ড. আশরাফ উদ্দিন আহমেদ : | বৃহস্পতিবার, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
আমার জন্ম হয়েছে যে গ্রামে (রতনপুর) এবং প্রতিবেশী কয়েকটি গ্রামের সাথে আজন্ম পরিচিতি ও দীর্ঘদিনের বিরতিতে সাম্প্রতিক ভ্রমণের অভিজ্ঞতা আমাকে নেহাতই ক্ষুদ্র কলেবরের এ নিবন্ধটি লিখতে প্রলুব্ধ করেছে। আমার চিরচেনা গ্রামটি এখন এলাকায় যে শিল্পায়ন হচ্ছে, তার পরিচ্ছায়ায় এখন সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে নতুন রূপ ধারণ করতে শুরু করেছে। এ অর্থেই এটি লোকালয় ভিত্তিক—সামগ্রিক অর্থে বাংলাদেশ কেন্দ্রিক নয়। যে কেউ আমার ধারণার সাথে দ্বিমত পোষণ করতে পারেন। স্বাগতম।

সামাজিক দায়িত্ব, দায়বদ্ধতা, জন্মনিষিক্ত প্রেম-ভালোবাসা-এসবের নিরিখে যে নাড়ির সংযুক্তি এবং আন্তরিক আকর্ষণ, তার প্রভাব ও বিস্তৃতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণও বটে। আশি বছর বয়সের পদচারণায় কমিউনিটি পর্যায়ে যে পরিবর্তন দেখছি, তা আমাকে যুগপৎ বিস্মিত করেছে, কষ্টের কারণও হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমার দেখা, বেড়ে ওঠার পরিবেশ, আত্মিক, আত্মীয়তার বন্ধনে আবেগ-আবিষ্ট সম্প্রীতির সম্পর্কগুলোর পরিবর্তন হলেও মিইয়ে যায়নি। চিনতে পারিনি অনেককেই। তবে বাপ, দাদা, মা, দাদীর নামের প্রসঙ্গ টানলে ঠিক শনাক্ত করতে পারি। এমনটি হওয়াটা স্বাভাবিক। কমিউনিটির ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক পরিবর্তন বিস্তর।
সবুজ, শান্ত, ছায়াঘেরা গ্রাম, আত্মীয়-স্বজনের ঘন সম্পর্কবিজড়িত গ্রামীণ পরিবেশ ও সমাজ আগের মতো নেই। ছনপাতায় ছাওয়া কুটির, স্বল্পসংখ্যক টিনের ঘরবাড়ির স্থানে এখন ইটের দালান, কিছুসংখ্যক আবার দ্বিতল বাড়িÑশহরের আবাসনের মতো। সায়হাম ইন্ডাস্ট্রিজ এবং গ্রামের পশ্চিমে অবস্থিত বিস্তীর্ণ ধানখেত, বিশ্বরোড অন্তত দশ-বারো কিলোমিটার জুড়ে শিল্পনগরের রূপ নিয়েছে। গ্রামের আবাসগুলোতে ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করা বহিরাগতরা ভাড়াটিয়া হিসেবে বসবাস করছে। ফলত আগেকার আত্মিক সম্পর্ক ভিন্ন রূপ ধারণ করেছে। আর্থিক অবস্থা অনেক ভালো এখন। ফকির-মিসকিন নেই বললেই চলে। জমির দাম আকাশছোঁয়া। পরিবেশবান্ধব আমার পরিচিত কমিউনিটি, ঝকঝকে তকতকে গ্রামের রাস্তা যেন অতীতের বাস্তব। এখন কিছু কিছু বাড়ির পাশ দিয়ে নর্দমার পঙ্কিলতা, অসহনীয় দুর্গন্ধ সহ্য করে চলতে হয়। যার বাড়ি, তারই সামনের রাস্তার পরিচ্ছন্নতা দেখা—সামাজিক দায়িত্ব, এ বোধ উবে গেছে। বিকল্প ব্যবস্থা, গ্রুপ বা টিম দায়বদ্ধতা এখন সময়ের দাবি।
গ্রাম উন্নয়ন নিয়ে কথা বলতে সামাজিক পরিবর্তনের প্রসঙ্গ আসতে বাধ্য। ইতিহাস এমনই বলে। শিল্পাঞ্চলে গ্রাম উন্নয়ন সুকঠিন বিষয়। এ নিবন্ধে যে লোকালয়ের কথা বলা হচ্ছে, তা হবিগঞ্জ জেলার প্রবেশদ্বার মাধবপুর থেকে বিশ্বরোড সমান্তরালে প্রায় ২০ কিলোমিটার পর্যন্ত সুতাং সায়েস্তাগঞ্জ এলাকায় বিস্তৃত। এককালে ধানী জমির অনেকটা এখন শিল্পাঞ্চল। আশেপাশের গ্রামগুলোতে গ্রামীণ সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, লোকাচার দ্রুত বিলুপ্তির পথে। নাগরিক সমাজের জীবনযাত্রার চালচলন পরিদৃষ্ট হচ্ছে, কিন্তু পরিপোক্ত হয়নি; বরং গ্রামীণ মূল্যবোধের অস্পৃশ্যমান বিশাল থাবা দৃশ্যমান—এমন সঙ্গাতময় এক সামাজিক-সাংস্কৃতিক আবহে এ লোকালয় পরিবেষ্টিত। পরিবর্তনের জন্য কঠিন সংকটের ক্রান্তিকালে নিপতিত এ লোকালয়।
অবস্থা এমন যে পরিবর্তন এ সময়ে ধীরলয়ে চলে না, বরং লম্ফমান বা লাফিয়ে চলে। যোগাযোগ ব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তনেই এমনটি হয়। পরিবর্তনের এজেন্ট যারা, তাদের সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্য অষ্টপ্রহর চোখ-কান খোলা রাখতে হয়। এজন্য প্রচুর শিক্ষা-প্রশিক্ষণ, তীক্ষ্ণ প্রত্যক্ষণ, বইপত্র পাঠ, নিত্য আন্তঃসংযোগ, মিথস্ক্রিয়ায় রত থাকা প্রয়োজন পড়ে। সুযোগ বুঝে এবং পেলেই মসজিদ, মন্দির, পাঠাগার, বিদ্যালয়, সংযোগকেন্দ্র যেমন বাজার, গ্রোথ সেন্টার, স্থানীয় সরকারকেন্দ্রÑএসবের সাথে সংযোগের সুযোগ নিয়ে অংশগ্রহণমূলক উপলব্ধি এবং তা ছড়িয়ে দেওয়া এবং বাস্তবায়নের কৌশল বের করতে হবে।
পল্লী উন্নয়ন নিয়ে আমার অভিজ্ঞতা প্রায় বিশ বছরের। ডাকসাইটে আমলা, কিংবদন্তিতুল্য প্রশাসক এম. মোকাম্মেল হকের সাথে সত্তরে শুরু করে ১৯৯৫ পর্যন্ত এ কাজে অধিষ্ঠিত ছিলাম। কী শিখেছি, সমাজকে দিয়েছি জানি না; তবে গ্রাম বাংলাদেশের প্রেমে এখনো আকণ্ঠ নিমজ্জিত আছি। এ সত্য অন্তরে ধারণ করি বিধায় গত জানুয়ারিতে অনধিক এক মাসের জন্য গ্রামের বাড়িতে গিয়েও একই গীত গেয়েছি।
পল্লী উন্নয়ন এখন অত্যন্ত জটিল চ্যালেঞ্জ। কৃষিঋণ, ক্ষুদ্রঋণ, কৃষিপণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি—এসব এখনও গুরুত্বপূর্ণ; তবে আরও অনেক ইস্যু যুক্ত হয়েছে। শান্তি আনয়নে মহতি প্রচেষ্টা ছাড়া পল্লী উন্নয়নসংক্রান্ত কোনো কাজে সফলভাবে প্রফুল্লচিত্তে হাত দেওয়া সম্ভব নয়। গ্রামীণ টাউটদের সাথে শহুরে শিক্ষিত লোভী ভূমিখোর একাট্টা হয়ে ভয়াবহ সামাজিক অশান্তি, সমস্যা সৃষ্টি করেই চলছে। গ্রামের গোষ্ঠীভিত্তিক স্বার্থান্ধ নেতৃত্ব নিষ্ঠুরভাবে বিভিন্ন অপকৌশল প্রয়োগ করে এদের সাথে একাত্ম হয়ে অত্যাচার, অনাচারের স্টিমরোলার চালিয়ে যাচ্ছে। জমি বেচাকেনাসংক্রান্ত দপ্তরগুলোতে দালাল, ফড়িয়াদের যোগসাজশে ঘুষ বাণিজ্যে সয়লাব। সাধারণ মানুষের ভোগান্তি না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না।
এতসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে গ্রাম বা লোকালয় উন্নয়ন দুরূহ কাজ, তবে অসম্ভব নয়। অংশগ্রহণমূলক প্রচেষ্টায় গ্রুপ প্রেসার এবং দলবদ্ধ উদ্যোগে অনেক চ্যালেঞ্জ সফলতার সাথে মোকাবেলা করা যায়। প্রতি গ্রামে ১৫-২০ জনের তরুণ এবং যুবক একতাবদ্ধ হয়ে কয়েকটি চিহ্নিত অগ্রাধিকারভিত্তিক সমস্যা সমাধানে পরিকল্পনা ও কৌশলের মাধ্যমে এগিয়ে গেলে জয় সুনিশ্চিত।
আমাদের লোকালয়ে নর্দমা মেরামত, মশা-মাছি নির্মূলের জন্য নালা-নর্দমা পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্ন রাখা অগ্রাধিকারভিত্তিতে পরিকল্পনায় এনে বাস্তবায়ন করতে হবে। পর্যায়ক্রমে ছড়াগুলো সংস্কার করা এবং প্রয়োজনে স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে এনে নর্দমার বর্জ্য অপসারণ বস্তুনিষ্ঠভাবে করা সম্ভব হয়। পরিবেশ দূষণ থেকে লোকবসতিগুলোকে মুক্ত রাখতে হলে এ প্রচেষ্টার বিকল্প নেই। একই সমান্তরালে রাস্তা-ঘাটের মেরামত ও সংস্কার দলবদ্ধভাবে করা প্রয়োজন। এ ব্যবস্থা কবরস্থানের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। নিজেদের ভূমি ছাড়াও পরিত্যক্ত স্থানে শাকসবজি চাষ করে পুষ্টির অভাব পূরণে অবদান রাখা এমন কঠিন কিছু নয়। প্রয়োজন সংগঠিত হয়ে অংশগ্রহণমূলক প্রচেষ্টায় অভিষ্ট লক্ষ্য অর্জনে নেমে যাওয়া।
গ্রামীণ কোন্দল, তেমোহনার বাজারে দীর্ঘস্থায়ী আড্ডা-এসবকে না বলে বা কাটছাঁট করে শুদ্ধ বিনোদন, টিম-উদ্দীপনার ব্যবস্থা নিজেদেরকেই বের করে নিতে হবে। গ্রামের যারা বিদেশে আছেন, যোগাযোগ করলে তা অর্থসংস্থানের একটি অংশের যোগান দিতে পিছপা হওয়ার কথা নয়। সামান্য পরিমাণ অর্থ গ্রামের আত্মীয়দের দ্বারাও উদ্যোগ নিলে আসবে বলে আমি নিশ্চিত। আমাদের জনপদে না খেয়ে আছেন-এমন অবস্থায় এবারের যাত্রায় আমি দেখেছি বলে মনে হয় না।
Posted ১১:০৩ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh