শনিবার ২৩ অক্টোবর ২০২১ | ৭ কার্তিক ১৪২৮

Weekly Bangladesh নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত
নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত

স্মৃতির মনিকোঠায় একজন আদর্শ শিক্ষক ও প্রশাসক

অধ্যাপক মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম   |   বৃহস্পতিবার, ১৯ আগস্ট ২০২১

স্মৃতির মনিকোঠায় একজন আদর্শ শিক্ষক ও প্রশাসক

২৪শে জুন ২০২১ সাল, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বনামধন্য ভাইস চ্যান্সলর প্রফেসর মোহাম্মদ আলী স্যার আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে আমাদের ছেড়ে তাঁর সান্নিধ্যে চলে গেছেন। সংবাদটা সবধরনের গণমাধ্যমের কল্যাণে জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হওয়ায় সবাই ইতোমধ্যে কমবেশী অবগত। তারপরও কিছু কিছু মানুষ ইহজগৎ ত্যাগ করলেও মনোজগতে সবসময়ই জাগরুক থাকে তাদের মধ্যে প্রফেসর মোহাম্মদ আলী অন্যতম একজন। স্যারের সহধর্মীনি প্রফেসর খালেদা খানম মেডাম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে সমসাময়িক সময়ে অধ্যাপনারত ছিলেন ।মেডাম সম্পর্কে আমার তেমন কোন জানাশোনা না থাকলেও ভিসি স্যারের সহধর্মীনি হিসাবে এবং বাংলা বিভাগের অধ্যাপিকা হিসাবে পরিচিত ছিল। মেডামও ভিসি স্যারের ন্যায় খুবই ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন ছিলেন । স্যারের মৃত্যুর পর মেডামও গত সপ্তাহে অসুস্থতা নিয়ে চট্টগ্রামের ইম্পেরিয়েল হাসপাতালে চিকিৎসারত অবস্হায় গত ৩রা জুলাই ইন্তেকাল করেন। দুজনেই বয়োজেষ্ঠ, অবসর জীবন পার করছিলেন । স্যার ছিল ইংরেজী সাহিত্যে শিক্ষক আর ম্যাডাম বাংলা সাহিত্যের। স্যার ও ম্যাডামের আত্বার মাগফিরাত কামনা করছি।

শিক্ষা ক্ষেত্রে স্যারের অসামান্য অবদান লিখে শেষ করার মতো নয়। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি পদ থেকে বিদায় নেওয়ার পর (মেয়াদ থাকা অবস্হায় কেন তিনি বিদায় নিলেন সেই প্রেক্ষিতের মাঝেই তার ব্যক্তিত্বের পরিচয় পাওয়া যায়, সে প্রসঙ্গে পরে আসছি) বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুুরী কমিশনের সদস্য হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। মঞ্জুুরী কমিশনে দায়িত্ব পালন শেষে চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় ও সাউদার্ন বিশ্ববিদ্যালয়সহ মোট ৪টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হিসাবে অত্যন্ত সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করেন। সেটাও সম্ভবতঃ বাংলাদেশের ইতিহাসে আর দ্বিতীয় নজির নেই।

১৯৮৭ সাল, আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২২তম ব্যাচের ছাত্র হিসাবে জুলাই মাস থেকে ১ম বর্ষের ক্লাস আরম্ভ করি । তখন তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ছিলেন। ১৯৮৭ সালের শেষ দিকে বা ১৯৮৮ সাল (এখন মাস-তারিখ মনে পড়ছে না)। আমি স্যার এ এফ রহমান হলের আবাসিক ছাত্র, হলের কাছাকাছি বাংলাদেশ সংসদ ভবনের আদলে লাল সিরামিক ইটে গড়া স্থাপত্যশৈলীর এক অনন্য নিদর্শন নয়নাভিরাম মোজাম্মেল মিলনায়ন অবস্থিত ।

১৯৮১ সালে ইসলামি ছাত্র শিবির প্রকাশ্যে তেমন শক্তিশালী ছাত্র সংগঠন হিসাবে না থাকলেও ছাত্র সংসদ নির্বাচনে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের ভোটে হল সংসদ ও কেন্দীয় সংসদে নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে , সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও ছাত্র শিবির ছাত্র সংসদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেনি সর্বোদলীয় শিবির বিরোধী সংগঠন সমূহের বাধার কারনে । কিন্তু ১৯৮৬ সালের ২৬শে ডিসেম্বর , ছাত্র শিবিরের সাথে এরশাদ সরকারের ছাত্র সংগঠন জাতীয় ছাত্র সমাজের হামিদ বাহিনীর সংঘর্ষের মধ্যে দিয়ে হামিদ বাহিনীর একক আধিপত্য খর্ব করে ক্যাম্পাসে শিবিরের প্রকাশ্যে রাজনীতি করার সুযোগ বা আধিপত্য বলবৎ হয় । যাক সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ, বিভিন্ন জনের বিভিন্ন রাজনৈতিক দৃস্টিভঙ্গীর আলোকে সেটাকে বিশ্লেষন করার চেষ্টা করবেন । সেই বিতর্কে আমি যেতে চাই না । আমি আমার মূল আলোচনায় ফিরতে চাই। আমি ব্যক্তিগতভাবে যেহেতু ছাত্র রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলাম ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েক জন ছাত্র নেতা এ এফ রহমান হলে থাকতেন, যার ফলে প্রথম থেকে বিভিন্ন নেতৃবৃন্দের সাথে একটা ভালো সম্পর্ক গড়ে উঠে। ঐ সময়ে মোজাম্মেল মিলনায়তনে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট অধিবেশন তথা সিনেট অধিবেশন চলছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ম বর্ষের ছাত্র হিসাবে তখন সবকিছুই তো রঙ্গিন মনে হতো ,লেখাপড়ার চাপ কম জমসে আড্ডা, আর ঘুরাঘুরি ।

সিনেট অধিবেশনে আমরা দর্শক হিসাবে আমীর ভাইয়ের নেতৃত্বে অধিবেশন কক্ষের পিছনের সারিতে মূল গেইট ও স্টেইজ বরাবর মাঝের প্রবেশ পথের ধারে বসে অধিবেশন উপভোগ করলাম। অধিবেশন শেষে যখন ভিসি স্যার অধিবেশন কক্ষ ত্যাগ করবেন সিনেট সদস্যবৃদ্ধ ও ছাত্র – শিক্ষক সবাই দাঁড়িয়ে ভিসি স্যারকে সন্মান জানাচ্ছিল আমরা যথারীতি মূল ফটকে দাঁড়িয়েছিলাম। ভিসি স্যারকে সেই দিনই আমার প্রথম দেখা। সুঠামদেহী, কি বিশাল অভিব্যক্তি, যখন আমীর ভাইয়ের সামনে দিয়ে উনি অতিক্রম করছিলেন তখন আমীর ভাই একজন বিনীত ছাত্রের ন্যায় স্যারকে সালাম দিলেন, স্যার সালামের উত্তর দিয়ে অত্যন্ত মুডে শুধু এই টুকুই জিজ্ঞাসা করলো আমীর কেমন আছ ?
বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ভিসি হিসাবে যেমন ব্যক্তিত্ব থাকা উচিত, উনার মুড, চলার ভঙ্গি, ব্যক্তিত্ব ও সর্বপরি একজন ছাত্র নেতাকে নেতা হিসাবে নয়, একজন শিক্ষক , একজন প্রশাসক, একজন অভিভাবক হিসাবে ছাত্রকে যেমন করে মুল্যায়ন করতে হয় স্যার তাই করলেন । স্যারের সেই ব্যক্তিত্ব আমৃত্যু আমাকে শ্রদ্ধাবনতচিত্তে স্মরণ করিয়ে দিবে । (রাজনৈতিক কারনে বিরোধীতা করলেও ব্যক্তিত্বের নিরিখে ভিসি আলমগীর সিরাজ স্যারও আমার প্রিয় একজন ভিসি ছিলেন । তারা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় তথা বাংলাদেশের অহংকার।)

ভিসি মোহাম্মদ আলী স্যারের ব্যক্তিত্বের আরেকটি অনন্য উদাহরণ হলো মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে উনার পদত্যাগ করা । বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবির ও ছাত্র লীগের মধ্যে ক্যাম্পাসে মারামারির ঘটনা ঘটে, সংঘর্ষের পর যথারীতি শিবির ক্যাম্পাসে অবস্থান করে আর এন্টিশিবির পক্ষ ট্রেন যোগে শহরে চলে যায়। বিকালে বটতলী ট্রেন স্টেশনে ওরা নামার পর শিবিরের একজন কর্মীকে (নাম যদি ভুল না হয় সম্ভত আমিনুল ইসলাম বাড়ী কুমিল্লায় ) স্টেশনের বিশ্রামাগারে নিয়ে চুরিকাঘাত করে মেরে ফেলে। পরে পুলিশ লাশ উদ্ধার করে ক্যাম্পাসে নিয়ে যায় ।

তখন স্যার বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অভিভাবক হিসাবে তাঁর একজন ছাত্রকে যথাযথ নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছেন এই মনোকষ্ট থেকে পুরোদায় নিজের কাঁদে নিয়ে পদত্যাগের ঘোষনা দেন। আমার মনে হয়েছে স্বাধীনতা পরবর্তী এবং ২০০০ সালের আগের সরকারগুলো অতি দলবাজ শিক্ষকদের কখনওই এই ধরনের উচ্চ পদে পদায়ন করতেন না বলে প্রতিষ্ঠানসমূহ এই ধরনের যোগ্য লোকদেরকে অভিভাবক হিসাবে পেয়েছিল ।

আর বর্তমানে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দলবাজ, ধান্দাবাজ ভিসি বা প্রশাসকরা নেতাদেরকে তোয়াজ করে চলেন, নিজেও আখের ঘোচান , তাদেরও ভাগ দেন। যা মিডিয়ার কল্যাণে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিদের আমলনামা আপনারা অবগত। এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে লাশের মিছিল হলেও দলীয় প্রশাসকরা নাকে তৈল দিয়ে ঘুমায় এবং খুনিদের সাথে বসে মিটিং করে কিভাবে খুনিদেরকে বাঁচানো যায় ।
পরিশেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের আমার অগ্রজ ২১তম ব্যাচের মাঈন উদ্দিন ভাইয়ের (বর্তমানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব বিজ্ঞান ও তথ্য বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ) স্যার সম্পর্কে মূল্যায়নের কিছু অংশ আপনাদের জন্য সংযুক্ত করলাম।

মাঈন উদ্দিন ভাইয়ের পেইজ থেকে :

১৯৮৬ সালে আমি যখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই তখন মোহাম্মদ আলী স্যার উপাচার্যের দায়িত্বে। ঐ সময়ে কোন বড় অনুষ্ঠান ব্যতীত সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের ভিসি স্যার কে দেখা বা কথা শুনার সুযোগ ছিলো না। ১৯৮৭ সালে আমাদের ১ম বর্ষের ফরম পূরনের তারিখ ঘোষনা করা হলে দেখা গেল পরীক্ষার ফি আগের বছরের তুলনায় ৭০০ টাকা বৃদ্ধি হয়েছে। এ নিয়ে ১ম বর্ষের ছাত্রছাত্রীদের মাঝে ক্ষোভ বিরাজ করছিল।

একদিন শহর থেকে শাটল আসার পর শাহজালাল হলের সামনে দঁড়িয়ে শ্লোগান দিলাম- ১ম বর্ষের পরীক্ষার ফি – কমাতে হবে, কমাতে হবে। দেখলাম আমার পাশে কয়েকজন জমা হয়ে গেছে। সব হলের সামনে দিয়ে ঘুরে যখন মিছিল খেলার মাঠের উপরে ভিসি অফিসের সামনে গেল তখন এটি বিশাল একটি মিছিল। মিছিল শেষে ভিসি অফিসের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ফি কমানোর জন্য জ্বালাময়ী এক ভাষন দিলাম। হয়ে গেলাম ১ম বর্ষের ছাত্রছাত্রীদের লিডার। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ছিলেন রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর শামসুদ্দীন স্যার, একজন সহকারী প্রক্টরের নাম মনে আছে ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শওকতুল মেহের স্যার। (শওকতুল মেহের স্যার ৯২ সালে মার্কেটিং বিভাগ চালু হলে সে বিভাগে যোগদান করেন) । আমার ভাষন শেষে শওক্তুল মেহের স্যার আন্দোলন কারীদের পক্ষ থেকে ৪ জনকে ভিসির সাথে দেখা করতে যেতে বলেন। আমি গেলাম, রসায়নের সিরাজুল ইসলাম, এফ আর হলে থাকতো এখন কাপ্তাই সরকারী কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল গেল, আর দু’জনকে ভুলে গেছি। দোতলায় ভিসি স্যারের সাক্ষাত কক্ষে সোফায় বসলাম। ভিসি মোহাম্মদ আলী স্যার প্রক্টর ও সহকারী প্রক্টরদের সাথে নিয়ে আমাদের সামনে আসলেন। দাঁড়িয়ে সালাম দিলাম। বসতে বললেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার পর এই প্রথম ভিসি স্যারকে দেখলাম। সামনা সামনি বসে কথা বলার সুযোগ পেলাম। কোর্ট টাই পরিহিত ভিসি স্যার। তাঁর চেহারাতেই ব্যক্তিত্বের চাপ সুস্পষ্ঠ। কথা বার্তাতে একই বিষয় বুঝতে পারলাম। আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে আমিই কথা বললাম। উনি বিবেচনার আশ্বাস দিলেন। সবশেষে চারজনের নাম, বিভাগ ও রোল নম্বর লিখে দিতে বললেন। মনে মনে কিছুটা ভয় পেয়ে গেলাম। শাস্তির সম্মুখীন হই কিনা। কিন্তু ভাগ্য ভালো কোন শাস্তি পেতে হয়নি। এ নিয়ে আন্দোলনও আর আগায়নি , মিছিলও আর বের করিনি, ফিও আর কমেনি। স্যার ও উনার সহধর্মীনির জন্য মাগফিরাত কামনা করছি ও আল্লাহ যেন উনাদেরকে জান্নাতবাসী করেন সেই কামনা করছি ।

Posted ৫:৩২ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ১৯ আগস্ট ২০২১

Weekly Bangladesh |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

গল্প : দুই বোন
গল্প : দুই বোন

(1504 বার পঠিত)

মানব পাচার কেন
মানব পাচার কেন

(490 বার পঠিত)

যত সঙ্কট তত লাভ
যত সঙ্কট তত লাভ

(398 বার পঠিত)

advertisement
advertisement
advertisement

আর্কাইভ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০৩১
Dr. Mohammed Wazed A Khan, President & Editor
Anwar Hossain Manju, Advisor, Editorial Board
Corporate Office

85-59 168 Street, Jamaica, NY 11432

Tel: 718-523-6299 Fax: 718-206-2579

E-mail: weeklybangladesh@yahoo.com

Web: weeklybangladeshusa.com

Facebook: fb/weeklybangladeshusa.com

Mohammed Dinaj Khan,
Vice President
Florida Office

1610 NW 3rd Street
Deerfield Beach, FL 33442

Jackson Heights Office

37-55, 72 Street, Jackson Heights, NY 11372, Tel: 718-255-1158

Published by News Bangladesh Inc.