আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু : | বৃহস্পতিবার, ১৯ ডিসেম্বর ২০২৪
আমার যেসব বন্ধু ও ঘনিষ্টজন ফেসবুকে বিচরণ করেন এবং যারা পত্রপত্রিকা পাঠ করেন, তারা ইতোমধ্যে জানেন যে গত ৩ মে ২০২৪, মোতাবেক ২২ শাওয়াল ১৪৪৫, মোতাবেক ১৮ বৈশাখ ১৪৩১ তারিখে আমার মৃত্যু হয়েছে। পৃথিবীর হিসাবে আমি সাত মাস তেরো দিন আগে ইহলোক ত্যাগ করেছি। আমার হায়াত ফুরিয়ে গিয়েছিল। পৃথিবীতে আমার প্রয়োজন শেষ হয়ে গিয়েছিল। অতএব, যিনি আমার সৃষ্টা, তিনি আমাকে তুলে নিয়েছেন। এটি তারই বিধান। আমাদের হিদায়াত ও সিরাতুল মুস্তাকিমে চলার নির্দেশনা দিতে তিনি নবী মুহাম্মদ সা. এর ওপর যে কোরআন নাজিল করেছেন, তাতে তিনি বলেছেন, “কুল্ল নাফসিন জায়িকাতুল মওত,” অর্থ্যাৎ প্রত্যেক জীবকে অবশ্যই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।’ আমি সেই স্বাদ গ্রহণ করেছি। পৃথিবীতে আমার ৭০ বছরের যাত্রাবিরতির পর মুনকার ও নকীর নামে দুই ফেরেশতা আমাকে কবরে জেরা করেছেন। এরপর তারা আমার নশ্বর দেহকে কবরে রেখে আমার আত্মাকে ‘আলম-ই-বারজাখ’ এ প্রেরণ করেছেন। আমার আত্মা এখন ‘আলম-ই-বারজাখ’ এ প্রতীক্ষা করছে ‘ইয়াওমুল কিয়ামাহ’ বা শেষ বিচারের দিনের। সেদিন আমার ‘পুনরুত্থান’ হবে এবং আমাকে আবার অবয়ব দেওয়া হবে।
আমার মৃত্যুর দিনের বর্ণনায় আমি ‘আলম-ই-বারজাখ’ সম্পর্কে সামান্য ধারণা দিয়েছিলাম। কিন্তু মনুষ্য চিত্ত সদাচঞ্চল। তাদের চিন্তার স্রোত পার্বত্য ঝরনার মতো দ্রুত সঞ্চরণশীল। কোথাও স্থির থাকে না। বিশেষ করে, মানুষ ইচ্ছা করেই মৃত্যুচিন্তা দূরে রাখতে চেষ্টা করে। জীবিত মানুষ সবসময় ভাবে, যারা মরেছে, মৃত্যু তাদেরকেই জড়িয়ে রাখুক। মৃত্যু তাকে ও তার প্রিয়জনদের স্পর্শ না করুক। অতএব, তারা আমার লেখায় কবরে ফেরেশতাদের জেরা এবং বারজাখ সম্পর্কে দেওয়া বর্ণনা ইতোমধ্যে বিস্মৃত হয়েছেন, এটাই স্বাভাবিক। সেজন্য একটু স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি যে, ‘আলম-ই-বারজাখ’ হচ্ছে ‘মৃত্যু এবং পুনরুত্থান’ এর মধ্যবর্তী সময়ে আত্মার আবাস। বিষয়টি আমার কাছেও রহস্যজনক ছিল। কিন্তু আমার আত্মা যেহেতু ইতোমধ্যে এখানে রয়েছে, অতএব জীবনকালের রহস্য তিরোহিত হয়েছে।
মাওলানা জালালুদ্দীন রুমি তার ‘মসনবী’তে ‘বারজাখ’ এ অবস্থান সম্পর্কে তার বিশ্বাস ব্যক্ত করেছেন এভাবে: “সর্বশক্তিমান আল্লাহ যদিও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, পুনরুত্থানের পর আমরা আমাদের কাজের পরিণতির মুখোমুখি হবো। কিন্তু তা সত্ত্বেও আমরা মৃত্যু ও পুনরুত্থানের মধ্যবর্তী সময়ে আমাদের পার্থিব জীবনকালের প্রতিটি মুহূর্তের প্রতিক্রিয়ার অভিজ্ঞতা লাভ করবো।”
মানব সভ্যতার সকল যুগে সর্বত্র কিছু জ্ঞানী মানুষের আবির্ভাব ঘটেছে, যারা দেহকে নয়, আত্মাকেই গুরুত্ব দিয়েছেন। তারা দেহের মৃত্যুর কথা এবং আত্মার অবিনশ্বরতার কথা বলেছেন। প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিস বলেছেন, “মৃত্যুতে দেহ পৃথিবীতে রয়ে যায়, কিন্তু আত্মার মৃত্যু নেই, আত্মা অপরিবর্তনীয় এবং অনন্ত। ইমাম গাজ্জালির একটি কবিতা পড়েছিলাম। আহা, কি চমৎকার কথা! ৭০টি বছর যাবত যে দেহকে ‘আমি’ ভেবে যত্ম করেছি সেটি ‘আমি’ নই। অস্বস্তি অনুভব করলে ‘আমাকে’ নিরাময় করতে কত ধরনের ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়েছি, আত্মা দেহ ছেড়ে গেলে সেই দেহ আর আমার নয়। ‘আমি’ মানে আমার আত্মা! গাজ্জালি কি বলেছেন, আমার পৃথিবীর বন্ধুদের জানা উচিত :
“তুমি কি ভাবছো, লাশটা আমি, যেটি কবর দেবে?
খোদার কসম, এই যে মরদেহ, সেটি আমি নই।
আমি তো আত্মার মাঝে এবং আমার এই দেহ
একসময় আমার আবাস ও আমার পোশাক ছিল।
আমি সম্পদের ভাণ্ডার, ধূলির তৈরি তাবিজের নীচে
আড়াল থাকলেও আমাকে যাতনা সইতে হয়েছে।
আমি এক মুক্তা, খোলস আমাকে বন্দি করেছিল,
কিন্তু খোলস ছাড়ার পর আমি এখন যন্ত্রণামুক্ত।
আমি এক পাখি, একসময় এটি আমার খাঁচা ছিল,
কিন্তু এটিকে নমুনা হিসেবে রেখে আমি উড়ে গেছি,
আমাকে মুক্ত করে আমাকে বেহেশতের উচ্চতায়
আবাস দান করায় আমি আল্লাহর প্রশংসা করি।
এখন আমি তোমাদের মাঝে একজন মৃত মানুষ,
কিন্তু আমি কাফন ছেড়ে জীবনে ফিরে এসেছি।”
পৃথিবী ছেড়ে অনন্ত জীবনে ফিরে আসা অথবা যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন, তিনি আমাকে পৃথিবী থেকে তুলে আনার এই পর্যায়টি সম্পর্কে জালালুদ্দীন রুমি আরও প্রত্যক্ষভাবে বলেছেন:
“আরও একবার পৃথিবীর অশুভ ফাঁদ থেকে
আমি শেকল ভেঙে মুক্ত হয়েছি।
আরও একবার আমি তোমার যৌবনের প্রেম
এবং এই প্রতারণাপূর্ণ জাদুর কবর থেকে
মুক্ত হয়েছি, যাকে আমরা জীবন বলি।
কোথাও না থেমে আমি দিনরাত দৌড়াতে দৌড়াতে
অবশেষে আমাকে মহাজাগতিক ধনুক থেকে
তীরের মতো মুক্ত হয়ে পৃথিবীর নিয়মরীতি ভেঙে
ভয়াবহ সময়সূচি থেকে বের হয়ে আসতে হয়েছে।”
আমার আত্মাকে ‘বারজাখ’ এ পাঠানোর পরও আত্মার অস্তিত্ব নিয়ে যা কিছু জানা ছিল, সব মনে পড়ছে। ধর্মে যেহেতু আমার কিছু মতিগতি ছিল, সেজন্য বারজাখের কাহিনি প্রথমে অতিরঞ্জিত মনে হলেও পরবর্তীতে মহাজাগতিক অস্তিত্বে কখনও সন্দেহ পোষণ করিনি। কোনোকিছুতে সন্দেহ পোষণ না করার মতো স্বাচ্ছন্দ আর কোনোকিছুতে নেই। এখন যেহেতু আমি দেহমুক্ত আত্মা, আমার জাগতিক লাভ-লোকসান কোনোকিছুর সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই, অতএব আমার মাঝে কোনো সংশয়, মোহ থাকাও উচিত নয়। তবে আমার যেহেতু এখনও আমার বিচার কার্য নিস্পন্ন হয়নি এবং বিচার না হওয়া অবধি আমাকে ‘বারজাখ’ এ প্রতীক্ষা করতে হবে, তাই এখানে রেখে যাওয়ার পর আমার আত্মায় এক ধরনের প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছিল যে, প্রতীক্ষাকাল কত দীর্ঘ অথবা কত হ্রস্ব? বারজাখ এর সময় পৃথিবীর সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। পৃথিবীর মতো এখানে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত নেই। ঘন্টা ও দিন এবং পৃথিবীর বর্ষপঞ্জির মতো কিছু নেই। বারজাখ এ এসবের প্রয়োজনই বা কি? পৃথিবীতে খাদ্য গ্রহণ থেকে সন্তান জন্মদান পর্যন্ত সবকিছু সময় অনুযায়ী চলে। এখানে ওইসবের বালাই নেই, সময় হিসাবের তাই প্রয়োজন পড়ে না।
তাছাড়া আমার আত্মার ‘বারজাখ’ এ আগমন যেহেতু মাত্র কিছুদিন আগেই হয়েছে, অতএব আত্মা এখনও অতো কিছু জানতে পারেনি। এখানে যেহেতু কোনোকিছুর আকৃতি নেই, অতএব জানার পৃথক কোনো উৎস আছে, এমনও নয়। একমাত্র আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সব রহস্য জানেন। এখানে আমার আত্মা কিছু অভিজ্ঞতা লাভ করছে, যা আমার পার্থিব জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। ‘বারজাখ’ সম্পর্কে আমি যা পড়েছিলাম, তা দুনিয়াতেই ভুলে গিয়েছিলাম। কোরআনে আছে: “যখন তাদের কারও কাছে মৃত্যু আসে, তখন সে বলে, ‘হে আমার পালনকর্তা! আমাকে পুনরায় (দুনিয়াতে ) প্রেরণ করুন, যাতে আমি সৎকর্ম করতে পারি, যা আমি করিনি।’ কখনও নয়, এ তো তার একটি কথার কথা। তাদের সামনে পর্দা আছে, যা থাকবে পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত,” (২৩:৯৯-১০০)।
আমার পক্ষে পৃথিবীতে ফিরে যাওয়ার আর কোনো উপায় নেই। উপায় থাকলেও আমি সম্ভবত যেতে আগ্রহী হতাম না। আমার মায়ের মৃত্যুর পরই পৃথিবীতে আর কোনোকিছুর প্রতি আমি মোহগ্রস্ত ছিলাম না। পৃথিবী তখনই আমার কাছে অতীতের অস্তিত্ব হয়ে গিয়েছিল। আমি উপলব্ধি করেছিলাম যে, আমি ‘একা’ হয়ে গেছি। গৌতম বুদ্ধের মাঝে যখন পার্থিব জগতের অসারতা মুখ্য হয়ে উঠে এবং তিনি নিজেকে সকল ধরনের যাতনার শিকারে পরিণত হতে দিয়ে অবশেষে নির্বাণ লাভ করেন। তিনি তার আলোকপ্রাপ্ত হওয়াকে বর্ণনা করেছেন তার ‘পুনর্জন্ম’ হিসেবে। কিন্তু আমি পুনর্জন্মের বিশ্বাস নিয়ে বেড়ে উঠিনি। আমি তার মতো সংসার ত্যাগ করে আধ্যাত্মিকতার পথ বেছে নিতে পারিনি। আমি খুবই সাধারণ মানুষ ছিলাম। আমার বড় কোনো স্বপ্নও ছিল না। মৃত্যুর পরও খুব আশা নিয়ে ‘বারজাখ’ এ বাস করছি না। এটাই আল্লাহর বিধান।
এ বিধানের ব্যত্যয় হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এখানে আমার দেহশূন্য আত্মার কোনো কাজ নেই। আত্মার ক্ষুধা নেই। আত্মা ইন্দ্রিয় নেই, ইন্দ্রিয়ের জান্তব তাড়নাও নেই। কোনো কারণে কোনো অনুশোচনা, কোনো আফসোসও নেই। একথা সত্য পৃথিবীতে আমি কোনো পূন্যাত্মা ছিলাম না, কিন্তু সাধ্যের মধ্যে মানুষের কল্যাণ করা ছাড়া জ্ঞাতসারে কারও ক্ষতি করিনি। সুফিরা বলেন, ‘আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টিই করেছেন তাকে দিয়ে ভুল করানোর জন্য।’ তিনি আদম-হাওয়াকে সৃষ্টি করে তাদেরকে ভুল করার সুযোগ দিয়েছিলেন এবং ভুলের অজুহাতে তিনি এই আদি মানব ও মানবীকে পৃথিবীতে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। সেই বিবেচনায় পৃথিবী পরীক্ষার স্থান।
যেহেতু আমি ফেরেশতা ছিলাম না। দোষগুণ মিলেই আমি একজন মানুষ ছিলাম; এবং যেহেতু জীবনের কোনো পর্যায়েই আমার হৃৎপিণ্ড বিদীর্ণ আবে জমজম দিয়ে পরিশুদ্ধ করা হয়নি, সেজন্য আমার দ্বারা কিছু ভুল, ছোটোখাটো কিছু পাপ হয়েও থাকতে পারে। আমি নিশ্চিত, সবই সগিরা বা ছোটো টাইপের গুনাহ, যা তওবা বা অনুশোচনায় মার্জনাযোগ্য। তবে, পৃথিবীতে আমার কর্মজীবনে আমাকে অপমানজনক পরিস্থিতিতিতে ফেলার জন্য একজন দায়ী ব্যক্তি, তার প্রতি আমি প্রচণ্ড ঘৃণা ও ক্ষোভ পুষে রেখেছি, যা এই ‘আলম-ই-বারজাখ’ আসার পরও আমার আত্মায় তরতাজা রয়েছে। পৃথিবীতে আমি তাকে দু’একটা চপেটাঘাত করে অপমান করতে পারতাম। কিন্তু আমি তা না করে ্আল্লাহর দৃষ্টিতে সৎ কাজ করেছি। আল্লাহর শাহী দরবারেই ওই লোকটির ব্যাপারে আমার ঘৃণা ও ক্ষোভপূর্ণ যে অভিযোগ দাখিল করা আছে, সে অভিযোগ আমি প্রত্যাহার করিনি। আল্লাহর ন্যায়বিচারের প্রতীক্ষা করছি।
তবে হ্যাঁ, আমার আত্মা কিয়ামতের দিনের আগমন পর্যন্ত পৃথিবীতে আমার কর্ম ও এর পরের ভাগ্য সম্পর্কে সচেতন। ‘বারজাখ’ এ যেহেতু ভালো মানুষের জন্য শান্তি ও অনুগ্রহের স্থান এবং মন্দের জন্য যন্ত্রণা ও নৈরাশ্যের স্থান, সেজন্য কিছু দুর্ভাবনা আমার আত্মায় উঁকিঝুঁকি মারলেও আমি নিশ্চিত বারজাখের পর্যায় আমার মন্দ কাটবে না। পৃথিবীর কোনো পরীক্ষা আমার উত্তীর্ণ হওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি এবং কবরে দুই ফেরেশতা মুনকার ও নকীর তাদের প্রশ্নের সঠিক উত্তর পেয়েছেন। অতএব আমাকে যদি বারজাখ এ কোনো পরীক্ষার মুখোমুখিও হতে হয়, তাহলে আমার জন্য সে পরীক্ষা খুব সহজ হবে।
একটি হাদিসে বারজাখকে বেহেশতের উদ্যান বলে বর্ণনা করা হয়েছে, ‘যেখানে আত্মাকে আনন্দে রাখার ব্যবস্থা করা হবে, যা কিয়ামতের দিন পর্যন্ত অব্যাহত রাখা হবে।’ আমি মুহাম্মদ সা. এর মোটামুটি ভালো অনুসারী হিসেবে তার বর্ণনা অনুযায়ী একজন বিশ্বাসী হিসেবে বেহেশতে আমার স্থান কোথায় হতে পারে ‘বারজাখ’ থেকেই আমাকে তা প্রদর্শন করানো হবে এবং আমার আত্মা বেহেশত থেকে ভেসে আসার সুবাসিত মৃদুমন্দ বায়ুর অভিজ্ঞতা ধন্য হবে। মন্দ আত্মাকে নি:সন্দেহে দোজখের গনগনে অগ্নিকুণ্ড প্রদর্শন ও তার পরিণতির অভিজ্ঞতার সম্মুখীণ করা হবে, যা নিয়ে আমার আগ্রহ নেই।
‘বারজাখ’ এ আমার আত্মা চারপাশের বিষয়গুলো সম্পর্কে বেশ সচেতন। আমার আবেগ, অনুভূতি আমি এখনও টের পাই। আমি আমার চারপাশে আরও আত্মার উপস্থিতি আঁচ করতে পারি। আমার মায়ের আত্মা, যে আত্মা আমাকে ছেড়ে পৃথিবী থেকে তেইশ বছর আগে থেকে বারজাখ এ আছে। তার আত্মা আমার আত্মার কাছে আসে। আমি তার উপস্থিতি টের পাই, কিন্তু আমার মায়ের আত্মা আমি জড়িয়ে ধরতে পারি না। কারণ আত্মার কোনো অবয়ব নেই। মায়ের আত্মা আমাকে বলে, ‘তেইশ বছর কেমন ছিলি, বাবা?’ বাইশ বছরের বিচ্ছিন্নতার কান্না একসাথে কাঁদতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু আত্মা কাঁদতে পারে না। আমি আমার আম্মাকে কেবল বলি, ‘এতগুলো বছর আমি যে শুধু সারাক্ষণ তোমার অনুপস্থিতির নিদারুণ কষ্ট অনুভব করেছি তা নয়, কষ্টের কথা কারও কাছে বলতে না পারার কষ্টও আরও দুর্বহ ছিল। আমি তোমার নেওটা ছিলাম বলেই হয়তো তোমার সব সন্তানের মধ্যে আমার আত্মাই সবার আগে তোমার কাছে এসেছে। তোমার আত্মার সান্নিধ্য আমার কষ্ট দূর করেছে। তুমি আশপাশেই থেকো, মা।’ আম্মার আত্মা আমাকে আশ্বাস দেয়, ‘হাশরের ময়দানের পর আমরা আবার মিলিত হবো।’ আমি স্বস্তি বোধ করি। আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে আমার আত্মা। আল্লাহর প্রতি আমার ঈমানের প্রাচীর আরও দৃঢ় হয় এবং তার প্রতি গভীর সম্পর্কের অনুভূতি সৃষ্টি হয়।
আমার আত্মাকে কিয়ামতের দিনে ইসরাফিলের শিঙার কর্ণবিদারি আওয়াজ শোনার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। যে আওয়াজে আমি আমার দৈহিক অবয়বে পুনরুত্থিত হয়ে হাশরের ময়দানে উপস্থিত হবো। যদিও আমার ধারণা সব মানুষকেই সেখানে হাজির করা হবে, কিন্তু কবি ইকবাল সংশয় প্রকাশ করেছেন যে পৃথিবীতেই যাদের আত্মা ছিল না, ইসরাফিলের শিঙার প্রচণ্ড শব্দও তাদের দেহে জীবন ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হবে না:
“বঙ-এ-ইসরাফিল উন কো জিন্দা কর সাকতি নেহি,
রুহ মে থা জিন্দেগি মে ভি তেহি জিন কা জাসাদ।”
(এমনকি ইসরাফিলের শিঙাও ওদের জীবন্ত করতে পারবে না,
যারা জীবিত থাকতেও তাদের দেহে কখনো আত্মা ছিল না।)
এ নিয়ে আমার আত্মার দুর্ভাবনা নেই। পৃথিবীতে আমার নশ্বর দেহ আত্মায় পুষ্ট ছিল। এখন ‘আলম-ই-বারজাখ’ এ অবস্থান করছে আমার পবিত্র আত্মা। আমি বেহেশতে প্রবেশের অপেক্ষা করছি।
Posted ১:৫৬ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ১৯ ডিসেম্বর ২০২৪
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh