন জনপ্রিয় নেতা, যিনি দেশের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হবার কথা, তাকে গ্রেফতার করা কঠিন হবে। কিন্তু প্রকৃত ঘটনা ছিল তার উল্টো। বিনা বাঁধায়, অনায়াশেই তারা শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হন। গ্রেফতার করে তাকে নিয়ে আসেন নতুন রাজধানীর নির্মাণাধীন জাতীয় পরিষদ ভবনে। সেখানে কর্নেল এস ডি আহমেদ দুঃখ করে বলেন, ‘এই ভবনে আপনার পা রাখার কথা দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে, বন্দি হিসেবে নয়’। এবং জাতীয় এই দুঃখজনক ঘটনার জন্য তিনি শেখ মুজিবকেই দায়ী করেন। শেখ মুজিব নিজেকে নির্দোষ দাবী করে বলেন, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে ঐকমত্যে পৌছানোর বিষয়ে তিনি আশাবাদী ছিলেন।
ক্যাপ্টেন বেলাল তাকে বিনা বাঁধায় গ্রেফতার করতে পেরে খুব অবাক হন এবং এই বিষয়ে শেখ মুজিবুর রহমানকে বিব্রত করার জন্য প্রশ্ন করেন, একজন ব্যক্তিও আপনাকে বাঁচাতে জীবন দেওয়ার জন্য সামনে এগিয়ে আসেনি কেন? বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, ক্যাপ্টেন সাহেব আপনি কি জানেন না যে বাঙালিরা কেমন বেঈমান?
উল্লেখ্য, ২৫ মার্চ থেকে ১ এপ্রিল পর্যন্ত, এই ৭দিন, ঢাকা সেনানিবাসের বিভিন্ন জায়গায় বন্দি হিসেবে শেখ মুজিবকে রাখা হয়। ভারত তাকে উদ্ধারের চেষ্টা করতে পারে এই বিবেচনা থেকে এক স্থানে বেশিক্ষণ রাখা হয়নি। ১ এপ্রিল সকালে পিআইএর একটি বোয়িং বিমানে করে তাকে প্রথমে করাচী ও পরে রাওয়ালপিন্ডি নিয়ে যাওয়া হয়। আর্জেন্টিনা থেকে গ্রেফতার করে মোসাদ যেভাবে কৌশলে জীবিত আইখম্যানকে তেল আবিব নিয়ে যায় অনেকটা সেইরকম নাটক করে শেখ মুজিবকে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়।
বিমানটিকে এমনভাবে তৈরি করা হয় যেন সবাই বুঝতে পারে লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খান এই বিমানে সফর করছেন। একজন সেনা অফিসার টিক্কা খান সেজে গাড়ির বনেটে তার পতাকা তুলে দেন। অতি দ্রুত সেই গাড়িতেই মুজিবকে তুলে নিয়ে বিমানবন্দরের রানওয়েতে ছুটে যান। দ্রুত উড্ডয়নের জন্য বিমানটি আগে থেকেই চালু করে রাখা হয়। অতি দ্রুত তাকে বিমানে তুলে উড্ডয়নের জন্য তাড়াহুড়া করায় শেখ মুজিবের স্যুটকেস গাড়িতেই থেকে যায়, পরে সেই স্যুটকেস অন্য ফ্লাইটে পাঠানো হয়।
১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ থেকে ১লা এপ্রিল পর্যন্ত বহু ঘটনা ঘটে যা খুব একটা পরিস্কারভাবে গণপরিসরে আসেনি, বিশেষ করে গ্রেফতারের পর যে শেখ মুজিব ১ সপ্তাহ ঢাকাতেই ছিলেন এই ঘটনা খুব কম মানুষই জানে, তাই আজ স্বাধীনতা দিবসের গদ্যটি লিখতে গিয়ে ইতিহাস থেকে এই ঘটনাটি তুলে আনলাম। শেখার জন্য হয়ত এই ঘটনাটি তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়, তবে আগ্রহোদ্দীপক তো বটেই।
ইতিহাস থেকে যা শিখতে হয় তা হলো, ইতিহাস আমাদের ভিত্তি। ওখান থেকে সামনে এগিয়ে যেতে হয়। ইতিহাসের শিক্ষা নিয়ে অর্থনীতির রাজনীতি করতে হয়, সাম্যের, গণতন্ত্রের, সততার, নৈতিকতার রাজনীতি করতে হয়। প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতা কাজে লাগিয়ে দেশকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার রাজনীতি করতে হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা শুধু ইতিহাসের রাজনীতিটাই করি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আমাদের ভিত্তি কিন্তু এটি নিয়ে রাজনীতি করা জাতির জন্য আত্মঘাতী। একটি বিভক্ত জাতি কখনোই উন্নতির সোপানে পা রাখতে পারে না।
আমার বিবেচনায় অলস জাতিগুলো ইতিহাস আঁকড়ে পড়ে থাকে। তারা তাদের অতীতকেই শ্রেষ্ঠ বলে ঘোষণা করে এবং আর সামনে এগিয়ে যাবার চেষ্টা করে না। এটি খুব দুঃখজনক যে আওয়ামী লীগ এবং তাদের সমর্থকেরা মনে করেন শেখ মুজিবুর রহমানের চেয়ে বড়ো নেতা, বড়ো রাষ্ট্রনায়ক হওয়া সম্ভবই নয়, বিএনপি মনে করে জিয়াউর রহমানের চেয়ে বড়ো এবং সফল রাষ্ট্রনায়ক আর কারো পক্ষে হওয়া সম্ভব নয়। আমরা যদি শেখ মুজিব এবং জিয়াউর রহমানের চেয়ে বড়ো এবং দক্ষ নেতা তৈরি করতে না পারি তাহলে দেশ এগুবে কী করে?
রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব হচ্ছে অতীতের সফল, অসফল সকল রাষ্ট্রনায়কের কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করা, তাদের ব্যর্থতা এবং ভুলগুলো সুনির্দিষ্টভাবে নির্ণয় করা এবং সেই ভুলের পুনরাবৃত্তি না করা। নিজের দলের প্রধান নেতার ভুলগুলো জনপরিসরে তুলে ধরে ঘোষণা করা যে এই ধরণের ভুল আমরা আর করবো না। সফল ব্যক্তিদের সাফল্যগুলো নির্ণয় করে তা মানুষের সামনে তুলে ধরে বলতে হবে কোন কৌশলে বর্তমান নেতৃত্ব এর চেয়েও অধিক সফল হবেন।
শেখ মুজিবের ভাষায় ‘বেঈমান’ বাঙালির অসংখ্য প্রমাণ আমরা মুজিবোত্তরকালে পেয়েছি। হেলিকপ্টারে করে ব্যালট বাক্স তুলে এনে খন্দকার মুশতাককে নির্বাচনে জিতিয়েছিল শেখ মুজিব। নিঃসন্দেহে এটি নির্বাচনী এলাকার ভোটারদের সঙ্গে প্রতারণা। সেই প্রতারণার প্রাপ্তি মুশতাককে কৃতজ্ঞ করেনি, করেছে বেঈমান। মুজিব হত্যায় তার সম্পৃক্ততার বহু প্রমাণ আজ গণমাধ্যমে প্রকাশিত। জিয়াকে পাল্টা ক্যু করে মুক্ত করেন কর্নেল তাহের। অথচ সেই তাহেরের গলায় ফাঁসির রজ্জু পরিয়ে দিলেন জিয়াউর রহমান। শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরে আসার, রাজনীতি করার সুযোগ করে দেন জিয়াউর রহমান, অথচ তিনি দেশে ফেরার ১৩ দিনের মাথায় জিয়া নিহত হন।
খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমান বেশ কয়েকজন সিনিয়র অফিসারকে ডিঙিয়ে বিশ্বস্ত মঈন ইউ আহমেদকে সেনাপ্রধান করেন অথচ সেই মঈন ইউ আহমেদ খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার ও তারেক রহমানকে বন্দি করে নির্যাতন করেন। শুধু তাই না, কথিত আছে ২০০৮ সালের নির্বাচনে ফলাফল প্রকাশে ইঞ্জিনিয়ারিং করে সেইফ এক্সিটের নিশ্চয়তার জন্য আওয়ামী লীগকে সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ আসন দিয়ে ক্ষমতায় আনেন ফখরুদ্দিন-মঈনুদ্দিন সরকার।
শেখ হাসিনা একের পর এক নির্বাচনে কারচুপি করে ১৭ বছর ক্ষমতায় টিকে থাকেন এবং ফ্যাসিস্ট দানবে পরিণত হন। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী মিলে বহু আন্দোলন করেও হাসিনার কেশাগ্রও টলাতে পারেনি। সকলে ধরেই নিয়েছিল আমৃত্যু হাসিনাই এদেশের মসনদে আসীন থাকবেন, তাকে কেউ সরাতে পারবে না।
কিন্তু হঠাৎ করে দেশে তৈরি হলো এক গণসুনামী, ২০২৪ সালের বর্ষাকালে উত্তাল হয়ে উঠলো জনসমুদ্র। হাসিনার শুধু পতনই হলো না, সদলবলে দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যেতে বাধ্য হলেন। অভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারী তরুণ ছাত্র-জনতা একে একে বিএনপির নেতা-কর্মীদের জেল থেকে বের করে আনেন। কেউ ভারত থেকে দেশে ফিরে আসেন, তারেক রহমান লন্ডন থেকে মামলা বিহীন এক নির্ঝঞ্ঝাট বাংলাদেশে ফিরে এসে বীরোচিত গণসম্বর্ধনা লাভ করেন। বিএনপির নেতারা কেঁদে কেঁদে ছাত্রনেতাদের কাছে কৃতজ্ঞতা জানান।
১৭ মাসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পর নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা গ্রহণ করে বিএনপি কিন্তু আবারও সেই বেঈমানীর পুনরাবৃত্তি। ছাত্ররা এদেশের মানুষকে রাষ্ট্র মেরামতের স্বপ্ন দেখিয়েছিল, যে স্বপ্ন দেশের কোটি জনতাকে রাজপথে টেনে এনেছিল, হাসিনার পতন ঘটিয়েছিল, যে স্বপ্ন বাস্তবায়নের সূচনাকল্পে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে দিনের পর দিন আলোচনা করে তৈরি করেন জুলাই সনদ, যেটি এদেশের মানুষ গণভোটের রায়ের মধ্য দিয়ে অনুমোদন করে, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে এখন বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে তারেক রহমানের সরকার। এবার আর কোনো একক ব্যক্তি বা দলের সঙ্গে নয়, বেঈমানী পুরো জাতির সঙ্গে, যেটি হাসিনা করেছিলেন তত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে দিয়ে পিতার মত চিরকাল ক্ষমতায় টিকে থাকার ফন্দি-ফিকির করে।
২০২৪ সালে অতীতের সকল বেঈমানীর ইতিহাস জেনেই ছাত্র-জনতা আশায় বুক বেঁধেছিল, এ-জাতির অনেক শিক্ষা হয়েছে, হাসিনার এই শোচনীয় পরাজয় থেকে নিশ্চয়ই ক্ষমতায় আসা দল কিছু শিখবে কিন্তু চোরায় না শোনে ধর্মের কাহিনী। সেই পুরনো গল্পের পুনরাবৃত্তি। ২০২৬ সালের স্বাধীনতা দিবসে ক্ষমতাসীনদের বোধোদয় হোক, ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ করুক, সম্ভাবনা ক্ষীন হলেও প্রত্যাশার এই প্রদীপ সর্বদাই জ্বালিয়ে রাখতে চাই।
হলিসউড, নিউইয়র্ক। ২০ মার্চ ২০২৬
Posted ১০:১০ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ ২০২৬
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh