ড. আশরাফ উদ্দিন আহমেদ : | বৃহস্পতিবার, ১২ ডিসেম্বর ২০২৪
সিরিয়ার উত্তর পূর্বাংশে জোরেশোরে যুদ্ধ চলেছে বড়জোর দশ দিন। যুক্তরাষ্ট্র,তুরস্ক,ইরান,রাশিয়া এ যুদ্ধে জড়িয়ে গেছে। বিগত দেড়-দু’মাসে সাউথ লেবানন, এমনকি খোদ বৈরুত নগরীতে আক্রমণ চালিয়ে ইসরায়েল হেজবুল্লাহ বাহিনীর প্রথম কাতারের অধিকাংশ নেতৃবৃন্দকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছে। হেজবুল্লাহ বাহিনীর আসাদের পক্ষ হয়ে ময়দানে নামার কোনো সম্ভাবনা বা উদ্যোগ দেখা যায়নি, যদিও হুমকি দিয়েছে সময়ে সময়ে। ইসরায়েল নিজের সীমান্ত, জনপদ এবং শহর-নগর রক্ষায় ব্যস্ত থাকায় বিদ্রোহীদের ক্ষমতা দখলের পড় গোলান হাইটসের বাফার জোন করায়ত্ত করে ফেলেছে বিনা আয়েসে। ইসরাইলের ইরান ভীতি,ইয়ামেনের হুতি গ্রুপ, হামাস দলের তৎপরতা অমূলক প্রমাণিত হয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধফ্রন্টে রাশিয়া উত্তর কোরিয়ার ১০ হাজারের ও বেশী সৈন্য সাথে নিয়ে যুদ্ধ করছে। সক্রিয় ভাবে আসাদের সাহায্যে আসতে পারছে না যদিও এক পর্যায়ে রাশিয়া সিরীয় সরকারের সাথে একযোগে আকাশ যুদ্ধে বিদ্রোহীদের আক্রমণ করেছিল। আমেরিকাও সিরিয়ায় নিজেদের সেনা ঘাটি সুরক্ষার নামে বিদ্রোহীদের অবস্থানে বিমান হামলা করেছে। ইরান সমর্থিত ইরাকি সামরিক যোদ্ধারাও সিরীয় সৈন্যদের সহায়তা করার জন্য যুদ্ধ ফ্রন্টে প্রবেশ করেছিল। ইদলিব,আলেল্লো, হামা, হোম শহরগুলোর একে একে ত্বরায় পতনের পর আসাদের সকল ভরসা লীন হয়ে যায়। আসাদ দামাস্কাস ছেড়ে পালিয়ে সপরিবারে মস্কোতে আশ্রয় নেন।
হাফেজ আল আসাদের পরবর্তীতে পশ্চিমা শিক্ষা দীক্ষায় শিক্ষিত চক্ষু চিকিৎসাবিদ বাশার আল-আসাদ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলে আশা করা হয়েছিল তিনি উদারপন্থী মনোভাব নিয়ে শাসন কাজ চালাবেন। বাস্তবে তা হয়নি। আসাদ একজন স্বেচ্ছাচারী, অত্যাচারী স্বৈরশাসক হিসেবে অচিরেই আসল স্বরূপ প্রকাশ করেন। দীর্ঘ ২৪ বছর তিনি একজন নিষ্ঠুর একনায়ক এবং আধিপত্যবাদের দৃষ্টান্ত হিসেবে সিরিয়া শাসন করেন। রাশিয়া,ইরান এবং হেজবুল্লাহ এই ত্রি-শক্তির নিরন্তর মদদে আসাদ ঠিকে ছিলেন। গোলান হাইটস ইসরাইলের জোর-জবরদস্তি দখল থেকে ফিরিয়ে আনবেন এ প্রতিজ্ঞা ক্ষমতায় আরোহণ করেই প্রচার করলেও বাস্তবে তৃণ পরিমাণ ভূমি ও ইসরাইলের দখল থেকে ফেরত আনতে তো পারেনইনি পরুন্ত ইসরায়েলের ভয়ে রাশিয়া, ইরান এবং হিজবুল্লাহ দলটিকে নিত্য তোয়াজ করতেন।
আভ্যন্তরীণ শাসন ব্যবস্থা পরিচালনায় আসাদ দারুণ কর্তৃত্ববাদী ছিলেন। ইসলামী ষ্টেটের ছোট্ট একটি গ্রুপ খুবই অল্প দিনের মধ্যে সিরিয়ার বড় তিনটি শহর দখল করে ঐতিহাসিক দামেশক নগরীকে দু’দিক থেকে ঘেরাও করলে আসাদের রাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনী তেমন কোন প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিতে পারেনি। বলতে গেলে বিনা প্রতিবন্ধকতায় রাজধানী দামাস্কাসের পতন ঘটে। মিত্রদের বাগাড়ম্বরই সার ছিল। কেউই তেমন ভাবে এগিয়ে আসেনি। শিয়া এবং সুন্নী মুসলমানদের এ সীমিত লড়াইয়ের মহড়া বিশ্ব উপভোগ করছে। রাশিয়া এখন ইউক্রেন আক্রমণ নিয়ে পুরোপুরি মনোনিবেশ করতে পারবে। বেকায়দায় পড়বে লেবানন এবং ইসরাইল। ইরান এবং হিজবুল্লাহ লেবাননে বড় ধরনের সমস্যা সৃষ্টি করবে। এ কাজে ইসরাইল এবং তার মিত্ররা বাঁধা দেবে। আমেরিকা বলেছে সিরিয়া থেকে ঘাটি সরাবে না। প্রিয় নগরী বৈরুত সত্তরের গৃহযুদ্ধ, প্যালেস্টাইনই উদ্ধাস্তু এবং সিরিয়ান বাহিনীর হাতে সত্তর সাল থেকে যেমন নিগৃহীত হয়েছিল দীর্ঘ এক যুগ, এসময়ে আরও বেশী ধ্বংসযজ্ঞের শিকার হবে নিশ্চিত। ইসরাইল নির্বিচারে হিজবুল্লাহ এবং নিরীহ লেবানিজদের হত্যা করবে।
জনমানুষের স্থানান্তর, দুর্ভিক্ষ, অপুষ্টি, রোগবালাই নিত্যই দুর্ভাগ্য নিয়ে আসবে বিস্তীর্ণ এ অঞ্চলের মানুষের জন্য। যুদ্ধাস্ত্র বিক্রেতা রাষ্ট্রগুলো দারুণ লাভবান হবে। যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যেই পঞ্চাশ বারের ও বেশী তাদের আধুনিক যুদ্ধবিমান ব্যবহার করে আইএসআইএস এর ঘাটিগুলোর ওপর বোমাবর্ষণ করেছে। দোসর ইসরায়েল গোলান হাইটসের বাফার জোন দখল করে নিয়েছে। এ দুটি দেশ এবং তাদের মিত্রদের পণ হচ্ছে আই আই এস এস যাতে সিরিয়ায় মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে;যে কোন উপায়ে ইসলামী রাষ্ট্রের পুনরুথান প্রচেষ্টা রুদ্ধ করে দিয়ে ইসরায়েলকে আরব রাষ্ট্রগুলোর ওপর হম্বিতম্বি করার সুযোগ করে দেওয়া। যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যদিও বলেছেন সিরিয়া আমেরিকার ব্যাপার নয়, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি অন্য বাস্তবতার ধারক ও বাহক।
ডিসেম্বর ০৯, ম্যানহাসেট হিলস
নিউইয়র্ক
Posted ২:১১ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ১২ ডিসেম্বর ২০২৪
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh