চৌধুরী মোহাম্মদ কাজল : | বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬
বাংলাদেশের উপচে পড়া জনসংখ্যা বাংলাদেশীদের বিদেশে যেতে বাধ্য করছে। ছোট্ট দেশ এত মানুষ। কর্মসংস্থান তো দূরের কথা বসবাস করাটাই অসম্ভব হয়ে পড়ছে। জনসংখ্যার ঘনত্ব ভারত বা চীনের চেয়েও বেশী। তাই সবাই যেন দেশ থেকে পালাতে ব্যস্ত। যারা পারছে ভিসা নিয়ে যাচ্ছে। যাদের ভিসা নেই তারা নৌপথে জীবনের ঝুকি নিয়ে পাড়ি জমাচ্ছে। শুধু ইটালী নয়, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া যাওয়ার জন্য জীবন বিসর্জন দিচ্ছে। যাদের সেই সামর্থ্যটুকুও নেই তারা ভারত হয়ে আমাদের সাবেক রাস্ট্র পাকিস্তানে যাচ্ছে। করাচীতে যে এত বাঙালী থাকে পাকিস্তান যাওয়ার আগে আমার ধারনাই ছিল না। লক্ষ লক্ষ বাঙালী শুধু করাচীতেই থাকে।
অন্যান্য জায়গায় কি পরিমান বাঙালী আছে তার হিসেব নেই। এইসব বাঙালীরা সবাই বাংলাদেশী। ওদের পাকিস্তানের জাতীয় পরিচয় পত্র আছে (শনাক্তি কার্ড)। পাকিস্তানে দালালের মাধ্যমে জাতীয় পরিচয় পত্র বানানো যায়। কিন্তু পাকিস্তানের পুলিশ সেটা গ্রাহ্য করে না। সুযোগ পেলেই গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। টাকা খেয়ে আবার ছেড়েও দেয়। যারা ধনী তাদের গ্রেফতার হওয়ার সম্ভাবনা বেশী। ক্রান টাকা ওয়ালারা যখন গ্রেফতার হলে মোটা অঙ্কের ঘুষ দিতে পারে। আপনার যে টাকা আছে পাকিস্তানের পুলিশ কি করে জানবে। আপনার স্বদেশী ভাইলোগ আছে না। ওরাই পুলিশকে জানিয়ে দেবে।
উর্দুতে ওদেরকে বলা হয় মকবুর (ইনফর্মার)। করাচীতে প্রচুর বাঙালী আছে যারা মকবুরী করে প্রচুর অর্থের মালিক হয়েছে। পাকিস্তানে বাঙালীদের থাকার কোন আইনী বৈধতা নেই। তারা শুধু একটি কথাই জোড় দিয়ে বলতে চায় ‘হাম একাত্তরসে পেহলেসে হে’। প্রকৃতপক্ষে একাত্তরসে পেহেলেসে নয়, বেশীর ভাগ ১৯৮০ সালের পর বাংলাদেশ থেকে অবৈধপথে পাকিস্তান গিয়েছে। ওই সময় তারা ভারতকে করিডোর হিসেবে ব্যবহার করে বিএসএফের সহায়তা নিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে বিপদজ্জনক বর্ড়ার পাড়ি দিয়ে পাকভুমিতে আত্মপ্রকাশ করেছে। পাঞ্জাব দিয়ে পাকিস্তান প্রবেশ করে ট্রেনে করে সোজা করাচী।
ভারত হয়ে পাকিস্তান প্রবেশ করাটা যেমন সহজ তেমনি কঠিন। মানব পাচারের সময় পাচারকারীদের দলে অবশ্যই কিছু মেয়ে থাকতে হবে বিএসএফকে উপঢৌকন দেওয়ার জন্য। নাহলে ওরা বর্ডার পার হতে দেবে না। পাক-ভারত সীমান্তে বিএসএফ দলের পুরুষ সদস্যদের রাতের অন্ধকারে উল্টো করে বসিয়ে ঠিক তাদের পেছনে তাদেরই পরিবারের মেয়েদের স্বাগত জানায়।
সাবধান কেউ ঘাড় ফেরাতে পারবে না। এরপর পাকিস্তানে ঠেলে দেওয়ার সময় বলে দেয় ওপাড়ে পাকিস্তানীরা মেরে ফেললেও ভারতে ফিরে আসতে পারবে না। ওপাড়ে গিয়ে রেঞ্জার্সের হাতে ধরা পড়লে ওরা আবার ভারতের দিকে ঠেলে দেবে (পাকিস্তানের সীমান্ত রক্ষীদের বলা হয় রেঞ্জার্স)। এপাড়ে এলে আবার বিএসএফ পাকিস্তানের দিকে ঠেলে দেবে। অর্থাৎ আপনি যদি প্রতিবারই রেঞ্জার্স ও বিএসএফের হাতে ধরা পড়েন তাহলে আপনাকে অনন্তকাল ভারত ও পাকিস্তানের নো ম্যান্স ল্যান্ডে এপাড় ওপাড় করতে হবে। কোন দেশেই ঢুকতে পারবেন না। কিন্ত বাস্তবে এমনটা ঘটে না। এখানে যা বলেছি প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে শুনে বলেছি। এগুলি দুই দশক আগের কথা। এখন নিশ্চয় পরিস্থিতি ভিন্ন। এখন মনে হয় আগের মত সহজে পাকিস্তান ঢোকা যায় না। তাই হয়ত অনেকে ভারতেই থেকে যাচ্ছে।
দেশে জায়গার সংকুলান না হলে মানুষ দেশান্তরী হবেই। এটাই মানুষের সহজাত প্রবণতা। কিন্তু আমাদের মানুষ সেই সব দেশে যাওয়ার চেস্টা করছে যে সব দেশ আমরা আগেই ছেড়ে এসেছি। বাংলাদেশের মানুষ এখন অবৈধ পথে পাকিস্তান গিয়ে সব রকমের নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে সেখানে অমানবিক জীবন যাপন করছে। অথচ এই দেশটা এক সময় আমাদেরই ছিল। তখন পাকিস্তানের জনসংখ্যা ছিল সাড়ে পাচ কোটি, আমাদের ছিল সাড়ে সাত কোটি। অথাৎ গনতন্ত্রের বিচারে সবসময় আমরা থাকতাম মেজরিটি। ওদের ছিল ভূমি, আমাদের ছিল জনসংখ্যা।
শিক্ষার হারও ছিল আমাদের বেশী। একসাথে থাকলে ওই দেশটা আমাদেরই নিয়ন্ত্রনে থাকত। আামদের অভিযোগ শেখ মুজিব নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পরও পাকিস্তানের সামরিক সরকার তার কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেনি। কিন্তু একসময়তো দিতেই হত। কতদিন আটকে রাখতে পারত। একটা সামরিক সরকার কতদিন ক্ষমতায় থাকতে পারে। আমরা এতকিছু না ভেবে একটি অপরিনাশদর্শী সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম। আমাদের রাজনীতিবিদরা স্বাধীনতার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠল। জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষনা দিয়ে পুরো দেশকে যুদ্ধের মুখে ঠেলে দিলেন। ত্রিশ লক্ষ লোকের প্রাণ গেল। বিশ্ববাসী দেখল একটা দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগন সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে তৃতীয় আরেকটি দেশের সহযোগিতা নিয়ে।
শেখ মুজিব ও জিয়াউর রহমান স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশের রাস্ট্রপতি হয়েছিলেন।
এখনও দেশটা নিয়ন্ত্রন করছে তাদেরই বংশধররা। পাতি নেতারা মন্ত্রী হয়েছে, এমপি হয়েছে। জনগন কি পেয়েছে। দেশান্তরী হয়ে আমরা দেশে দেশে ঘুরে বেড়াচ্ছি। আমরা ভারত ছেড়ে এসেছি ১৯৪৭ সালে, পাকিস্তান ছেড়েছি ১৯৭১ সালে। এখন ভারত গেলে ওরা বলে তোমরা এদেশ ছেড়ে চলে গিয়েছ এখন আবার এসেছ কেন। পাকিস্তানও বলে ১৯৭১ সালে চলে গিয়েছিলে আবার এখন কেন। আমরা যাব কোথায়। শেখ মুজিব, জিয়ার বংশধররা পালাক্রমে দেশ শাসন করছে। দেশটা লুটে পুটে খাচেছ। অবস্থা বেগতিক দেখলে ইংল্যান্ডে চলে যাচ্ছে। সেখানে বিলাসী জীবন যাপনের ব্যবস্থা আগেই করে রেখেছে। অভিজাত বৃটিশরা তাই ভারত-পাকিস্তানীদের মত বলে না ‘হোয়াই ইউ আর হিয়ার?’। সাধারন বাংলাদেশীরা যারা পারছে ইওরোপ আমেরিকা চলে যাচ্ছে। যাদের সে সামর্থ্য নেই তারা ভারত পাকিস্তান গিয়ে নানা রকমের লাঞ্ছনা সহ্য করছে।
এই যে শেখ মুজিব ও জিয়াউর রহমানের ছেলেপুলেরা জনগনের টাকায় খেয়ে পরে নিজেদের মেদবৃদ্ধি করছে জনগনের প্রতি তাদের কোন দায়বদ্ধতা আছে কি? দেশের জন্য, জনগনের জন্য তারা কি করেছে। অথচ তারা দেশের মালিক, জনগনের প্রভু। অর্ধ শিক্ষিত জনগন তাদের প্রভুত্ব মেনেও নিয়েছে। আর তারা জনগনের অজ্ঞতার সুযোগ নিয় জনগনকে আরও বেশী অজ্ঞ করে রেখেছে। দেশে কয়েক বছর পর পর গনঅভ্যুত্থান হয়, সেই অভ্যুত্থান বিপ্লবে পরিণত হয় না। ঘুরে ফিরে আসে সেই দুই পরিবার। জনগনের অধিকার কখনও অর্জিত হয় না।
জনগনতো জানেই না তাদের অধিকার কি। জনগন শিক্ষিত হলে সমস্যা আছে। ওরা যেন ব্যালট পেপার পড়তে না পারে। চীরকাল যেন মার্কা দেখে সিল মারে সেই ব্যবস্থা রাখতে হবে। দেশে আইনের শাসন নেই। থাকবে কি করে আইন সভার সদস্যরা আইন বোঝে না। বোঝার দরকারও পড়ে না। নেতার কথায় হাত তুলবে আর হাত নামাবে। দেশ নিয়ে কারও চিন্তা নেই। জাতীয় সংসদ তস্করদের ক্লাবে পরিণত হয়েছে। দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ নেই। কথা বলার স্বাধীনতা নেই।
সরকারের বিরুদ্ধে কথা বললে বেচে থাকারও অধিকার নেই। তাইতো সবাই বিদেশে ছুটছে। যাদের সামর্থ্য আছে ইওরোপ আমেরিকায় চলে যাচ্ছে। সেখানে গিয়ে হয়ে ওঠছে সেই সব দেশের গর্বিত নাগরিক। যারা পারছে না তারা স্রোতের শেওলার মত ভাসছে। কেউ কেউ ডিপোর্ট হয়ে ফিরে আসছে। অনেকে আটকে আছে দুই দেশের মাঝখানে ’নো ম্যানস ল্যান্ডে’। আমরা যাব কোথায়? দেশটা যে চলে গেছে ক্ষমতালোভী তস্করদের নিয়ন্ত্রনে।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও স্ট্যাটেন আইল্যান্ড লায়ন ক্লাবের সাধারন সম্পাদক।
Posted ২:৩৭ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh