আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু : | বৃহস্পতিবার, ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫
জুলাই বিপ্লবের সাফল্যের পর যা করা প্রয়োজন ছিল, তা করতে বিপ্লবীরা ব্যর্থ হওয়ায় আজ দেশজুড়ে নৈরাজ্য সৃষ্টি হয়েছে। বিপ্লবের এক নেতা, ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকান্ডকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থানে নতুন করে অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও লুণ্ঠনের ঘটনা ঘটছে। বিপ্লব চলাকালে এবং সাফল্য অর্জন পর্যন্ত বিপ্লবীদের মধ্যে যে ঐক্য ও শৃঙ্খলা ছিল এখন আর তা নেই। বিপ্লবকে ব্যর্থ করার অপচেষ্টায় লিপ্ত থাকাসহ ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী, তাঁর দলের প্রায় সমগ্র নেতৃত্ব এবং সাবেক মন্ত্রী ও ভেঙে দেওয়া দ্বাদশ জাতীয় সংসদের আওয়ামী লীগদলীয় প্রায় সব সদস্য, সাবেক সরকারের আমলে সুবিধাভোগীদের আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করে তুলতে ইন্ধন জোগানোর হাজারো অভিযোগ ভারতের বিরুদ্ধে থাকলেও কোনো দায়িত্বশীল অবস্থান থেকে দেশটির একটি অংশকে পৃথক করে ফেলার হুমকি দেওয়া রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত আচরণ বিপ্লবী চেতনার পরিপন্থি।
শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটায় ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার, এমনকি ক্ষমতার বাইরে থাকা কংগ্রেস নিদারুণ মনঃকষ্টে আছে। শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর প্রায় দেড় বছর কেটে গেছে। ইতোমধ্যে মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় তাঁর এবং ভারতে আশ্রিত তাঁর মন্ত্রিসভার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালের বিরুদ্ধে মৃত্যুদন্ডাদেশ দিয়েছে বিশেষ আদালত।
বাংলাদেশ সরকার একাধিকবার শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর অনুরোধ জানালেও ভারত তাতে সাড়া না দেওয়ায় ড. ইউনূসদের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে বিজেপি সরকারের টানাপোড়েন চলছে। এমন একটি পরিস্থিতিতে জুলাই বিপ্লবের নেতাদের দ্বারা গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা হাসনাত আবদুল্লাহর ভারত ভাঙার বক্তব্য এবং অন্যদের পক্ষ থেকে বাংলাদেশে নিয়োজিত ভারতের কূটনীতিকদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার হুমকি প্রদানের অর্থ হচ্ছে, দেশকে বিপদের দিকে ঠেলে দেওয়া।
ইতোমধ্যে ভারত বাংলাদেশে তাদের দুটি ভিসা কেন্দ্র বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে।
এখন দেশে যে পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে, তা যদি ২০২৪-এর ৫ আগস্ট থেকে শুরু হয়ে কয়েক দিন পর্যন্ত চলত, তা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিপ্লবোত্তর পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতো। বিপ্লব শুরু হয়েছিল অভিন্ন একটি লক্ষ্য অর্জনের জন্য। কিন্তু এখন যা ঘটছে তা বিপ্লবের অন্যতম নেতা ও বিপ্লবীদের সাহস জোগানোর স্তম্ভ শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকান্ডে ক্ষুব্ধ তরুণদের প্রতিক্রিয়া হিসেবে। আওয়ামী লীগের মতো অশুভ একটি দল, যারা দেশকে নয়, দেশবাসীকে নয়, যারা ভালোবাসে ও পূজা করে ব্যক্তির, যে ব্যক্তির যাবতীয় অপকর্ম, এমনকি প্রতিপক্ষকে নির্মূল করাও সিদ্ধ বলে মনে করে, গত দেড়টি বছর তারা নিশ্চিন্তে বসে ছিল ভাবলে বোকার স্বর্গে বাস করার শামিল হবে।
তাদের নেতারা ভারতে পালালেও দলটির কর্মীরা তো হাওয়ায় মিলিয়ে যায়নি। আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের অসংখ্য কর্মী ঘাপটি মেরে অলিগলিতে আমাদের মাঝেই অবস্থান করে ওত পেতে আছে দেশে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করার জন্য। হাদিকে তারা টার্গেট করেছিল তাঁর আশপাশে অবস্থান করেই। তারা ভারতের প্রতিও গভীর ভালোবাসা পোষণ করে। ভারত যে কোনো সময় যে কোনো উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তাদের নিরাপদ আশ্রয়। তাদের জন্য ভারতের সীমান্ত অবারিত। তারা বিনা অনুমতিতে, বিনা ভিসায় সীমান্ত পাড়ি দেয়। অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রমের অভিযোগে বাংলাদেশি নাগরিকদের গুলি করে হত্যায় পারঙ্গম ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) সদস্যরা আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের বিনা ভিসায় সীমান্ত অতিক্রমকে অবৈধ বিবেচনা করে না। তাদের ওপর গুলিও চালায় না। ওসমান হাদি ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। আওয়ামী লীগের পৃষ্ঠপোষকতা লাভকারী ভারতপ্রেমিক বাংলাদেশি বুদ্ধিজীবীদের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। অতএব তিনি ভারতের শত্রু। একই কারণে তিনি আওয়ামী লীগেরও শত্রু। তিনি ছিলেন পড়াশোনা জানা তরুণ। যুক্তি খন্ডনে অনন্য একজন সুবক্তা। শ্রোতারা তাঁর কথা শুনত মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে।
আওয়ামী লীগ তাঁকে তাদের জন্য নিরাপদ ভাবেনি, ভারতও তাঁকে নিরাপদ ভাবেনি। অতএব এই নির্ভীক তরুণ নেতাকে আওয়ামী লীগ ও ভারতের কোপানলে পড়ে অসময়ে বিদায় নিতে হয়েছে। তারা জানত ওসমান হাদির মতো এক অনলবর্ষী নেতাকে হত্যা করার প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে। তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ীই সব হয়েছে। তরুণরা রাস্তায় নেমে এসেছে। ভাঙচুর করেছে, আগুন দিয়েছে। কিন্তু এর মাঝে গত দেড় বছর ধরে ক্ষমতার স্বাদ, চাঁদাবাজির বখরাবঞ্চিত আওয়ামী গুন্ডা-মাস্তানরা এই নৈরাজ্যকে উসকে দেয়নি এবং হামলায় অংশগ্রহণ করেনি, তা বিশ্বাসযোগ্য হতে পারে না। দিল্লি থেকে নেত্রীর উসকানি তো ছিলই।
বিপ্লব সফল হওয়ার দেড় বছর পর নৈরাজ্যে নতুন উপসর্গ যোগ হয়েছে দুটি সংবাদপত্র প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার অফিসে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধন এবং দুটি সাংস্কৃতিক সংগঠন উদীচী ও ছায়ানট কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। ঢাকায় সংবাদপত্র অফিসে এর আগেও হামলার ঘটনা ঘটেছে। ২০২৪ এর ৫ আগস্টের পর বিভিন্ন মিডিয়া হাউসে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। তার আগে দৈনিক আমার দেশ ও দৈনিক সংগ্রাম অফিসে হামলা হয়েছে এবং দুটি দৈনিকের সম্পাদককেই শারীরিকভাবে নাজেহাল ও গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
আওয়ামী লীগের ভারত প্রেমে কোনো রাখঢাক নেই। ভারতের প্রতি প্রথম আলো এবং ডেইলি স্টার-এর অনুরাগ সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ কেন পত্রিকা দুটির ভূমিকায় চরম অসন্তুষ্ট ছিল তা অনেকের কাছেই দুর্বোধ্য। শেখ হাসিনা টানা তৃতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে ২০২৩ সালের ১০ এপ্রিল জাতীয় সংসদে বক্তব্যদানকালে প্রথম আলোর নাম উল্লেখ করে বলেন : “স্বনামধন্য এক পত্রিকা, খুবই পপুলার, নাম তার প্রথম আলো। কিন্তু বাস করে অন্ধকারে। প্রথম আলো আওয়ামী লীগের শত্রু, প্রথম আলো গণতন্ত্রের শত্রু, প্রথম আলো দেশের মানুষের শত্রু। আমি এটা অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলি যে এরা কখনো এই দেশের স্থিতিশীলতা থাকতে দিতে চায় না।”
আওয়ামী লীগের শাসনামলে দীর্ঘদিন প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার সরকারি বিজ্ঞাপন থেকেও বঞ্চিত ছিল। তবু তারা সংবাদপত্র দুটির অফিসে হামলা চালানোর জন্য তাদের মাসলম্যানদের পাঠায়নি। একাধিক রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সংগঠন বিশেষ করে প্রথম আলো অফিসের সামনে মানববন্ধন করেছে, স্লোগান দিয়েছে। কিন্তু কখনো হামলা চালায়নি। তাদের কোনো সাংবাদিককে নাজেহাল করেনি। এমনকি জুলাই বিপ্লবের পর পত্রিকা দুটি তাদের ভূমিকায় কোনো পরিবর্তন আনেনি। অনেকে ক্ষুব্ধ হয়ে তাদের অফিসের সামনে গিয়ে বিক্ষোভ করেছে। ওসমান হাদির এ সময়ের এক বক্তৃতায় দেখা যায়, তিনি বলছেন, “এই যে প্রথম আলোর অফিসের সামনে যারা দাঁড়িয়ে আছে, আমরা কি তাদের পক্ষে দাঁড়িয়েছি? আমরা বলি, না। আপনি পারলে প্রথম আলোর বিকল্প আরও ১০টি প্রথম আলো তৈরি করেন। তার অফিসের সামনে আপনার কাজটা কী?”
এবার পত্রিকা দুটি এবং উদীচী ও ছায়ানট অফিসে হামলা ও অগ্নিসংযোগের মতো ব্যতিক্রমী ঘটনা ঘটল কেন? আওয়ামী লীগ ও তাদের কোলঘেঁষা বাম দলগুলোর সহজ উত্তর, “হামলাকারীরা ছিল, জামায়াত-শিবির ও উগ্র মৌলবাদী গোষ্ঠীর লোকজন। তাদের মাথায় টুপি, গায়ে লম্বা পাঞ্জাবি, মুখে দাড়ি ছিল এবং তারা আল্লাহু আকবর ধ্বনি দিয়েছে।” এ ধরনের অভিযোগকারীরা কিছু সময়ের জন্য ভুলে যেতে পছন্দ করেন যে ‘আওয়ামী ওলামা লীগ’ নামে আওয়ামী লীগের একটি লেজুড় আছে, মাইজভান্ডারিদের তরকিত ফেডারেশনসহ নানা চামচা ধর্মীয় সংগঠন আছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে লোভনীয় তোহফা পেয়ে তাঁকে ‘কওমি জননী’ খেতাব প্রদানকারী কোনো কোনো সংগঠনের কর্মী-সমর্থকরা বরং দাড়ি-টুপি-পাঞ্জাবি ছাড়া পথেই নামে না। ওসমান হাদির হত্যাকান্ডের প্রতিক্রিয়ায় বিক্ষোভের আগুন সংবাদপত্র ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের অফিস পর্যন্ত নিয়ে স্থাপনাগুলোকে ধ্বংস করায় তাদের ইন্ধনের বিষয়টি আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর গোয়েন্দারা বিবেচনায় রাখতে পারেন।
একটা বিপ্লব সফল হওয়ার পর বিপ্লবী সরকারের পরিবর্তে কেবল ‘সততার গুণসমৃদ্ধ ও আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত’ একজন ব্যক্তিত্বের নেতৃত্বে ঢিলেঢালা অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করে তাদের হাতে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব ন্যস্ত করা যে কতটা অসংগত হয়েছে, এখন তা পদে পদে অনুভূত হচ্ছে। এই সরকারে দুজন বিপ্লবীকে নেওয়া হয়েছিল। এখন একজনও বিপ্লবীও সরকারে নেই। বিপ্লবের ফসল হিসেবে বিপ্লবী সরকার গঠন না করার অর্থ ছিল বিপ্লবকে মাঝপথে ছেড়ে দেওয়া।
ফরাসি বিপ্লবের মহানায়কদের অন্যতম ছিলেন এক তরুণ, যাঁর নাম ‘লুই আন্তোয়ে ডে-সে-জুয়ে’। ১৭৮৯ সালে বিপ্লব শুরু হওয়ার সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র ২২ বছর। ২৬ বছর বয়সে তিনি ‘ফ্রেঞ্চ ন্যাশনাল কনভেনশন’-এর প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। একজন চরমপন্থি বিপ্লবী হিসেবে তিনি বলতেন, ‘যারা অর্ধেক বিপ্লব করে, তারা প্রকৃতপক্ষে নিজেদের কবর খনন করে। বিপ্লবকে সফল করতে হলে শত্রুকে নির্মূল করা জরুরি। শত্রুকে ক্ষমা করে তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখলে একদিন তারাই বিপ্লবীদের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।’
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান হাদির হত্যাকান্ড জুলাই বিপ্লবকে মাঝপথে থামিয়ে বিপ্লবী চেতনা থেকে নিজেদের গুটিয়ে ফেলার অনিবার্য পরিণতি। হাদির হত্যাকান্ড থেকে বিপ্লবীরা যদি কোনো শিক্ষা গ্রহণ না করে, তাহলে আরও কজন হাদিকে ঘাতকের গুলির শিকার হতে হবে, তা আন্দাজ করে বলা কঠিন। তবে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বহুল কাঙ্ক্ষিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন যে ঝুঁকির মাঝে পড়বে, তা বুঝতে কারও সমস্যা হওয়ার কথা নয়।
Posted ১১:৫৭ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh