আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু | শুক্রবার, ২৬ জুলাই ২০২৪
কোটা সংস্কারের পক্ষে আন্দোলনকারী ছাত্রদের ইঙ্গিত করে মাত্র দেড় সপ্তাহ আগে সুপ্রীম কোর্টের প্রধান হাকিম বলেছিলেন, “রাস্তায় শ্লোগান দিয়ে আদালতের রায় বদলানো যায় না।” শেষ পর্যন্ত রাস্তার শ্লোগানেই রায় বদলে গেল। এর আগেও উচ্চ আদালত রাস্তার শ্লোগানে রায় পরিবর্তন করেছে। স্বল্পদর্শীরা এসব ইতিহাস ইচ্ছা করেই ভুলে যায়। বিচার বিভাগ যে কতটুকু স্বাধীন, তার প্রমাণ পাওয়া গেছে সুপ্রীম কোর্টের এব প্রধান হাকিম এস,কে সিনহার জীবন নিয়ে পলায়নের মধ্য দিয়ে।। “য: পলায়তি স: জীবতি” – যে পালায় সে বাঁচে। আহা বেচারা সিনহা! হয় হুকুম মানো, তা না হলে সিনহা হওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকো। অতএব হাকিম সাহেবরা হুকুম পাওয়ার অপেক্ষা করেন। তবে হুকুমটা নিহতের সংখ্যা দু’শোর কাছাকাছি ঘটানোর আগে আসলে ভালো হতো।
এতো শিক্ষার্থী নিহত হলো কেন? ছাত্র আন্দোলন ঠেকাতে আর্মার্ড পারসোনেল ক্যারিয়ার, হেলিকপ্টার ব্যবহার, ছাত্র আন্দোলন দমাতে কারফিউ, ‘শ্যুট অ্যাট সাইট’ অর্ডার! এর যৌক্তিকতা কতটুকু ? কবে থেকে এবং কেন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেল? ছাত্ররা বিক্ষোভ প্রদর্শন শুরু করেছে গত ৫ জুন হাইকোর্টে কোটা বাতিলের রায় ঘোষণার পরদিন থেকে। ১০ জুলাই আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায়ের ওপর স্থিতাবস্থা দেয়। ১৪ জুলাই প্রধানমন্ত্রী তার সাংবাদিক সম্মেলনে আন্দোলনকারীদের কটাক্ষ করে যে কথা বলেন, তা বিক্ষোভ পরিস্থিতিকে বেসামাল করে ফেলে। তারা যে শ্লোগানগুলো দেয়, সেগুলো কি তাদের প্রতি সরকার প্রধানের কটাক্ষের কারণেই ছিল না? বিক্ষোভ শুরু করার পর এক মাস ৪ দিন পর্যন্ত তো তারা অমন শ্লোগান দেয়নি। প্রধানমন্ত্রীর ভক্তবৃন্দ জোর গলায় বলছেন যে, “প্রধানমন্ত্রী কখনোই বলেননি যে, আন্দোলনকারীরা ‘রাজাকারের নাতিপুতি’।” দালালিরও তো একটা লিমিট থাকে। রবি বাবু কি আর সাধে বলেছেন: “বাবু যত বলে পারিষদ-দলে বলে তার শতগুণ।”
গান্ধীজি যেমন তাঁর শেষ নি:শ্বাস ত্যাগের আগে উচ্চারণ করেছিলেন, “হে রাম!” সুবিধাভোগী পারিষদ-দলের তোষামোদি দেখে আমার বলতে ইচ্ছা করে “ধরণী দ্বিধা হও।” বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা তো দুদু খায়। প্রধানমন্ত্রী কি বলেছেন বা বলতে চেয়েছেন, তা বোঝার মতো বয়স ওদের হয়নি। অমন মারফতি কথার ভেদ বোঝার মেধা তো ওদের একেবারেই নেই। প্রধান হাকিম বলছেন, ওরা কোমলমতি, আইনমন্ত্রীও বলছেন, ওরা কোমলমতি। স্বয়ং ইবলিসও এসব লোককে দেখতে পেলে দৌড়ে গিয়ে তাদের হস্তচুম্বন করে তার শয়তানি দায়িত্ব থেকে অবসর নেবে।
বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদের বয়স, পরিপক্কতা ও মেধা তো ছিল কেবল ১৯৫২, ১৯৬৮ ও ১৯৬৯ সালে। ওই সময়ের ছাত্র আন্দোলনকারীদের ভূমিকার কথা বলতে এই পন্ডিতদের মুখে ফেনা বের হয়। তখন ছাত্ররা ছিলেন বিপ্লবী, তারা ঐতিহাসিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দান করেছেন এবং জাতিকে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। আর এখন অধিকারের আন্দোলন করতে রাস্তায় নেমে ওরা দুদু পান করা “কোমলমতি” হয়ে গেল! প্রধানমন্ত্রী কি বলেছেন কোনো বিশ্ববিদ্যালয় যদি ছাত্রদের তা বোঝানোর মতো যোগ্যতা সৃষ্টি না করতে পারে, তাহলে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বন্ধ করে দেওয়া উচিত।
আন্দোলনের ধারাক্রম (সূত্র : বিবিসি):
৫ জুন: কোটা বাতিলের সিদ্ধান্ত অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের রায়।
৬ জুন: কোটা বাতিল করে আদালতের রায়ের প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ।
৯ জুন: হাইকোর্টের রায় স্থগিত চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদন।
১ জুলাই: শিক্ষার্থীদের ব্যাপক আন্দোলন শুরু।
৭ জুলাই: সারাদেশে ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচী।
৯ জুলাই: আন্দোলনকারীদের সাথে ছাত্রলীগের সংঘাত।
১০ জুলাই: সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের চার সপ্তাহের স্থিতাবস্থা।
১৪ জুলাই: এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এক বক্তব্যের জের ধরে রাতে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ
১৫ জুলাই: আন্দোলনকারীদের সঙ্গে ছাত্রলীগের সংঘাত
১৬ জুলাই: সড়ক অবরোধ, সারাদেশে ব্যাপক সহিংসতা, ছয়জন নিহত
১৭ জুলাই: পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে তীব্র সংঘর্ষ, জাতির উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ। আদালতের রায় আসা পর্যন্ত ধৈর্য্য ধারণের আহ্বান।
১৮ জুলাই: বিটিভি ভবনে অগ্নি সংযোগ। মেরুল বাড্ডায় পুলিশ অবরুদ্ধ, পরে হেলিকপ্টারে উদ্ধার।
পুলিশের সাথে বিক্ষোভকারীদের দফায় দফায় সংঘাত সংঘর্ষে শিক্ষার্থীসহ বিক্ষোভকারী হতাহত। ৫৬ শতাংশের পরিবর্তে ২০ শতাংশ কোটার প্রস্তাব আওয়ামী লীগের। আলোচনায় বসতে সরকার রাজী বলে জানান আইনমন্ত্রী। আলোচনার প্রস্তাব নাকচ আন্দোলনকারী। ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ।
সারা দেশে ব্যাপক সংর্ঘর্ষে অন্তত ২৫ জন নিহত।
১৯ জুলাই: ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক সংঘর্ষ, পরিস্থিতি থমথমে। মেট্রোরেল স্টেশন, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের টোল প্লাজা, মিরপুর ইনডোর স্টেডিয়ামসহ বিভিন্ন সরকারি স্থাপনায় ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ।রাত ১২টা থেকে কারফিউ জারি। সারা দেশে সংঘর্ষে অন্তত ৫৬ জন নিহত।
২০ জুলাই: কারফিউ এর মধ্যেও বিভিন্ন স্থানে সংঘাত। বিক্ষোভকারী হতাহত। আইনমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী ও তথ্য প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে কোটা সংস্কার আন্দোলনের তিন সমন্বয়কারীর বৈঠক। আট দফা দাবি পেশ।
শনিবার সহিংসতায় ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে ২৬ জন নিহত।
২১ জুলাই: কারফিউ অব্যাহত, সাধারণ ছুটি। আপিল বিভাগের শুনানি, কোটা পুনর্বহাল নিয়ে হাইকোর্টের রায় বাতিল। ৯৩ শতাংশ মেধা কোট, ৫ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা, ১ শতাংশ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী, ১ শতাংশ প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের জন্য কোটা নির্ধারণের আদেশ।
Posted ১২:১০ পূর্বাহ্ণ | শুক্রবার, ২৬ জুলাই ২০২৪
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh