শরমিলি শারমিন লাভলী : | বৃহস্পতিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫
সকালের আলোটা জানালার ফাঁক দিয়ে ঘরে ঢুকে আমার মুখে এসে পড়তেই হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল । ঘুম ভাঙতেই সকালটা অদ্ভুত ভারী লাগছিল আমার। রাতুল টা আজ কাল কেমন যেন হয়ে যাচ্ছে… ঠিক আগের মতো নেই। আজ আমাদের নবম এনিভার্সারি ছিল অথচ সে দিব্যি ভুলে বসে আছে। ঘুম থেকে উঠেই তাড়াহুড়া করে অফিসের ফাইল গুছিয়ে নিলো, নাস্তা সেরে নীরব মুখে দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল । আমাকে উইশ পর্যন্ত করলো না…এমন কি আমার দিকে একবার ফিরেও তাকালো না।আমি দরজার পাশে দাঁড়িয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। বুকের ভেতরটা যেন মোচড় দিয়ে উঠল। কী এমন ব্যস্ততা যে আজকের মতো দিনে একটি শুভেচ্ছাবাক্যও বলা হলো না?
রাইসা কে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে বাড়ি ফিরে আসার পরও সেই শূন্যতা থেকে মুক্তি পাচ্ছিলাম না কিছুতেই। রান্না ঘরের কাজ ফেলে দিয়ে চা বানালাম। কিন্তু কাপের ধোঁয়া ঠান্ডা হয়ে মিশে যাচ্ছিল নির্জনতায়। কাজে মন বসাতে পারছিলাম না । অগত্যা বিছানায় গা এলিয়ে দিলাম। জানালার ফাঁক দিয়ে মৃদু বাতাস বইছে… আকাশে আজ ঘনকালো মেঘ জমে ভরে গেছে। একটু পরেই হয়তো বৃষ্টি নামবে।
মনে পড়ে গেলো সেই প্রথম রাতের কথা।
আমাদের বিয়ে হয়েছিল অনেকটা তাড়াহুড়ো করে, পারিবারিক সিদ্ধান্তে। হবু বর রাতুলের সাথে আমার কথা হয়েছিল সর্বোচ্চ আধঘণ্টা। এতটুকু সময়ে একজন মানুষকে কতটুকু চেনা যায়?
অজানা পরিবেশে অচেনা রুমে কিছুটা ভয় আর শিহরণ নিয়ে কাচুমাচু হয়ে বসে ছিলাম খাটের এক কোণে।মনে মনে ভাবছিলাম , এখন থেকে এই মানুষটার সাথে সারাজীবন কাটাতে হবেৃ কেমন হবে জীবনটা?”
কিছুক্ষণ পর রাতুল ঘরে ঢুকল। তখনো আমি বিয়ের সাজে ছিলাম। হঠাৎ আঁতকে উঠেছিলাম ভেতরে ভেতরে। ও এগিয়ে এলো, তবে যথেষ্ট দূরত্ব রেখে শান্ত স্বরে বলল, “মিলা, আমি জানি তুমি ক্লান্ত। আমিও তাই। যাও, ফ্রেশ হয়ে এসো। তারপর দুজনে মিলে কিছুটা সময় গল্প করি।” একটানা বলতে শুরু করলো নিজের জীবনের গল্প। শৈশবের দুষ্টুমি, কৈশোরের স্বপ্ন, বন্ধুদের নিয়ে স্মৃতি, পরিবারের গল্পৃ সবকিছু। এত সহজ, সাবলীলভাবে ও যখন কথা বলছিল, আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনে যাচ্ছিলাম,একটিবারও মনে হয়নি আমি একেবারে নতুন মানুষের সাথে কথা বলছি।কিন্তু আজ? নয় বছর পর এই মানুষটা যেন অনেক দূরে চলে যাচ্ছে মনে হলো।
কলিংবেলের শব্দে সম্বিত ফেরে ‘আমার’। কখন যে চোখের কোণে নিজের অজান্তেই পানি জমেছে আজ! সেকি! চোখের লোনা পানিতে বালিশ ভিজে গেছে বেশ খানিকটা। তড়িঘড়ি করে চোখ মুছে দরজা খুলে দেখি, দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে আছে ‘রাতুল’। এক হাতে একগুচ্ছ লাল গোলাপ আরেক হাতে একটা কেক। আমি অপলক তাকিয়ে আছি… স্বপ্নের মতো ! রাতুল ঘরে ঢুকে ফুলের তোড়া আর কেক ডাইনিং টেবিলের উপর রেখে আমায় আলতো করে জড়িয়ে ধরে বলল,
— Happy anniversary, মিলা! মুখটা এতো ভার কেন? নিশ্চয়ই অভিমান করেছো আমার ওপর।”
আমি গলায় চাপা অভিমান মিশ্রিত কণ্ঠে বললাম-
-“অকারণে আমাকে এতটা কষ্ট না দিলেও পারতে!
রাতুল হেসে জবাব দিলো-
-“তাহলে ভেবে দেখো মিলা, গত এই নয় বছরে তুমি আমাকে কতবার কষ্ট দিয়েছো। আমিও তো তোমার মত অপেক্ষায় থাকতে পারি।
– আমি লজ্জা মিশ্রিত কন্ঠে মুচকি হেসে বললাম ,স্যরি !
রাতুল হঠাৎ গম্ভীর স্বরে বলল,
“শোনো মিলা, আজ একটু আগে ফিরব অফিস থেকে। তুমি রাইসাকে ওর নানুর বাসায় দিয়ে এসো। ঠিক পাঁচটায় রেডি হয়ে থাকবে। আমরা দুজনে বের হব। ফুচকা খাবো, রাস্তায় হাঁটবো, হয়তো বৃষ্টিতে ভিজবও.. তারপর ভিজে ভিজেই বাড়ি ফিরব।”
রাতে সবাই মিলে একসাথে কেক কাটবো।
তারপর একটু থেমে যোগ করল,
“আর হ্যাঁ, শাড়ি পড়তে ভুলোনা যেন। শাড়িতে তোমাকে ভীষণ সুন্দর লাগে।”
আমার মন ভরে উঠল অদ্ভুত এক প্রশান্তিতে। মাথা নেড়ে সম্মতি জানালাম।
কিন্তু তখনই আমার চোখে পড়লো—ফুলের ভেতরে গুঁজে রাখা একটি ছোট্ট কার্ড।আমি কার্ডটা টেনে বের করলাম । কার্ডে লেখাথ To Mili, with love – Ratul.
আমার শরীর শিউরে উঠলো।মিলা নয়, সেখানে লেখা মিলি! হঠাৎ বুকের ভেতর ঢেউ উঠলো ”মিলি কে?”
আমি ধীরে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলাম—- “রাতুল… এখানে নামটা ভুল লেখা কেন?”রাতুল চমকে উঠলো! মুখে জোর করে হাসি টেনে বললো-“দোকানদারের ভুল- এ নিয়ে এত ভাবছো কেন?”
এ কথা বলে রাতুল চলে গেল। কেকের ডিজাইন (বাকি অংশ ৩৬ পাতায়)
বিবাহ বার্ষিকী
দেখার জন্য কেকের বাক্স খুলে আমি অবাক হয়ে গেলাম…দেখলাম , সেখানে লেখা, Happy Anniversary Ratul & Milly
কার্ডের লেখা না হয় দোকানদারের ভুল কিন্তু কেক?
মনের মধ্যে সন্দেহের ঝড়। মাথার ভেতর ঘুরপাক খেতে লাগলো হাজারো প্রশ্ন। কে এই মিলি? কোনো অতীত? নাকি বর্তমানের কারো নাম?”প্রতিটি মুহূর্তে মনে হচ্ছিল, সত্যটা জানতেই হবে, নইলে শান্তি নেই আমার।বাইরে তখন ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি পড়ছে। অথচ আমার মনের ভেতরে ঝড়ের তাণ্ডব শুরু হয়ে গেছে।বুকের ভেতর জমে উঠলো তীব্র শীতলতা। মনে হলো—যে মানুষটাকে এতদিন নিঃশর্তে ভরসা করেছি, সে কি আসলে আমারই? নাকি কারও সঙ্গে ভাগাভাগি করা এক অজানা গল্প আছে ওর জীবনে? এজন্যই বোধহয় ওর চোখ দুটোতে যেন এক রহস্য এড়ানো দৃষ্টি ছিল তখন।
পাঁচটার আগেই রাতুল বাড়ি ফিরল। আমি রাগত স্বরে চিৎকার করে রাতুলকে জিজ্ঞেস করলাম, মিলিটা কে?নিশ্চয়ই তুমি আমার কাছে গোপন করছো কিছু।
রাতুল কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো।তারপর ধীরে ধীরে বললো,
— মিলা, তুমি কি ভুলে গেছো ? মা তোমাকে কখনো ‘মিলা’ বলে ডাকেনি।মা সবসময় স্নেহ করে তোমাকে ‘মিলি’ ডাকতো।বিয়ের তিন দিন পরই তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন।আজ ভেবেছি, আমাদের বার্ষিকীতে মায়ের সেই ডাকটাই আবার ফিরিয়ে আনি।হঠাৎই অনুভব করলাম—এই নামের ভেতরে কতটা ভালোবাসা, কতটা স্মৃতি লুকিয়ে আছে।
—তাহলে বুঝি আমি তোমার কাছে শুধু মিলা নই, আদরের মিলিও?রাতুল জড়িয়ে ধরে ফিসফিস করে বললো,
হ্যাঁ, তুমি আমার সবকিছু।
রাতুলের কথায় আমার চোখ ভিজে গেল ,বুকের ভেতরে জমে থাকা রাগ অভিমানের দেয়ালটাকে মুহূর্তে ভেঙে গেল। গভীর ভালোবাসার সুরে ও বললো—
ভালোবাসা আসলে কখনো ম্লান হয় না, শুধু নতুনভাবে খুঁজে নিতে হয়।তুমি কি জানো মিলা, আমি প্রতিদিন নতুন করে তোমার প্রেমে পড়ি। হয়তো আমরা ঝগড়া করি, অভিমান করি, কিন্তু দিন শেষে আমি চাই তুমি আমার পাশে থাকো। আজও তাই।
—রাতুল, আমি বুঝতে পারি তুমি এখনও আগের মতোই আছোৃ শুধু আমি-ই মাঝে মাঝে তা ভুলে যাই।
আমরা দুজন বৃষ্টি নামা শহরে বের হয়ে গেলাম,ভিজে ভিজে হাঁটলাম, ফুচকা খেলাম, বেশ ঘোরাঘুরি করে রাইসাকে নিয়ে বাসায় ফিরলাম।প্রতিটি মুহূর্তে মনে হলো, দীর্ঘ নয় বছর কেটে গেলো কিন্তু আমাদের ভালোবাসা আজও নতুনের মতো।বাইরে হালকা বৃষ্টি, ভিতরে অনন্ত আনন্দ।আমরা তিনজন মিলে কেক কাটলাম। আমার মনে হচ্ছিল, মা যেন দূরে কোথাও বসে হাসছেন।
“মিলা” আর “মিলি”—দুটো নাম মিলেমিশে আজকের দিনটাকে করে তুললো আরো স্মৃতিময়, আরও গভীর ভালোবাসাময়।
Posted ১১:২৫ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh