ড. আশরাফ উদ্দিন আহমেদ : | বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি ২০২৬
প্রায় ছয় বছর পর রতনপুর-মাদাডগডা গ্রামের বাড়িতে আসার আজ সাতটি মূল্যবান দিবস কেটে গেলো। হাড় কাঁপানো শীতের কারণ ঘরের বাইরে যাওয়া খুব একটা হয়ে ওঠেনি। শীত উপেক্ষা করে একদিন জগদীশপুর সাবরেজিষ্ট্রি অফিসে গিয়েছিলাম। কাজ শেষ করা যায়নি। কারণ একই জমি ভিন্ন ভিন্ন পরিমাণে দুজন ক্রেতা। এ কারণে দুটি দলিল করতে হয়েছে। পড়ন্ত বেলায় মাত্র একটি দলিল উপস্থাপনের কারণে একটিই রেজিস্ট্রেশন হয়েছে। কি কারণে সাথের অন্য দলিলটি উপস্থাপিত হলোনা তা রহস্যাবৃত হলেও অনুমানের অতীত নয়। এই যদি হয় গ্রামগঞ্জের অতি নিকটে অবস্থিত এ রকম একটি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের সেবার নমুনা তাহলে দুর্নীতি কিভাবে সাধারণ মানুষকে অবর্ণনীয় অসহায় অবস্থায় নিপতিত করেছে তা ভাবলে যুগপৎ কষ্ট এবং আফসোস হয়। দেশ কোন পথে চলছে প্রশ্ন আসে! জনসাধারণের ভোগান্তি হয় যে দুর্নীতির কারণে তা যখন স্থানীয় পর্যায়ে স্থান করে নেয় তখন জবাবদিহিতার অবস্থা কেমন তা সহজেই অনুমান করা যায়।

আমাদের ক্ষুদে আমলা এবং তাদের কর্ম সম্পাদনে সহায়তাকারী অধিকাংশের মানবিক চরিত্রে যে ধস নেমেছে তা সহজেই অনুমান করা যায়। নিত্য নৈমিত্তিক কর্মপ্রবাহে ঘুষের আদান প্রদানের এই যে প্রবণতা তা নষ্ট সংস্কৃতিতে পরিণত হয়ে প্রাতিষ্ঠানিক হওয়ার পর্যায়ে চলে এসেছে। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া অদৌ সম্ভব হবে কিনা তা নিয়ে কোন পজিটিভ আশাবাদ করার উপায় খোঁজার কোন বিকল্প দেখিনা। নৈতিক অবক্ষয় রোধ করা কঠিন কাজ। বিকল্প হিসেবে গণজবাবদিহিতা প্রক্রিয়া শুরু করা গেলে হয়তো জনসাধারণের কাছ থেকে সাধারণ কাজ সম্পন্ন করতে নিন্ম প্রশাসনিক পর্যায়ে যে ঘুষ বানিজ্য প্রথা তা কিছুটা হলেও বন্ধ হতে পারে।
তবে, বিপরীত চিত্র দেখেছি নোয়াপাড়া ইউনিয়ন পরিষদ দপ্তরে। তরুণ চেয়ারম্যান সৈয়দ আতাউল মোস্তফা সোহেলের দপ্তরে খানিকক্ষণ ছিলাম। সাথে ছিল আমার ভাগিনা তপু মেম্বার। সে আবার বাংলাদেশে বহুল আলোচিত ব্যক্তিত্ব। ইউনিয়ন পরিষদের ওয়ার্ড মেম্বার নির্বাচনে এক ভোটে হারার বিষয় চ্যালেঞ্জ করে আদালতের শরণাপন্ন হয়েছিল। আদালতের রায়ে ভোট পুনঃগণনার করলে সে ৫৩৩ ভোটে জয়ী হয়েছে সিদ্ধান্ত হয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশন কর্তৃক তপু সসম্মানে দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে। এ ব্যাপারে যারা দোষী তা সাব্যস্ত করে বিচারিক শাস্তি দীর্ঘসুত্রিতায় প্রলম্বিত হচ্ছে।
এ ধরণের বিচারিক প্রক্রিয়া ত্বরায় মীমাংসিত হলে তা উদাহরণ হিসেবে কাজ করতে পারে বলে আমার ধারণা। সম্মানিত স্নেহাস্পদ চেয়ারম্যান আমাকে অভ্যর্থনা জানিয়ে অফিসে নিয়ে গেলে সেখানে বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের সাক্ষাত পাই। বেশীর ভাগই মহিলা। জন্ম, মৃত্যু নিবন্ধন, ওযারিশান সনদ ইত্যোকার কাজে তারা এসেছেন। আমার সাথে কথা বলছেন টুকটাক তারপরও দক্ষতার সাথে কাজ করে যাচ্ছিলেন। গ্রামের মানুষজনের মাঝে কোনরকম সংকোচ লক্ষ্য করিনি। বুঝতে কষ্ট হয়নি যে চেয়ারম্যান মহোদয় জনসাধারণের কাছে সমাদৃত মানুষ। তিনি তাদেরই প্রতিনিধি হিসেবে তাদের অন্তরে আপনজন হিসেবে স্থান করে নিতে সমর্থ হয়েছেন। মানবিক সম্পর্কের যে অনানুষ্ঠানিক দিক এ দপ্তরে দেখেছি তা আমাকে স্থানীয় সরকারের এ গুরুত্বপূর্ণ স্তরের কার্যকারিতা এবং ব্যবহারবিধির ব্যাপারে আশার আলো দেখিয়েছে। সোহেলের মত মানবিক চেয়ারম্যানগণ গ্রাম বাংলাদেশের সমাজ চিত্র বদলে দিতে পারবেন – এ প্রতীতি আমার মনে জমেছে। দৃঢ় ধারণা জন্মেছে, সুস্থ মন মানসিকতা সম্পন্ন জনপ্রতিনিধি তারাই যারা তাদের দরোজা হামেশাই খোলা রাখেন বিভিন্ন কাজে আসা জনসাধারণের অবাধ প্রবেশের জন্য।
গ্রামের একশ্রেণীর মানুষ দারুণ কষ্টের মধ্য দিয়ে দিনাতিপাত করছে। গত পাঁচ বছর পূর্বে গ্রামের বাড়িতে আসলে আমি যা দেখিনি বর্তমান সময়ে তা দেখছি। গ্রামে নির্মাণ কাজে নারী ও শিশু শ্রমিক দেখে হতচকিত হয়ে পরেছি। পুরুষ শ্রমিকদের পাশাপাশি তারা কায়িক পরিশ্রমের কাজ করছেন। এ ধরণের কাজের মাধ্যমে রুজি-রোজগার স্পষ্টতই বলে দেয় যে গ্রামীন মানুষদের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো নেই। সামাজিক শ্রেণি বিন্যাস ব্যবস্থায় দৃশ্যমান পরিবর্তনের ইংগিত ও এতে পাওয়া যায়। দশ বছরের যে ছেলেটির স্কুলে থাকার কথা সে আজ নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে উদয়াস্ত অমানুষিক কায়িক পরিশ্রম করছে। যে নারী কয়েক বছর পূর্বে ঘরসংসারে কাজ করতো সে আজ শ্রমিকের কাজ করছে পুরুষ শ্রমিকের সাথে সমানতালে। এতে গর্ব করার মতো সমাজতাত্মিক ব্যাপার থাকলেও গ্রামীণ অর্থনীতির পর্যুদস্ত অবস্থার ইংগিত দেয়। কিছু ফটকাবাজ, দালাল শ্রেণীর লোক ভালো আছে। বিত্তহীন সৃষ্টি হচ্ছে বিরামহীনভাবে। নতুন পুরাতন মিলিয়ে বিত্তহীন শ্রেণীর বিস্তৃতি ভয়াবহ এবং করুণ। যতই প্রাচুর্যের কথা প্রচার করা হয় তা যে সর্বাংশে সত্যি নয় তা ব্যথিতচিত্তে এ যাত্রা প্রত্যক্ষ করলাম।
প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন লক্ষ্য করার মতো। শিক্ষক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা জোরদার এবং নিয়মিতকরণ এক্ষেত্রে সুফল নিয়ে এসেছে। প্রয়াত প্রধান মন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সময় মহিলাদের প্রাইমারী শিক্ষা ব্যবস্থায় অধিক সংখ্যায় নিয়োগ যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত ছিল। এ ধারা পরবর্তী সময়ে ও চালু রাখায় বিশেষত মেয়েরা লাভবান হয়েছে, জাতি লাভবান হয়েছে।
পরিবেশ জগৎ ভালো নেই। রঘুনন্দন পাহাড় ন্যাডা হয়ে গেছে। বনজ সম্পদ, যেমন ছন, বাঁশ, শাল, সেগুনসহ নানান জাতীয় গাছপালা চোখে পরে না যেমন নেই বন্য জীবজন্তু। বনমোরগের যে আধিক্য ছোটবেলায়, অর্থ্যাৎ ১৯৫০-৬০ সময়ে দেখেছি তার ছিঁটেফোটা এখন দেখা যায় না। মায়াহরিণ বা বার্কিং ডিয়ার বছর খানেক পূর্বে শুনেছিলাম দেখা যায় কিন্তু এ যাত্রায় খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম যে একটি বহর ত্রিপুরার রঘুনন্দন অংশ থেকে মাইগ্রেট করেছিল সেগুলো হাওয়া হয়ে গেছে। অধিক সংখ্যক মানুষের আনাগোনা, অপ্রতুল খাবার, নিকটবর্তী দূরত্ব আবাস নির্মাণ, পানি পানের উৎস পাহাড়ি ছড়াগুলো শুকিয়ে যাওয়া, বন-জঙ্গল, গাছপালা, শনজাতীয় ঘাসগাছড়া সাফসুতরা করে পেলে মানুষ পরিবেশের যে অপূরণীয় ক্ষতি করেছে তার খেসারত আমরা দিচ্ছি।
প্রকৃতি আর আমাদের উদারতার দরোজা তেমন করে উন্মুক্ত করে দিচ্ছে না, দিতে পারছেনা। সরকারী বনভূমি বেদখল হয়ে যাচ্ছে পরিদর্শন, পরিচর্যার অভাবে। স্থানীয় পর্যায়ে বনবিভাগের পাহাড় জঙ্গল, সম্পদ, জীবজন্তু, পানির উৎস এসব ব্যবস্থাপনায় গাফিলতি সুবিদিত কিন্তু এ বাহিনীকে পর্যবেক্ষণ, তদারকি করা, দায়বদ্ধতা দেখার কোন অথরিটি আছে বলে মনে হয়না। যথাযথ বিট পুলিশিং ছাড়া বনরক্ষা আকাশকুসুম কল্পনামাত্র। একই সমান্তরালে পরিবেশ রক্ষার ব্যবস্থাও ব্যবস্থিত। সচেতন জনসাধারণ এবং বন, পরিবেশ বান্ধব বনকর্মীর যৌথ প্রচেষ্টায়ই এ ক্ষেত্রে সুফল বয়ে নিয়ে আসতে পারে। গ্রাম বাংলাদেশ ভালো নেই!
Posted ২:৪৬ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি ২০২৬
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh