কাজী জহিরুল ইসলাম : | বৃহস্পতিবার, ০৫ জুন ২০২৫
বাংলাদেশে কোনো রাজনীতি নেই, রাজনৈতিক বক্তব্য নেই, রাজনৈতিক নেতা নেই, রাজনৈতিক দূরদর্শিতা নেই, প্রজ্ঞা নেই। কেন নেই? কারণ বাংলাদেশে কোনো রাজনৈতিক দল নেই। আছে কতগুলো রাজনৈতিক কোম্পানি। কয়েকটি বড়ো কোম্পানি, পারিবারিক মালিকানাধীন, আর বেশ কিছু ছোটো কোম্পানি, ব্যক্তিমালিকানাধীন। যাদেরকে তারা দলের নেতা-কর্মী বলেন তারা সকলেই সেইসব কোম্পানির কর্মচারী, এবং তারা মালিকের অনুগত ও আজ্ঞাবহ। নিজের বিবেক, বুদ্ধি, বিবেচনা প্রসূত রাজনৈতিক বক্তব্য কোনো নেতা-কর্মী প্রদান করেন না বা করতে পারেন না। সর্বত্রই কেয়া হুয়া আর হুক্কা হুয়ার প্রতিধ্বনি।
এদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় কখনোই কোনো রাজনৈতিক দল ছিল না, ছিল শেখ পরিবারের মালিকানাধীন কোম্পানি আওয়ামী লীগ, জিয়া পরিবারের মালিকানাধীন কোম্পানি বিএনপি এবং এরশাদ পরিবারের মালিকানাধীন কোম্পানি জাতীয় পার্টি। ফলে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার সুবিধা বাংলাদেশ কখনোই পায়নি। বাংলাদেশের মানুষ কখনোই রাজনৈতিক সংস্কৃতি, শিষ্টাচার, দেশপ্রেম দেখেনি। তারা জানেই না রাজনীতি আসলে কী জিনিস। শুধু দেখেছে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন, ক্ষমতার ভাগাভাগি, বিদেশে অর্থ পাচার, ক্ষমতাচ্যুত হলে বিদেশে পলায়ন এবং আরাম আয়েশের জীবন-যাপন, ক্ষমতাসীন নেতা নেত্রীদের বাড়ি, গাড়ির মালিক হওয়া, ব্যবসা-বাণিজ্য, ব্যাংক-বীমা, মিডিয়া সাম্রাজ্যের মালিক হওয়া এবং ক্ষমতাচ্যুত হলে প্রতিপক্ষের হাতে খুন, গুম, নির্যাতিত হওয়া। বড়ো বড়ো রাজনৈতিক কোম্পানির পাশাপাশি কিছু ছোটো প্রাইভেট কোম্পানি আছে, রাশেদ খান মেননের ওয়ার্কার্স পার্টি, হাসানুল হক ইনুর জাসদ, আ,স,ম, আব্দুর রবের জাসদ, কামাল হোসেনের গণফোরাম, আন্দালিব রহমান পার্থর বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি, আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর জাতীয় পার্টি ইত্যাদি। রাজনীতির এই অপসংস্কৃতি অর্ধশতকের বাংলাদেশের মাটিতে এমনভাবে শেকড় গেড়েছে তা আজ এক মহীরুহ হয়ে উঠেছে। ডালপালা বিস্তার করে ঢেকে দিয়েছে সকল সম্ভাবনা। নতুন যেসব দল তৈরি হচ্ছে সেগুলোও একই পথ অনুসরণ করে এগুচ্ছে। সেদিন তৈরী হওয়া গণঅধিকার পরিষদও ক্রমশ গণবিচ্ছিন্ন হয়ে শুধুমাত্র নুরুল হক নুরুর অধিকার পরিষদে পরিণত হয়েছে। মনে হচ্ছে না এই দলটিও নতুন কোনো নেতৃত্ব খুঁজে নিয়ে ‘কোম্পানি’ চরিত্রের বাইরে বেরিয়ে আসতে পারবে।
ব্যক্তিমালিকানাধীন কোম্পানির মত দলগুলোর প্রতিষ্ঠাতারাই আজীবন দলের মালিক থাকেন এবং তাদের মৃত্যুর পরে পরিবারের কেউ উত্তরাধিকার সূত্রে দলের মালিক হন, এর কোনো ব্যত্যয় ঘটে না। শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক দল আছে, জামায়াতে ইসলামী, যারা নির্দিষ্ট মেয়াদান্তে তাদের রীতি অনুযায়ী নতুন নেতৃত্বের হাতে দলের দায়িত্ব তুলে দেন। এই দলের কাউকে দুই/তিনবার দলের প্রধান বা দ্বিতীয় প্রধান হতে দেখিনি। কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে দলটির বিতর্কিত ভূমিকা এবং ধর্মভিত্তিক কট্টর পন্থার কারণে ভালো এবং দেশের একমাত্র রাজনৈতিক দল হওয়া সত্বেও অনেকেই এই দলে শামিল হতে পারছেন না।
রাজনৈতিক দলের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে প্রতিযোগিতা। সর্বক্ষেত্রে এই প্রতিযোগিতার উপস্থিতি নিশ্চিত করাই রাজনৈতিক দলের কাজ এবং সেই প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে থাকবে দলের আদর্শে অনুপ্রাণিত স্বদেশপ্রেম। দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা রাষ্ট্রের বিভিন্ন অফিসের দায়িত্ব গ্রহণের জন্য যেমন নির্বাচনে প্রতিযোগিতা করবে ঠিক তেমনি দলের ভেতরেও বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃত্ব গ্রহণের জন্য থাকবে স্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা। সেই প্রতিযোগিতায় মেধাবী এবং উজ্জ্বল নেতৃত্বের গুণাবলী সম্পন্ন ব্যক্তিরাই এগিয়ে থাকবেন। কে কোন পরিবার থেকে এলো, কার কত টাকা আছে, কার কয়টা গুণ্ডা আছে, এগুলো যখন নেতৃত্ব প্রাপ্তির বিবেচনায় আসে তখনই রাজনীতির মৃত্যু ঘটে। সুস্থ প্রতিযোগিতা না থাকলে নেতৃত্বের বিকাশ ঘটে না। পারিবারিক কোম্পানির মালিকেরা সুস্থ প্রতিযোগিতার পথ রুদ্ধ করে দেবার জন্য দলের প্রতিষ্ঠাতাকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে যান, যেন তার মত মহান নেতা আর কারো পক্ষে হওয়া সম্ভবই না। কাজেই সকলেই যেন তার পুজা করেন, তার ও তার পরিবারের আনুগত্য (প্রকৃতপক্ষে দাসত্ব) করেন। এভাবেই কাল্ট তৈরি হয়।
সরকার সম্পর্কে একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে, ভালো গভর্নমেন্ট খুব কম গভর্ন করে। নেতৃত্ব সম্পর্কেও আমরা এই কথাটা শুনি, তিনিই যোগ্য নেতা যিনি নেতার আসনে না বসেই নেতৃত্ব দিতে পারেন। নেতৃত্বের চেয়ারে বসার জন্য যে নেতা পাগল হয়ে যান কিংবা ক্ষমতায় বসার জন্য যে দল পাগল হয়ে যায় তারা কিছুতেই যোগ্য নেতা বা দল হয়ে উঠতে পারে না। ক্ষমতার বাইরে থেকে যদি দেশকে বেশি দেয়া যায় তাহলে প্রকৃত রাজনৈতিক দল কখনোই ক্ষমতায় বসতে চায় না। রাজনীতির মূল কাজ হচ্ছে দেশকে সর্বোচ্চটা দেয়া, দেশের সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় যারা ছিলেন এবং যারা বিরোধী দলে ছিলেন উভয় পক্ষই সব সময় দেশের মানুষকে ভিন দেশী শত্রুর ভয় দেখিয়েছেন। কেউ বলেছেন, ওরা দেশকে পাকিস্তান বানিয়ে ফেলছে, আবার কেউ বলেছেন ওরা দেশকে ভারতের হাতে তুলে দিচ্ছে। এই প্রসঙ্গে আইনস্টাইন বলেছেন, “প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতিবিদরা জনগণের চোখের সামনে বাইরের বিপদ ঝুলিয়ে রাখে, এভাবে তারা সকল বুদ্ধিবৃত্তিক প্রচেষ্টার প্রতি মানুষের সন্দেহ তৈরি করে”। এই চিত্র আমরা বাংলাদেশে সর্বদাই দেখেছি, এখনও দেখছি, ফলে বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তার চর্চা এখানে চিরকালই সীমিত।
আজকের দিনে আইনস্টাইনের এই কথা আরো অধিক প্রযোজ্য। এখন পৃথিবীর কোনো দেশ বিচ্ছিন্ন নয়। আমাদের দেহের প্রতিটি অঙ্গ যেমন পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল তেমনি পৃথিবীর সকল রাষ্ট্রই পরস্পরের ওপর কম/বেশি নির্ভরশীল। আধুনিক তুরস্কের স্থপতি কামাল আতাতুর্কও জাতিসংঘের মতো কোনো সংস্থা গঠনের তাগিদ অনুভব করে এইরকম একটি কথা বলেছিলেন। তার মতে, পৃথিবীর কোথাও যুদ্ধ লাগলে আমরা এমনভাবে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করবো যেমনটা আমাদের একটি অঙ্গে আঘাত লাগলে অন্য অঙ্গ করে থাকে। ভিন্ন দেশের সঙ্গে লেনদেন আদান-প্রদান করতেই হয়। এর মধ্য দিয়েই দেশগুলো এগিয়ে যায়। এখন হিসেব করে দেখতে হবে সেইসব লেনদেনে আমাদের কতটা লাভ আর কতটা ক্ষতি হয়। প্রশাসন যেন সেই হিসেব জনগণের সামনে খোলাসা করে তুলে ধরে তা নিশ্চিত করা সরকাররের দায়িত্ব।
ফিরে আসি দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে। এখন বাংলাদেশে একটি অরাজনৈতিক অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আছে। সরকারের বাইরে আছে সব রাজনৈতিক শক্তি। এই শক্তিগুলোর মূল লক্ষ্য হচ্ছে দ্রুত ক্ষমতায় বসা। সত্তরের নির্বাচনের পরে শেখ মুজিবুর রহমান তার বক্তৃতায় বলেছিলেন, “আমরা গদিতে বসতে পারি নাই”।
“গদিতে বসা” কথাটা যে কত অশ্লীল এটা যেমন ৫৫ বছর আগের নেতা বুঝতে পারেননি, এরই ধারাবাহিকতায় অসুস্থ রাজনীতির হাত ধরে উঠে আসা আজকের নেতারাও বুঝতে পারছেন না। এখনও “ক্ষমতায়” বসতে না পারার আহাজারি ছাড়া তাদের মুখে আর কোনো বাক্য উচ্চারিত হয় না। অথচ একটি ভঙ্গুর অর্থনীতির দেশকে গড়ে তোলার জন্য তারা এই অন্তর্বর্তী সরকারকে কতই না উপদেশ/পরামর্শ দিতে পারেন। বুঝতে পারবেন কী করে? তারা তো মনেই করেন না রাজনীতিকে যুগোপযোগী করে তোলা দরকার।
আওয়ামী লীগ বিশ্বাসই করে না শেখ মুজিবের চেয়ে ভালো নেতা হওয়া যায়, ঠিক একইভাবে বিএনপিও বিশ্বাস করে না জিয়াউর রহমানের চেয়ে ভালো নেতা হওয়া সম্ভব। অথচ তাদের প্রতিদিন এই চর্চাই করা উচিত ছিল মুজিব কিংবা জিয়াকে অতিক্রম করে, তাদের গুণগুলো নিয়ে, দোষগুলো পরিহার করে, আধুনিক বিশ্বের সাথে সঙ্গতি রেখে কীভাবে এ-কালের যোগ্য নেতা হয়ে ওঠা যায়। দলকে যদি প্রাইভেট কোম্পানির বাক্সে বন্দি করে রাখা হয় তাহলে নেতৃত্ব নির্বাচনের দিগন্তটা সীমিত হয়ে যায়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো সেই বিশাল সম্ভাবনাকে একটি পরিবারের মধ্যে বন্দি করে রেখেছে। এই ক্ষুদ্র গণ্ডি থেকে বৃহৎ নেতা বেরিয়ে আসবে কী করে?
সম্প্রতি শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদ হটানোর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মানুষ আবারও নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে। একটি সম্ভাবনাময় নতুন রাজনৈতিক দল এনসিপি তৈরি হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর সীমাবদ্ধতাগুলো থেকে বেরিয়ে এসে তারা যদি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করে সততা ও নৈতিকতার চর্চা করতে পারে তাহলে এই দলটি দাঁড়িয়ে যাবার সম্ভাবনা আছে।
ক্ষমতায় যাওয়া নয়, মানুষকে সেবা দেওয়া, সরকারকে সঠিক পথে পরিচালিত হবার জন্য চাপে রাখা, এইসবই তাদের রাজনৈতিক লক্ষ্য স্থির করতে হবে। তাদেরকে প্রথমেই প্রমাণ করতে হবে ‘কোম্পানী’ চরিত্র থেকে বেরিয়ে এসে তারা সত্যিকারের রাজনৈতিক দল হয়ে উঠবে।
কিছুটা সম্ভাবনা তারা দেখিয়েছেন, একক কোনো নেতৃত্বের স্তুতি করছেন না। সেই সঙ্গে জুলাই বিপ্লবের কৃতিত্বও এককভাবে তারা যেন দাবী না করেন। ক্রেডিট নেওয়া নয়, অন্যকে ক্রেডিট দেওয়ার মধ্য দিয়ে তাদের গড়ে উঠতে হবে তাহলেই কেবল তাদেরই ভাষায় দেশে ‘নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের’ সংস্কৃতি গড়ে উঠবে।
Posted ৯:৫৯ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ০৫ জুন ২০২৫
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh