আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু : | বৃহস্পতিবার, ২১ আগস্ট ২০২৫
শেখ মুজিবুর রহমান এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সংগ্রামে তার ভূমিকা ও অবদানকে যদি কোনো ব্যক্তি-পক্ষ বিতর্কিত করে থাকে, সেজন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী তার কন্যা শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ। শেখ মুজিব কোনো অবতার, এমনকি মহামানব ছিলেন না। একজন মানুষ ও রাজনীতিবিদ হিসেবে তিনি মানবিক ভুলত্রুটি’ সমালোচনার ঊর্ধ্বে ছিলেন না। তিনি অজাতশত্রুও ছিলেন না। তার অপঘাত মৃত্যুই বড় প্রমাণ যে তিনি নিজেকে সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রের সব ক্ষমতার উৎস এবং জনগণের ভাগ্যবিধাতা বিবেচনা করে প্রচুর শত্রু সৃষ্টি করেছিলেন। বাড়াবাড়ি, দুঃশাসন, রাষ্ট্র পরিচালনায় অদক্ষতা সত্ত্বেও দাম্ভিকতার কারণে কাছের লোকজনেরও বিরাগভাজন হয়েছিলেন তিনি। তারাই তার হাত থেকে দেশ ও জনগণকে বাঁচাতে তাকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট যারা ঢাকায় ছিলেন ওই দিনটির সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে তারা দলে দলে রাস্তায় নেমে আসেন। হত্যার প্রতিবাদ জানাতে নয়, আনন্দ প্রকাশ করতে। এত বিশাল একজন রাজনৈতিক নেতা, ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ওই সময়ের রেসকোর্স ময়দানে তার ভাষণ শুনে যারা পাকিস্তানি দুঃশাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে উজ্জীবিত হয়েছিল, তার অনুপস্থিতিতে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছিল এবং পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি দেশে প্রত্যাবর্তন করলে তাকে যেভাবে বীরোচিত সংবর্ধনা দিয়ে বরণ করেছিল, তার প্রতি সেই শ্রদ্ধা-ভক্তি মাত্র সাড়ে তিন বছরের মধ্যে কতটা ঘৃণায় পর্যবসিত হলে তার হত্যাকাণ্ডকে আনন্দ উচ্ছ্বাসে উদযাপন করতে পারে সে দৃশ্য যারা দেখেননি তাদের কাছে তা হয়তো বিশ্বাসযোগ্য হবে না। তার অপশাসন, বিরুদ্ধবাদীদের নিপীড়ন গণতন্ত্র ও বাকস্বাধীনতা হরণকারী ‘বাকশালী’ স্বৈরশাসন চাপিয়ে দেওয়ায় তার বিরুদ্ধে পুঞ্জীভূত ঘৃণার বিস্ফোরণ ঘটেছিল। জনগণ তাদের একসময়ের পূজনীয় নেতার মৃত্যুতে শোকের অশ্রুপাত না করে নাজাত দিবস পালন করেছিল।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট নিজের জীবন বাঁচাতে শেখ হাসিনা ও তার প্রিয়ভাজনদের পলায়ন আওয়ামী লীগ নেতাদের প্রথম ও একমাত্র পলায়ন কাহিনি নয়। নিজেদের বিপদ আসন্ন দেখলেই তারা পালায় এবং যারা পালায় তারাই বাঁচে। শেখ মুজিবের মৃত্যু দিবসেও আওয়ামী লীগ এবং দলটির সব অঙ্গ-সংগঠনের নেতা-কর্মীরা পঁচাত্তরে ১৫ আগস্ট দলে দলে গা-ঢাকা দিয়েছিলেন। শেখ মুজিবকে তার যেসব রাজনৈতিক সঙ্গী সহ্য করতে পারেননি এবং তার জীবৎকালে মুখ পর্যন্ত খুলতে পারেননি ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়ির সিঁড়িতে গড়িয়ে পড়া শেখ মুজিবের রক্ত জমাট বাঁধার আগেই মুজিবমুক্ত বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট ও মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন।
তা সত্ত্বে ব্যক্তিগতভাবে শেখ মুজিব যত ভুলই করে থাকুন সেজন্য তাকে হত্যা করা, হত্যার ঘটনায় আনন্দ-উচ্ছ্বাস প্রকাশ করার মতো ঘটনাগুলোকে আমি স্বাভাবিক বিবেচনা করতে বা মানতে পারি না। যদিও একটি হাদিসে আছে যে- কোনো মৃত মুসলিমের প্রতি যদি নিন্দাসূচক মন্তব্য করে তার মৃত্যুতে স্বস্তির প্রকাশ হিসেবে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ উচ্চারণ করা হয়, তাহলে মৃতের জন্য জাহান্নাম ওয়াজিব হয়ে যায়। আর যার প্রতি প্রশংসাসূচক মন্তব্য করা হয়, সে মৃতের জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়ে যায়। (বুখারি ১৩৬৭)। যেহেতু শেখ মুজিবের নিন্দা ও প্রশংসা করার লোকজন এখনো রয়েছে সেজন্য তিনি জাহান্নামে বা জান্নাতে যাবেন সে সিদ্ধান্ত একান্তই মহান সৃষ্টিকর্তার।
যদিও শেখ মুজিবের দুঃশাসন ও রক্ষীবাহিনীর নজিরবিহীন অত্যাচার দেখার ও ভালোভাবে বোঝার মতো বয়স আমার হয়েছিল এবং পিঠ বাঁচিয়ে তার সমালোচনাও করেছি, তবুও তার মৃত্যুতে উচ্ছ্বসিত না হয়ে আমি স্বভাবসুলভভাবে ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ উচ্চারণ করেছি।
১৯৯৬ সালে প্রথমবার ক্ষমতায় গিয়ে স্বয়ং শেখ হাসিনা এবং তার দল আওয়ামী লীগ শেখ মুজিবকে যেভাবে মহামানবে পরিণত শুরু করেছিলেন, তার ষোলকলা পূর্ণ হয় ২০০৯ সালে দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় গিয়ে টানা সাড়ে পনেরো বছর ক্ষমতায় থেকে তার পিতাকে পূর্ণ দেবতার রূপ দিতে। শেখ মুজিবকে তিনি দেশবাসীর সব সমালোচনার ঊর্ধ্বে আরাধ্যের পাত্রে পরিণত করেন। মুহূর্তের জন্যও তিনি বিবেচনা করেননি যে, তার ফ্যাসিবাদী শাসনে জনগণকে অতিষ্ঠ করে তোলা ছাড়াও সব কাজে, সব কথায় কারণে-অকারণে প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে তার মরহুম পিতাকে টেনে এনে অর্থহীনভাবে মৃত পিতাকে গ্লোরিফাই বা মহিমান্বিত করার চেষ্টা চালিয়ে তিনি নিজের ও কবরবাসী পিতার সর্বনাশ করেছেন।
শেখ হাসিনা প্রতিনিয়ত দাবি করতেন যে, তিনি প্রতিদিন ফজরের নামাজ আদায়ের পর কোরআন তেলাওয়াত করতেন। কিন্তু দৃশ্যত নামাজ ও তেলাওয়াত তাকে হেদায়েতের পথে আনতে পারেনি। হেদায়েত দান করা একান্ত আল্লাহর ইচ্ছা। কোরআনে বলা হয়েছে- ‘আল্লাহ যাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্ট করেন এবং যাকে ইচ্ছা হেদায়েত দান করেন।’ (সুরা মুদ্দাসসির : ৩১)। আল্লাহ যেহেতু তাকে হেদায়েতের পথে আনতে পারেননি, আল্লাহর ইচ্ছায় জনগণ তাকে দেশ পরিচালনায় ব্যর্থ ও ক্ষতিকর বিবেচনা করে নিজেদের মৃত্যু ও রক্তক্ষয়ের মধ্য দিয়ে ক্ষমতার মসনদ থেকে তাকে পলায়নে বাধ্য করে। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট তার পিতার মৃত্যু-পরবর্তী আনন্দ-উচ্ছ্বাসের চেয়ে বহুগুণ বেশি উচ্ছ্বাসে ৫ আগস্ট উদযাপন করেছে।
শেখ হাসিনার জন্য আমার দুঃখ হয়। তিনি যদি পঁচাত্তরের আগস্টের হত্যাকাণ্ডের বিচার সম্পন্ন করে দোষীদের শাস্তি বিধান করার মধ্যেই তার প্রতিশোধস্পৃহা চরিতার্থ করা সীমিত রাখতেন তাহলে তার ভাগ্যে এতটা দুর্দশা না-ও আসতে পারত। কিন্তু শাসক হিসেবে শেখ হাসিনা আগ্রাসি হয়ে উঠেছিলেন। তিনি তার পিতৃহত্যার দায় চাপিয়েছেন সমগ্র জাতির ওপর এবং পিতার ঘাতকদের মতো জাতিকেও দুর্ভোগের শিকারে পরিণত করেছেন। পুরো বাংলাদেশকে তিনি প্রাচীরবিহীন এক কারাগারে রূপান্তরিত করেছিলেন। নামাজ ও কোরআন তাকে কোনো শিক্ষা দিতে না পারলেও তার পিতার মৃত্যু নিয়ে বিদগ্ধজনেরা কী লিখেছেন, সেগুলো পাঠ করলেও তিনি উপলব্ধি করতে পারতেন যে তার করণীয় কী হওয়া উচিত ছিল। আমি তাদের লেখা থেকে কিছু অংশ উদ্ধৃত করতে চাই।
শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর খ্যাতিমান সাংবাদিক এবং পরবর্তীতে রাষ্ট্রদূত ও মন্ত্রী এনায়েতুল্লাহ খানের একটি দীর্ঘ নিবন্ধ সাপ্তাহিক বিচিত্রায় প্রকাশিত হয়েছিল, যেটি পরে একাধিক গ্রন্থে স্থান পেয়েছে। “শেখ মুজিব : পুতুলনাচের ইতিকথা” শীর্ষক এক নিবন্ধে তিনি বলেন: “শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনীতি, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় তার অধিষ্ঠান এবং পরিশেষে ‘স্বর্গ হতে বিদায়’-এ অবশ্যম্ভাবিতারই বিয়োগান্ত আলেখ্য। শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড একদিকে নাটকীয়তায় চমকপ্রদ, অন্যদিকে দ্বৈততায় খণ্ডিত। অগণিত আত্মদান এবং এক ঝুড়ি রূপকথা মিলিয়ে তৈরি হয়েছিল তার স্বর্গের সিঁড়ি। ব্যক্তিত্বের অপরিমিত শৌর্য ও অনুকূল ইতিহাসের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছিল তার রাজকাহিনি। তিনি ছিলেন রূপকের রাজা।
সত্যিকারের মুকুটের ভার তাই তিনি বইতে পারেননি বরং মুকুটের ভারে তিনি ন্যুব্জ হয়েছেন। যারা প্রাণ দিল, অস্ত্র তুলে নিল, যারা দেশপ্রেমের সুমহান অঙ্গীকারের রক্ত দিয়ে মাতৃভূমির ঋণ শোধ করল, তাদেরই রক্ত-মাংস-হাড়ের বিনিময়ে তিনি গড়তে চেয়েছিলেন এক অলৌকিক ক্ষমতার দেউল। সেখানে দেবতা একক, কিন্তু পূজারি নেই। মানুষকে বাদ দিয়ে শুরু হলো বিগ্রহের রাজনীতির পুতুলের খেলা। পরদেশী পটুয়ার হাতে সৃষ্টি হলো পুতুলের রাজা শেখ মুজিবুর রহমান। কিন্তু ইতিহাস আরও বেশি নির্মম এবং তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ ১৫ আগস্ট। একঝাঁক আগ্নেয় সিসা লক্ষ কোটি মানুষের সীমাহীন রোষের আকস্মিক বিস্ফোরণের মতো নিপাত করল পুতুলের রাজত্ব।”
এনায়েতুল্লাহ খান আরও লিখেছেন : “ত্রিশ লক্ষ প্রাণ ও আকাক্সিক্ষত জাতীয় মুক্তির পরিবর্তে দেশবাসী পেল এক পুতুল সরকার এবং সংক্ষেপে এটাই হচ্ছে পুতুলনাচের ইতিকথা। শেখ মুজিবুর রহমান এই ইতিকথার নেপথ্য নায়ক।… তিনি ছিলেন দক্ষ নট। অভিনয়ের চাতুর্যে প্রতিটি নাটকীয় মুহূর্তে দর্শকবৃন্দের তুমুল করতালি কুড়িয়েছেন, বাগ্মিতার সম্মোহন ও বিভ্রমের মায়াজাল রচনা করেছেন। জাতীয় স্বাধীনতার মহানায়কের শিরোপা পরিধান করেছেন। কিন্তু বারবার মুক্তিকামী মানুষের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। সেখানেই তার ট্র্যাজেডি।
গণচেতনাকে পায়ে মাড়িয়ে, সার্বভৌমত্ব বিসর্জন দিয়ে শুরু হয়েছিল পরিকল্পনার দ্বিতীয় অধ্যায়। এরই ফলশ্রুতি একদল, একনেতা, একদেশ। শেখ মুজিবুর রহমান এ নাটকের নিরুপায় ক্রীড়নক। তিনি ছিলেন কিংবদন্তির নায়ক। তার রাজনীতির প্রক্রিয়া দ্বিচারণে অতুল্য। শেখ মুজিবুর রহমানের উত্থান এবং পতন এই ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে নিহিত ছিল। শেখ মুজিবুর রহমান জুডাসের সিংহ নন অথবা দেব বংশোদ্ভব কূলনায়ক নন। তিনি বাংলাদেশের সমাজ বিন্যাস ও পরিমণ্ডলে লালিত একজন নশ্বর মানুষ। গণতন্ত্র হরণ, নির্মম নিপীড়ন, কণ্ঠরোধ এবং হত্যা এ প্রক্রিয়ারই অন্যতম পর্যায়। শেখ মুজিবুর রহমানের তিন বছরের দুঃশাসন সহস্র জননীর বুক ভেঙে দিয়েছে, শত শত বীর দেশপ্রেমিকের রক্ত রঞ্জিত হয়েছে। দেশকে ভালোবাসতে গিয়েও তিনি দেশের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। জীবন দিয়ে তাকে সেই মূল্য শোধ করতে হয়েছে।” (তথ্যসূত্র : ফ্যাক্টস অ্যান্ড ডকুমেন্টস : বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড/অধ্যাপক আবু সাইয়িদ, চারুলিপি-জুলাই, ২০১০)।
শেখ মুজিবকে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী নেতৃত্ব মহিমান্বিত করার শতচেষ্টা করলেও ইতিহাস তার প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়। স্বয়ং তিনিও যে লুণ্ঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন সে সম্পর্কিত তথ্য পাওয়া যায়, প্রথমা প্রকাশিত ‘মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর কথোপকথন’ বইয়ে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী মঈদুল হাসানের স্মৃতিচারণমূলক অংশে। তিনি বলেছেন: “বাংলাদেশের দায়িত্ব থেকে ডি পি ধরকে ফেব্রুয়ারি (১৯৭২) মাসের প্রথম দিকেই শেখ মুজিবুর রহমানের জোরালো দাবির কারণে সরিয়ে নিয়েছিলেন ইন্দিরা গান্ধী (স্থলাভিষিক্ত করেছিলেন পি এন হাকসারকে)।
পি এন হাকসার ভেবেছিলেন নিশ্চয়ই ডি পি ধর এমন কিছু ভুল করেছেন, যার জন্য তাকে সরিয়ে দেওয়ার দাবি করা হয়েছে। তারপর ঢাকায় আসেন পি এন হাকসার। ঢাকায় এসে শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে অনেক বিষয়ে আলোচনার পর হাকসার বলেন, বাংলাদেশ সরকারের বেশ কয়েক কোটি টাকা- যতদূর মনে পড়ে ১৭ কোটি টাকা রয়েছে ভারতে। যে টাকাটা পূর্ব পাকিস্তান থেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
সেই টাকা বদলানো হয়েছিল ভারতীয় মুদ্রায়। সেই টাকা প্রবাসী সরকার কিছু খরচ করেছে, অবশিষ্ট টাকা রয়েছে ভারতীয় ব্যাংকে। তিনি তাকে বলেন, ‘ভারত সরকার এ টাকাটা ফেরত দিতে চায়। কিন্তু কীভাবে আমরা ফেরত পাঠাব। ব্যাংক ড্রাফট করে পাঠাব নাকি তোমরা জিনিসপত্র কিনবে- জিনিসপত্র কিনলে তার বিপরীতে আমরা ব্লক হিসেবে সেই টাকা দেব। তবে আমরা বৈদেশিক মুদ্রায় দিতে পারব না, ভারতীয় মুদ্রায় দেব।’
“তখন শেখ মুজিব বললেন, টাকাগুলো ট্রাকে করে পাঠিয়ে দিতে। বিস্মিত পি এন হাকসার শেখ মুজিবকে বললেন, ‘ট্রাকে করে টাকা কীভাবে দেব? আমাদের তো সরকারি হিসাব-পদ্ধতি আছে, ব্যাংকিং পদ্ধতি আছে।’
তারপর নাকি শেখ মুজিব বলেছিলেন, ‘সামনে আমার নির্বাচন, এই টাকা সেজন্য আমার দরকার হবে।’ পি এন হাকসার অত্যন্ত নিয়মতান্ত্রিক, ন্যায়নিষ্ঠ মানুষ ছিলেন। শেখ মুজিবুর রহমানের ওই কথায় তিনি খুবই আহত হয়েছিলেন। পরে হাকসার ভারতে ফিরে গিয়ে মিসেস গান্ধী ও তাঁর সহকর্মীদের এ কথা বলেন। ডি পি ধর, যিনি তখন ভারতের পরিকল্পনামন্ত্রী- আমাকে ১৯৭২ সালের জুন মাসে এ খবরটা দেন। ১৯৮১ সালে হাকসার নিজেও আমার কাছে এই ঘটনাটা নিশ্চিত করেন।”
আলোচিত বুদ্ধিজীবী ও লেখক আহমদ ছফা তার ‘শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য প্রবন্ধ’ গ্রন্থের এক প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন: “কী ছিলেন শেখ মুজিব- বীর? প্রতারক? অনমনীয় একগুঁয়ে, উচ্চাকাংখী, চরম ক্ষমতালোভী একজন একনায়ক? নাকি শেখ মুজিব ইতিহাসের সেসব ঘৃণিত ভিলেনের একজন, যারা জনগণকে মুক্তি এবং স্বাধীনতার নামে জাগায় বটে, কিন্তু সামনে যাওয়ার নাম করে পেছন দিকে চালনা করে। একটা সময় পর্যন্ত জনগণ ভিলেনদের কথা শোনে, তাদের নির্দেশ শিরোধার্য করে মেনে নেয়।
“কিন্তু যখন তারা বুঝতে পারে শয়তানের প্রলোভনে মুগ্ধ হয়ে ফুল-ফসলেঘেরা সবুজ উপকূলের আশায় পা বাড়িয়ে ভ্রান্ত স্বপ্নের ছলনায় ভ্রান্ত গন্তব্যে এসে উপনীত হয়েছে; তাদের আশা করার, বাসা করার, ভরসা করার কিছুই নেই; আছে শুধু পথচলার ক্লান্তি, অনিশ্চয়তার হতাশা এবং প্রখর মরুভূমিতে মরীচিকার নিত্যনতুন ছলনা, তখন তারা তাদের ভাগ্যকে ধিক্কার দেয়, অভিসম্পাতের বাণী উচ্চারণ করে সেই বহুরূপী সঙ-নেতার নামে, যার ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠা এবং উচ্চাকাক্সক্ষার পতাকাকে নিরীহ, শান্তিপ্রিয়, খেটে-খাওয়া জনগণ তাদের মুক্তিসনদ বলে ভুল করেছিল।
শেখ মুজিবও কি একজন তেমন মানুষ?”
১৫ আগস্ট পার হয়ে গেল। গত বছরের মতো এবারও মুজিবভক্তরা দিনটিকে তাদের প্রচলিত ধারায় ‘শোক দিবস’ হিসেবে পালন করতে পারেননি। তবে স্থিরচিত্র ও ভিডিওচিত্রে দেখেছি এখানে-সেখানে বিক্ষিপ্তভাবে জড়ো হওয়া শোকার্তদের। আশুরা উপলক্ষে ইমাম হোসাইন (রা.)-এর স্মরণে শিয়া সম্প্রদায়ভুক্তরা যেমন কালো বস্ত্র ধারণ করে, শেখ মুজিবের স্মরণে তারাও কালো জামা পরেছে। টুঙ্গিপাড়ায় তার মাজার ও ৩২ নম্বরের প্রতিকৃতিতে রাষ্ট্রীয় সম্মান জানানোর কর্মসূচি গতবারের মতো এবারও ছিল না। ইতিহাসে ‘যার যা প্রাপ্য তাকে তা দেওয়ার’ ধারাবাহিকতা বজায় রাখার পরিবর্তে ঘৃণা পুষে রাখার কারণ তৈরি করে গেছেন তারই কন্যা শেখ হাসিনা। মহিমান্বিত করার বাড়াবাড়ি করে তিনি তার পিতাকে ঘৃণার সমুদ্রে ডুবিয়ে দিয়েছেন।
এ প্রসঙ্গে খ্যাতিমান কবি ও প্রাবন্ধিক কাজী জহিরুল ইসলাম তার “কেন বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা যাবে না!” শীর্ষক প্রবন্ধে লিখেছেন- “তিনি অবৈধভাবে রাষ্ট্রক্ষমতায় দীর্ঘদিন থেকেছেন বঙ্গবন্ধুকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে। তার অবৈধ ক্ষমতার দেহে আঘাত করার জন্য দেশের ছাত্র-জনতা সেই ঢাল ভেঙে দিয়েছে। এটা ছাড়া তো গণমানুষের সামনে অন্য কোনো পথ খোলা ছিল না। যখন নির্বাচনের পথ বন্ধ, আলোচনার পথ বন্ধ, আঘাতই একমাত্র সমাধান। আর সেই আঘাত ঠেকানোর ঢাল যদি হয় বঙ্গবন্ধু সবার আগে তো সেই ঢালই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। ঠিক এই ঘটনাই ঘটেছে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে।”
কবি কাজী জহির আরও বলেছেন: “এ দেশে বঙ্গবন্ধুর কি কোনো অবদান নেই? এই প্রশ্ন অনেকেই করেন। হ্যাঁ, অবশ্যই বঙ্গবন্ধুর অবদান আছে। কিন্তু ঠিক এই মুহূর্তে, যখন বঙ্গবন্ধুই হয়ে উঠেছেন ফ্যাসিবাদী শক্তির প্রধান প্রতীক, তখন তার প্রতি ভালোবাসা বা শ্রদ্ধা প্রদর্শন দেশ গড়ার জটিল যাত্রাপথে এক বিরাট প্রতিবন্ধকতা হয়ে দেখা দেবে। এ মুহূর্তে তার প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা প্রদর্শন করার অর্থ হলো হাসিনার খুন, গুম, অবৈধ ক্ষমতার বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার যে পবিত্র বিপ্লব তাকে অসম্মান করা এবং ফ্যাসিবাদের প্রতি নমনীয় হওয়া।
যারা আবেগের জায়গা থেকে বঙ্গবন্ধুর প্রতি ভালোবাসা দেখাতে চান তাদের মনে রাখতে হবে- দেশের চেয়ে বঙ্গবন্ধু বড় নয়। ইতিহাস কাউকে মুছে দেয় না। এক দিন সময় আসবে যখন এ দেশের মানুষ বঙ্গবন্ধুর অবদান স্বীকার করবে, তাকে তার প্রাপ্য সম্মান দেবে। কিন্তু এ মুহূর্তে তার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন জাতির জন্য বিপজ্জনক। এখন তিনি যে ফ্যাসিবাদের সিম্বল হয়ে উঠেছেন, তা মাড়িয়েই এ জাতি বিনির্মাণ করছে নতুন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ।”
Posted ১০:৪৫ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২১ আগস্ট ২০২৫
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh