রওশন হক : | বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট ২০২৬
বাংলাদেশের রাজনীতিতে কিছু শব্দ আছে, যেগুলো ক্ষমতার সঙ্গে সঙ্গে হঠাৎ জনপ্রিয় হয়ে যায়, আবার ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সেগুলো যেন অভিধান থেকেই হারিয়ে যায়। “মব” এবং “কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট” তার অন্যতম উদাহরণ। ইন্টোরিম সরকারের সময়ে এই দুটি শব্দ নিয়ে এমন আলোচনা হয়েছে, যেন বাঙালি এই শব্দ দুটির জন্মই প্রথমবার শুনেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে মূলধারার সংবাদমাধ্যম, অ্যাক্টিভিস্ট থেকে বুদ্ধিজীবী, সবাই তখন প্রশ্ন তুলেছেন, কার সঙ্গে কার স্বার্থের সংঘাত, কে কোন সুবিধা পাচ্ছেন, কে ক্ষমতার প্রভাব ব্যবহার করছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই নৈতিক মানদণ্ড এখন কোথায়?
ইন্টারিম সরকারের সময়ে আসিফ মাহমুদ স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা থাকাকালে তাঁর বাবার একটি ঠিকাদারি লাইসেন্স নেওয়ার ঘটনাকে ঘিরে যে তুমুল আলোচনা হয়েছিল, সেটি নিশ্চয়ই অনেকের মনে আছে। লাইসেন্স নেওয়া হয়েছিল, কাজ পাওয়া নয়। তবুও “কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট” প্রশ্নে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম উত্তপ্ত হয়েছিল, অনুসন্ধানী সাংবাদিকরা বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। শেষ পর্যন্ত আসিফ মাহমুদ প্রকাশ্যে বিষয়টি ব্যাখ্যা করেন এবং তাঁর বাবার লাইসেন্স বাতিলের উদ্যোগ নেন।
এখানে আসল বিষয় আসিফ মাহমুদ নন। আসল বিষয় হলো একটি নৈতিক মানদণ্ড। যদি একজন উপদেষ্টার বাবার শুধু ঠিকাদারি লাইসেন্স করাটাই স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্ন তৈরি করে, তাহলে একজন ক্ষমতাসীন মন্ত্রীর ছেলে যখন সরকারি ঠিকাদারি ব্যবসায় সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন এবং বড় অঙ্কের সরকারি কাজ পাওয়ার অভিযোগ ওঠে, তখন একই প্রশ্ন উঠবে না কেন? সম্প্রতি বিভিন্ন সংবাদে মন্ত্রীদের স্বজনদের সরকারি প্রকল্পের ঠিকাদারি কাজ পাওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে। এমনকি বড় অঙ্কের প্রকল্পে মন্ত্রীর পরিবারের সদস্যদের ব্যবসায়িক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও আলোচনায় এসেছে। এসব অভিযোগ সত্য হলে, স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে।
প্রক্রিয়াটি কী ছিল?; যোগ্যতা কী ছিল?; অভিজ্ঞতা কী ছিল? ; টেন্ডার প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ ছিল?; মন্ত্রী হিসেবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অবস্থান কি কোনোভাবে প্রভাব ফেলেছে? ; এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, এখানে কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্টের প্রশ্নটি কোথায়? এই প্রশ্নগুলো করা মানেই কাউকে অপরাধী ঘোষণা করা নয়। বরং এটাই গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের দায়িত্ব। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, ইন্টারিম সরকারের সময়ে যে প্রশ্নগুলোকে গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার অপরিহার্য অংশ হিসেবে দেখা হয়েছিল, এখন সেগুলো করার ক্ষেত্রে অনেকের অস্বস্তি দেখা যাচ্ছে। তাহলে কি নৈতিকতারও দলীয় পরিচয় আছে? ৎআসিফ মাহমুদের বাবার লাইসেন্স হলে যদি “কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট” হয়, অন্য সরকারের মন্ত্রীর ছেলে ব্যবসা করলে সেটি কেন শুধু “ব্যবসা” হয়ে যায়? ইন্টারিমের সময়ে কোনো অনিয়মের সম্ভাবনা দেখা দিলে যদি “মব কালচার” নিয়ে এত আলোচনা হয়, এখন ক্ষমতাসীনদের স্বজনদের বিরুদ্ধে প্রশ্ন উঠলে সেই একই কণ্ঠগুলো এত নীরব কেন? আর এখানেই সবচেয়ে বড় হতাশা।
জুলাইয়ের আন্দোলনের বড় অংশের শক্তি এসেছিল এমন তরুণদের কাছ থেকে, যারা কোনো মন্ত্রীর ছেলে ছিল না, কোনো সরকারি সুবিধার প্রত্যাশায় রাস্তায় নামেনি। তারা আন্দোলন করেছে, মামলা খেয়েছে, আহত হয়েছে, জীবন দিয়েছে। তাদের স্বপ্ন ছিল রাষ্ট্রের চরিত্র বদলাবে, ক্ষমতার সংস্কৃতি বদলাবে, জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু আজ যদি সেই পরিবর্তনের জায়গায় আবার দেখা যায় ক্ষমতাবানদের স্বজনেরা ক্ষমতার সুবিধা নিচ্ছে, আর প্রশ্ন তোলার দায়িত্বে থাকা মানুষগুলো দলীয় আনুগত্যের কারণে চুপ হয়ে যাচ্ছে, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই: তাহলে জুলাই বদলালো কী? আরও একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন আছে। যারা জুলাইয়ের সময় রাজপথে ছিলেন, তাদের অনেকেই আজ কোথায়?
কেউ চাকরি করছেন, কেউ ব্যবসা করছেন, কেউ প্রবাসে বসে নিজের রাজনৈতিক দলের পক্ষে অনলাইনে লড়ছেন। অথচ ক্ষমতার কেন্দ্রের চারপাশে নতুন সুবিধাভোগীদের আবির্ভাব নিয়ে তাদের অনেকেই কথা বলছেন না।কাউকে অভিযুক্ত করার আগে তদন্ত হোক। প্রমাণ প্রকাশ হোক। জবাবদিহিতা নিশ্চিত হোক। কিন্তু প্রশ্ন করার অধিকারটি যেন হারিয়ে না যায়। কারণ রাষ্ট্রের পরিবর্তন মানে শুধু শাসক পরিবর্তন নয়।
রাষ্ট্রের পরিবর্তন মানে একই অন্যায়ের বিরুদ্ধে একই রকম প্রশ্ন তোলার সাহস। হাসিনার সময়ে কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট নিয়ে প্রশ্ন করলে যদি সেটি নৈতিকতার প্রশ্ন হয়, বিএনপির সময়ে প্রশ্ন করলে সেটি দলবিরোধিতা হতে পারে না। লীগের সময়ে মন্ত্রীদের স্বজনদের সুবিধা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে যদি সেটি সাংবাদিকতার দায়িত্ব হয়, এখন একই প্রশ্ন করলে সেটি ষড়যন্ত্র হতে পারে না।
আর জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় শিক্ষা যদি সত্যিই আমরা ধারণ করে থাকি, তাহলে আমাদের বলতে হবে: ক্ষমতা যারই হোক, প্রশ্ন একই থাকবে। সরকার যারই হোক, জবাবদিহিতা একই থাকবে।স্বজন যারই হোক, কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্টের মানদণ্ডও একই থাকবে। নইলে আমরা শুধু সরকার বদলাব, রাষ্ট্রের সংস্কৃতি বদলাব না। আর তখন ইতিহাস আমাদের কাছে খুব সহজ একটি প্রশ্ন রাখবে:জুলাই কি শুধু ক্ষমতার পালাবদলের জন্য হয়েছিল, নাকি ক্ষমতার সংস্কৃতি বদলানোর জন্য?
Posted ১:১৩ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট ২০২৬
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh