ড. আশরাফ উদ্দিন আহমেদ : | বৃহস্পতিবার, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৫
‘আলোচনার শুরুতেই বলে রাখা প্রয়োজন যে স্বল্প পরিসরের নিবন্ধটিতে ফ্রিডম, লিবার্টি এবং অটোনমি প্রত্যয়গুলোকে মোটামুটি ভাবে সমার্থক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে এগুলোর মধ্যে ভিন্নতা থাকা সত্বেও। স্বাধীনতা’ নিয়ে আলোচনায় সাধারণত ভৌগলিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং সার্বভৌমত্ব সর্বাধিক গুরুত্ব পায়। কোন জনপদ, রাজ্য অন্য দেশের পদানত, অধীনস্ত নয়, অর্থ্যাত পরাধীন নয় এমন অবস্হাকে স্বাধীন বলা হলেও এমন সংজ্ঞায়ন সম্পূর্ণ নয়।
মনস্তাতিক দিকটি অবশ্যই সত্যিকার স্বাধীনতার বাস্তবতায়, উপলব্দিতে আসতে হবে, অন্যথায় ‘স্বাধীন’, ‘স্বাধীনতা’ প্রত্যয়গুলো অনেকাংশেই অর্থহীন রূপ পরিগ্রহ করবে। ব্যক্তি, কম্যুনিটি, সমাজ এবং দেশ পরিপ্রেক্ষিতে নিরাপত্তার অভাব স্বাধীনতা অনুভবে বা বাস্তবে তা ভোগ ক্ষুন্ন করে। উত্তম মাত্রায় নিরাপত্তার বিধান বা বেষ্টনী না থাকলে স্বাধীনতার স্বাদ পাওয়া যাবে না। স্বাধীনতা কথাটি একটি পবিত্র প্রত্যয় যা একটি মূর্তিমান বাস্তব। স্বায়ত্ব শাসন, অটোনমি, সার্বভৌমত্ব, ভৌগলিক সীমানা সুরক্ষার শক্তিশালী, যথাযোগ্য ব্যবস্হার আবিশ্যিক উপাদান থাকা অবশ্যই প্রয়োজন। ব্যতিক্রম, কলোনী বা অন্য রাষ্ট্রের অধীনস্ত হিসেবেই বিবেচিত হয়।
স্বাধীনতা লাভে সার্বভৌমত্ব অর্জন থাকে মূল উদ্দেশ্য। শান্তিপূর্ণভাবে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতা, নাকি জোরপূর্বক যে কোন ধরণের শক্তি, শাসন উৎখাত করে ক্ষমতা দখল তাও এখানে প্রাসঙ্গিক। শেষোক্ত ক্ষেত্রে তা বিপ্লব হতে পারে। মাধ্যম যাই হোক, জনগনের সন্তুষ্টি, শান্তি, নিরাপদে চলাফেরার, নির্ভয়ে মত প্রকাশের অধিকার, সুবিচার লাভের পরিবেশ সমন্বিত বিচার ব্যবস্হা অর্থবহ স্বাধীনতার রক্ষাকবচ। সরকারের জবাবদিহিতা, জনসাধারণের সপ্রতিভ, স্বতস্ফুর্ত সমর্থন ও আনুগত্য অবশ্যই অর্থবহ স্বাধীনতার স্বাদ পেতে প্রয়োজন।
রাজতন্ত্র যে সব দেশে সেগুলোও সার্বভৌম। পরাধীন না হলেও সেখানে স্বাধীনতার মূল্যবোধের প্রজ্জলন নেই; ভয়-ভীতি নিয়ে মানুষ জীবন-যাপন করে , সামাজিক রীতি-নীতি, কলা-কানুন, নিয়ন্ত্রণ মাধ্যম এবং প্রয়োগে জনসাধারণের তেমন কোন ভূমিকা নেই যে সব রাষ্ট্রে শাসন ব্যবস্হায় সাংগঠনিক প্রক্রিয়া অনুপস্হিত সেসব রাষ্ট্র ভৌগলিক ভাবে স্বাধীন হলেও মনস্তাতিক স্বাধীনতা সেখানে নেই। পৃথিবীতে এমন দেশের সংখ্যা নেহাৎ কম নয় । মধ্যপ্রাচ্যের বেশীর ভাগ দেশ এমন । আফ্রিকার ট্রাইবাল সমাজ ও জনপদগুলো ও এমনতরো। চেক এবং ব্যালান্স নেই, জনসাধারণের আনুগত্য নিজস্ব ট্রাইবের প্রতি বিদ্যমান থাকে এবং জনসাধারণের অংশগ্রহন না থাকায় বা নামকাওয়াস্তে থাকায় রাষ্ট্রীয় সংহতি সেখানে অনেকটা গৌণ। স্বাচ্ছাচারিতা, আধিপত্যবাদ দুষ্ট এমন রাষ্ট্রে নিয়মতান্ত্রিক সাংগঠনিক ব্যবস্হার প্রায়শই অনুপস্থিত থাকায় অরাজকতা, অসাম্য, অন্যায়, অনাচার এসবের প্রাধান্যই বেশী। রাজা এবং গোত্র প্রধানের ইচ্ছেই বিচার। তেমন দেশে, সমাজে স্বেচ্ছাচারিতা ব্যক্তি স্বাধীনতাকে নিত্যই ভূলুন্ঠিত এবং অর্থহীন বিষয়ে পর্যবসিত করে।
এমনতরো রাষ্ট্রে গঠনতন্ত্র প্রায়শই থাকে না। গণতন্ত্র ও স্বাধীনতা সমার্থক হওয়ার কথা থাকলেও অনেক গনতান্ত্রিক দেশে আধিপত্যবাদ প্রবল। গইতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও স্বাধীনতার দোহাই দিয়ে ক্ষুদ্র ও দূর্বল জনগোষ্ঠির উপর নির্যাতন নিত্যই ঘটছে। একমাত্র স্বচ্ছ, সংগঠন ব্যবস্হিত বিচার ব্যবস্হা এবং প্রক্রিয়া সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারে। রাজতন্ত্র , কতৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্হা, অগণতান্ত্রিক ভাবে সৃষ্ট এবং পরিচালিত রাষ্ট্রযন্ত্রে সুবিচার কদাচিৎ আশা করা যায়। সামাজিক অবিচারের প্রতিবাদ, প্রতিকার ব্যবস্থা না থাকলে রাষ্ট্র সমাজে বিদ্যমান শ্রেণীসমূহের প্রতিনিধিত্ব করতে নিশ্চয় অপারগ হবে। স্বাধীন, স্বাধীনতা এমনতরো পবিত্র প্রত্যয়, বিমূর্ত ধারণার প্রতিপক্ষ হিসেবে ইতিহাসে এমন রাষ্ট্রের পরিচিতি মানুষ ঘৃণার সাথে উল্লেখ করবে; শাসন, অত্যাচার, শোষণের কুখ্যাত ইতিহাস হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
Posted ১২:১৭ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৫
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh