ড. আশরাফ উদ্দিন আহমেদ : | বৃহস্পতিবার, ২০ মার্চ ২০২৫
প্রায় অর্ধ শতাব্দী যাবত অসুস্হ দেশ লেবানন। সত্তর দশকের মাঝামাঝি থেকে নিষ্ঠুর এক গৃহযুদ্ধে নিপতিত দেশটি বোধ করি সুদিনের মুখ দেখল যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প সরকারের কল্যাণে। একসময়ের মধ্যপ্রাচ্যের সুন্দরতম নগরী এবং প্রকৃতির অকৃত্রিম দানে ভরপুর দেশ লেবানন যুগেযুগে নিগৃহীত হয়েছে মানুষের, রাজরাজরাদের লোভ- লালসার কারণে। দীর্ঘ দুইশত বছর ব্যাপ্তির ক্রুসেড ছিল বৈরুত নগরীর যন্ত্রণার সময়। অধিকাংশ যুদ্ধবাজ খ্রিষ্টান সেনাধ্যক্ষরা বৈরুতকে পদানত করে লুন্ঠন করেছে বাধাবন্ধনহীনভাবে। লেবাননের কোনকালেই যুদ্ধনিপুণ সেনাবাহিনী ছিলনা। ভূমধ্যসাগর তীরবর্তী এ জনপদের মানুষ সনাতনভাবেই কোমল প্রকৃতির।
বিদেশী আক্রমণ ঠেকানোর তাদের মধ্যে কদাচ দেখা গেছে। দেয়াল দিয়ে ঘিরে ও শত্রু আক্রমণ থেকে বৈরুতকে রক্ষা করা যায়নি। ক্রুসেডের এক পর্য্যায়ে সাইপ্রাসে জাহাজ থেকে পণ্য খালাস এবং বোঝাই করার কম ঝুকিপূর্ণ হওয়ায় বনিকরা বৈরুতের বদলে নিকোসিয়াকে প্রাধান্য দিতে শুরু করে বন্দর হিসেবে নগরীর গুরুত্ব এবং জৌলুস কমে যায়। অভিজাত খ্রিষ্টান ধনিক পরিবারগুলো বৈরুতকে স্বাস্থ্যকর আবাসস্থল হিসেবে ব্যবহার করা শুরু করে। তবে, এ খ্রিষ্টান নগরীতে তেমন কোন শক্তিমান শাসক ছিলনা যে জনসাধারণকে আক্রমণকারীর হাত থেকে রক্ষা করবে।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় রানি ইসাবেলার স্বামী হামু গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় মৃত্যুশয্যায় থাকাকালে সাইপ্রাসের কিং হোজে যাতে রানির হাত থেকে জোরপূর্বক বৈরুত পদানত করতে না পারেন এজন্য মিশরের সুলতান বাইবারকে অনুরোধ করেছিলেন রানি এবং তার রাজত্ব রক্ষা করার ব্যবস্থা নেয়ার জন্য। বাইবার তার কথা রেখেছিলেন। ইসাবেলাকে অপহরণ করার জন্য সাইপ্রাস অধিপতি সৈন্য পাঠালে মিশরের সুলতানের দ্রুত হস্তক্ষেপে হোজের পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। সুলতান একটি গার্ড রেজিমেন্ট বৈরুতে রেখে খ্রীষ্টান রাজার হাত থেকে একজন সম্ভ্রান্ত খ্রিষ্টান মহিলা শাসককে সুরক্ষার ব্যবস্থা করেন।
ফরাসিদের কলোনি হিসেবে বৈরুত তথা লেবাননে কৃষ্টি, সংস্কৃতি ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব উন্নয়ন হলেও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নডবডে অবস্থায় রেখে লেবাননকে পূর্নাঙ্গ স্বাধীন রাষ্ট্র ঘোষণা করা হয়। শিয়া, সুন্নি, দ্রুজ এবং মেরোনাইট খ্রিষ্টান অধ্যুষিত দেশটি শুরু থেকেই রাজনৈতিক ও সামরিক দিক থেকে দুর্বল রাষ্ট্র ছিলো। আভ্যন্তরীণ কোন্দল চরমে পৌঁছে সত্তরের শুরুতে জর্ডানের বাদশাহ হোসেনের তাড়া খেয়ে দলে দলে ফিলিস্তিনি লেবাননে আশ্রয় নেয়। বৈরুত তখন থেকে একটি বিশাল উদ্বাস্তু নগরীর রূপ পরিগ্রহ করে।
১৯৭৪ থেকে যে গৃহযুদ্ধ শুরু হয় তা ফিলিষ্টিনীরা রাষ্ট্রের মধ্যে রাষ্ট্র গঠন করার বাস্তব অবস্হা থেকেই উৎসারিত। পরবর্তীতে সিরিয়া এতে সংযুক্ত হয় এবং বানি আল সদরের ইরানী বাহিনী তথা হিজবুল্লাহ লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ঘাঁটি গেড়ে বসে। রাশিয়ার মদদ, আমেরিকা-ইসরায়েল পক্ষ, সৌদি আরব এবং ইরান এই দুই প্রতিপক্ষ তথা সুন্নি- শিয়া এসব ফ্যাক্টর লেবাননকে একটি বিভক্ত অকৃতকার্য রাষ্ট্রে পর্যবসিত করে। বিগত পঞ্চাশ বছর যাবত এমনটিই চলছে।
ট্রাম্প প্রশাসন লেবাননের জন্য বরাদ্দকৃত ৯৫ মিলিয়ন ডলার বৈদেশিক সাহায্য আন-ফ্রিজ করে দেয়ার সিদ্ধান্তটি দেশটির জন্য বড়ো ধরণের আশীর্বাদ নিঃসন্দেহে। অত্যন্ত সময়োচিত এ পদক্ষেপ লেবাননের সামরিক বাহিনীকে শক্তিমান করবে। ইসরায়েল হিজবুল্লাহ বাহিনীর উপরের কাতারে নেতাদের টার্গেট অনুযায়ী হত্যা করে ইরান সমর্থিত এ বাহিনীকে মারাত্মক রকমের দুর্বল করে দিয়েছে। বৈরুত এবং দক্ষিণ লেবানন এখন লেবানন সেনাবাহিনী মূখ্যত নিয়ন্ত্রণ করছে। এ সত্য আংশিক হলেও লেবানন এবং বৈরুতের জন্য এ উত্তরণ এক বিরাট আশীর্বাদ।
ম্যানহাসেট হিলস্, লং আইল্যান্ড
Posted ১:০৮ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২০ মার্চ ২০২৫
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh