কাজী জহিরুল ইসলাম | বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২৬
হক সাহেবের পরামর্শে আমি জীবনানন্দ দাশ ও শামসুর রাহমানের কবিতা পড়তে শুরু করি। দৈনিকের সাহিত্য পাতায় ছাপা হওয়া কবিতা পড়তে শুরু করি। তখন ইত্তেফাকের সাহিত্য সাময়িকী সবচেয়ে জনপ্রিয় ছিল, পাশাপাশি দৈনিক বাংলা, সংবাদ, দৈনিক আজাদ, দৈনিক নব অভিযান এইসব পত্রিকার সাহিত্য বিভাগ সংগ্রহ করে পড়তে শুরু করি। দৈনিক আজাদ এবং দৈনিক নব অভিযান এই দুটি পত্রিকা সব জায়গায় পাওয়া যেত না।
এগুলো সংগ্রহ করার জন্য গুলশান ১ নম্বর গোল চক্করে যেতে হত। মাঝে মাঝে ওখানেও হকারের কাছে পেতাম না, তখন রামপুরা বা মালিবাগ মোড় পর্যন্ত চলে যেতাম। দেখা যেত একটি পত্রিকা সংগ্রহের জন্যই অর্ধেক দিন পেরিয়ে গেছে। আমিনুল হক আনওয়ার প্রতিদিন যেসব নতুন কবিতা লেখেন তার প্রথম পাঠক বা শ্রোতা আমি। তিনি নিজে ততোটা ভালো পড়তে পারতেন না। মহাপ্রাণ বর্ণগুলো উচ্চারণে সমস্যা হত। সব সময় তার নতুন কবিতাটি অফিস থেকে টাইপ করিয়ে আনতেন। আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলতেন, পড়ো তো, দেখি তোমার কণ্ঠে কেমন শোনায়।
আমি যখন শুদ্ধ উচ্চারণে কবিতাটি পাঠ করতাম তিনি তন্ময় হয়ে শুনতেন, তখন আবেগে তার দুচোখ টলমল করত। তিনি আমাকে স্বরবৃত্ত এবং মাত্রাবৃত্ত ছন্দে কবিতা লিখতে নিরুৎসাহিত করতেন। বলতেন, আধুনিক কবিতার ছন্দ হচ্ছে অক্ষরবৃত্ত, এই ছন্দে কবিতা লেখো। অক্ষরবৃত্ত ছন্দের প্রতি তার প্রবল পক্ষপাতিত্ব থাকলেও প্রায়শই বলতেন, শামসুর রাহমান ফ্রি-ভার্সের কবি। তখন আমি এই কথার অর্থ বুঝতাম না। ফ্রি-ভার্স এবং অক্ষরবৃত্ত ছন্দের পার্থক্য বুঝতাম না। আবার মাঝে মাঝে বলতেন, পয়ারে শামসুর রাহমান খুবই স্বতঃস্ফূর্ত। এই পার্থক্যগুলো তখন একদমই বুঝতাম না। মনে হত তিনি উল্টোপাল্টা কথা বলছেন। এখন বুঝতে পারি, তিনি কোনো ভুল কথা বলতেন না। অক্ষরবৃত্ত ছন্দেরই আরেক নাম পয়ার। যখন এই ছন্দে, বা অন্য যে কোনো ছন্দে, রচিত পঙক্তিগুলো সমমাত্রায় সন্নিবেশিত না হয়ে বড়ো-ছোটো হয়, তখনই তাকে ফ্রি ভার্সের কবিতা বলে।
আমার কাছে মনে হত ফ্রি-ভার্স মানে যেখানে ছন্দের বা নিয়মের কোনো বালাই নেই। সর্বার্থেই কাঠামোমুক্ত কবিতা। আজকের বাংলা ভাষার অধিকাংশ কবি এবং পাঠক আমার সেই সময়ের ধারণার মধ্যেই আছেন, তারাও মনে করেন ফ্রি-ভার্সের কবিতা মানেই কাঠামোমুক্ত কবিতা। অবশ্য বিশ্বকবিতায়ও ফ্রি-ভার্সের এই রকম একটি ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যদিও সেগুলোকে তারা প্রোজ-পোয়েট্রি বা গদ্য কবিতা বলেন। আমি এখনও মনে করি ফ্রি-ভার্স মানে ছন্দমুক্ত বা ছন্দহীন কবিতা নয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা অক্ষরবৃত্ত ছন্দে রচিত, তবে অন্য যে কোনো ছন্দেও হতে পারে, বা প্রবহমানতা ঠিক রেখে মিশ্র ছন্দেও রচিত হতে পারে, শুধু ভার্স বা পঙক্তিগুলোতে মাত্রা সংখ্যা সুনির্দিষ্ট কোনো নিয়মে বাঁধা থাকবে না, ফ্রি থাকবে।
শামসুর রাহমানের কবিতা পড়ে পড়ে আমি একদিন শামসুর রাহমান হয়ে গেলাম। রাত জেগে একটি ফ্রি ভার্সের কবিতা লিখে নিয়ে এলাম। আমিনুল হক আনওয়ারের হাতে কাগজটা তুলে দিয়ে বলি, আমি তো শামসুর রাহমান হয়ে গেছি। তিনি কবিতাটি পড়ে খুব জোরে জোরে হাসতে লাগলেন। এরপর কলম দিয়ে কেটে কেটে ছন্দের ত্রুটিগুলো ধরিয়ে দিলেন। এভাবে আমি অক্ষরবৃত্ত ছন্দ শিখতে শুরু করি।
পরদিন তিনি আমাকে বলেন, আগামীকাল তুমি আমার অফিসে এসো, অফিসের পরে তোমাকে এক জায়গায় নিয়ে যাবো। আমি কলেজ থেকে বাসে চড়ে, হেঁটে, তেজগাঁয়ে বাংলাদেশ ফর্মস অ্যান্ড পাবলিকেশন্সের অফিসে গিয়ে হাজির হই। তখন দুপুর হেলে পড়েছে। বিশাল একটি ফ্লোরে অসংখ্য টেবিল পাতা। ৬ ফুট দূরে দূরে একটি টেবিল এবং একটি চেয়ার। পুরো ফ্লোরে এরকম কম করে হলেও ৩০টি ডেস্ক। এগুলোর ঠিক মাঝখানে একটি টেবিলে, আধো আলো আধো অন্ধকারে, নুয়ে পড়ে মুখ গুজে কিছু একটা লিখছেন কবি আমিনুল হক আনওয়ার। ফ্যানের বাতাসে তার এলোমেলো কালো দাড়িগুচ্ছ উড়ছে। ত্রিশটি টেবিলের প্রায় সবগুলোই ফাঁকা, হয়ত আর একজন বা দুজন আছেন দূরের কোনো টেবিলে। আমি তার পাশে গিয়ে দাঁড়ালে তিনি চোখ তুলে তাকান। ও, তুমি এসেছ। বসো। বলেই তিনি আবার লিখতে শুরু করেন।
আমি কোথায় বসবো, সামনে তো কোনো চেয়ার নেই। তিনি কাগজ-কলমে ডুবে আছেন। প্রায় পাঁচ মিনিট পরে চোখ তুলে বলেন, দাঁড়িয়ে আছো কেন, বসো। এরপর নিজেই খেয়াল করেন বসার জন্য তো কোনো চেয়ার নেই তার ডেস্কের সামনে। মনে মনে বিড়বিড় করে কাউকে গালমন্দ করেন। সম্ভবত কোনো সহকর্মী এখান থেকে চেয়ারটি সরিয়েছে, তাকেই গালি দিলেন। তিনি উঠে গিয়ে অন্য ডেস্কের সামনে থেকে একটি চেয়ার এনে নিজের টেবিলের সামনে রাখেন।
এবার বসো। আমি বসলে তিনি তার সদ্য লেখা কবিতাটি আমাকে পড়ে শোনান। দেখো তো ছন্দ ঠিক আছে নাকি? ছন্দ দেখতে হলে তো হাতে নিয়ে অক্ষর গুনে গুনে দেখতে হবে। ভুল। অক্ষর গুনে অক্ষরবৃত্ত ছন্দ ঠিক করতে হয় বটে, তবে কানে সেটা কী-রকম আনন্দ নিয়ে বাজে সেটাই ছন্দের আসল রহস্য। সবাই তা বুঝতে পারে না। সেজন্য পয়ার পাঠের একটা সুর আছে, কবিতা পাঠ করার জন্য সেই সুরটা রপ্ত করতে হয়।
নিশ্চয়ই শামসুর রাহমান সেই সুরটা রপ্ত করতে পেরেছেন? তুমি মনে হয় শামসুর রাহমানের ওপর রেগে আছ? না, হিংসে করছি। কেন?
আপনি সারাক্ষণ শুধু তার নামই করেন। কেন? আমি তো জীবনানন্দ দাশের নামও বলি। মৃত মানুষকে ঈর্ষা করে কী লাভ? এরপর তিনি বিশাল হলরুম কাঁপিয়ে হাসেন। তুমি একদিন ভালো বক্তা হবে। মজার মজার যুক্তি দিতে পারো। না, না, সেটা আমি কোনোদিনও পারবো না। জসীম উদদীন পরিষদের সভায় যখন সমালোচকেরা কথা বলেন আমার তখন ভয়ে বুক কাঁপে। এগুলো থাকবে না। তুমি ডিজরেইলি নামের এক মহিলার নাম শুনেছ? বিদেশি কবি? না, পৃথিবীর একজন সেরা বক্তা। একদিন তিনি মঞ্চে দাঁড়িয়ে বলেন, আই কনসিভ, আই কনসিভ…আই কনসিভ…
আর কিছুই তার মাথায় আসছে না। তিনি খুব অন্তর্মুখী ছিলেন, দর্শকদের মধ্য থেকে একজন তাকে কটাক্ষ করে বলেন, ইউ কুড কনসিভ টু চিল্ড্রেন নাথিং মোর। এতে তিনি দারুণ অপমানিত বোধ করেন। বাসায় গিয়ে বড়ো একটি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা চর্চা করতে শুরু করেন। পরে তিনি একজন সেরা বক্তা হিসেবে আবির্ভূত হন।
দারুণ তো! তুমিও পারবে। চিন্তা যদি স্বচ্ছ হয়, আইকিউ যদি ভালো হয়, জড়তা একদিন কেটে যায়ই। তিনি পিয়নকে দিয়ে চা আনান, বিস্কুট আনান। আমরা চা বিস্কুট খেয়ে বেরিয়ে পড়ি। ওখান থেকে রিক্সা নিয়ে শাহবাগ যাই। যেতে যেতে আমাকে জিজ্ঞেস করেন, কখনো রেডিও অফিসে গেছ? না। সেখানেই যাচ্ছি। তুমি তো কাজী সালাহউদ্দিনের কবিতা পড়েছ। পড়েছ না? হ্যাঁ পড়েছি, নব অভিযান পত্রিকায়। কেমন লেগেছে? ভালোই তো। আসলে খুব বেশি ভালো না। তার কাছেই যাচ্ছি। তাকে আবার বলো না যেন, আপনার কবিতা বেশি ভালো হয় নাই।
না, না, তা বলবো না। সালাহউদ্দিন বেতার বাংলার সহকারী সম্পাদক। বেতার বাংলা কি একটি পত্রিকা? মাসিক পত্রিকা। রেডিওর। ওখানে লেখা ছাপা হলে টাকা দেয়। আমার দুইটা কবিতার বিল বাকি আছে। আজ পাব। আমরা রেডিও অফিসের গেইটে গিয়ে অপেক্ষা করি। একজন পিওন দুটো পাস নিয়ে এলে ভেতরে ঢুকি। কী-যে আনন্দ লাগে। মনে হচ্ছে আমি এক নতুন পৃথিবীতে ঢুকেছি এবং এতোদিন ধরে অপেক্ষা করছিলাম এই পৃথিবীর ভিসা পাওয়ার জন্য।
বেতার বাংলার কমার্শিয়াল ম্যানেজার ছিলেন মনসুরুল আনোয়ার জোয়ারদার। তিনিও কবিতা লিখতেন। সুদর্শন মানুষ। কবি হিসেবে তিনি নিজের নাম লেখেন মনসুর জোয়ারদার। গানও লেখেন। মনসুর জোয়ারদার একা একটি রুমে বসেন। কাজী সালাহউদ্দিন এবং বারী হাওলাদার দুজন মিলে একটি রুমে বসেন, তারা দুজনই বেতার বাংলার সহকারী সম্পাদক। বারী হাওলাদার একজন প্রতিষ্ঠিত গীতিকার। আমি তাদের অফিসে পরেও বহুবার গিয়েছি কিন্তু কখনোই তাদেরকে গল্প করা, আড্ডা মারা, চা খাওয়া আর গান/কবিতা লেখা ছাড়া অন্য কোনো কাজ করতে দেখিনি।
হক সাহেব তাদের সঙ্গে অনেকক্ষণ আড্ডা দেন। আমাকে পরিচয় করিয়ে দেন। সালাহউদ্দিন ভাই আমাকে বলেন, তরুণ কবি, কবিতা দেবেন, আজাদের জন্য। তখনই জানতে পারি সরকারী চাকরির পাশাপাশি তিনি দৈনিক আজাদের সাহিত্য সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেন। ১৯৮৫ সালে সালাহউদ্দিন ভাইয়ের মাধ্যমে আমার প্রথম কবিতা কোনো দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য বিভাগে ছাপা হয়। কবিতাটির নাম ছিল ‘বাগান’। কবিতাটি ছিল এরকম, “একগুচ্ছ রজনীগন্ধার প্রত্যাশায়/ ক্ষুধার্ত সর্পের মত ফণা তুলে/ আমি বারবার ছুটে যাই/ ভোরের কুয়াশাভেজা বাগানের কাছে…” এইরকম। সেই কবিতা আমি ফেলে দিয়েছি। প্রথম জীবনে লেখা এমন অসংখ্য কবিতা ফেলে দিয়েছি। সেগুলোর কথা মনে হলে এখন খুব হাসি পায়। তবে এগুলো যে মূল্যহীন ছিল তা মনে হয় না। এইসব ছেলেমানুষী আবেগ, উত্তেজনা দিয়েই তো রচিত হয়েছে আজকের ভিত্তিমূল।
Posted ১২:৫৩ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২৬
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh