রওশন হক : | বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট ২০২৬
ইতিহাস কখনো কখনো অদ্ভুতভাবে ফিরে আসে। শুধু চরিত্র বদলে যায়, সময় বদলে যায়, বদলে যায় ক্ষমতার কেন্দ্র। কিন্তু দেশপ্রেমের সার্টিফিকেট বিলির রাজনীতি থেকে যায়। ১৯৭২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ‘উইকলি হলিডে’ সম্পাদক এনায়েতুল্লাহ খান তাঁর বহুল আলোচিত কলামে লিখেছিলেন ‘সিক্সটি ফাইভ মিলিয়ন কোলাবরেটরস?’ স্বাধীনতার পরপরই ‘কোলাবরেটর’ শব্দটির রাজনৈতিক ব্যবহারের বিরুদ্ধে তিনি যে প্রশ্ন তুলেছিলেন, তার প্রাসঙ্গিকতা আজও শেষ হয়ে যায়নি। তাঁর ব্যঙ্গাত্মক প্রশ্নের ভেতরে ছিল একটি গভীর রাজনৈতিক সত্য : যুদ্ধের সময় কে কোথায় ছিল, সেটি দিয়ে কি মানুষের দেশপ্রেমের সম্পূর্ণ হিসাব করা যায়? সীমান্ত পেরিয়ে যাওয়া যেমন দেশপ্রেমের একমাত্র প্রমাণ নয়, তেমনি দেশে থেকে যাওয়াও কারও দেশপ্রেমের স্বয়ংক্রিয় সনদ নয়। ইতিহাস মানুষের অবস্থান নয়, তার ভূমিকা ও ত্যাগের হিসাব রাখে। অথচ আমাদের রাজনীতি বারবার সেই হিসাবটাকেই গুলিয়ে ফেলেছে।
১৯৭১-এর পর যারা ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন, তাদের ত্যাগ ও দুর্ভোগকে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু সেই আশ্রয়কে যদি পরবর্তী ৫৪ বছর ধরে রাজনৈতিক পুঁজি বানানো হয়, আর দেশের ভেতরে থেকে যারা যুদ্ধের সময় ও পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে জীবন কাটিয়েছেন, তাদের অবদানকে আড়াল করা হয়, তাহলে ইতিহাসের প্রতি চরম অন্যায় হয়। আজ সেই পুরোনো প্রশ্নটি নতুন পোশাকে আমাদের সামনে দাঁড়িয়েছে।
গত ১৭ বছর যারা বিদেশে ছিলেন, তাদের অনেকেই তখন দেশের রাজপথে ছিলেন না। এমনকি নিউইয়র্কে থাকার পরও অনেককেই সামান্য প্রতিবাদ করতে রাস্তায় নামানো যায়নি । চমৎকার সুশীল হয়ে ছিলেন । থাক নাম না লিখি। কেউ কেউ বিদেশে বসে রাজনীতি করেছেন, সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরব ছিলেন। তাদের ভূমিকা থাকতেই পারে। কিন্তু বিদেশে থাকা এবং রাজনৈতিক ত্যাগ স্বীকার করা এক জিনিস নয়।
দেশের রাজনীতি যখন দমন-পীড়নের মধ্য দিয়ে গেছে, তখন কত মানুষ চাকরি হারিয়েছেন, ব্যবসা হারিয়েছেন, মামলা খেয়েছেন, জেলে গেছেন, বাড়িঘর বিক্রি করে মামলার খরচ চালিয়েছেন, রাতের পর রাত পালিয়ে থেকেছেন, পুলিশের ভয়ে সন্তানকে স্কুলে পৌঁছে দিতে পারেননি, তাদের গল্পগুলো কোথায়? তাদের অনেকের নাম কোনো সংবাদ সম্মেলনের ব্যানারে নেই। কোনো বিদেশি সেমিনারের মঞ্চেও নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের চকচকে ছবিতেও নেই। কিন্তু রাজনীতির কঠিন দিনগুলোতে তারাই ছিল মাঠে। রাজনীতিতে ত্যাগের একটি অদ্ভুত স্বভাব আছে। ত্যাগের সময় তার কোনো দর্শক থাকে না। ক্ষমতার সময় তার কোনো দাম থাকে না। আর যখন ক্ষমতা আসে, তখন ত্যাগীদের অনেকেই দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকেন, আর দরজার ভেতরে ঢুকে পড়েন তারা, যারা ঠিক সময়ে ঠিক মানুষের প্রশংসা করতে জানেন। এখানেই আজকের প্রশ্নটি সবচেয়ে বেশি জরুরি।
তারেক রহমান, আপনি কি ত্যাগীদের মূল্যায়ন করছেন, নাকি আপনার চারপাশে তৈরি হওয়া প্রশংসার বলয়কেই মূল্যায়ন করছেন? আমরা নয়নকে নিয়ে ট্রল করি। রাকিবকে নিয়ে মজা করি। তাদের সরলতা, আবেগ কিংবা রাজনৈতিক আচরণ নিয়ে হাসাহাসি করি। কিন্তু একটু থামুন। এই নয়নই তো গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করতে করতে এমন অবস্থায় পৌঁছেছিল যে, তাকে মৃত ভেবে তার দেহ পর্যন্ত পোস্টমর্টেমের জন্য পাঠানো হয়েছিল। তার মাথায় ড্রিল করবার সময় জেগে উঠেছিল অলৌকিকভাবে আল্লাহ তাকে বাঁচিয়ে দিয়েছেন। অথচ আজ সেই নয়নকেই দিয়ে নানা রকম আকাম-কুকাম করানো হচ্ছে।
আর রাকিব? তার শরীরের ক্ষতচিহ্ন হয়তো কোনোদিন মুছে যাবে না। সেই ক্ষত শুধু শরীরের নয়, একটি সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতারও সাক্ষী। শেষ পর্যন্ত সেই ছেলেগুলোকে দেখা যাচ্ছে আপনার গাড়ির পেছনে ছুটতে। নয়ন-রাকিবদের রাজনৈতিক বোধ হয়তো নিখুঁত নয়। তাদের ভাষা হয়তো পরিশীলিত নয়। পোশাক হয়তো অভিজাত নয়। তারা হয়তো ইংরেজিতে চমৎকার বক্তৃতাও দিতে পারে না। কিন্তু রাজনীতি কি কেবল পরিশীলিত ভাষা, দামি পোশাক আর ইংরেজি উচ্চারণের নাম? নাকি রাজনীতির আসল সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে সেই মানুষগুলোর মধ্যে, যারা কঠিন সময়ে রাস্তায় থাকে, গুলি খায়, মামলা খায়, জীবন বাজি রাখে এবং বিনিময়ে কোনো পদ-পদবি দাবি করে না?
নয়ন-রাকিবদের নিয়ে আমরা হাসতে পারি, ট্রল করতে পারি। তাদের রাজনৈতিক ভুল নিয়ে সমালোচনা করতেই পারি। কিন্তু তাদের ত্যাগকে হাসির বিষয় বানানোর আগে আমাদের মনে রাখা উচিত, ক্ষমতার মঞ্চে দাঁড়িয়ে যারা আজ বড় বড় কথা বলছে, তাদের অনেকের চেয়ে এই অখ্যাত ছেলেগুলোর শরীরেই হয়তো রাজনীতির সত্যিকারের ইতিহাস বেশি লেখা আছে। যে মানুষটি পুলিশের গুলি খেয়েছে, যে মামলা খেতে খেতে সর্বস্বান্ত হয়েছে, যে নিজের জমি বিক্রি করে দলের মামলা চালিয়েছে, যে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে বছরের পর বছর অপমান সহ্য করেছে, তার ত্যাগ কি একজন প্রবাসী রাজনৈতিক কর্মীর চেয়ে কম?
প্রবাসে থাকা কোনো অপরাধ নয়। বরং বিদেশে থেকেও দেশের জন্য কাজ করা সম্মানের। যোগ্যতা থাকলে প্রবাসীরা অবশ্যই দেশের প্রশাসন, অর্থনীতি, কূটনীতি কিংবা রাজনীতিতে অবদান রাখবেন। কিন্তু প্রবাসী হওয়াকে যদি রাজনৈতিক যোগ্যতার বিশেষ সনদ বানানো হয়, আর মাঠের কর্মীর ক্ষতচিহ্নকে অদৃশ্য করে দেওয়া হয়, তখন প্রশ্ন উঠবেই। আজ দেশের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে কাদের বসানো হচ্ছে, সেটি দেখলেই সেই প্রশ্ন আরও জোরালো হয়।
যোগ্যতার সঙ্গে যদি তেলবাজি যোগ্যতার বিকল্প হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে বিপদ। কারণ তেলবাজ মানুষ ক্ষমতায় থাকা মানুষকে শুধু তার নিজের মুখটাই দেখায়। সে বলে, সব ঠিক আছে। সে বলে, আপনি অসাধারণ। সে বলে, আপনাকে ঘিরে সবাই ঐক্যবদ্ধ। অথচ বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা ত্যাগী কর্মীটি হয়তো চুপ করে ভাবছে, ‘আমরা তাহলে এতদিন কী ছিলাম?’ রাজনীতির সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি তখনই ঘটে, যখন নেতা নিজের চারপাশের আয়নাগুলোকে সত্য বলে বিশ্বাস করতে শুরু করেন। তেলবাজরা কখনো নেতাকে তার দুর্বলতা দেখায় না। তেলবাজরা প্রশ্ন করে না। ত্যাগী কর্মী করে। ত্যাগীরা কখনো অভিমান করে, কখনো প্রতিবাদ করে, কখনো ভুলও করে। কিন্তু তাদের রক্তের সঙ্গে রাজনীতির সম্পর্ক থাকে।
ক্ষমতার করিডোরে নতুন মুখ দেখা যাওয়া কোনো সমস্যা নয়। সমস্যা তখনই, যখন সেই নতুন মুখগুলোর পেছনে অতীতের কোনো ত্যাগের ইতিহাস নেই, অথচ তাদের সামনে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয় সেই মানুষগুলোর, যারা বছরের পর বছর রাজনৈতিক ঝড়ের মধ্যে দলকে ধরে রেখেছে।
আমরা আজ সরাসরি জানতে চাই: গত ১৭ বছরে যারা দলের জন্য জেল খেটেছেন, মামলা খেয়েছেন, অর্থনৈতিকভাবে নিঃস্ব হয়েছেন, রাজপথে থেকেছেন, তাদের রাজনৈতিক খাতা কোথায়? আর যারা আজ বড় বড় পদে বসছেন, তাদের গত ১৭ বছরের খাতাটাই বা কোথায়?
দেশপ্রেম কি একটি নির্দিষ্ট সময়ে বিদেশ থেকে নেতার সঙ্গে যোগাযোগ রাখার সার্টিফিকেট? দেশপ্রেম কি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েকটি পোস্ট? দেশপ্রেম কি নেতার প্রতিটি কথায় হাততালি দেওয়া? নাকি দেশপ্রেম হলো সেই সময় পাশে থাকা, যখন পাশে দাঁড়ানোর জন্য কোনো পদ নেই, কোনো সুবিধা নেই, কোনো পুরস্কার নেই? রাজনীতিতে ত্যাগের কোনো শর্টকাট নেই। যে কর্মী ক্ষমতার বাইরে থেকেও দলের পতাকা বহন করেছে, তার মূল্যায়ন ক্ষমতায় এসে না করলে সেই ক্ষমতা একদিন অর্থহীন হয়ে যায়।
কারণ দল শুধু নেতা দিয়ে তৈরি হয় না। দল তৈরি হয় সেই অগণিত মানুষের ঘাম, চোখের জল, মামলা, জেল, রক্ত আর অপেক্ষা দিয়ে, যাদের নাম কখনো ইতিহাসের বড় অক্ষরে লেখা হয় না। তারেক রহমানের প্রতি আমাদের একটি প্রত্যাশা তাই থাকতেই পারে। আপনি আপনার চারপাশের করতালির শব্দের চেয়ে দূরে দাঁড়িয়ে থাকা ত্যাগী মানুষের নীরবতাটা শুনুন। যারা আপনাকে প্রশংসা করছে, তাদের সবাইকে সন্দেহ করার দরকার নেই। কিন্তু যারা আপনার জন্য সব হারিয়েও কোনোদিন আপনার কাছে কিছু চায়নি, তাদের ভুলে যাওয়ারও কোনো অধিকার আপনার নেই।
কারণ তেলবাজরা ক্ষমতার সঙ্গে থাকে। ত্যাগীরা ইতিহাসের সঙ্গে থাকে। আজ যারা বড় পদে বসেছেন, তারা হয়তো কালও থাকবেন, হয়তো থাকবেন না। কিন্তু নয়ন, রাকিব কিংবা তাদের মতো হাজার হাজার অখ্যাত কর্মীর শরীরের ক্ষত, তাদের হারানো জীবনের বছরগুলো, তাদের বিক্রি করা জমির দলিল, তাদের জেলখাটার দিনগুলো, তাদের পরিবারের কান্না কোনো পদায়নের তালিকা দিয়ে মুছে ফেলা যাবে না। ১৯৭২ সালে এনায়েতুল্লাহ খান প্রশ্ন করেছিলেন, ‘সিক্সটি ফঅইভ মিলিয়ন কোলাবরেটরস?’ আজ, ৫৪ বছর পর আমাদের প্রশ্ন অন্য রকম : দেশপ্রেমের সার্টিফিকেট আবার কারা বিলি করছে? আর তার থেকেও বড় প্রশ্ন : যারা সবচেয়ে কঠিন সময়ে পাশে ছিল, ক্ষমতার সবচেয়ে সহজ সময়ে তাদের পাশে কে দাঁড়াবে? ইতিহাসের শিক্ষা খুব নির্মম। ক্ষমতা ত্যাগীদের ভুলে গেলে একদিন ক্ষমতাই ত্যাগীদের হাতে লেখা ইতিহাসের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য হয়। কারণ ক্ষমতার মঞ্চে আলো অনেক থাকে।কিন্তু ইতিহাস শেষ পর্যন্ত আলো নয়, ক্ষতচিহ্নই মনে রাখে।
Posted ১:২৭ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট ২০২৬
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh