আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু : | বৃহস্পতিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৪
তোমরা আমাকে হত্যা করলে কেন? আমি তো মৃতই ছিলাম। কেবল প্রতীক্ষা ছিল, কখন আমার আত্মা দেহ থেকে বের হয়ে আমাকে মুক্তি দেবে। তোমরা তোমরা তো জানতে না, আমি কেন তোমাদের কাছে গিয়েছিলাম! সেই জ্ঞান তোমাদের হয়নি। আমার নি:সঙ্গ জীবনে খানিক সঙ্গ লাভের স্বাদ নিতে, তোমাদের সান্নিধ্য পেতে। পৃথিবীতে আমার কেউ ছিল না। বহুদিন আগে আমার বাবা মারা গেছেন। এর কয়েক বছর পর মা আমাকে ছেড়ে গেছেন। একটি মাত্র ভাই ছিল, গতবছর তিনিও মারা গেছেন। আমাকে সান্তনা দেয়ার মতো, আমাকে আশ্রয় দেয়ার মতো এ পৃথিবীতে কেউ ছিল না। একাকীত্ব আমাকে অস্থির করে ফেলেছিল। লোকজন আমার কথা, আমার আচরণে অসঙ্গতি খুঁজে পেত। আমার আড়ালে পাগল আমাকে বলতো। আমার একটি মেয়ে বন্ধু ছিল। ওকে গভীর ভালোবাসতাম। আমরা কমিটেড ছিলাম। আমার মাঝে পাগলামির ভাব দেখে সে আমাকে ছেড়ে গেছে। ওর কি দোষ? কোন্ মেয়ে মানসিক ভারসাম্যহীন একটি তরুণকে নিয়ে ভবিষ্যৎ গড়ার কথা ভাববে? এরপর থেকে আমি আমাকে নিয়েই ছিলাম।
আমাকে হত্যা করার প্রয়োজন ছিল না। আমি মরে যাওয়ার জন্যই বেঁচে ছিলাম। তোমরা যে আমাকে তোমরা পিটিয়ে মেরেছো, এটা একটা উপলক্ষ মাত্র। তোমরা যেভাবে আমাকে পিটিয়েছো, আগুনের ছ্যাকা দিয়েছো, আমি চিৎকার করিনি। আমার জীবন বাঁচানোর জন্য কাতর কণ্ঠে নিবেদন করিনি। হাতের আঙুল লাঠি দিয়ে, পায়ে পিষে ছেঁচে ফেলেছো। ্আমি যন্ত্রণায় মুখ বিকৃত করিনি। আমার মৃত্যু নিশ্চিত করে তোমরা আমার মৃতদেহ ঘিরে দাঁড়িয়ে-বসে ছিলে। তখনও আমার হাত দুটি মোনাজাতের ভঙ্গিতে আকাশমুখী ছিল। আমার প্রাণহীন অসার দেহ আল্লাহর কাছে মোনাজাত করছিল তাঁর শাহী দরবারে আশ্রয় দেওয়ার উদ্দেশ্যে আমার আত্মাকে যে মুক্ত করেছেন, সেজন্য তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে এবং তোমাদের ধন্যবাদ জানাতে। আল্লাহ এ কাজটি অন্য যেকোনো উপায়ে আমাকে মৃতদের মধ্যে শামিল করতে পারতেন। আমার ঘুমের মধ্যে, অথবা যখন রাস্তা পার হতাম তখন আমার ওপর একটি গাড়ি চাপিয়ে দিয়ে, বা বরগুনা থেকে যখন ঢাকায় আসতাম বা ঢাকা থেকে ফিরে যেতাম, তখন নদীতে লঞ্চ ডুবিয়ে।
কিন্তু জাহেরি ও বাতেনি জ্ঞানের আধার সৃষ্টিকর্তা তোমাদের মাধ্যমে আমাকে হত্যা করিয়েছেন। কারণ তিনি চেয়েছেন, মানব সমাজে শৃংখলা বিধানের জন্য মানুষের তৈরি আইনে আমাকে হত্যা করার অপরাধে যাতে তোমাদের উপযুক্ত শাস্তি প্রদান করা হয়। তা না করা হলে তোমরা যে অপরাধটি করেছো, তার পুনরাবৃত্তি ঘটতেই থাকবে। যদিও পৃথিবীর আদালতের দণ্ডই চূড়ান্ত শাস্তি নয়, কিয়ামতে তিনি যখন তোমাদের কাজের হিসাব নেবেন, আমার সাক্ষ্য চাওয়া হলে, আমি তাঁর আরশের সামনে অবনত হয়ে তোমাদের পক্ষে বলবো যে, তোমরাই আমার আত্মাকে আমার দেহ থেকে মুক্ত করতে সহায়তা করেছো। তা না হলে পৃথিবীতে আমাকে আরও জুলুম-নিপীড়ন ভোগ করতে হতে পারতো। এরপর সিদ্ধান্ত গ্রহণের এখতিয়ার তাঁর।
তবুও আমার আত্মা একটি প্রশ্ন নিয়ে নশ্বর পৃথিবী ছেড়েছে: তোমরা সবাই মিলে আমাকে হত্যা করলে কেন? তোমরা সবাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ের মেধাবী ছাত্র। কিন্তু সবাই বয়সে ও শিক্ষায় আমার জুনিয়র। আমি বেশ ক’বছর আগে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অনার্স ও মাষ্টার্স করেছি। আমি আইন শাস্ত্রে পড়াশোনা করছিলাম। কিন্তু কিছুই হলো না। আমার কেউ ছিল না। আমি অসহায় ছিলাম। আমার খাওয়ার সংস্থান পর্যন্ত ছিল না। ক্ষুধার বোধও যে তেমন হতো, তাও না। ক্ষুধা জন্ম থেকে আচরিত একটি অভ্যাস মাত্র। তোমরা নিশ্চয়ই আত্মা সম্পর্কে জানার সুযোগ পাওনি। আত্মার কয়েকটি অংশের মধ্যে একটি জান্তব দিক থাকে, যা মানুষকে ক্ষুধার তাগিদ দেয়। সেই তাগিদে মানুষ আহার্য গ্রহণ করে।
কিন্তু আমি আমার ক্ষুধা নিবারণের জন্য চুরি করে খাবার খাইনি। খাবার কিনে খাওয়ার জন্য কখনও কারও কোনোকিছু চুরি করিনি। কেড়ে নেইনি। কেউ আমার মলিন মুখ দেখে করুণা করে খেতে দিলে খেয়েছি। না হলে অভুক্ত কাটিয়েছি। তোমরা আমাকে চোর সন্দেহ করে এক দফা মারধোর করে খেতে দিয়েছো। আমি পরিতৃপ্তি সহকারে খেয়েছি। তোমাদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। এর আগে কখন শেষ খাবার খেয়েছিলাম, তা আমার মনে নেই। তোমাদের পরিবেশিত খাবারই যে যিশু খ্রিস্টের ‘লাস্ট সাপার’ এর মতো হবে, তা আমিও জানতাম না, তোমরাও জানতে না।
তোমরা আমাকে হত্যা করলে কেন? তোমরা কি ভেবেছিলে, আমি পেশাদার চোর, অতএব আমি মার খেয়ে খেয়ে অভ্যস্ত এবং তোমাদের শত আঘাতেও আমার প্রাণবায়ু নির্গত হবে না? শুরুতেই তোমরা উপসংহারে চলে গেলে কেন যে, আমিই তোমাদের মোবাইল চুরি করেছি এবং আমি ঢাকায় সংঘবদ্ধ মোবাইল চোরদের একজন? তোমরা মেধার জোরে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। আমার কথাবার্তার অসংলগ্নতাও টের পেলে না কেন? সন্দেহ বশে দু’চার ঘা দিয়ে আমাকে পুলিশের হাতে তুলে দিলেই তো তোমাদের আজ হত্যা মামলার আসামী হতে হতো না! তোমরা গ্রেফতার হয়েছো। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তোমাদের সাময়িকভাবে বহিস্কার করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অপরাধে আদালত তোমাদের দণ্ডিত করলে তোমাদের শিক্ষা জীবনেরও ইতি ঘটবে।
আমাকে হত্যা করে তোমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেও কলঙ্কিত করেছো। কতজন স্বপ্ন দেখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার। সুযোগ না পেয়ে হা-হুতাশ করে। তোমরা সে সুযোগ পেয়ে নিজেদেরও কলঙ্কিত করেছো। তোমরা তোমাদের অভিভাবকদের সম্মানহানির কারণ হয়েছো। তারা এখন মানুষের কাছে মুখ দেখাতেও লজ্জাবোধ করছেন। তোমাদের ভাইবোনেরা রাস্তায় বের হলে লোকজন বিদ্রƒপ করে বলবে, “ওই যে যায় খুনির ভাই বা বোন।” তোমরা যে মেয়েগুলোর সঙ্গে প্রেম করতে, তারা তোমাদের ঘৃণা করবে। লজ্জায় মুখ লুকাবে। আমার প্রেমিকা তো আমাকে ছেড়ে গিয়েছিল আমি সত্যি সত্যি মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছিলাম বলে। কিন্তু তোমরা তো তা ছিলে না। তবুও তোমরা আমাকে হত্যা করলে কেন?
Posted ৩:২৫ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৪
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh