বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬ | ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

Weekly Bangladesh নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত
নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত

শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকারের ব্যবচ্ছেদ

আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু :   |   বৃহস্পতিবার, ২৮ মে ২০২৬

শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকারের ব্যবচ্ছেদ

ভারতে আত্মনির্বাসিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘খুব শীঘ্র’ দেশে ফিরবেন বলে হিন্দুস্তান টাইমসকে দেওয়া এক ইমেইল সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন। বাংলাদেশ ‘তাঁর দেশ, তাঁর বাবার দেশ’, অবশ্যই ফিরে আসবেন। যখনতখন আসবেন। তবে তাঁর ফিরে আসা নির্ভর করে বাংলাদেশে ‘গণতান্ত্রিক পরিবেশ’-এর ওপর। তাঁর কথা শুনে ৩০০ বছর আগের বাঙালি কবি ভারতচন্দ্র রায়ের (১৭১২-১৭৬০) কবিতার লাইন মনে পড়েছে : ‘শিলা জলে ভাসি যায়, বানরে সংগীত গায়, দেখিলেও না হয় প্রত্যয়—-।’ ২০০৯ থেকে ২০২৪-এর জুলাই পর্যন্ত তিনি ও তাঁর দল জাতিকে গণতন্ত্রের যে সবক দিয়েছে, তাতে অন্তত তাঁর ও তাঁর দলের লোকজনের মুখে ‘গণতন্ত্র’ শব্দটি মানায় না।

তিনি আসবেন। আসতে চাইলে অবশ্যই আসবেন। এর আগেও তিনি এসেছিলেন। যে জিয়াউর রহমানের শাসনামলকে তিনি ‘অগণতান্ত্রিক’ বলতে দ্বিধা করেন না, ১৯৮১ সালের ১৭ মে সেই বিএনপির ‘অগণতান্ত্রিক’ শাসনামলেই তিনি “‘ধনধান্য পুষ্প ভরা, আমাদের এই বসুন্ধরা’য় অর্ধযুগের বেশি সময় পর তার পাদপদ্ম রেখে এই ভূখণ্ডকে আরও ধন্য করেছিলেন। সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, “আমার জন্য ১৭ মে অত্যন্ত আবেগময় ও স্মরণীয় দিন।” তাঁর জীবন থেকে দুটি স্মরণীয় ১৭ মে চলে গেছে, তাঁর দেশে ফেরা হয়নি।

শেখ হাসিনা আশঙ্কা করছেন, বিএনপির বর্তমান শাসনে বাংলাদেশে বিএনপি-জামায়াত জোটের ২০০১-২০০৬ ক্ষমতার মেয়াদের মতো “কালোদিন” ফিরে আসতে পারে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলেই বাংলাদেশে “স্বর্ণযুগ” বিরাজ করে, আর অন্য কোনো দল বা গোষ্ঠী ক্ষমতায় গেলে বাংলাদেশের দিনগুলো ঘোর “কালো” সকল কিছু গ্রাস করে তাঁরা ক্ষমতায় না থাকলেই দেশের “স্বাধীনতা বিপন্ন হয়”, “বাকস্বাধীনতা ও আইনের শাসন থাকে না,” —- এই বদ্ধমূল ধারণাগুলো যত দিন আওয়ামী মনমানসে বিরাজ করবে, তত দিন দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরে আসবে না।
তিনি দেশ থেকে তাঁর অনুপস্থিতিকে নিজের “নীরবতা” মনে করেন না। তিনি “প্রতিমুহূর্তে দেশের জন্য লড়াই করছেন’” এবং “কূটনৈতিক পর্যায়ে, আন্তর্জাতিক আইনগত কাঠামোতে সক্রিয় রয়েছেন” এবং আন্তর্জাতিক মিডিয়ার মাধ্যমে’ কাজ করছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে তাঁর দলের বিরুদ্ধে “নীরব রাজনৈতিক গণহত্যা” চালানো হয়েছে বলেও তিনি অভিযোগ করেছেন এবং এ পরিস্থিতি থেকে জীবন বাঁচাতে আওয়ামী লীগের বহু নেতা-কর্মী দেশ ত্যাগে বাধ্য হয়েছেন, যাঁরা “ন্যূনতম গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা” হওয়ামাত্র বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করবেন বলে সাক্ষাৎকারে তিনি উল্লেখ করেছেন।

১৯৮১ সালের ১৭ মে শেখ হাসিনার দেশে প্রত্যাবর্তনের সঙ্গে তার এবারের “খুব শীঘ্র প্রত্যাবর্তন”-এর আকাংখার বেশ পার্থক্য রয়েছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পিতাসহ তার নিজ পরিবার এবং তার সম্প্রসারিত পরিবারের অনেক সদস্যকে হত্যার পর প্রায় সাত বছর নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে পঁয়তাল্লিশ বছর আগে তিনি যখন ভারত থেকে বাংলাদেশে আসেন, তখন তাঁর বিরুদ্ধে কোনো মামলা ছিল না। কিন্তু এবার মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের একটি মামলায় তারই প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) তাঁর অনুপস্থিতিতে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন।

অনুরূপ আরও কিছু মামলা বিচারাধীন আইসিটিতে। মামলাগুলো জামিন অযোগ্য। তাঁর সাবেক সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামালের বিরুদ্ধে একটি মামলায় তাঁকেও মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আইসিটি। আরও অনেক সাবেক আওয়ামী মন্ত্রী, নেতা, আওয়ামী সমর্থক সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবীর বিরুদ্ধে হত্যা মামলা বিচারাধীন। দেশে যদি “ন্যূনতম আইনের শাসন” না-ও থাকে, তবু বিদ্যমান আইনের আওতায় দেশে প্রত্যাবর্তনমাত্রই আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার করবে, অথবা তাঁকে আদালতে আত্মসমর্পণ করতে হবে। উচ্চ আদালত তাঁর বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় পুনর্বিবেচনা এবং রায় পর্যালোচনা করে আইনি ফাঁকফোকর পেলে তাঁকে বেকসুর খালাস দিতে পারেন। এটাই আইনি অবস্থান।

আওয়ামী যুগে মানবতাবিরোধী অপরাধ ও হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এবং রাষ্ট্রদ্রোহের মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত বেশ কজন ব্যক্তি অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে তাঁদের নির্বাসিত জীবনের অবসান ঘটিয়ে দেশে প্রত্যাবর্তন করে আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। তাঁদের কারাগারে পাঠানো হয়। তাঁদের বিরুদ্ধে রায়গুলো উচ্চ আদালত পর্যালোচনা করেন এবং অভিযুক্তরা বেকসুর খালাস পান। এ ছাড়া দীঘদিন যাবৎ কারাগারে আটক তিনজন রাজনৈতিক নেতা, যাঁরা তাঁদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার অপেক্ষায় ছিলেন। তাঁরা বিচারিক পর্যালোচনায় কারামুক্ত হয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন, “তাঁরা হচ্ছেন, বিএনপির সাবেক দুই মন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর ও আবদুস সালাম পিন্টু এবং জামায়াতে ইসলামীর এ টি এম আজহারুল ইসলাম।” শেখ হাসিনা ও তাঁর দলের অভিযুক্ত নেতাদেরও একই বিচারিক প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের রাজনীতিতে পুনর্বাসিত হতে হবে।

দ্বিতীয় আরেকটি পন্থাও সম্ভবত আছে। বিএনপি সরকার শেখ হাসিনার প্রতি যদি সদয় হয়, তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের করা অন্যান্য মামলা এবং তাঁর সাবেক সরকারের মন্ত্রী এবং দলের নেতা ও দলীয় স্তাবকদের বিরুদ্ধে হওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধ ও হত্যার মতো গুরুতর অভিযোগের মামলাগুলো প্রত্যাহার করে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে পুনর্বাসনের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।

তৃতীয় একটি পথ হচ্ছে, আওয়ামী লীগের পক্ষে একটি বিপ্লব ঘটিয়ে গণেশ পাল্টে দেওয়া। যদিও এমন শোনা যায়, বিএনপি সরকার আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতি দিয়েই ক্ষমতায় এসেছে। গত ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে আওয়ামী ভোটারদের প্রতি শেখ হাসিনার নির্দেশ ছিল বিএনপি প্রার্থীদের ভোট দেওয়ার ইত্যাদি।

তবে রাজনীতিতে এমন উদারতা দেখা যায় না। বিশেষ করে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস যেখানে প্রীতিকর তো নয়ই, রীতিমতো প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার। জিয়া পরিবারকে কি না বলেছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে সদম্ভে বলেছেন, “জিয়া খুনি, খালেদা জিয়া খুনি, তারেক জিয়া খুনি, তাঁদের বিচার হবে” (ডেইলি স্টার, ৩০ ডিসেম্বর ২০২৩)। মুক্তিযুদ্ধে জিয়ার অবদান অস্বীকার করেছেন, তাঁর মাজার সরিয়ে ফেলতে চেয়েছেন। তিনবারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে তাঁর বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করেছেন। সাজানো মামলায় কারাগারে পাঠিয়েছেন। তাঁকে পাকিস্তানি তকমা দিয়ে বলেছেন : “এ্যয় মেরি জান পিয়ার কি দামান, আঁখো কি তারা, আসমান কি চান, মেরি জান, পাকিস্তান” (বাংলা ট্রিবিউন, ২৩ জুন, ২০২২)। জঘন্য ভাষায় তাঁর কুৎসা রটনা করেছেন। এমনকি নৈতিক ও রাজনৈতিক শিষ্টাচার ভুলে খালেদা জিয়ার চিকিৎসা নিয়ে ব্যঙ্গবিদ্রুপ করে বলেছেন : “সে এভারকেয়ার, বাংলাদেশের সব থেকে দামি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছে। আর রোজই শুনি এই মরে মরে, এই যায় যায়। বয়স তো আশির ওপর। মৃত্যুর সময় তো হয়ে গেছে,” (দৈনিক ইনকিলাব, ৩ অক্টোবর ২০২৩)।’

সাবেক প্রধানমন্ত্রী যা কিছু বলেছেন, তাঁর অনুচরেরা এসবকে আরও ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে বলার মধ্যে একধরনের বিকৃত আত্মপ্রসাদ লাভ করেছেন। এসব বোলচালকে রাজনৈতিক বিশ্রম্ভালাপ বলে যদি উড়িয়েও দেওয়া হয়, তাহলে আওয়ামী লীগের টানা সাড়ে ১৫ বছরের সময়কালে বিএনপিকে রাজনীতি থেকে চিরতরে বিদায় করতে দলটির হাজারো নেতা-কর্মী খুন, গুম, লাখ লাখ নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে সাজানো মামলায় আটক ও পালিয়ে বেড়ানোর ঘটনা তারা যদি “যা হওয়ার হয়েছে” বলে ক্ষমা করে দিতে পারত, তাহলে বাংলাদেশ এত দিনে পৃথিবীতেই এক খণ্ড বেহেশতে পরিণত হতে পারত। আওয়ামী লীগ তার প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারে বা ক্ষমতায় যাওয়ার ক্ষেত্রে ভারসাম্যে পরিণত হতে পারে, এমন কোনো দলকে কখনো ছাড় দেয়নি, বিএনপি আওয়ামী লীগকে ছাড় দিয়ে যে ভুল করেছে, ভবিষ্যতে তা করবে বলে মনে হয় না।

তা ছাড়া শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ তিনটি নির্বাচনি নাটকের মঞ্চায়ন করে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, সে দৃষ্টান্তের অর্ধেকও যদি বিএনপি অনুসরণ করে, তাহলেও ক্ষমতায় যাওয়ামাত্র ফ্যাসিবাদী হয়ে ওঠা আওয়ামী লীগকে বিএনপি সরকার খুব সহজে পুনর্বাসনের সুযোগ দেবে বলে মনে হয় না।

শেখ হাসিনা নির্বাচনি গণতন্ত্রকে স্বৈরাচারে রূপান্তরিত করে তাঁর বহুল কথিত ‘আইনের শাসন’কে কবরস্থ করে দেশকে পরিপূর্ণ অনাচারের শাসন উপহার দিয়েছিলেন। রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী হিসেবে তিনি কোনো ভারসাম্য ছাড়াই ক্ষমতা প্রয়োগ এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে তাঁর এমন সব তাঁবেদারকে নিয়োগ দিয়েছিলেন, যাঁরা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের চেয়ে তাঁর পদস্পর্শ করার জন্য বেশি ব্যস্ত থাকতেন। ফলে আমাদের চোখের সামনেই ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’ সর্বগ্রাসী নির্বাচিত একনায়কতন্ত্রে পরিণত হয়েছিল এবং বাংলাদেশ পরিণত হয়েছিল শেখ হাসিনাশাসিত একদলীয় রাষ্ট্রে। রাষ্ট্র কাঠামোর এ ধরনের পরিণতিকে একজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বর্ণনা করেছেন, ‘ডেমোক্রিসাইড’ বা ‘গণতন্ত্র হত্যা’ হিসেবে।

চব্বিশের জুলাই বিপ্লব না ঘটলে বাংলাদেশ দায়মুক্ত ক্ষমতা অপব্যবহারের এক অবাধ লীলাভূমির রূপ লাভ করত, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তাঁকে বিশেষ পরিস্থিতিতে জীবন রক্ষার্থে তড়িঘড়ি দেশ থেকে পালাতে হয়েছে। যেহেতু ‘জান বাঁচানো ফরজ’, অতএব দেশ ত্যাগ করে তিনি যেমন অন্যায় করেননি, একজন নাগরিক হিসেবে নিজ দেশে ফিরে আসার অধিকারও তাঁর আছে। সরকার তাঁর প্রত্যাবর্তনের ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা জারি করেনি। আইনের শাসনের প্রতি তিনি যদি সত্যিই শ্রদ্ধা পোষণ করেন এবং যদি তিনি মনে করেন, আদালত তাঁর বিরুদ্ধে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়নি, তিনি আদালতের সেই সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করতে পারেন। তাঁর প্রত্যাবর্তন ও রাজনৈতিক পুনর্বাসনের জন্য অনেকে অপেক্ষমাণ।

Posted ১০:৩০ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২৮ মে ২০২৬

Weekly Bangladesh |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আমরা মরি কেন?

(968 বার পঠিত)

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১
১৩১৫১৬১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭৩০  
Dr. Mohammed Wazed A Khan, President & Editor
Anwar Hossain Manju, Advisor, Editorial Board
Corporate Office

86-47 164th Street, Suite#BH
Jamaica, New York 11432

Tel: 917-304-3912, 718-523-6299 Fax: 718-206-2579

E-mail: [email protected]

Web: weeklybangladeshusa.com

Facebook: fb/weeklybangladeshusa.com

Mohammed Dinaj Khan,
Vice President
Florida Office

1610 NW 3rd Street
Deerfield Beach, FL 33442

Jackson Heights Office

37-55, 72 Street, Jackson Heights, NY 11372, Tel: 718-255-1158

Published by News Bangladesh Inc.