কাজী জহিরুল ইসলাম : | বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬
নোবেল বিজয়ী আইরিশ কবি সিমুস হিনি বলেছেন, ‘সনেট হচ্ছে কবিতার কাঠামোগত একটি আন্দোলন’। ৮০০ বছরেও এই আন্দোলন স্তিমিত হয়নি। এখনো পৃথিবীর সকল ভাষার কবি সনেট রচনা করছেন। সনেট সম্পর্কে বিলেতি সনেটের জনক শেক্সপিয়ার তার ১৮ নম্বর সনেটের প্রথম দুই লাইনে লেখেন, “তোমাকে আমি গ্রীষ্মের এক মনোরম দিনের সঙ্গে তুলনা করবো কী, তুমি তার চাইতেও স্নিগ্ধ”।
সেই স্নিগ্ধ কবিতাটিকে বাংলা ভাষায় অক্ষরবৃত্তের গুরুগম্ভীর কাঠামোর মধ্যে বন্দি করে রেখেছেন বাংলা ভাষার কবিরা। যেহেতু জন্মকাল থেকেই সনেট রচিত হয়েছে সুশৃঙ্খল স্বরবৃত্ত ছন্দে, মাঝে মাঝেই বাঙালি কবিদের কেউ কেউ স্বরবৃত্ত এবং মাত্রাবৃত্ত ছন্দে সনেট লিখতে চেয়েছেন। মুহম্মদ নূরুল হুদা, আতাহার খানসহ অনেকেই অক্ষরবৃত্তের কাঠামো ভেঙে সনেটের স্বতঃস্ফূর্ততার বিকাশ ঘটিয়েছেন, আমি নিজেও স্বরবৃত্ত ছন্দে পরীক্ষামূলক একগুচ্ছ সনেট লিখেছি। এখন সময় এসেছে বাংলা ভাষার মিষ্টিছন্দ স্বরবৃত্ত এবং মাত্রাবৃত্তে সনেট রচনা করে বাংলা সনেটকে তার মূল স্রোতের সঙ্গে যুক্ত করার।
ভাষার নিজস্ব ভঙ্গির কারণে কোনো ভাষায় অল্প শব্দে অনেক কথা বলা যায় আবার কোনো ভাষায় সেই কথা বলতে আরো কিছু বেশি শব্দ দরকার হয়। এই বিবেচনায় সনেট রচনার ক্ষেত্রে কোনো কোনো ভাষার কবি পঙক্তিতে মাত্রার সংখ্যা বেশি/কম করেছেন। যেমন ফরাসীরা ইতালিয় বা বিলেতিদের মত ১০ সিলেবলে পঙক্তি নির্মাণ না করে ১২ সিলেবলের কাঠামো নির্ধারণ করেছেন, যেটিকে আলেক্সান্দ্রিন কাঠামো বলা হয়, কিন্তু সনেটের যে মূল ছন্দ, সিলেবল ভিত্তিক, যেটি বাংলা ভাষার স্বরবৃত্ত ছন্দ, সেখান থেকে কেউই বিচ্যুত হননি।
অন্তমিলের স্কিমেও ফরাসীরা তাদের নিজস্বতার সাক্ষর রেখেছেন। তারা পেত্রার্কীয় অইইঅ দিয়ে প্রথম এবং দ্বিতীয় চার লাইন রচনা করেন। অর্থাৎ অষ্টকের অন্ত্যানুপ্রাস নির্মাণ করেন ABBAABBA পদ্ধতিতে। ষষ্টকেও ব্যতিক্রমী সূত্র ব্যবহার করেন ফরাসী কবিরা, এখানে তারা পছন্দ করেন CCDEED অথবা CCDEDE কাঠামো। ফরাসী কবি ক্লেমন মারো অন্তমিলের এই সূত্রের প্রণেতা, তিনি পেত্রার্কান সনেট থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে এই সূত্র তৈরি করেছেন। তিনি ষোড়শ শতকের কবি।
স্পেনিশ কবিরা মূলত ১১ সিলেবলে সনেট রচনা করেন তবে কেউ কেউ ১৪ সিলেবলেও লেখেন। ১১ সিলেবলের স্পেনিশ সনেটের কাঠামোকে বলা হয় এন্ডেকাসিলেবোস। স্পেনিশ সনেটের অন্তমিলের কাঠামোটি পেত্রার্কীয় ধারা অনুসরণ করে তৈরি হলেও ফরাসীদের মত ওদেরও নিজস্বতা আছে। অষ্টক ফরাসীদের মতোই ABBAABBA কাঠামোতে নির্মিত। কিন্তু ষষ্টকে একটু ব্যতিক্রম আছে। এখানে তারা পেত্রার্কীয় ধারায় CDCCDC কাঠামো অনুসরণ করেন।
আরব্য কবিরা ইংরেজ এবং ইতালীয় কবিদের মতোই ১০ সিলেবলে সনেটের পঙক্তি রচনা করেন। তবে ওদের অন্তমিলের কাঠামোটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। অষ্টকের কাঠামো AAAABBBB এবং ষষ্টকের কাঠামো CCCDDD অনুযায়ী নির্মিত। আরবী সনেটে বক্তব্যের মোচড়টি আসে অন্য সনেটের মতোই নবম পঙক্তিতে। ইতালিয় শব্দ সনেটো (Sonetto) বা ছোটো গান, ইংরেজিতে যেটিকে বলা হয় লিটল সং (Little Song), থেকেই ত্রয়োদশ শতকে ইতালির সিসিলি দ্বীপে জন্ম নেয় ১৪ লাইনের আনন্দময় এক নতুন কবিতার কাঠামো, কালক্রমে যার নাম হয় সনেট।
ষোড়শ শতকে এসে এই ধারায় লিখতে শুরু করেন বিলেতি কবিরা। বিশ্ববরেণ্য বিলেতি কবি শেক্সপিয়ার সনেটের কাঠামো ভীষণ পছন্দ করেন এবং তিনি ১৫৪টি সনেট রচনা করেন। ষোড়শ শতকের, এবং অব্যবহিত পরের, বিখ্যাত ইংরেজ কবিরা প্রায় সকলেই সনেট রচনা করেন। এডমুন্ড স্পেন্সার, উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ, জন মিল্টন, পার্সি বিশ শেলি, জন ডান, স্যামুয়েল টেইলর কোলরিজ এরা সকলেই প্রচুর সনেট রচনা করেন।
ত্রয়োদশ শতকে ইতালির কবি গিয়াকোমো দা লান্তিনি সনেটের কাঠামো সৃষ্টি করলেও, এটিকে চূড়ান্ত রূপ দেন এবং জনপ্রিয় করে তোলেন চতুর্দশ শতকের কবি ফ্রান্সেস্কো পেত্রার্ক। ইতালির জাতীয় কবি দান্তে আলেগিরিও প্রচুর সনেট লিখেছেন। ইংরেজ কবিরা দেরীতে শুরু করলেও সনেট রচনায় তারাও ইতালিয় কবিদের চেয়ে পিছিয়ে ছিলেন না। দুই ভাষার কবিরাই সনেট রচনায় ‘কেউ কারে নাহি ছাড়ে, সমানে সমান’। তাই বিশ্বজুড়ে সনেটের দুটি প্রধান ধারা তৈরি হয়। ইতালিয় ধারাটি পেত্রার্কান সনেট এবং বিলেতি ধারাটি শেক্সপিয়েরিয়ান সনেট হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। সারা পৃথিবীতেই এই দুই ধারায় সনেট লেখা হয়।
এ-ছাড়াও ষোড়শ শতকের শেষের দিকে আরেক বিলেতি কবি এডমুন্ড স্পেনসার অন্তমিলের স্কিমে কিছুটা পরিবর্তন এনে একটি ভিন্ন ধারা তৈরি করেন, এই ধারা তেমন জনপ্রিয় না হলেও বিশ্বসাহিত্যে স্পেন্সারিয় সনেট বলে একটি জনরার কথা উল্লেখ আছে। ১৪ লাইনের কাঠামোটি দুই ভাগে বিভক্ত। প্রথম ৮ লাইনে একটি সমস্যার বিস্তার বা প্রসঙ্গের উত্থাপন করা হয়, পরের ৬ লাইনে এর সমাধান বা বিষয়টি নিয়ে কবির কনক্লুসিভ মন্তব্য উপস্থাপন করা হয়। সাধারণত প্রেম, বিরহ, দেশ, আধ্যাত্মিকতা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে সনেট রচিত হলেও বিশ্বব্যাপী আধুনিক সনেট রচয়িতারা বিষয়ের সীমানা ভেঙে যে কোনো বিষয় নিয়েই লিখছেন।
কাঠামোগত কবিতার মধ্যে পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি লেখা হয়েছে সনেট। এর পরেই আছে জাপানি ছোট্ট কবিতা হাইকুর অবস্থান। সনেটের একটি বড়ো বৈশিষ্ট্য হচ্ছে প্রতিটি লাইন সমমাত্রায় রচিত। ত্রিধারায়ই লাইনগুলো ১০ সিলেবলে রচিত। ইংরেজিতে এই ছন্দকে বলে আয়াম্বিক পেন্টোমিটার। মানে পাঁচ জোড়া সিলেবল। আয়াম্বিক প্যান্টোমিটারে খোলা+বন্ধ, খোলা+বন্ধ, এভাবে ৫টি জোড়া দিয়ে দশ মাত্রার পঙক্তি নির্মাণ করা হয়। সনেট রচনার ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী ছন্দের এই সূত্র অনুসরণ করা হয়। এই ছন্দটি বাংলা সাহিত্যের স্বরবৃত্ত ছন্দের অনুরূপ।
ছন্দের বিষয়ে ত্রিধারার কারো মধ্যেই কোনো ভিন্নমিত নেই। পেত্রার্কান, শেক্সপিয়েরিয়ান এবং স্পেন্সারিয়ান সনেটের মূল পার্থক্য হচ্ছে অন্তমিলের স্কিমে। ইতালিয় বা পেত্রার্কান সনেটের অন্তমিলের স্কিমটা হচ্ছে ABBA CDDC EFGEFG. বিলেতি বা শেক্সপিয়েরিয়ান সনেটের অন্তমিলগুলো তৈরি হয় ABAB CDCD EFEF GG পদ্ধতিতে। এডমুন্ড স্পেনসার কিছুটা ভিন্নতা আনেন। তিনি মালেশিয়ায় জন্ম নেয়া এবং ফ্রান্সে বেড়ে ওঠা পানতুম কিংবা জাপানি কবিতা তানকার মত একটি শেকল নির্মাণ করেন। তার অন্তমিলের স্কিমটি হলো ABAB BCBC CDCD EE.
ভার্সাই, বিলেত ঘুরে এসে ঊনিশ শতকের বাঙালি কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত বাংলা ভাষায় সনেট আমদানি করেন। তিনি অবশ্য সনেটের মূল যে ছন্দ, স্বরবৃত্ত, সেটি অনুসরণ না করে মধ্যযুগের বাঙালি কবিদের রচিত অক্ষরবৃত্তের পয়ারকে ১৪ লাইনের কলেবরে বেঁধে দেন। এবং পরবর্তীতে ওয়াল্ট হুইটম্যানের ব্লাংক ভার্সের অনুকরণে অন্ত্যানুপ্রাস তুলে দিয়ে বলেন, এর নাম অমিত্রাক্ষর ছন্দ। মূলত মাইকেলের মৌলিক সৃষ্টির কোনো কৃতিত্ব নেই। তিনি মধ্যযুগের কবিদের কাছ থেকে (৮+৬) ১৪ মাত্রার পয়ার নিয়ে পশ্চিমের ব্লাংক ভার্সের সঙ্গে সমন্বয় ঘটান।
জীবনানন্দ দাশ ১৪ মাত্রার পয়ারকে টেনে বড়ো করেন, তিনি ১৮, ২২, ২৬ এমনকী ৩০ মাত্রায়ও পয়ার রচনা করেন, যেটিকে আমরা এখন মহাপয়ার বলি। পয়ারে বা অক্ষরবৃত্তেই বাংলা ভাষায় সনেট রচনার একটি পাকাপোক্ত ধারা তৈরি হয়। ত্রিশের দশকের জীবনানন্দ দাশ, সুফী মোতাহার হোসেন, পঞ্চাশের আল মাহমুদ, শামসুর রাহমান, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, ফজল শাহাবুদ্দীন, সৈয়দ শামসুল হক, ষাটের আবদুল মান্নান সৈয়দ, শামসুল ইসলাম, সত্তরের মোস্তফা মীর, আতাহার খান, আবিদ আজাদ, আশির নূরুল হক এবং আমিসহ অনেকেই এই ধারায় সনেট রচনা করেন। সুফী মোতাহার হোসেন তার সমস্ত জীবনে সনেট ছাড়া অন্য আর কোনো ফর্মে কবিতা লেখেননি। ফজল শাহাবুদ্দীনের এবং আমার শুধু সনেটেরই গ্রন্থ আছে।
জনপ্রিয়তার দিক থেকে আল মাহমুদের “সোনালী কাবিন” এবং সৈয়দ শামসুল হকের “পরাণের গহীন ভিতর” সনেট সিরিজ দুটি সবচেয়ে সফল কবিতা। যেহেতু সনেট আনন্দের কবিতা এবং মূল সনেট ধ্বনিভিত্তিক সিলেবলে রচিত হয়েছে, তাই সত্তরের দশকের কবি আতাহার খান, ষাটের মুহম্মদ নূরুল হুদা এবং আশির দশকের আমি প্রায়শই মূলের কাছাকাছি যেতে চেয়েছি। আমরা সব সময়ই শুদ্ধ ছন্দে কবিতা রচনার বিশেষ তাগিদ অনুভব করেছি এবং এই বিষয়ে পারদর্শীও। মাত্রাবৃত্ত এবং স্বরবৃত্ত ছন্দে প্রচুর সফল কবিতা রচনার দৃষ্টান্ত আমাদের আছে।
সম্প্রতি কবি আতাহার খান আমার সঙ্গে আলোচনা করে ঠিক করেন মাত্রবৃত্ত ছন্দে সনেট রচনার একটি ধারা বাংলা কবিতায় তৈরি করবেন, যার মধ্য দিয়ে প্রকৃতপক্ষে মূল সনেটের কাছাকাছি যাওয়া যাবে এবং মাইকেল মধুসূদন দত্তের ভ্রান্তিরও একটা সংশোধনের চেষ্টা করা হবে। আমাদের এই নীরিক্ষাকর্মে যুক্ত হন নব্বইয়ের দশকের কবি জাকির আবু জাফর, আশির আব্দুল হাই শিকদার, ষাটের মুহম্মদ নূরুল হুদা, সত্তরের ফারুক মাহমুদ প্রমূখ। তারা প্রত্যেকেই নিজ নিজ দশকে ছন্দবোদ্ধা কবি হিসেবে উজ্জ্বল।
Posted ২:৫১ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh