আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু : | বৃহস্পতিবার, ০২ জানুয়ারি ২০২৫
গালিবের কবিতায় মূল প্রতিপাদ্য প্রেম। প্রেমের উচ্ছ্বাস অথবা প্রেমে পরাজয় বা বিচ্ছেদের যন্ত্রণা, যা-ই হোক না কেন, গালিবের কবিতা মানুষের আবেগের মর্মকে ধারণ করেছে। গালিব তাঁর কবিতার মাধ্যমে প্রেমের রহস্যময় দিকগুলো উদ্ভাবন করেছেন বলে তাঁর কবিতায় প্রেমের অনুষঙ্গ বিচ্ছেদ ও প্রতীক্ষার যন্ত্রণা এবং প্রাপ্তির ক্ষেত্রে আনন্দের প্রতিফলন ঘটেছে। কবিতায় তাঁর ব্যবহৃত রূপক ও প্রতীক পাঠককে তাঁর কবিতার সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত করে। পাঠকের আত্মাকে স্পর্শ করে তাদের সুপ্ত আবেগকে জাগ্রত করার করে।
গালিবের গজলের কাব্যিক উৎকর্ষ শ্রোতাকে এমন ভাবাবেশে আচ্ছন্ন করে যে সেই আচ্ছন্নতা থেকে তারা নিজেদের সহজে বের করে আনতে পারে না। গজলের গঠন এবং শব্দ প্রয়োগ এমন যে মনে হয় প্রতিটি লাইনে ব্যবহৃত শব্দ তাঁর গভীর দার্শনিক অন্তর্দৃষ্টির প্রকাশ:
‘দিল-এ-নাদান, তুঝে হুয়া কিয়া হ্যায়,
আখির ইস দর্দ করা দাওয়া কিয়া হ্যায়?’
(হে অবুঝ হৃদয়, তোমার কী হয়েছে,
এই যে যন্ত্রণা, এর নিরাময়ের উপায় কী?)
তাঁর কালোত্তীর্ণ কবিতা আবেগকে এখনো একইভাবে স্পর্শ করছে বলে কবিতাপ্রেমীরা কবিতায় প্রয়োগকৃত শব্দের শক্তি সম্পর্কে ধারণা করতে সক্ষম হন। পাঠক তাঁর কবিতায় আত্মদর্শন খোঁজে ও সহানুভূতির অনুভূতি জাগিয়ে তোলে। একজন দক্ষ কবি হিসেবে গালিবের উত্তরাধিকার এবং উর্দু সাহিত্যে তাঁর অসাধারণ অবদান নিশ্চিত করেছে যে উর্দু ভাষা যত দিন থাকবে, তাঁর কবিতাও তত দিন দাপটের সঙ্গে টিকে থাকবে। তিনি লিখেছেন:
‘ইয়া-রব জমানা মুঝ কো মিটাতা হ্যায় কিস লিয়ে,
লওহে জাহান পে হরফ-ই-মুকাররার নেহি হুঁ ম্যায়।’
(হে প্রভু, পৃথিবী আমাকে মুছে ফেলতে চায় কেন?
আমি বাড়তি কোনো শব্দ নই, যা আগে লেখা হয়েছে।)
গালিবকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া যে কারও জন্য ধৃষ্টতা। তিনি স্বয়ং নিজের পরিচয় দিয়েছেন :
‘হ্যায় আউর ভি দুনিয়া মে সুখান-ওয়ার বহুত আচ্ছে,
কেহতে হ্যায় কি “গালিব” কা হ্যায় আন্দাজ-এ-বয়ান আউর।’
(পৃথিবীতে তো আরো অনেক ভালো কবি আছেন,
কিন্তু বলা হয়, গালিব তাঁর অভিব্যক্তি প্রকাশে অনন্য।)
গালিব তাঁর কবিতায় মৃত্যুর কথা খুব সহজে বলেছেন। ঘুরেফিরে তিনি মৃত্যুর কথা এনেছেন। মৃত্যু শুধু তাঁর একার ভাবনার বিষয় নয়। মৃত্যু সকলকে স্পর্শ করবে। আল্লাহ মানুষকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, ‘কুল্লু নাফসিন জায়েকাতুল মউত’, — প্রতিটি প্রাণীকে অবশ্যই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। জীবনের অবশিষ্ট কটি দিনকে তিনি কাজে লাগানোর কথা বলেছেন :
‘কয়ি দিন গর জিন্দেগি আউর হ্যায়,
আপনে জি মে হামনে থা’ন আউর হ্যায়।
আতিশ-এ-দোজখ মে ইয়ে গরমি কাহাঁ, সোজ-এ-গম হ্যায়ে নিহানি আউর হ্যায়।’
(জীবনের আর মাত্র কয়েকটি দিন অবশিষ্ট আছে,
বেঁচে থাকতে আরো কিছু কাজ করে যেতে চাই।
দোজখের আগুনের মাঝে কোথায় সেই উত্তাপ?
তার চেয়ে উত্তাপ বেশি হৃদয়ের দুঃখ-বিষাদে।)
মির্জা গালিবকে কেবল কবিতার একটি নির্দিষ্ট তত্ত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যায় না। কারণ, তিনি কবিতা রচনার প্রচলিত রীতি লঙ্ঘন করে কবিতার নতুন মান নির্ধারণ করেছেন। গালিবের ক্ষেত্রে প্রচলিত প্রবাদ : ‘অজ্ঞতা যেখানে সুখ, সেখানে জ্ঞানী হওয়া মূর্খতা’ যথার্থ এবং আরো অর্থবহ। তাঁর মাঝে ‘শিল্পের জন্য শিল্প’ অথবা ‘জীবনের জন্য শিল্প’ — এই দুটি কাব্যিক দর্শনের কোনো প্রভাব ছিল না বলেই হয়তো তিনি একজন মহান কবি হয়েছেন। এই আনন্দময় অজ্ঞানতাই তাঁকে কল্পনার সাগরের গভীরে ডুবিয়েছে এবং তিনি অতুলনীয় সব কবিতা রচনা করেছেন।
‘রেহনে দে মুঝে ইন আন্ধেরে মে গালিব,
কমবখত রোশনি মে আপনো কে আসলি চেহরে সামনে আ যাতি হ্যায়।’
(গালিব, আমাকে অন্ধকারের মাঝেই থাকতে দাও,
অভিশপ্ত আলোতে নিজের আসল চেহারা বের হয়ে আসে।)
Posted ১২:২১ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ০২ জানুয়ারি ২০২৫
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh