বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬ | ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

Weekly Bangladesh নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত
নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত

‘তখন রাত ২টা বেজে ১৫ মিনিট’: ২৬ মার্চ ১৯৭১

মানিকুল আজাদ :   |   বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ ২০২৬

‘তখন রাত ২টা বেজে ১৫ মিনিট’: ২৬ মার্চ ১৯৭১

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ, রাত ২টা ১৫ মিনিটে পাকিস্তানি সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। বন্দরনগরী চট্টগ্রামে তাঁর অধীনস্থ বাঙালি সেনাদের সংগঠিত করে তিনি এই সশস্ত্র বিদ্রোহের সূচনা করেন। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস। পরবর্তীতে এক স্মৃতিচারণমূলক নিবন্ধে জিয়া এই দিনটিকে বর্ণনা করেন ‘বাঙালির হৃদয়ে রক্তাক্ষরে লেখা দিন’ হিসেবে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান ৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড হিসেবে কর্মরত ছিলেন। সেই রাতে ঠিক ওই মুহুর্তেই তিনি ব্যাটালিয়ন থেকে পাকিস্তানি সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন। স্বাধীনতার প্রথম বার্ষিকীতে অর্থাৎ ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ তৎকালীন ‘দৈনিক বাংলা’ সংবাদপত্রে তাঁর একটি বিশেষ নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। ‘বার্থ অব অ্যা নেশন’ (একটি জাতির জন্ম) শীর্ষক সেই নিবন্ধটি যখন প্রকাশিত হয়, সেসময় জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীর উপপ্রধান হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন। তখন তাঁর র‌্যাঙ্ক ছিল মেজর জেনারেল। ১৯৭১ সালের একজন জ্যেষ্ঠ অভিজ্ঞ সেনা কর্মকর্তা ও বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তিনি এ পদে উন্নীত হয়েছিলেন। পরবর্তীতে ১৯৭৪ সালের ২৬ মার্চ পত্রিকাটির সহযোগী প্রতিষ্ঠান সাপ্তাহিক ‘বিচিত্রা’ নিবন্ধটি আবারও প্রকাশিত হয়।

জিয়াউর রহমান লিখেছেন, ‘সময়টা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেনাদের মধ্যে বাঙালি অফিসার, জেসিও (জুনিয়র কমিশন্ড অফিসার) ও জওয়ানদের (সাধারণ সৈনিক) ডেকে তাদের সশস্ত্র সংগ্রামে অংশ নিতে নির্দেশ দিই। সবাই একযোগে সেই আদেশ স্বতঃস্ফূর্তভাবে মেনে নেন।’ এরপর জিয়াউর রহমান তাদেরকে নিয়ে বন্দর নগরীর উপকণ্ঠে অবস্থিত কালুরঘাট এলাকায় চলে যান। বাঙালি বেতার কর্মীরা সেখানে ততক্ষণে একটি অস্থায়ী ও গোপন ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ স্থাপন করেছিলেন। সেই কেন্দ্র থেকেই তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন।

স্মৃতিচারণ নিবন্ধটিতে জিয়া ছাত্রজীবন এবং সৈনিক জীবনের শুরুর দিকের অভিজ্ঞতার আলোকে পাকিস্তান শাসনামলে বাঙালিদের সাংস্কৃতিক দমন-পীড়ন এবং রাজনীতিতে কোণঠাসা করে রাখার কথাও তুলে ধরেন। বিশেষ করে দীর্ঘ সামরিক শাসনের ভয়াবহতার কথা বর্ণনা করেছিলেন। তিনি লেখেন, ‘পাকিস্তান সৃষ্টির পর জনাব জিন্নাহ (পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা) তার ঐতিহাসিক ঢাকা সফরে ঘোষণা করছিলেন, ‘উর্দু এবং উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’। আমার মতে সেদিন থেকেই বাঙালিদের হৃদয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদের বীজ বপন হয়।’
জিয়া তাঁর লেখায় আরও বলেন, ‘পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা নিজেই সেদিন ঢাকায় এই অস্বাভাবিক দেশটির ধ্বংসের বীজ বুনে দিয়েছিলেন।’ তাঁর মতে, পাকিস্তানি জান্তার কর্মকাণ্ডই বাঙালির সশস্ত্র প্রতিরোধকে অপরিহার্য ও অনিবার্য করে তুলেছিল। নিবন্ধে জিয়াউর রহমান তাঁর নিজের মনে গভীর রেখাপাত করা প্রধান রাজনৈতিক ঘটনাগুলো পর্যায়ক্রমে বিররণ দেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন; ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচন; আইয়ুব খানের সামরিক শাসন; ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধ; ষাটের দশকের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন এবং ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন।

পাকিস্তানি শাসকদের ইচ্ছাকৃতভাবে পূর্ব পাকিস্তানের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করা, বাঙালিদের প্রতি অবমাননাকর মনোভাব এবং জাতীয়তাবাদী আন্দোলন দমনের পদক্ষেপÑএসবই বাঙালিদের শেষ পর্যন্ত মহান মুক্তিযুদ্ধের দিকে ধাবিত করেছিল বলেও বিশেষভাবে উল্লেখ করেন জিয়া । ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রধান আসামি করে দায়ের করা আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে আরও সুসংহত করেছিল। জিয়া লিখেছেন, ‘ওই মামলার পরিণতি (শেখ মুজিবের নিঃশর্ত মুক্তিলাভ) বাঙালি সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে ঐক্য গড়ে তোলে… তারা বাঙালি (বেসামরিক) জনগণের সঙ্গেও সংহতি প্রকাশ করে।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয় পাকিস্তানি শাসকদের জন্য ছিল বড় এক ধাক্কা। ক্ষমতা হস্তান্তরে তাদের টালবাহানা ও ষড়যন্ত্র রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে, ফলে ১৯৭১ সালের মার্চে দেশব্যাপী অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়। জিয়া লিখেছেন, পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তখন গোপনে সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি জোরদার করতে শুরু করে। আর সেই প্রেক্ষাপটেই শেখ মুজিবুর রহমান ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। নিবন্ধে আরও বলা হয়, ‘রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিবের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ আমাদের কাছে ‘গ্রিন সিগন্যাল’ হিসেবে এসেছিল। এরপর আমরা আমাদের পরিকল্পনার চূড়ান্ত রূপ দিলাম…তারপরই নেমে এলো ২৫ ও ২৬ মার্চের কালরাত।’

জিয়া উল্লেখ করেন, ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনী ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহরে নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর নৃশংস গণহত্যা চালায়। সেই বিভীষিকাময় মুহূর্তগুলোই বাঙালিদের জন্য মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার ‘সঠিক সিদ্ধান্ত’ নেওয়ার চূড়ান্ত সন্ধিক্ষণে পরিণত হয়। তিনি লিখেছেন, সেই কালরাতে ১টার দিকে তাঁর কমান্ডিং অফিসার চট্টগ্রাম বন্দরে পাকিস্তানি জেনারেল আনসারির কাছে রিপোর্ট করার নির্দেশ দেন। সেখানে একটি নেভি ট্রাকে করে তাঁর যাওয়ার কথা ছিল। জেনারেল আনসারি সেখানে শিকারির মত অপেক্ষায় ছিলেন, ‘সম্ভবত আমাকে চিরতরে শেষ (হত্যা) করে দেওয়ার জন্য। তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, বন্দরের পথে যাওয়ার পথে বাঙালি মেজর খালেকুজ্জামান চৌধুরী তাঁকে থামান এবং পাকিস্তানি বাহিনীর সশস্ত্র হামলার খবর দেন। এরপর জিয়া দ্রুত নিজ ব্যাটালিয়নে ফিরে আসেন। সেখানে গিয়ে দেখেন, বাঙালি সৈন্যরা ততক্ষণে সব পাকিস্তানি অফিসারকে একটি কক্ষে বন্দি করে ফেলেছে।

জিয়া লিখেছেন, অফিসে পৌঁছে তিনি বাঙালি লেফটেন্যান্ট কর্নেল এমআর চৌধুরী এবং মেজর রফিকুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন, কিন্তু কাউকেই পাননি। সামরিক কর্মকর্তাদের না পেয়ে তিনি বেসামরিক টেলিফোন অপারেটরকে ফোন করেন। তাঁর ভাষায়, ‘আমি অপারেটরকে অনুরোধ করলাম ডেপুটি কমিশনার, পুলিশ সুপার, কমিশনার, ডিআইজি এবং আওয়ামী লীগ নেতাদের জানাতে যে, ৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট বিদ্রোহ করেছে এবং তারা দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করবে।’

জিয়া আরও জানান, প্রথমে তিনি নিজেই সব বেসামরিক কর্মকর্তার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু কাউকে পাননি। শেষে সেই টেলিফোন অপারেটরের শরনাপন্ন হন এবং তিনি সানন্দে জিয়ার অনুরোধ রাখতে রাজি হন। এরপর তিনি নিজ ইউনিটের বাঙালি সেনাদের উদ্দেশে ভাষণ দেন। জিয়া সেই বিদ্রোহের মুহূর্ত বর্ণনা করতে গিয়ে লিখেছেন, ‘তারা সব জানত। (তবুও) আমি সংক্ষেপে তাদের সবকিছু বললাম।’

ইন্টারনেটে সংরক্ষিত এই বিশেষ নিবন্ধটি ৩ হাজার ৬৫০ শব্দেরও বেশি। সেখানে জিয়া লিখেছিলেন, স্বাধীনতার প্রথম বার্ষিকীর আগে একজন সাংবাদিক তাকে এটি লিখতে উৎসাহিত করেন। যদিও নিজের লেখালেখির দক্ষতা নিয়ে শুরুতে কিছুটা দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিলেন বলেও উল্লেখ করেন। জিয়া আরও লিখেন, ‘আমি একজন সৈনিক। লেখালেখি হল খোদা প্রদত্ত শিল্প আর সৈনিকদের মধ্যে সাধারণত এই দুর্লভ শিল্পগুণ থাকে না। কিন্তু সেই ঐতিহাসিক আবেগঘন মুহূর্তে আমাকেও কিছু লিখতে হয়েছিল। আমাকে কলমও ধরতে হয়েছিল।’

Posted ১১:১৯ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ ২০২৬

Weekly Bangladesh |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

গল্প : দুই বোন

(9324 বার পঠিত)

মানব পাচার কেন

(1584 বার পঠিত)

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১
১৩১৫১৬১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭৩০  
Dr. Mohammed Wazed A Khan, President & Editor
Anwar Hossain Manju, Advisor, Editorial Board
Corporate Office

86-47 164th Street, Suite#BH
Jamaica, New York 11432

Tel: 917-304-3912, 718-523-6299 Fax: 718-206-2579

E-mail: [email protected]

Web: weeklybangladeshusa.com

Facebook: fb/weeklybangladeshusa.com

Mohammed Dinaj Khan,
Vice President
Florida Office

1610 NW 3rd Street
Deerfield Beach, FL 33442

Jackson Heights Office

37-55, 72 Street, Jackson Heights, NY 11372, Tel: 718-255-1158

Published by News Bangladesh Inc.