ড. আশরাফ উদ্দিন আহমেদ : | বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬
১৯৬৯-১৯৭০ সময়ে নবাবগঞ্জ উপজেলার কলাকোপা-বান্দুরা এলাকাটি দেখে আমার মনে যে মুগ্ধতার জন্ম নিয়েছিল তা এই আশি বছর বয়সে আজো সমুজ্জ্বল। সময়টি ছিলো আমার জন্য নদী পাড়ের গ্রামে-গঞ্জে ঘুরে বেড়ানোর এক অত্যুজ্জল মোক্ষম সুযোগ। তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান পরিবার পরিকল্পনা সমিতির ক্লিনিক্যাল রিভার বোট ‘সুখী পরিবার’ প্রকল্পটির সুপারভাইজার হিসেবে অনধিক দু’বছর কিছু নির্দিষ্ট নদীপথ এলাকায় পরিবার পরিকল্পনা ও স্বাস্থ্য সেবা প্রদানের মহতি কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ হয়েছে। সাথে থাকতেন দু-তিনজন ডাক্তার (এ মুহূর্তে ডা. নূরজাহান-ডাক্তার তোফাজ্জল করিম, ডাক্তার আবুবকর, ডাক্তার নাসিমা-ডাক্তার মফিজ দম্পতি, আগরতলা মামলার অন্যতম আসামী অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার খুরশিদ এ ক’জনের নাম মনে পড়ছে)।
প্রাক্তণ আইজিপি আলমগীর কবীর, এডভোকেট শামসুল ইসলাম (বিএনপি আমলের মন্ত্রী, বিচারপতি নুরুল ইসলাম, রাজনীতিবিদ মোহাম্মদ সোলেমান প্রমুখের সুদক্ষ নেতৃত্বে রিভার বোট প্রকল্পটি একটি ব্যতিক্রম ধর্মী সেবামূলক জনপ্রিয় প্রতিষ্ঠান ছিলো। দু’তিনজন ডাক্তার, একজন ক্লিনিক্যাল সহকারী (প্রিয় সোলেমান), একজন দাই ছাড়াও প্রায় ছ’সাতজন মাঝি-মাল্লাসহ (সারেং, সুকানি, ইঞ্জিন রুম মাস্টার ইত্যাদি) সমন্বয়ে গঠিত টিমটির প্রশাসনিক দায়িত্বে ছিলাম আমি। কাজটি মোটেও সহজ ছিল না কারণ সন্ধ্যে বেলায় যখন পরিবার পরিকল্পনা উদ্ধুদ্ধকরণ শো পর্দায় দেখানো হতো তখন মোল্লা মৌলবাদী মানুষের সকল অশুভ প্রতিক্রিয়া আমাকেই মাইক হাতে নিয়ে মোকাবেলা করতে হতো । চ্যালেঞ্জিং এ কাজে আমি প্রচুর আনন্দ, আত্মপ্রত্যয় লাভ করেছি ।
উল্লেখিত জনবল, রসদপত্র (কমপক্ষে এক সপ্তাহ ভ্রমণের জন্য- মাসে তিন-চারটি ভ্রমণ) নিয়ে কর্মসূচী অনুযায়ী মেঘনার লৌহজংয়ের নীচ থেকে মুন্সীগঞ্জ, হয়ে কালীগঙ্গার দু পাড়ের গ্রামের ঘাট, জামসা হয়ে বাঁয়ে ইছামতী নদী ধরে সেবা দিতে দিতে এগোতাম। সে রকম এক যাত্রায় দেখা মেলে অনিন্দসুন্দর এক জনপদের যার নাম কলাকোপা-বান্দুরা। একটি গির্জা, মিশনারি স্কুল এবং একজন শেতাঙ্গ পাদ্রি এলাকাটিকে সুশিক্ষিত, পরিবেশবান্ধব এবং দারুণ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন জনপদে রূপান্তরিত করেছে। প্রায় ৫৫ বছর পূর্বের এ ছবির মতো গ্রাম আমার মনে গেঁথে গিয়েছিল একটি আদর্শ পরিবেশ বান্ধব জনপদ হিসেবে। আদর্শ হিসেবে রঘুনন্দনের উঁচু ভূমিতে নৈসর্গিক সুষমায় পরিবেষ্টিত আমার পিতৃভূমি রতনপুর-মাদারগডা-উত্তর নোয়াপাড়ার প্রায় দুই কিলোমিটার ব্যাপ্তির জনপদকে যদি তুলনা করি ৫৫ বছর পূর্বে দেখা কলাকোপা-বান্দুরার সাথে তখন মনে ব্যথা অনুভব করি। আমার এলাকাটিতে শিক্ষার হার সন্তোষজনক হলেও পরিবেশগত দিক থেকে অনেক পিছিয়ে আছে।
এলাকায় কমপক্ষে সাতটি মসজিদ আছে, অর্থাৎ সাত জন ইমাম সাহেব আছে কিন্তু পরিবেশ সচেতনায় অন্ধকার যুগে। ইসলাম পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতাকে ঈমানের অঙ্গ হিসেবে গণ্য করে। মাদারগডার মন:গ্রাহী মসজিদের সামনে, আশেপাশে অপরিষ্কার দূর্গন্ধময় নর্দমা কারো চোখে পড়ে বলে মনে হয়না। মসজিদের ইমাম সাহেবদের সুনেতৃত্বে পরিবেশের এহেন চিত্র ভিন্ন পথে যেতে পারে ঠিক যেমনটি আমি দেখেছি ৫৫ বছর আগে কলাকোপা-বান্দুরার ক্ষেত্রে। সম্প্রতি যুব সম্প্রদায় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যন, স্থানীয় কৃষিবিভাগ এবং এলাকার মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পরিবেশ উন্নয়ন, সুস্থ বিনোদন ও সামাজিক সাংস্কৃতিক অঙ্গনে প্রশংসনীয় কাজ শুরু করেছে। চলমান থাকলে, ইমাম, মুসল্লিদের যোগদানের মাধ্যমে এ লোকালয় শিক্ষায় অগ্রগামীতার সাথে সামঞ্জস্য রেখে পরিবেশ-বান্ধব আদর্শ এলাকা হতে পারবে অচিরেই।
Posted ২:২২ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh