শরমিলি সারমিন লাভলী : | বৃহস্পতিবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫
শৈশব আমাদের জীবনের সবচেয়ে রঙিন অধ্যায়। নির্ভার হাসি, খেলা আর বন্ধুত্বে ভরা সে সময়ের স্মৃতি আজও হৃদয় ছুঁয়ে যায়। অন্য সব বাচ্চার মতো ছোটবেলা থেকেই আমারও ছিল খেলার প্রতি প্রচণ্ড দূর্বলতা। আমরা যখন ছোট ছিলাম খেলার মাঠ না থাকলেও টাঙ্গাইল শহরের মাঝখানে সাবালিয়া পাড়ায় ময়মনসিংহ রোডের সাথে নুরু ফকিরের বাড়ি, (বর্তমানে যেখানে পপুলার ক্লিনিক)আমার দুই চাচা আর দুই দারোগা-হরিণ ও ময়না দারোগার(হরিণ ও ময়না পালনের জন্য আসল নাম বিলুপ্ত) বাসা খেলার মাঠের চেয়ে কোন অংশে কম ছিল না।
বিকেল হলেই মন ছটফট করতো কখন খেলতে যাবো? বিকেলের মিষ্টি হাওয়ায় মাঠে ছুটে যাওয়া ছিল প্রতিদিনের নিয়ম। প্রতিটি খেলায় ছিল আলাদা আনন্দ, আলাদা শিক্ষা, যা আজও আমার মনে গভীর রেখাপাত করে আছে।
গোল্লাছুট, কুতকুত, চিবুরি, লুকোচুরি, দারিয়া বান্ধা,সাতচারা, পাঁচগুটি, মার্বেল, ব্যাডমিন্টন, খোলা মাঠে ঘুড়ি উড়ানো এগুলোই খেলতাম ঘুরে ফিরে। সবচেয়ে প্রাণবন্ত খেলা ছিল দৌড় প্রতিযোগিতা। কে আগে গন্তব্যে পৌঁছাবে সেই প্রতিযোগিতায় শরীর ক্লান্ত হলেও মন ক্লান্ত হতো না। পড়ে গিয়েও আবার উঠে দাঁড়াতাম।
লুকোচুরি মানেই এক রহস্যময় আনন্দের খেলা। গাছের আড়াল বা খাটের নিচে লুকিয়ে নিঃশ্বাস আটকে থাকার মজা ছিল অপরিসীম আর ধরা পড়লে বন্ধুদের সাথে হাসাহাসি।
কানামাছি ভোঁ ভোঁ, যাকে পাবি তাকে ছোঁ — ছড়া কাটতে কাটতে এই খেলা খেলতাম। আমাদের খেলতে দেখে মাঝে মাঝে আমার সৌখিন চাচি আম্মাও(কুমুর মা) ভাড়াটিয়াদের বলতো,খেলবা নাকি তোমরা? যেদিন মুরুব্বীরা আমাদের সাথে খেলত, খেলার আনন্দ সেদিন আরো বেড়ে যেত।
যখন প্রাইমারি স্কুলে পড়ি তখন একবার রাস্তা ঠিক করার কাজ চলছিল। রাস্তার কিছু দূরে…দুরেই …বালু উঁচু করা ছিল। স্কুল থেকে ফেরার পথে বালুর ওপরে উঠতাম আর নিচে নামতাম। এভাবে খেলতে খেলতে বাড়ি ফিরতাম। একদিন বালির ওপর থেকে পা পিছলে রাস্তায় পড়ে যাই। আর তখনি একটা রিক্সা আমার পায়ের উপর উঠে যায়। ডান পায়ের সে কাঁটা দাগটা এখনও যেমন আছে…তেমনি আছে স্কুলে খেলতে গিয়ে অন্য মেয়েদের সাথে ধাক্কা খেয়ে পড়ে গিয়ে ভ্রু কাঁটার দাগ।
গোল্লাছুট ছিল শৈশবের সবচেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ খেলাগুলোর একটি। একবার গোল্লাছুট খেলার সময় বলভাবির (ভাড়াটিয়া মোটাসোটা গোলগালের কারণে সবাই তাকে বলভাবি ডাকত) সাথে ধাক্কা খেয়ে পড়ে গিয়ে আমার ডান হাত মচকে গিয়েছিল।
মার্বেলের খেলা ছিল হাতের নিপুণতার খেলা। এই খেলা সহজে পারতাম না। অপেক্ষাকৃত বড় এবং ছেলে বন্ধুরা সব সময় জয়লাভ করতো। তেমনি আরেকটা খেলা ছিল খোলা আকাশে ঘুড়ি উড়ানো। ঘুড়ি কাটতে না পারলেও পড়ে যাওয়া রঙিন ঘুড়ি কুড়িয়ে আনার আনন্দ ছিল রোমাঞ্চকর!
শীতের বিকেল মানেই ব্যাডমিন্টন খেলা। আব্বার বন্ধু হালিম ডাক্তারের দুই মেয়ে মিতু ও রুমু ছিল আমার বান্ধবী। সব বান্ধবীরা মিলে শীতের বিকেলের নরম রোদে নিয়মিত খেলতাম এই জনপ্রিয় খেলা। ব্যাডমিন্টন খেলার কোড কাটতো আর প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি কিনতো আব্বা আর আব্বার বন্ধুরা মিলে। আমরা বিকেলে খেলতাম। আব্বা আর আব্বার বন্ধুরা সবাই খেলতো রাত আটটা নয়টায়। ঐ সময় আমরা পড়া শেষ করে মাঠে বসে লাইটের উজ্জ্বল আলোতে খেলা দেখতাম।
খেলার সাথী কম হলে আমাদের উঠানে আর কুয়ার পাড়ের চিকন উঁচু জায়গায় চেরা দিয়ে দাগ কেটে কুতকুত খেলতাম। একদিন আম্মা বলে,
-তুই খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছিস কেন?
– পায়ে ব্যাথা পেয়েছিস নাকি?
আমি বললাম,
না তো…আমি তো ঠিক মতই হাঁটছি।
হাজার হোক মায়ের মন আবার খেয়াল করে বলে,দেখি তো…বিছানায় শোয়ার পর দেখা গেল ডান পায়ের চেয়ে বা পা চার আঙ্গুল বড়। সবাই আতঙ্কিত!কিন্তু আমি কিছুই বুঝতে পারছিনা। ব্যাথা নেই তবুও একি অবস্থা?টাঙ্গাইলের এক ডাক্তার বলল,অপারেশন করতে হবে আবার অন্য ডাক্তার বলল,পঙ্গু হয়ে যাবে।
ঢাকা বড় ডাক্তার দেখানো হল…তখনকার দিনে আট আনার ডিসপ্রিন খেয়ে আমার পা সম্পূর্ণ ভালো হয়ে গিয়েছিল। এখন আমার মনে হয়, অতিরিক্ত কুতকুত খেলার কারণে(ডান পায়ে চাপ আর বা পা ঝোলা)আমার পা বুঝি কোন ব্যাথা আর কোন কারণ ছাড়াই বড় হয়ে গিয়েছিল।
তখনকার দিনে ফান্টাসি কিংডম না থাকলেও প্রাকৃতিক ফান্টাসি কিংডম ছিল আমাদের পুকুরের ঐ পাড়ে কুমুদের বাসার পুকুর পাড়ের বিশাল বড় মোটা আম গাছটা। আর কোন গাছে আম না ধরলেও ওই গাছে আম ঠিকই ধরতো। পুকুরের এপার থেকেও দেখা যেত হলুদ হলুদ ঝোপা ঝোপা আমগুলো। ওই গাছের ডালে মোটা দড়ি বেঁধে দোল খেতাম……একজন পেছন থেকে ধাক্কা দিলে দোল এমন উঁচুতে উঠে যেত… মনে হতো যেন আকাশ ছুঁয়ে ফেলবো! কখনো মনে হতো খোলা আকাশের নিচে পুকুরের মাঝখানে চলে এলাম … সে অনুভূতি অসাধারণ আনন্দের!
প্রথম যেদিন সিক্স এ ক্লাস করি হাই স্কুলে উঠার আনন্দ পেয়েছিলাম যেমন …দুঃখও পেয়েছিলাম তেমন …এই ভেবে যে, ৫ টায় বাসায় ফিরলে আমি খেলব কখন? হাইস্কুলে উঠার পর মাঠের খেলা কমে গেলে শুরু হয় ঘরোয়া খেলা।
কুমু,আমি শাড়ি পড়ে ভ্যানিটি ব্যাগ কাঁধে নিয়ে হতাম শিক্ষিকা,ডাক্তার আরও কতকিছু!চটের গোল ডিজাইনের ব্যাগের কথা আমি আজও ভুলিনি। একবার পরীক্ষার সময় আব্বা জিজ্ঞেস করল, কালকে তোর কি পরীক্ষা? বললাম, ইংরেজি ২য় পত্র। বই নিয়ে আয়। ঞবহংব পড়ানোর সময় বলল,কলম নিয়ে আয়(অন্য সবকিছুর চেয়ে আব্বা ঞবহংব পড়াতে বেশি পছন্দ করতো)। কিন্তু কি আশ্চর্য!সারা বাড়ী খুঁজেও আমার দুটি কলমের একটিও পেলাম না। অসম্ভব ধৈর্যশীল বাবা সেদিন খুব রেগে গিয়ে আমাকে অনেক বকা দিয়েছিলেন। জীবনের প্রথম তার বড় মেয়েকে বকা দিয়ে রাত ৮ টায় দুটো দামি কলম এনে দিয়েছিলেন।
পরের দিন বিকেলে খেলতে গিয়ে দেখি,চটের ব্যাগের ভেতর আমার সেই কলম দুটো। যেগুলো শিক্ষিকা সাজার সময় ব্যাগে ঢুকিয়েছিলাম।
হরিণ দারোগার মেয়ে সুইটি আর ছন্দা আপার সাথে ক্যারাম খেলার নেশা হঠাৎ করেই বেশ বেড়ে গিয়েছিল। ঐ সময় আমার ছোট ভাই খুব অসুস্থ্য। যে অসুখে এক ছেলে মারা গিয়েছে ঠিক সেই অসুখই আরেক ছেলের। আমার আম্মা তখন পাগল প্রায়। বিকেল বেলা খেলে সন্ধায় বাড়ী ফিরলেই রাগ করতো। আমার ছেলে অসুস্থ্য। তার কাছে থকবি আর তুই খেলে বেড়াস?কালকে থেকে যেন আর তোকে ক্যারাম খেলতে যেতে না দেখি। তবুও চলে যেতাম আর বাসায় ফিরলে খেতাম উঠানে রাখা লাকড়ির বাড়ি। মনে মনে ঠিক করতাম আর খেলব না কিন্তু বিকেল হলেই নিজেকে দেওয়া ওয়াদা ভেঙ্গে ফেলতাম। একদিন আব্বা ক্যারাম বোর্ড কিনে এনে দিল বাসায় খেলার জন্য। নিজের বোন,চাচাত, খালাত ভাই বোন আর আত্মীয়-স্বজনের সাথে চলতো ক্যারাম খেলা। বেশী খেলতাম এ জন্য আম্মা মাঝে মাঝে ক্যারাম বোর্ড ভেঙ্গে ফেলতো আর আব্বা আবার কিনে দিতো। এভাবে যে কত ক্যারাম বোর্ড আব্বা কিনেছে আর আম্মা ভেঙ্গেছে তার হিসেব নেই।
স্কুল জীবনে বার্ষিক ক্রিয়া প্রতিযোগিতায় কখনও পুরষ্কার পেয়েছি বলে মনে হয় না…
তবে বিয়ের পর বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট গাজীপুর, বরের চাকরির সুবাদে যখন গেলাম.. খেলার পরিবেশটা তখন নতুন করে পেলাম। ২৬শে মার্চ, ১৬ই ডিসেম্বর খেলা হতো -সুঁইসুতা দৌড়, মারবেল দৌড়, চোখ বেঁধে হাড়ি ভাঙ্গা, গোলক, চাকতি, বল নিক্ষেপ ইত্যাদি। এসব খেলায় প্রতিবছরই দু-তিনটা পুরস্কার পেতাম। তাছাড়া কর্মকর্তা গৃহিণী ক্লাবের বার্ষিক খেলায় ক্যারাম বোর্ড একক, দ্বৈত ও দাবা খেলা এই তিনটা পুরস্কার আমার কখনও মিস হতো না। পুরস্কার পাওয়ার আনন্দের চেয়ে বেশি আনন্দ পেয়েছি খেলতে এসে আড্ডা আর একেক দিন একেক ভাবির খিচুরি খাওয়ায়।
বাচ্চাদের সাথে মাঠে একদিন সব ভাবিরা মিলে শখ করে সাতচারা খেলেছিলাম। ভুলে গিয়েছিলাম বয়স, চলে গিয়েছিলাম শৈশবে। মনে হয়েছিল,আমাদের দেশে এলাকাভিত্তিক খেলার মাঠ আর খেলার পরিবেশ থাকলে আধুনিকতার সাথে সাথে মানুষের মধ্যে ক্রমাগত যে অস্থিরতা বেড়েই চলছে সেটা কিছুটা হলেও কমে যেত।
খোলা আকাশের নিচে খেলাধুলা যে আনন্দ দেয়, তা সব বয়সের মানুষের জন্যই অতুলনীয়। আজকের প্রযুক্তির ভিড়ে মোবাইল আর ল্যাপটপের গেমে অভ্যস্ত শিশুরা কখনও সেই নির্মল আনন্দের স্বাদ অনুভব করতে পারবে না।
শৈশব আমাদের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময়। এই সময়ের সবচেয়ে বড় আনন্দ ছিল খেলাধুলা। প্রতিটি খেলায় ছিল ভিন্ন ভিন্ন আনন্দ, ভিন্ন ভিন্ন শিক্ষা। সেই শিক্ষা আমাদের শিখিয়েছে দলবদ্ধতা, সহনশীলতা আর বন্ধুত্বের মূল্য। তাই শৈশবের খেলাধুলার রঙিন মুহূর্তগুলো আমাদের স্মৃতিতে থাকবে চির অম্লান!
Posted ১১:২৫ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh