ড. আশরাফ উদ্দিন আহমেদ : | বৃহস্পতিবার, ১৩ নভেম্বর ২০২৫
দুই শত বছরেরও অধিক সময় যাবৎ সমবায় আন্দোলন ও ব্যবস্থা বিশ্বে টিকে আছে। বেশীরভাগ দেশে ঢিমেতাল অবস্থায় তবে সমবায় সমিতি সংগঠন হিসেবে প্রান্তিক অবস্থানে হলেও চালু রয়েছে । ইউরোপে শিল্প বিপ্লবের ফলশ্রুতিতে সামন্তবাদ সামাজিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় যে যুগান্তকারী পরিবর্তন সূচিত হয়েছিল তা শ্রমিক এবং কারিগর শ্রেণীকে মারাত্মকভাবে আর্থিক ও সামাজিক বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছিল।
সামাজিক পরিবর্তনের সেই যুগসন্ধিক্ষণে ১৮৪৪ খৃষ্টাব্দে রবার্ট ওয়েনের উদ্যোগে এবং সহায়তায় ইংল্যান্ডের রচডেলে ২৮জন তাঁতী ও কারিগর মাত্র ২৮ পাউন্ড মূলধন জোগাড় করে পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ভোগ্যপণ্য সমবায় সমিতি গঠন করেন । ১৮৪৯ সালে জার্মানির হেড রাইফেজেন সে দেশে কৃষকদের সংগঠিত করে কৃষি ঋণদান সমবায় সমিতি চালু করেন। সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে জার্মান বিচারক সুজ-টেলিজ শিল্পশ্রমিক ও কারখানার কারিগরদের সংগঠিত করে ক্ষুদ্র শিল্প ঋণ সমবায় সমিতি স্হাপন করেন । সমবায়ের আদর্শে ও ভাবধারায় অনুপ্রাণিত হয়ে ১৮৫০ সালে সুইডেনে কৃষি উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ সমবায়, ১৮৫১ সালে সুইজারল্যান্ডে কনজুমার্স সমবায় এবং ১৮৬৫ সালে ফিনল্যান্ডে কনজুমার্স , উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ সমবায় গঠিত হয় দেখুন, আশরাফ উদ্দিন আহমেদ, সমবায় আন্দোলন-একটি সংক্ষিপ্ত তাত্ত্বিক আলোচনা, সমবায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সমবায় দিবস ও সপ্তাহ উদযাপন কমিটি ৮৪, চট্টগ্রাম)।
উল্লেখিত ইউরোপীয় দেশগুলোর সমবায় ব্যবস্থা সফলকাম হয়ে এখনো জোরদার অবস্থায় ধনতন্ত্র ও গণতন্ত্রের সাথে সহাবস্থান করে টিকে আছে । আয়ারল্যান্ডে ও দুগ্ধ খামার এবং দুগ্ধজাত পণ্যের বিপণন সমবায় লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত এবং বাজার অর্থনীতির সোপান হিসেব স্বীকৃত।
একই অবস্থা সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি অধিভুক্ত দেশগুলোতেও। এ ক্ষেত্রে লেনিন ছিলেন পথিকৃৎ। নিরন্তর প্রশিক্ষণ ও সাংস্কৃতিক বিপ্লবের মাধ্যমে সকল, শ্রেণীর কৃষকদের সমবায়ে অন্তর্ভুক্ত করার কর্মসূচি গ্রহণের জোরালো পরামর্শ দেন। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে “সমবায়ের মাধ্যমে মধ্য কৃষকদের ব্যক্তি স্বার্থ আর সমাজতান্ত্রিক স্বার্থের সমন্বয় করা সম্ভব”। (দেখুন, নজরুল ইসলাম, ‘পুঁজিবাদের পর কী?, সমাজ অর্থনীতি ও রাষ্ট্র, সমাজ গবেষণা কেন্দ্র কর্তৃক প্রকাশিত সাময়িকী, পৃষ্ঠা ১০২)।
১৯০৪ সালে ভারতে গ্রামীণ ঋণদান সমিতি , ১৯০৫ সালে জাপানে কৃষি উৎপাদন, ঋণদান, বাজারজাত কনজুমার্স সমবায়, ১৯০৮ সালে আমেবিকায় ক্রেডিট ইউনিয়ন, সরবরাহ, বাজারজাত কনজুমার্স সমবায়ের সূচনা হয় । সমবায়ের যে আন্তর্জাতিক সংগঠন (আই,সি,আই) এর সদস্যসংখ্যা প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন।
সমবায় আন্দোলনের এই দীর্ঘ ইতিহাস পর্যালোচনায় যে সত্যটি নির্দ্ধিধায় উদ্ভাসিত হয় তা’হলো যে কোন সমাজ ব্যবস্থায়, সেটি ধনতন্ত্র, সমাজতন্ত্র বা মিশ্র অর্থনীতিতে সমবায় কাজ করে। রাশিয়ার যৌথ খামার, চীনে কম্যুন , ইসরাইলের খিব্বুজ, দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামুয়েল উনডন, বাংলাদেশে কুমিল্লা বা দ্বিস্তর বিশিষ্ট সমবায় এ প্রসংগে উল্লেখ করা যায় । যে কোন রাষ্ট্রীয় আদর্শ ও কাঠামোত সমবায় কার্যক্রম চলতে পারে, খাপ খাওয়াতে পারে একই সমান্তরালে সমন্বিত ভাবে। সমাজের কল্যাণে সমবায়কে ব্যবহার করা যায়। জাপানের মত উন্নত ধনী দেশেও আপৎ কালে সরকার এবং প্রাইভেট সংস্হা সমবায় সংগঠন থেকে ঋণ নেয় ।
এমন নজির আরও আছে । আমাদের দের দেশে সমবায় সমিতির ইতিহাস অনেক পুরনো হলেও শক্তিশালী সংগঠনের পর্যায়ে পৌঁছতে পারেনি । কুমিল্লা সমবায় যা জাতীয় ভাবে সত্তর দশকের শুরুতে আইআরডিপির (বিআরডিবি) মাধ্যমে কিছু পরিবর্তন সংস্কার করে সারা দেশে চালু করা হয়েছিল তা সুফল সাধনে অগ্রসর হওয়ার পথে এনজিওদের অসহযোগিতা এবং অসম প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে তেমন সুবিধে করতে পারেনি। আমলাতন্ত্র ও এক্ষেত্রে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। মাঝারি কৃষকের প্রতি অত্যধিক গুরুত্ব আরোপ করায় ক্ষুদ্র চাষীরা আরো কোনঠাসা হয়ে পড়ে। মহিলা সমবায় বেশ বেগবান হয়ে গ্রামীন মহিলাদের ক্ষমতায়ন ও অর্থকরী কাজে সংপৃক্ত করতে প্রশংসনীয় ভাবে সাফল্যের মুখ দেখে। পরিশেষে বলতে হয় সমবায় আদর্শের প্রতি প্রেমবোধ থাকলে, সদস্যভুক্তি যথাযথ হলে, নেতৃত্ব সৎ ও পরিশুদ্ধ হলে সমবায় ব্যবস্থার সাফল্য নিশ্চিত ।
লং আইল্যান্ড. নিউইয়র্ক । ১২ নভেম্বর ২০২৫ ।
Posted ১১:৪১ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ১৩ নভেম্বর ২০২৫
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh