আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু : | বৃহস্পতিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৪
আওয়ামী লীগের মূল ‘কায়েদ’(নেতা) ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দি। আওয়ামী ধর্মের অনুসারীরা তাহাকে ‘গণতন্ত্রের মানসপুত্র’ অভিহিত করিয়া থাকেন। তাহার গণতন্ত্রের ভিত্তি ছিল ‘বাহুবল’ অর্থ্যাৎ পেশি শক্তি। চল্লিশের দশকে ৭৩% হিন্দু অধ্যুষিত কলকাতায় দাপট বজায় রাখিতে যে গুণ্ডাপাণ্ডা লালন করা যে অপরিহার্য, এই জ্ঞানে সোহরাওয়ার্দি টনটনে ছিলেন। অতএব তিনি গুণ্ডা পুষিতেন। তাহার রাজনীতির মূলমন্ত্র ছিল হিন্দু বিদ্বেষ। তিনি ভারত ভাঙিয়া ‘লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’ এর জিহাদে বাঙালিদের মধ্যে সামনের কাতারে ছিলেন। কিন্তু অখণ্ড বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে তিনি ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট কলকাতায় হিন্দু নিধনে নেতৃত্ব দান করিয়া এখন পর্যন্ত কলকাতার হিন্দুদের কাছে ‘বাংলার কশাই’ হিসাবেই পরিচিত হইয়া আছেন। বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের অতি হিন্দু প্রীতি এবং হিন্দুদের অতি আওয়ামী ভক্তিতে যেহেতু আমি বিস্মিত। সেজন্য তাহাদেরকে আওয়ামী লীগের আদিপিতার কর্মকাণ্ডের কিছুটা স্মরণ করাইয়া দেওয়ার জন্য কয়েকটি পঙক্তি নিবেদন করিতেছি।
প্রবাদ আছে, ‘বীজগুণে ফসল’। ভালো বীজ বপন করার ব্যর্থতায় আওয়ামী লীগের ফসল কখনো ভালো হয় নাই। ‘কশাই’ অভিধা-সমৃদ্ধ একজন ব্যক্তির নিকট হইতে ভালো কিছু আশা করাও তাহার উম্মতের জন্য ঠিক হয় নাই। কিন্তু আল্লাহ যাহা চাহেন তাহাই করেন। আল্লাহ চাহেন নাই, অতএব লুত নবী তাহার পুত্রদের বিপথ থেকে সুপথে ফিরাইয়া আনিতে ব্যর্থ হইয়াছিলেন। ইহুদিরা বার বার মূসার মাধ্যমে তাহাদিগকে দেওয়া আল্লাহর আদেশ লংঘন করিয়াছে। আল্লাহ তাহাদিগকে অভিশপ্ত করিয়াছেন। আওয়ামী লীগ বার বার বাঙালি জাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করিয়াছে। তা সত্বেও আল্লাহ এই আশায় তাহাদিগকে বার বার পলায়নের সুযোগ করিয়া দিয়াছেন যে, তাহারা পলায়নকে আল্লাহ প্রদত্ত আসমানি শাস্তি হিসাবে বিবেচনা করিয়া সিরাতুল মুস্তাকিম অর্থ্যাৎ সরল সোজা পথে আসিবে। কিন্তু তাহারা আল্লাহর ইশারা বুঝিতে পারে না। রাতের নিদ্রা ত্যাগ করিয়া তাহাদের ২২ বছর ধরিয়া আদায় করা ৭০-৮০ রাকায়াত করিয়া তাহাজ্জুদ নামাজ আদায়ের ফজিলত আল্লাহ কেন প্রদান করিতেছেন না, এই ক্ষোভে তাহারা উল্টা আল্লাহর ওপরই বেজার।
যাহাই হোক, আল্লাহর কাজ আল্লাহ বুঝিবেন। আমি সোহরাওয়ার্দিতে ফিরিয়া আসি। ভারতীয় উপমহাদেশে খুব বেশি সংখ্যক ‘কশাই’ এর নাম জানা যায় না। তবে কয়েকটি নাম ইতিহাসে স্থায়ী আসন গাড়িয়া নিতে পাড়িয়াছে। তাহারা হইলেন: ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রেগিন্যাল্ড ডায়ার, যিনি জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকান্ড (১৯১৯) ঘটাইয়া ‘অমৃতসরের কশাই’; হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দি কলকাতায় (১৯৪৬) হিন্দু নিধনের নেতৃত্ব দিয়া ‘বাংলার কশাই’; জেনারেল টিক্কা খান বালুচদের হত্যা করিয়া ‘বেলুচিস্তানের কশাই’ (১৯৫৮) এবং বাঙালিদের হত্যা করিয়া ‘পূর্ব পাকিস্তানের কশাই’ (১৯৭১) এবং গুজরাটের মুসলমানদের নিধন করিয়া (২০০২) ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ‘গুজরাটের কশাই’।
উপরোক্ত কশাইদের মধ্যে আওয়ামী ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দির মৃত্যুর ছয় দশক পরও কলকাতায় ‘ফুলের মতো পবিত্র চরিত্রের’ অধিকারী এই ব্যক্তির ‘কশাইনামা’র চর্চা অব্যাহত রহিয়াছে। কলকাতা শহরে এই মৃত ব্যক্তির কুখ্যাতি এতটাই যে, কলকাতায় তাহার মামা স্যার হাসান শহীদ সোহরাওয়ার্দি, যিনি ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটির প্রথম মুসলিম ভাইস চ্যান্সেলর ছিলেন, তাহার নামে কলকাতার শহরের পার্ক সার্কাস এলাকায় একটি এভিনিউ রহিয়াছে। স্যার হাসান সোহরাওয়ার্দির অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ভারত বিভাগের ১৪ বছর আগে ১৯৩৩ সালে এভিনিউটির নামকরণ তার নামে করা হয়। বাঙালি যেহেতু ভারতজুড়েই সর্বাপেক্ষা বুদ্ধিমান হিসেবে খ্যাত এবং গোখলে বাবু বলিয়া গিয়াছেন, ‘বাংলা আজ যাহা ভাবিবে, অবশিষ্ট ভারত তাহা ভাবিবে একশ’ বছর পর।’
অতএব জয়দীপ মজুমদার নামে এক অতি বুদ্ধিমান বাঙালি সাংবাদিকের একটি নিবন্ধ ২০১৭ সালের ১৬ আগস্ট অর্থ্যাৎ ‘গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং ডে’তে ‘স্বরাজ’ নামে এক ডানপন্থী অনলাইন ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়। এর শিরোনাম ছিল: It’s A Crying Shame That, The Butcher Of Bengal Has A Road Named After Him In Kolkata (কি এক দুর্ভাগ্যজনক লজ্জা, ‘বাংলার কশাই’ এর নামে কলকাতায় একটি রাস্তার নামকরণ করা হয়েছে।) গণতন্ত্রের এই মহান ধ্বজাধারীর ১৯৪৬ সালের ১৬ থেকে ১৯ আগস্ট পর্যন্ত চার দিন ধরে কলকাতার হিন্দুদের নিধনে কি কি করিয়াছিলেন ৩,০০০ শব্দের এই নিবন্ধের কেন্দ্রীয় বক্তব্য ছিল: Huseyn Shaheed Suhrawardz engineered the killings, maiming, rape and molestation of tens of thousands of Hindus in Calcutta back in 1946. It is a shame, therefore, that a major thoroughfare in Kolkata is named after a criminal who was involved in such heinous crimes against humanity.” (হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দি ১৯৪৬ সালে কলকাতায় হাজার হাজার হিন্দুকে হত্যা, আহত, ধর্ষণ এবং শ্লীলতাহানির কারণ ঘটিয়েছিলেন। অতএব, একজন অপরাধী, যিনি এধরনের মানবতা বিরোধী অপরাধে জড়িত ছিলেন, তার নামে কলকাতার একটি প্রধান রাস্তার নামকরণ অত্যন্ত লজ্জার ব্যাপার।” নিবন্ধের শেষ প্যারায় ‘সোহরাওয়ার্দি এভিনিউয়ের নাম পরিবর্তনের দাবি জানিয়ে বলা হয়, “বাংলায় বীরের কোনো অভাব নেই এবং একজন অপরাধী, যিনি নগরীতে এত মৃত্যু ও ধ্বংস ঘটিয়েছে, তার পরিবর্তে বীরদের একজনকে সম্মানিত করার এখনই সময়।”
নগর কর্তৃপক্ষ বিষয়টি ব্যাখ্যা করে। কলকাতার রাস্তাসমূহের নামকরণের ইতিহাস বিষয়ক গ্রন্থ হইতে উদ্ধৃতি দেওয়া হয়। ‘স্বরাজ’ এর সাংবাদিক জয়দীপ মজুমদারের মূর্খতা নিয়েও পত্রপত্রিকায় বেশ লেখালেখি হয়। তাহাকে বিদ্রƒপ করা হয়। সকল সংবাদপত্র জয়দীপের নিবন্ধটিকে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলিলেও গণতন্ত্রের শিখণ্ডি সোহরাওয়ার্দিকে ‘বাংলার কশাই’ বলতে ভুল করে নাই। প্রতিটি সংবাদপত্রে তিনি ‘বুচার অফ বেঙ্গল’। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস এর শিরোনাম ছিল: Streetwise Kolkata: Suhrawardz Avenue no, not named after the Butcher Of Bengal.
২০২৩ সালের ১৬ আগস্ট সংখ্যা ‘ইন্ডিয়া টুডে’ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত বিহারের অবসরপ্রাপ্ত অ্যাকাউন্ট্যান্ট জেনারেল অমিতাভ ঘোষের নিবন্ধ ‘An eye-witness account of the Great Calcutta Killing of August 1946 এ ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে’ উপলক্ষে কলকাতায় হিন্দু নিধন সোহরাওয়ার্দির একক পরিকল্পনার ফল ছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে আরও বলা হয়, “সরকারি প্রশাসনকে পরিকল্পিতভাবে অপব্যবহার করার মাধ্যমে কলকাতার ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়। সোহরাওয়ার্দি প্রশাসনকে এমন নির্দেশ প্রদান করিয়াছিলেন বলিয়াও জানা যায় যে, “সশস্ত্র মুসলমানরা যদি শহরে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে তাহা হাইলে তাহাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইবে না।”
ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য তার “সোহরাওয়ার্দি এন্ড দ্য গ্রেট কিলিং : রিভিজিটিং দ্য এপিসোড এন্ড ইঁস কনসিকিয়েন্সেস” নিবন্ধেও একই ধারায় বলেছেন, বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে সোহরাওয়ার্দি দাঙ্গার আশঙ্কা দূর করার পরিবর্তে স্বয়ং দাঙ্গায় নেতৃত্ব প্রদান করেছেন পুলিশ কন্ট্রোল রুমে অবস্থান করে এবং পুলিশ কমিশনারকে নিষেধ করেছেন দাঙ্গা প্রতিরোধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে।
এর এক বছর পরই সোহরাওয়ার্দি তার পাকিস্তান হাসিল করেন। মুসলিম লীগ ত্যাগ করিয়া আওয়ামী লীগের গোড়াপত্তন করেন। তাহার আওয়ামী লীগ নেতারা ১৯৫৭ সালে পূর্ব বাংলা (পূর্ব পাকিস্তান) প্রাদেশিক পরিষদের ডেপুটি স্পিকার শাহেদ আলীকে চেয়ার নিক্ষেপ করিয়া হত্যা করে। তাহাদের মারামারি, কাটাকাটি কখনো সরকার ভাঙিয়া দেওয়া, গভর্নরের শাসন ও সামরিক শাসন জারির কারণ ঘটাইয়াছে। বিশেষ করিয়া তাহারা যখন সরকারে যায়, তখন তাহাদের নিচের জিনিস মাথায় উঠিয়া যায় এবং তাহারা উন্মাদের মতো আচরণ শুরু করে। এইবার তাহাদের উন্মাদনা বোধহয় বাড়াবাড়ির মাত্রাও ছাড়াইয়া গিয়াছিল। সেই জন্য ’৭৫ এর আগস্টের মতো ২০২৪ এর আগস্টেও তাহাদের পলায়ন করিতে হইয়াছে। পলায়ন করিবে বলিয়াই বোধহয় তাহারা পলায়ন না করিবার প্রতিশ্রুতি শতবার উচ্চারণ করে।
কিন্তু প্রত্যুষে নিদ্রা হইতে জাগ্রত হইয়া জায়নামাজ বিছাইয়া নামাজ আদায়ের পর যাহারা প্রতিদিন কোরআন তিলাওয়াত করে, তাহারা কি কোরআনের এই আয়াতটি বাদ দিয়া কোরআন পড়ে: “তোমরা এমন কথা বলো কেন, যা তোমরা করো না!” হে পরওয়ারদিগার, জনগণ তাহাদের পছন্দ করে না, তাহারাও জনগণকে পছন্দ করে না। কিন্তু তাহারা ফরজ, সুন্নত, ওয়াজিব এবং তাহাজ্জুদসহ সকল নফল নামাজ আদায় এবং অন্যান্য ইবাদত করিলেও তুমি তাহাদের ক্ষমতাচ্যুত করায় তাহাদের মনে যে অশান্তি বিরাজ করিতেছে, তা দূর করার জন্য তুমি তোমার বাণীটি তাহাদের কর্ণকুহরে তোমার গায়েবি ফুৎকারে প্রবিষ্ট করাইয়া দাও: “তুমি যাহাকে ইচ্ছা রাজত্ব দান কর এবং যাহার নিকট হাইতে ইচ্ছা রাজত্ব কাড়িয়া নাও, যাহাকে ইচ্ছা সম্মানিত করো এবং যাহাকে ইচ্ছা অপমানিত করো।”
Posted ১:০২ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৪
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh