ড. আশরাফ উদ্দিন আহমেদ : | বৃহস্পতিবার, ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু হয়েছিল গরুর উপর রচনা লেখা। গরু যে চতুষ্পদ জন্তু এ বাক্যটি দিয়ে শুরু করে জন্তুটির দেহের বিবরণ, উপকারিতা ইত্যাকার গতানুগতিক বর্ণনা থাকত। গরু ঘাস খায়, দুধ দেয়, হালচাষে গরুর ব্যবহার এসব লিখতে পারলেই অবনী মোহন রায় স্যারের বেত্রাঘাত থেকে রেহাই পাওয়া যেতো। আমার এ রচনাটি গরু নিয়ে তবে গতানুগতিক নয়।
গরু ঘাস খায় এ আপ্ত বাক্যটি থেকেই আমার আজকের রচনার সূত্রপাত। ঘাস ছাড়াও খৈল, ভূষি ধানের খর এসবও গরুকে খাওয়ানো হয়। সম্পন্ন গৃহস্থ যারা তারাই এ পুষ্টিকর খাবার দিতে পারতেন। সাধারণ, বিশেষত নিন্মমধ্য বিত্তের এবং মাঝারি আয়ের কৃষক পরিবার এহেন রাজসিক খাদ্য দিতে পারতেন না। তবে সকল বিত্তের চাষীদের গরু চরানোর ব্যবস্থা নিতে হতো আবিশ্যিক ভাবে। গরুর স্বাস্থ্য ভালো হলে জমি কর্ষণ মনোমত হতো। কৃশকায় গরু কাঁধে লাঙল দিলে টানতে অসুবিধে হতো। লাঙ্গলের ফলা মাটির গভীরে যেত না। অনেক কারণের মধ্যে এ কারণে ফসল মনোমত হতো না।
হালচাষে প্রযুক্তির পরিবর্তন বাংলাদেশে দেরিতে আসলেও এখন তা নাগালের মধ্যে। মেশিনে চাষ, ফসল কাটা থেকে বিভিন্ন ধাপে প্রক্রিয়াজাতকরণ সবই এখন মেশিনেই হয় । গরু কেন্দ্রিক চাষাবাদ এখন কদাচিৎ চোখে পড়ে। ফলশ্রুতিতে গরুপালন এখন কমে গেছে। গরুপালনের অনুসঙ্গ অনেক স্হাপনা অপ্রয়োজনীয় হয়ে ভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। রাখাল নামে যাদের আমরা ৪০-৫০ বছর পূর্বে চিনতাম তারা পেশা বদল করতে বাধ্য হয়েছে। এদের একটা বড় অংশ এখন নির্মাণ শ্রমিক। দুধ, দই, মাঠা, ঘি এখন প্রফেশনাল ব্যাপারিদের কাছ থেকে প্রয়োজনে কিনতে হচ্ছে। দুধ মন্থনের শব্দ আর গ্রামে তেমন শোনা হয়না। গরুর গাড়িও অনেক এলাকায় বিলুপ্তপ্রায়।
বদলে গেছে গরুর পাল নিয়ে গরু চরানোর অভীষ্ট স্থানে নিয়ে যাওয়ার জন্য ব্যবহার করা হতো সেই গোপাট। গোপাটগুলো অনেক স্থানে রাস্তায় রূপান্তরিত করা হয়েছে। গ্রামের পানি নিষ্কাশনে গোপাটের ভূমিকাকে খাটো করে দেখা হচ্ছে। দখল নিয়ে মারামারি, মামলা মোকদ্দমা অহরই চলছে। পরিবেশ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় অবতীর্ণ এ কাঠামো বা স্থাপনা অন্য ব্যবহারে রূপান্তরিত হয়েছে বা দ্রুততালে হচ্ছে। এতে পরিবেশগত সমস্যা যে হচ্ছে তা নিয়ে কেউ তেমন ভাবে ভাবছেন বলে মনে হয়না। পরবর্তী প্রজন্ম আমাদের এ কাজের জন্য দোষারূপ করবে। অনেক গ্রামেই পাকা দালান, রাস্তা নজরে পড়ে কিন্তু পানি নিষ্কাশনের কোন ব্যবস্থা নজরে পরেনা। কাঁচা ড্রেনগুলোর ময়লা জমে জমে অত্যন্ত উদারভাবে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে, মশা, মাছির আকর্ষণীয় উৎস বা উৎপন্নস্থানও এগুলো। বৃষ্টি হলে ড্রেনের ময়লা কিয়দংশ নিকটবর্তী ছড়ায় পড়ে সেটিও স্হির আবদ্ধ অর্থাৎ জলাবদ্ধ স্হান হয়ে জন স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ হয়ে পড়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে যে স্যানিটেশন ডিপার্টমেন্ট সেটি এ ব্যাপারে কোন কার্যকর ভূমিকা রাখছে এমন কোন প্রমান মেলেনা।
গোপাট প্রসঙ্গ থেকে পরবর্তী বিষয় হলো গোচারণ সম্পর্কিত। আমার গ্রামের বাড়ি হবিগঞ্জ জেলার মাধবপুর উপজেলার রতনপুরে। বঘুনন্দন পাহাড় সংলগ্ন এলাকা এটি । এ গ্রামের এবং আশেপাশের লোকালয়ের গরু চরানোর স্থান ছিল এ পাহাড়। সাধারণত গাঠিয়াল নামধারী একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তি গোপাট দিয়ে গরুর পাল নিয়ে পাহাড়ে ওঠতেন। সাথে কিছু রাখালও থাকতো বাঘ এবং অপরাপর হিংস্র প্রাণীদের আক্রমণ থেকে গরু রক্ষা করতে, সময় মতো ছড়া বা অন্য কোন পানির উৎসে গরুগুলোকে নিয়ে এদের পিপাসা মেটাতে। পড়ন্ত বিকেলে সহিসালামতে গরুর পাল গোপাট দিয়ে গ্রামে নিয়ে আসতো গাঠিয়াল বা গাঠ্যল। রঘুনন্দন পাহাড়ে গরু চরানোর স্হান নিয়ে লোকালয়ের গ্রাম বা
বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে ভুলবোঝাবুঝি হতো।
বঙ্গবন্ধুর প্রাইভেট সেক্রেটারি ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন তাঁর পিতৃভূমি রতনপুর ও আশেপাশের গ্রামের এ সমস্যা নিরসনে ১৫০ একর বনভূমি সরকার থেকে বন্দোবস্ত নিয়ে একটি গরুর চট্টান বা চারণ ভূমি নির্দিষ্ট করার ব্যবস্থা নিলে এহেন সমস্যগুলোর সমাধান হয়। তবে সময়ের নিরিখে চাষাবাদে গরু দিয়ে হাল, মই ইত্যাদি ব্যবস্হার নতুন নতুন উন্নততর প্রযুক্তির ব্যবহারে কৃষিকাজে আমুল পরিবর্তন আসায় গরুর চট্টানটি ব্যবহার বহুলাংশে কমে যায়। এ অবস্থায় কিছু দুষ্ট লোক নানান অজুহাতে চট্টানটি ব্যবহার করতে তৎপর হয়। এহেন পরিপ্রেক্ষিতে নয়াপাডা ইউনিয়ন পরিষদের তরুন চেয়ারম্যান সৈয়দ সোহেল তার দূরদর্শী সিদ্ধান্তে চট্টানটির কিয়দংশ লোকালয়ের বাসিন্দাদের নির্মল চিত্তবিনোদনের ব্যবহারের ব্যবস্থা নেয়ার চিন্তাভাবনা করে কাজ শুরু করেন।
এতে অভূতপূর্ব সাড়া পাওয়া যায়। প্রতিদিনই নিকটবর্তী গ্রামগুলোর লোকজন ছাড়াও দূর-দূরান্ত থেকেও মানুষের সমাগম হতে থাকে। এ বিকল্প ব্যবস্থা নিয়মসিদ্ধ ভাবে চালু করতে হলে সরকারের বন বিভাগ, স্থানীয় সরকার মন্ত্রনালয়, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং উপজেলা এবং স্থানীয় পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ, রতনপুর সহ আশেপাশের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ ও জনপ্রতিনিধি, আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক সংগঠনের সংশ্লিষ্টতার নিশ্চয়তা থাকা প্রয়োজন। এভাবে গড়ে উঠতে পারে অংশগ্রহণমূলক একটি সমন্বিত শুদ্ধ সামাজিক চিত্ত বিনোদন ব্যবস্থা।
Posted ১:২১ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh