আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু : | বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ ২০২৬

বিশ্বজুড়ে ছোটবড় সকল লাইব্রেরি থেকে কিছু কিছু বই চুরির ঘটনা সবসময় ঘটে। বই চুরির কিছু ঘটনা ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছে। বই পড়ুয়াদের প্রায় সবাই জীবনের কোনো না কোনো বই চুরি করেছেন, অথবা বই পড়তে নিয়ে প্রকৃত মালিককে আর ফেরত দেননি, অর্থ্যাৎ মেরে দিয়েছেন। বলতে দ্বিধা নেই, আমি নিজেও বন্ধুবান্ধবের কাছ থেকে বই নিয়ে বেশ ক’টা গুরুত্বপূর্ণ বই মেরে দিয়েছি। বই চুরি করিনি। মেরে দেওয়া বইগুলো এখনও আমার সংগ্রহে আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করার মাঝামাঝি সময়ে এক বন্ধু আমাকে তার বাসায় নিয়ে যান। তার বুকশেলফে রাশি রাশি মোটা মোটা ইংরেজি বই দেখে বিস্মিত হই এবং মন্তব্য করি যে, বইয়ের পেছনে তিনি বিপুল অর্থ ব্যয় করেছেন। তিনি অবলীলায় বলেন যে, একটা বইও তিনি কেনেননি, ব্রিটিশ কাউন্সিল লাইব্রেরি থেকে চুরি করেছেন। ঢিলেঢালা জামার ভেতরে বই লুকিয়ে ফেলতেন। কেউ কখনও সন্দেহ করেনি।
ব্রিটিশ কাউন্সিলের অবস্থান আমার হলের দেয়াল ঘেঁষা। আমার বন্ধুর কাছে আরও জানতে পারি যে, অনার্স পরীক্ষার ঠিক আগে আমাদের হলের এবং আমাদের ব্যাচের দুজন ছাত্র বই চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়েন। ব্রিটিশ কাউন্সিল পুলিশে খবর দেয়। পুলিশ হল প্রভোস্টকে জানান। হল প্রভোস্ট একজন হাউজ টিউটরকে পাঠান। জিজ্ঞসাবাদে তারা স্বীকার করে যে বেশ কিছু বই তারা চুরি করেছেন এবং অধিকাংশ বই তাদের গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছেন। পুলিশ তাদের নিয়ে তাদের বাড়ি গিয়ে চুরি করা বই উদ্ধার করে। অনার্স ও মাস্টার্স পরীক্ষার ফরম পূরণের আগে বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি, ব্রিটিশ কাউন্সিল লাইব্রেরি ও আমেরিকান সেন্টারের লাইব্রেরি থেকে ক্লিয়ারেন্স নিতে হতো। হল কর্তৃপক্ষ ব্রিটিশ কাউন্সিলের সাথে আলোচনা করে তাদের ক্লিয়ারেন্সের ব্যবস্থা করেন। তাদের ওপর থেকে বড় ধরনের ফাড়া কেটে যায়।
সেরা বই চুরির কয়েকটি দৃষ্টান্ত উল্লেখ করছি:
কার্নেগি লাইব্রেরির বই চোর গ্রেগরি প্রিওরে
পিটসবার্গের কার্নেগি লাইব্রেরি থেকে বিজ্ঞানি আইজ্যাক নিউটনের গণিতের নীতিমালার একটি কপি চুরি হয়ে গেছে, যার মূল্য ২০২০ সালের হিসেবে ছিল এক মিলিয়ন ডলার। উনবিংশ শতাব্দীতে জার্মান অনুসন্ধানীর তৈরি ১.২ মিলিয়ন ডলার মূল্যের একটি অ্যাটলাস চুরি হয়েছে। আরও শত শত মূল্যবান বই ও দলিল চুরি হয়েছে ওই লাইব্রেরি থেকে। এজন্য অভিযোগ আনা হয় কার্নেগি লাইব্রেরির দুর্লভ গ্রন্থ সেকশনের সাবেক আর্কিভিষ্ট গ্রেগরি প্রিওরে এবং ক্যালিবান বুক শপের মালিক জন শুলম্যানকে। তাদের সংগ্রহ থেকে এবং নেদারল্যান্ড ও লন্ডনে যাদের কাছে বিক্রয় করেছিলেন তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় ৮ মিলিয়ন ডলার মূল্যের দুর্লভ বই, মানচিত্র এবং অন্যান্য দলিল। ১৯৯২ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত সময়ে তারা এসব সংগ্রহ করেছিলেন। গ্রেগরি চুরি করে শুলম্যানের কাছে বিক্রয় করতেন।
কেমব্রিজের গ্রাজুয়েট বই চোর জ্যাক
কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটির গ্রাজুয়েট উইলিয়াম জ্যাক ২০০৪ থেকে ২০০৭ সালের মধ্যে রয়েল হর্টিকালচার সোসাইটি লাইব্রেরি থেকে ৪০ হাজার পাউন্ড মূল্যের ১৩টি গুরুত্বপূর্ণ দুর্লভ গ্রন্থ চুরির এক পর্যায়ে ধরা পড়েন। ঢিলেঢালা জ্যাকেট পরিধান করে তিনি লাইব্রেরিতে আসতেন এবং জ্যাকেটের ভেতরের বড় বড় পকেটে বই ঢুকিয়ে সহজে লাইব্রেরি থেকে বের হয়ে আসতেন। এর আগেও নব্বই দশকের শেষদিকে জ্যাককে এক মিলিয়ন ডলার মূল্যের দুর্লভ বই চুরির দায়ে চার বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।
সেরা বই চোর স্টিফেন ব্লুমবার্গ
বিপুল সংখ্যক বই চুরির দায়ে ১৯৯১ সালে বিচার করা হয় আইওয়া স্টেটের বাসিন্দা বিয়াল্লিশ বছর বয়সী স্টিফেন সি ব্লুমবার্গ। আমেরিকার ৪৫টি স্টেট ও কানাডার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের লাইব্রেরি থেকে চুরি করেছিলেন ২০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের ২৩ হাজার ৬শ’র বেশি বই। শেষ পর্যন্ত তিনি ধরা পড়েন। তাকে ধরিয়ে দেন তারই এক বন্ধু কেনেথ রোডস, যার সঙ্গে ব্লুমবার্গের আর্থিক লেনদেনের ঝামেলা ছিল। স্টিফেন নিজের দোষ স্বীকার করেন যে এক ধরনের হ্যালুসিনেশন বা মতিভ্রমের কারণে তিনি দুর্লভ বই চুরি করতেন। সাইকিয়াট্রিস্টরা তাকে সিজোফ্রেনিক বলে শণাক্ত করেন। স্বচ্ছল অবস্থা ছিল তার এবং চুরি করা বই কখনো বিক্রি করেননি। তাকে ৭১ মাসের কারাদণ্ড এবং ২ লাখ ডলার জরিমানা করা হয়।
Posted ১০:৪৫ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ ২০২৬
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh