ড. আশরাফ উদ্দিন আহমেদ : | বৃহস্পতিবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৫
শিরোনামটি পূর্ণ অবয়বে আসেনি। ইউনোস্কো দিবসটিকে আখ্যায়িত করেছিল World Book and Copyright Day or International Day of the Book নামে। সংক্ষেপ রূপ হিসেবে আন্তর্জাতিক বা বিশ্ব বই দিবস নামটিই অধিক পরিচিত। মুর্খজনেরা বলেন, কাজী নজরুল ইসলাম, রবীন্দ্র নাথ ঠাকুর প্রমুখ কবি, সাহিত্যিক, প্রবন্ধকার এঁদের প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যা-শিক্ষার তেমন উঁচুমানের সনদ ছিলো না। যে কথাটি অনেক দুর্জন স্বীকার করতে দ্বিধাবোধ করেন তাহলো তাঁদের সমতুল্য খ্যাতিমান সাহিত্য আচার্য উপমহাদেশে আজও জন্মেননি। সকল পর্যায়ের, ধরণের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তাঁদের সৃষ্ট জ্ঞানভান্ডার উদারভাবে (?) পড়ানো হয়, শেখানোর চেষ্টা করা হয়। তাঁদের সাহিত্যকর্ম বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছে যা তাদের জ্ঞান বিতরনে সহায়তা করছে নিরবধি ভাবে। বিশ্ব পুস্তক দিবসে গৌরবের সাথে নির্দ্ধিধায় বলা যায় রবীন্দ্র নাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম কিশোর বয়স থেকেই বই পড়া, গল্প , কেচ্ছা-কাহিনী শোনা, গান-গজল, ধর্মীয় শিক্ষা ইত্যাদি নানাবিদ মাধ্যমে বিদ্যার্জন করেছেন। তাঁরা তুমুল ভাবে বিদ্যালাভ করে স্বশিক্ষিত হয়ে জনপ্রিয়, দারুণভাবে সুশিক্ষিত, অনুকরণীয় ব্যাক্তিত্ব হিসেবে বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠা লাভ করেছেন জ্ঞানের মহীরুহ হিসেবে। প্রকৃতি থেকেও তাঁরা উদারভাবে পাঠ নিয়েছেন।
বাউন্ডেলে নজরুলের বেলায় এ অনুধাবন দীপ্ততার সাথে সত্য। মধ্যযুগে মুসলমান সাধকবৃন্দের জীবন, শিক্ষাদীক্ষা, অর্জন ইত্যোকার বিষয় পর্যালোচনায়ও এমনটিই মানসচক্ষে দৃশ্যমান হয়। জালালুদ্দিন রুমি, ওমর খৈয়াম প্রমুখ সুফী, সাধক, দার্শনিকদের বিদ্যাশিক্ষা তথা জ্ঞানার্জনের জন্য শরণাপন্ন হতে হয়েছে ওস্তাদ বা গুরু সমীপে। তাদের নিরন্তর সানুগ্রহ তত্তাবধানে, যত্নে তাঁরা শিক্ষা দীক্ষা লাভ করে জ্ঞানার্জন করেছেন। উপমহাদেশে গুরুর কৃপালাভ করে গুরুগৃহে শিক্ষা লাভ করে জীবনের এক সন্ধিক্ষণে নীরবে, নিভৃতে ধ্যানস্হ হতে হতো। বনে-জঙ্গলে নিভৃতচারী হয়ে কঠিন, কঠোর নিয়মসিদ্ধ তপস্যা করে তবেই জ্ঞানার্জন করে দেহ-মন ধাবিত হতো ইশ্বরমুখী। কনফুসিয়াস শিক্ষা ব্যবস্থা ও তেমনি গুরুনির্ভর কঠিন নিয়মের নিগড়ে আবদ্ধ ছিলো। ইসলামের মধ্যযুগে বাগদাদ, কর্দোভা, মরক্কো এসব স্থানে জোরদার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যবস্থা চালু। মূলত গ্রন্থ ভিত্তিক এ ব্যবস্থা ওস্তাদ বা শিক্ষকের সুনিপুণ তত্তাবধানে পরিচালিত হতো। সংক্ষেপে বলা যায় মানব সভ্যতার একটি বিস্তৃত সময়ে গুরু, ওস্তাদ এবং দার্শনিকদের কথন, বাণী শ্রবণ এবং তা আত্মস্থ করার মধ্যেই নিহিত ছিলো জ্ঞানার্জনের উত্তম মাধ্যম। পরিব্রজনের মাধ্যমে প্রকৃতিকে জানা, মানব সমাজ, সংস্কৃতি, ধর্ম, আচার, কানুন ইত্যোকার বিষয়ে পরিজ্ঞাত হওয়ার মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ নির্ভর শিক্ষা লাভের পদ্ধতিও বহু প্রাচীন এবং পরীক্ষিত।
বর্তমান সময়ে বলা হচ্ছে বই পড়া বা পুস্তক পাঠ সর্বজনীন ভাবে শিক্ষালাভ তথা জ্ঞানার্জনের সর্বাপেক্ষা উত্তম একটি মাধ্যম। জাতিসংঘের অনুসংগঠন ইউনেস্কো ১৯৯৫ সনের ২৩ এপ্রিলকে নির্দিষ্ট করেছে বিশ্ব পুস্তক দিবস (World Book and Copyright Day or International Day of the Book) হিসেবে। সেই থেকে প্রতি বছর এই দিনে দিবসটি পালিত হচ্ছে। উদ্দেশ্য হচ্ছে সর্বস্তরের মানুষকে বই পাঠে উৎসাহিত করা, পুস্তক প্রকাশনাকে অনুপ্রেরণা যোগান এবং কপিরাইট আইন মেনে চলায় উদ্ধুদ্ব করা। বিশেষ মর্যাদায় জাঁকজমকের সাথে দিনটি উদযাপনের লক্ষ্যে এক একটি শহরকে প্রতি বছর বেছে নেয়া হয়। একটি বিশেষ উপদেষ্টা কমিটি এ বাছাই করনের কাজটি করে থাকে। উল্লেখ করা যেতে পারে যে বিশ্ব পুস্তক রাজধানী হিসেবে নির্বাচিত হওয়া একটি গৌরবোজ্জল ব্যাপার।
ইতিহাস ঘাটলে প্রতীয়মান হয় যে ১৯২২ সালে বার্সেলোনার সার ভেন্টিজ (Cervantes) প্রকাশনা সংস্থার পরিচালক ভিন্সেন্ট ক্ল্যাভেনের (Vicente Claven) মস্তিস্ক প্রসূত এ ধারণাটি সর্বপ্রথম ৭ই অক্টোবর তার জ্ন্মদিন উৎসবে পালন করা হয়। পরবর্তীতে তারিখ বদলিয়ে তার মৃত্যু দিবসে (২৩ এপ্রিল ১৯৩০) তা উদযাপিত হয়। ক্ল্যাভেনের জন্মের শহর ক্যাটালিনা আড়ম্বরপূর্ণ ভাবে The Day of Books and Roses নামে দিবসটি পালন করা হয়।
পরিশেষে আশা করবো বিশ্ব পুস্তক বা বই দিবসটি উদ্দেশ্যের সাথে সংগতি রেখে যথাযথ মর্যাদায় পালন করে বই পাঠে আপামর জনসাধারনকে উদ্বুদ্ধ করার মহান লক্ষ্য অর্জনে আমরা সজাগ হই সাফল্যের সাথে। আসুন বই পাঠ করি শেখার জন্য, উত্তম মানুষ হওয়ার জন্য।
Posted ১১:৩৯ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৫
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh